৩ টি ছোট জেন গল্প

জেন গল্পগুলো বেশীরভাগই খুব ছোট আকারের হয়। কিন্তু ছোট আকারের হলেও এই গল্পগুলোতে শেখার অনেক কিছুই রয়েছে। বিশেষ এ গল্পগুলো যে কারো আক্কেল শক্তিকে বাড়িয়ে দেবার কিংবা আক্কেল গুড়ুম করে দেবার ক্ষমতা রাখে। তাহলে নিচের দেওয়া ৩ টি জেন গল্প পড়ে ফেলুন।

১. কোনকিছুই চিরস্থায়ী নয়, সবকিছুই পরিবর্তনশীল

সুজুকী রোশীর একটি লেকচার দেবার সময় একজন ছাত্র তাকে বলে বসল যে  আমি আপনার লেকচার কয়েক বছর যাবত শুনে আসছি; কিন্তু আমি আপনার লেকচার কিছুই বুঝতে পারছি না। আপনি কী আমাকে সংক্ষেপে কিছু বলতে পারবেন? আপনি কী আমাকে বুদ্ধের শিক্ষাকে একটি বাক্যে বলতে পারবেন?

সবাই তখন হেসে উঠল।  সুজুকীও হাসলেন।

“সবকিছুরই পরিবর্তন হয়।”- তিনি বললেন। এরপর তিনি পরবর্তী প্রশ্নের জিজ্ঞাসাতে চলে গেলেন।

মোরাল অফ দ্য স্টোরিঃ

ছোট চারাগাছের ধীরে ধীরে বৃদ্ধি, ছোট শিশুর ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠা, মানুষের বৃদ্ধ হয়ে যাওয়া ইত্যাদি প্রতিটি ঘটনাই আমাদের শেখায় সবকিছু ধীরে ধীরে পরিবর্তন হচ্ছে; কোনকিছুই থেমে নেই। যদিও আমাদের খালি চোখ তা সরাসরি দেখে না। কিন্তু যদি আমরা গভীর দৃষ্টিতে তাকাই তাহলে সবকিছুই পরিবর্তন হচ্ছে। আর এই সত্যতাকে না দেখতে পেয়েই আমরা কষ্টের মাঝে পতিত হই।

তাই আমরা যদি শান্তিপূর্ণ জীবন লাভ করতে চাই তাহলে আমাদের উচিত সবকিছুকে যেটা যেমনভাবে আছে ও প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হয়ে চলছে সেভাবে সেটাকে মেনে নেওয়া।

২. সবকিছুই হল দৃষ্টিভঙ্গীর খেলা

একদা একটি গ্রামে একজন বৃদ্ধ কৃষক বাস করত। কৃষকটি অনেক বছর ধরে তার জমিতে শস্য ফলানোর কাজ করে আসছিল। একদিন সে শুনতে পেল তার ঘোড়া কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। এই কথা শুনে গ্রামবাসীরা তার কাছে আসল এবং তারা সহানূভুতির সুরে বলতে লাগল, “কী দূর্ভাগ্য তোমার!”

বৃদ্ধ কৃষকটি তখন উত্তর দিল, “হয়তোবা”

পরের দিন সকালে ঘোড়াটি তার সাথে আরো তিনটি ঘোড়া নিয়ে ফিরে আসল। এই দেখে গ্রামবাসীরা তো বিস্মিত হয়ে গেল এবং বলতে লাগল, “বাহ্ কী সৌভাগ্য তোমার!”

“হয়তোবা”- কৃষকটি আবার উত্তর দিল।

আর ঐ একই দিনে তার ছেলে একটি পাগলা ঘোড়ার পিঠে উঠতে গিয়ে তার পা ভেঙ্গে বসে। গ্রামবাসীরা আবারও কৃষকটির কাছে আসে ও তাকে একইভাবে সমবেদনা জানায়।

কৃষকটি তখন জবাবে আবারো বলে, “হয়তোবা।”

এর ঠিক একদিন পর একদল আর্মির লোক এসে জোর করে যুবকদেরকে আর্মির দলে টেনে নেবার জন্য গ্রাম পর্যবেক্ষণ করতে আসলে, অবশেষে তারা বৃদ্ধ কৃষকটির বাড়িতেও আসে তার ছেলেকে তুলে নেবার জন্য; কিন্তু তার ছেলের পা ভাঙ্গা দেখে তাকে না নিয়েই চলে যায়। গ্রামবাসীরা আবার তার সৌভাগ্যের ব্যাপারে কথা বলতে থাকে।

“হয়তোবা”- কৃষকটি উত্তর দেয়।

মোরাল অফ দ্য স্টোরিঃ

প্রতিটি জিনিস ঘটার পেছনে কারণ রয়েছে। ভালো ও খারাপ; ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক এগুলো মানুষের তৈরী ধারণা ছাড়া আর কিছুই না। আমরা যেভাবে প্রতিটি বিষয় পর্যবেক্ষণ করি সেভাবেই আমরা বিষয়গুলোকে দেখে থাকি।

সবকিছুই প্রতিনিয়ত পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে চলছে। জীবন একটা দৈত্যাকার সমুদ্রের ঢেউয়ের মত।

আমরা  আসলে কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারি না যে ভবিষ্যৎ আমাদের জন্য কী নিয়ে অপেক্ষা করছেঃ ভালো নাকী খারাপ; সৌভাগ্য অথবা দূর্ভাগ্য।

মুদ্রার সবসময়ই দুটি পিঠ থাকে। আর এর সবমিলিয়েই জীবন।

৩. সবকিছুর প্রতি খেয়াল দেবার আগে, নিজের প্রতি খেয়াল করো

একদা কোন এক জায়গায় দুইজন এক্রোব্যাট বাস করত। এ দুজনের ভেতর যিনি শিক্ষক তিনি ছিলেন একজন গরীব বিপত্নীক এবং অন্যজন ছিল তার ছাত্রী যার নাম ছিল মেডা। এই যুগলদ্বয় প্রতিদিন রাস্তায় রাস্তায় তাদের এক্রোব্যাটিক খেলা দেখাতো যাতে করে তারা দুবেলা দুমুঠো খেতে পারে।

তারা রাস্তায় যে খেলাটি দেখাতো সেটি ছিল এরকম যে, যিনি শিক্ষক তিনি বেশ বড়সড় একটি  বাঁশ তার মাথার উপর রেখে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করবেন এবং ভারসাম্য রাখা অবস্থায় মেয়েটিকে সেই বাঁশের চূড়ার দিকে উঠতে হবে। এ খেলা দেখানোর সময় দুজনকেই সর্বোচ্চ পরিমাণ সতর্কতা অবলম্বন করতে হত যাতে তাদের কাউকে আহত হতে না হয়।

তো একদিন শিক্ষকটি তার ছাত্রীকে বলছেন, “মেডা শোন খেলা এখন থেকে দেখানোর সময় আমি তোমাকে সামলাবো, তুমি আমাকে সামলাবে; এভাবে আমরা খেলাতে সঠিক মনোযোগ বজায় রাখতে পারব এবং দুর্ঘটনা সম্ভাবনাব অনেকাংশেই এড়াতে পারব।

কিন্তু মেয়েটি ছিল বুদ্ধিমতী এবং সে বলল, ” আমার প্রিয় শ্রদ্ধেয় শিক্ষক, আমার মনে হয় আমাদের দুজনেরই নিজেকে সামলানো উচিত। আর এভাবে নিজেকে সামলানোর মাধ্যমে আমরা দুজন দুজনকেই সামলাতে সক্ষম হবো এবং দুর্ঘটনা এড়াতে পারবো।”

মোরাল অফ দ্য স্টোরিঃ

এই গল্প আমাদের কে এই শিক্ষা দেয় যে, আমরা অন্যের কল্যাণ সাধন করতে পারি একমাত্র নিজেদের কল্যাণ সাধন করার মধ্য দিয়ে। যখন আমরা আমাদের শারিরীক, মানসিক, আত্মিক, বৌদ্ধিক ইত্যাদি দিক দিয়ে সুস্থ থাকি ও আনন্দপূর্ণ থাকি; একমাত্র তখনই আমাদের আশেপাশে যারা রয়েছে তারাও সে সুস্থতা ও আনন্দের ভাগীদার হয়। তাই নিজের খেয়াল সম্পূর্ণরূপে রাখার মাধ্যমে আমরা পৃথিবীতে শান্তি ও ভালোবাসা ছড়িয়ে দিতে পারি।

এটা আমাদেরকে এ কথাই মনে করিয়ে দেয় যে, “নিজে বদলাও পৃথিবী বদলে যাবে।”

0Shares

নাজিউর রহমান নাঈম

আমিকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। কিন্তু সে যে কোথায় লুকাইলো ও এই লোকটি যে তা বড় আশ্চর্যের বিষয়! আমি হারিয়ে যা হল একে কীই-বা বলা যায় বলুন। এখন যাকে দেখছেন সে তো অন্য কাজ করে বেড়াচ্ছে, তার পরিচয়ও নিশ্চয়ই বদলে গেছে। তাহলে আপনি কাকে দেখছেন? দেখছেন আপনাকে আপনার চিন্তাকে যা আপনাকে আমাকে দেখাচ্ছে বা কল্পনা করাচ্ছে। তাহলে শুধু শুধু পরিচয় জেনে কী হবে বলুন। তার চেয়ে বরং কিছু সাইকোলাপ-ই পড়ুন ও নিজেকে হারিকেন নিয়ে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ুন। পথিমধ্যে হয়ত কোথাও দেখা হয়েও যেতে পারে!!! সে পর্যন্ত- কিছু কথা পড়ে থাকুক জলে ভেজা বিকালে খুঁজে চলুক এই আমি পিলপিল করে অনন্ত "আমি" র অদৃশ্য পর্দার আড়ালে

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *