LSD কী মাদক নাকী অন্যকিছু? – একটি ক্রিটিক্যাল আলোচনা

এলএসডি কী মাদক নাকী অন্যকিছু – একটি ক্রিটিক্যাল আলোচনা

এই লেখাটি এলএসডির ব্যাপারে জানাশোনা ও সচেতনতা নিয়ে লেখা। এটি পড়ে কেউ অতি আবেগে কোন জানাশোনা ছাড়াই নিজের মুখে এলএসডি রাখতে যাবেন না। কিছু হলে কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। সেইসাথে সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনা কোনভাবেই কাম্য নয়। তবে এ ব্যাপারে বাইনারি দৃষ্টিকোণ থেকে ঘটনাকে বিচার করে ফেলাটাও উচিত নয়। এজন্য এই লেখাটি ক্রিটিক্যাল পয়েন্ট অব ভিউ থেকে লেখার চেষ্টা করেছি। আশা করি আপনারা সেভাবেই পুরো লেখাটি পড়বেন ও চাইলে আপনার সুবিবেচ্য মতামতও জানাতে পারেন। ধন্যবাদ।

এলএসডি নিয়ে সম্প্রতি যে ঘটনা ঘটে গেলো তার সূত্র ধরে এটা নিয়ে অনেক কথামালার সূত্রপাত ঘটেছে। এখান থেকে একটা জিনিস ভেবে দেখার বিষয় যে, প্রতিটি জিনিসই উপযুক্তভাবে না বুঝে শুনে কিংবা নিছক কৌতূহলবশত করতে গেলে এবং সমাজে যখন কোন বিষয় ট্যাবু হয়ে থাকে তখন এগুলো থেকে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

আমরা মানুষরা সবকিছুই অতিরঞ্জিত করে দেখতে ও দেখাতে পছন্দ করি, যার কারণে কোন ঘটনা ঘটলে এর গভীরে অনুসন্ধান না করে এর প্রান্ত নিয়েই টানাটানি করি। যে ঘটনা ঘটেছে তা অতি ভিন্নরকম ও আশ্চর্যজনকভাবে ঘটেছে বিধায় এটা মনকে আকৃষ্ট করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু করোনায় অসংখ্য মানুষ যে মারা যাচ্ছে এটা আমাদের মনের কাছে অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে যার এই ঘটনা একটু চান্ঞ্চল্যকর বলে লাগাটাই স্বাভাবিক।

যাইহোক, এই ঘটনা নিঃসন্দেহে অনাকাঙ্ক্ষিত একটি ঘটনা। তবে এরজন্য কী এলএসডি পুরোটাই দায়ী না একে না জেনেশুনে এর অপ্রস্তুত ব্যাবহার ও সামাজিক ট্যাবু দায়ী তা একটু খতিয়ে দেখার চেষ্টা করব।

এলএসডি কী? এটা কী করে? এর কার্যবিধি কী এটা না বুঝে অনেকেই অনেক কিছু অনুমান করে ফেলতে পারি। কিন্তু বিষয়টাকে একটু ক্রিটিক্যালি দেখতে হবে আমাদের। তার জন্য আমাদের একটু অতীতে চলে যেতে হবে। আসুন ঘুরে আসা যাক।

১৯৫০ সালে এর পরবর্তীতে এলএসডি নিয়ে নানা ধরনের গবেষণাই করা হয়। একে নিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যাবহার করে অনেক অত্যাশ্চর্য অভিজ্ঞতা অনেকের মুখেই শোনা গেছে। ১৯৬০ সালের দিকে আমেরিকান হিপি আন্দোলনের সময় এলএসডি, গাঁজা এসব নিয়ে একপ্রকার বিপ্লবই শুরু হয়ে যায়। এছাড়াও এলএসডির বন্দনার পিছনে অনেক বিখ্যাত বিখ্যাত ব্যক্তিদের নামও চলে আসে স্টিভ জবস, বিল গেটস, মাইক টাইসন, টেরেন্স ম্যাকেনা থেকে শুরু আরও অনেকেই এর ইতিবাচক প্রভাবের কথা বর্ণনা করেন। এদের মধ্যে ইংরেজ ঔপন্যাসিক এলডক্স হাক্সলি তো সাইকেডেলিক এসব উপাদান নিয়ে তো একটি বই-ই রচনা করে ফেলেন।

এসব নিয়ে যখন আপনি গবেষণা করতে যাবেন তখন এলএসডিকে আপনার নিছক মাদকদ্রব্য বলে মনে হবেনা। কেননা সারাবিশ্বের অনেক জায়গায় মানসিক বিকার থেকে শুরু করে মদ, সিগারেট, কোকেন, মেথ এসব মাদকদ্রব্যের নেশা কাটাতে এই এলএসডি ব্যাবহারে সুফলের দেখা পাওয়া গেছে। অনেক অনেক জায়গায় মানসিক রোগসহ অতীতের মানসিক আঘাত, ট্রমা এগুলোর চিকিৎসায় এই এলএসডির সুফল পাওয়া গেছে বলে অজস্র গবেষণাপত্র রয়েছে।

তো এত এত সুফলতার সংবাদ এলএসডি ব্যাবহারে অনেককেই আগ্রহী করে তোলে। কিন্তু সমস্যা হলো এর সুফল থাকলেও এই সাইকেডেলিকের ব্যাপারে সঠিক জানাশোনা ও ভুলভাবে ব্যাবহার করলে এটা আপনাকে খারাপ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি ফেলে দিতে পারে। যারা এসব গ্রহণ করে তাদের এরকম ব্যাড ট্রিপের অনেক রিপোর্টও রয়েছে। এ থেকে মনে হয় সম্প্রতি যে ঘটনা সংঘটিত হয়েছে সম্ভবত তা এর ব্যাপারে যথেষ্ট জানাশোনার অভাব থেকেই হয়েছে। নিছক কৌতূহল, জোর জবরদস্তিতে এবং এটা নেওয়ার পর সামনে কোন বিপদজনক জিনিসপত্র থাকলে বা এটা নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়লে এ থেকে যে দূর্ঘটনা ঘটবে তা বলাই বাহূল্য।

এ কারণে যারা এসব নিয়ে গবেষণ করেন তারা সবসময় বলেন যে, এটার ব্যাবহার একজন অভিজ্ঞ কারও সাহচর্যে ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে মুক্তমন নিয়ে করলে এটা থেকে ভালো রেজাল্ট পাওয়া যায়। কিন্তু অনেকেই নতুন অভিজ্ঞতা, নিছক কৌতূহল এবং পূর্ণাঙ্গ জানাশোনা না করে দূর্ঘটনা ঘটিয়ে বসে।

এটাতো গেল এলএসডির ব্যাবহার বিষয়ে। কিন্তু বাইরের দেশেও এখনও অনেক জায়গায় এ নিয়ে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। অবশ্য কয়েক মাস আগে গাঁজা বাইরের দেশসহ ভারতে বৈধ করে দেওয়া হয়েছে। অবশ্য গাঁজাও বিপদ বয়ে আনতে পারে যদি একেও সঠিকভাবে ব্যাবহার করা না হয়। এটা অতি সহজ হিসাব।

কিন্তু আমাদের সমাজে স্বাভাবিকভাবে কী হয়…যে কোনকিছুকেই আমরা কোন কাহিনী ঘটনার সাথে সংযুক্ত করে ট্যাবু বানিয়ে ফেলি বা একটা বিপদজনক জিনিসকে স্বাভাবিক বানিয়ে ফেলি। যেমন এর একটা উদাহারণ হল সিগারেট ও মদের প্রচলন আছে। অথচ এ দুইটি আপনার মানসিক অবস্থাকে বিপর্যস্ত করে তুলতে পারে বা এ থেকে রোগব্যাধি হতে পারে। অন্যদিকে সাইকেডেলিক যে দ্রব্যসমূহ আছে তা গাঁজা থেকে উন্নত। (গাঁজাটা মূলত মধ্য পর্যায়ে আছে তবে অসংলগ্ন ব্যাবহারে এটাতেও সমস্যা আছে।)

গবেষণা থেকে পাওয়া গেছে এলএসডি নন-এডিকটিভ। এটা বারবার সিগারেট বা মদের মত আর্জেন্সি তৈরী করেনা। অনেক রিপোর্টেও পাওয়া গেছে যে, এলএসডি একবার কী দুইবার নেবার পর অন্যান্য নেশা তো দূর হয়ে গেছেই সেইসাথে এটাও তার নেবার আর কোন চাহিদার উৎপত্তি হয়নি।

এসব পড়ার পর মনে হতে পারে, আমি এলএসডির পক্ষে কথা বলছি। ব্যাপারটা মূলত পক্ষ, বিপক্ষের না। একটা জিনিসের ভালো-খারাপ দুটি দিকই রয়েছে। আমরা নরমাল যে ঔষুধও খাই ওটারও সাইড ইফেক্ট আছে বরং তা এলএসডি থেকে শতগুণ বেশী। তারপরও আমরা খাই। কেন? কেননা এটা একদিক দিয়ে ভালোও করে এবং সামাজিকভাবে আমরা এই ঔষধগুলোর ব্যাপারে অবগত এবং এ নিয়ে অনেক জানাশোনা উন্মুক্ত। তাই ঔষধ কেউ লুকিয়ে লুকিয়ে খায়না, বা এটা নিয়ে চোরা চালানি ব্যাবসাও করেনা।

কিন্তু এদের মধ্য থেকে গুটিকয়েক বিষয় নিয়ে আমাদের সমাজে জানাশোনা ও গবেষণা না থাকায় এটা নিয়ে ট্যাবু হয়ে যাবার ফলে এগুলোর ভুলভাল ব্যাবহারের কারণে যত্রতত্র দূর্ঘটনাও ঘটছে।

এলএসডিসহ অন্যান্য সাইকেডেলিক দ্রব্য মদ, সিগারেট, কোকেন, ইয়াবার মত নয়। এগুলোর কোনটাতে কতটুকু রিস্ক আছে তা আমি আমার সাইকেডেলিক ব্লগ সিরিজের পাঁচটি পর্বে ব্যাখ্যা করেছি পর্যায়ক্রমে। চাইলে নিচের লিঙ্ক থেকে তা দেখে আসতে পারেন।

Psychedelics 5 part Blog Series

 

এই রিস্কের সম্ভাবনা থেকে দেখা গেছে যে, সাইকেডেলিক দ্রব্যগুলোতে রিস্ক তেমন নেই বললেই চলে। অথচ সিগারেট, মদে শারীরিক ক্ষতির হার সবচেয়ে বেশী পরিসংখ্যানে পাওয়া গেছে।

এছাড়াও সাইকোডেলিক গ্রহণে এরকম অনাকাঙ্ক্ষিত দূর্ঘটনা মিলিয়ে দেখলে অন্যান্য দূর্ঘটনায় মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশী।

হ্যাঁ, এটা অস্বীকার করা যায়ন যে, এলএসডি সেবনে এক ধরনের উচ্চমাত্রিক অভিজ্ঞতা ব্যক্তির সাথে ঘটে। এখন এই অভিজ্ঞতা নিয়ে সে ছাদের কিনারে দাঁড়ালে সে ছাদ থেকে লাফ দিয়ে পড়ে তার জীবননাশ করে ফেলতে পারে অথচ ঐ ব্যক্তি কোন টেরও পাবেনা। এরকম দূর্ঘটনা এড়ানোর জন্য ব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রিত ও অভিজ্ঞদের সাহচর্যে এটা সেবনের কথা বলা হয়। নিচের এই ভিডিওতে একজন তার এলএসডির অভিজ্ঞতা নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে বর্ণনা করছেন।

এছাড়া এলএসডি সেবনে কোন শয়তান আপনার ওপরে আছড় করেনা বা কেউ আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করেনা। এটাকে বলা যেতে একপ্রকর সুররিয়ালিস্টিক বাস্তবতা। এ কারণেই অনেকে এতে আগ্রহী হয়। কিন্তু এরজন্য সচেতনতা প্রথমে প্রয়োজন। কারণ অনেকক্ষেত্রেই জানা গেছে যে, মাইন্ডসেট ঠিক না থাকলে এটা আপনার ভেতরের অবচেতন থেকে কোন খারাপ স্মৃতিকে তুলে আনবে ও সেটাকে খোলামনে গ্রহণ করার মানসিকতা এবং সেটাকে বাঁধা দেবার কারণেও অনেকের ব্যাড ট্রিপ হয়। ফলে ঐ ব্যক্তি এটা সেবনে মানসিক অবসাদে চলে যেতে পারে।

এলএসডি কোন ব্যক্তি কীভাবে কোন মাইন্ডসেট রেখে গ্রহণ করছে তার ওপর ভর করে সে বিচিত্র অভিজ্ঞতা উপলব্ধি করে। এক্ষেত্রে পজিটিভ না থাকলে নেগেটিভ চিন্তাধারা ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

আমরা যেমন স্বপ্নে ভয়ংকর কিছু দেখে চমকে উঠি। এটা সেবনে মনের অবচেতনে থাকা ভয়ানক স্মৃতি ভয়ানক রূপ নিয়ে ব্যক্তির সামনে চলে আসতে পারে। এর পাশাপাশি আত্মউন্নয়ন বা প্রচুর জানাশোনার পর এটা আপনাকে উচ্চমাত্রার অভিজ্ঞতা দিয়ে আপনার জীবন পাল্টে দিতে পারে। দুনিয়া দেখার দৃশ্যপট পাল্টে দিতে পারে যা অনেকের জীবন পাল্টে দিয়েছেও।

তাই সামাজিকভাবে ট্যাবু হয়ে থাকলে এটার সুবিধা ও জানাশোনা আড়ালে থেকে যাবে এবং এরকম দূর্ঘটনা আরও ঘটবে। আর এলএসডি রোধ করলেও মদ, সিগারেট এগুলোতে আসক্ত হয়ে মানুষের জীবনের বারোটা গতানুগতিকভাবে বাজতেই থাকবে। তার মানে এই নয় যে, এলএসডি স্বর্গীয় কোন জিনিস। বিষয়টা হল কোন নতুন জিনিসের সম্ভাবনাকে চেপে রাখলে কৌতূহলী মন না জেনেই তার প্রতি ঝুঁকে যাবে ও সঠিক জানাশোনার অভাবে দূর্ঘটনা বাঁধিয়ে বসবে।

এলএসডির গুণাগুণ জেনে একে অতিমাত্রায় উৎসাহ নিয়ে যত্রতত্র ব্যাবহার নয় ও একে সর্বনাশা পদ্মানদী বলে আখ্যা দেওয়া কোনটাই ভালো নয়। এটি সম্পর্কে সঠিক জানাশোনা ও মুক্তমন নিয়ে গবেষণা এবং যদি এটার কোন মঙ্গল থাকে সে ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। কেননা যেকোন জিনিসের অজ্ঞতাই সমস্যার সৃষ্টি করে। সঠিক জানাশোনা থাকলে কোন জিনিসের সঠিক প্রয়োগ সম্ভব হয়।

নিচে এলএসডি নিয়ে “world Science Festival” এর একটি ভিডিওসহ কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভিডিও-এর লিংক প্রদান করা হল। আগ্রহীরা দেখতে পারেন।

 

List Of Psychedelics Knowledge Videos

0Shares

নাজিউর রহমান নাঈম

আমিকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। কিন্তু সে যে কোথায় লুকাইলো ও এই লোকটি যে তা বড় আশ্চর্যের বিষয়! আমি হারিয়ে যা হল একে কীই-বা বলা যায় বলুন। এখন যাকে দেখছেন সে তো অন্য কাজ করে বেড়াচ্ছে, তার পরিচয়ও নিশ্চয়ই বদলে গেছে। তাহলে আপনি কাকে দেখছেন? দেখছেন আপনাকে আপনার চিন্তাকে যা আপনাকে আমাকে দেখাচ্ছে বা কল্পনা করাচ্ছে। তাহলে শুধু শুধু পরিচয় জেনে কী হবে বলুন। তার চেয়ে বরং কিছু সাইকোলাপ-ই পড়ুন ও নিজেকে হারিকেন নিয়ে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ুন। পথিমধ্যে হয়ত কোথাও দেখা হয়েও যেতে পারে!!! সে পর্যন্ত- কিছু কথা পড়ে থাকুক জলে ভেজা বিকালে খুঁজে চলুক এই আমি পিলপিল করে অনন্ত "আমি" র অদৃশ্য পর্দার আড়ালে

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *