হিরাক্লিটাসের সেই অমর বাণী – “একই নদীতে দুইবার গোসল করা যায় না।”

হিরাক্লিটাস(৫৩৫-৪৭৫ খ্রিস্টপূর্ব) ছিলেন প্রাক সক্রেটিস যুগের একজন দার্শনিক। তাঁর জন্ম হয়েছিল তৎকালীন আইওনিয়া নগরীর এফিসাসে এক পারস্য সম্রাজ্যে। হিরাক্লিটাস ছিলেন একজন রাজা। কিন্তু তিনি রাজা হিসেবে ছিলেন বেশ খামখেয়ালিপূর্ণ। তিনি খুব একটা সামাজিকও ছিলেন না। তিনি মনে করতেন আগুনই হলো এ পৃথিবীর আদিবস্তু। আগুন থেকেই সবকিছু উৎপত্তি ও আগুনেই সবকিছুর বিনাশ হয়। তাঁর একটি বিখ্যাত উক্তি আছে –

“একই নদীতে দুইবার গোসল করা যায় না।”

তিনি মনে করতেন এ পৃথিবীর কোনকিছুরই পুনরাবৃত্তি হয় না। প্রতিমুহূর্তে প্রতিটি বিষয়, ঘটনা নতুনভাবে আবির্ভূত হয়। ধরুন আপনি একটি নদীতে গোসল করতে গেছেন। এরপর গোসল করার পর, আপনার গায়ে আবার কাঁদা লেগে গেল! তাই কী আর করা, অগত্যা আপনি আবার গেলেন সেই নদীতে গোসল করতে। কিন্তু মনে রাখবেন আপনি কিন্তু আর সেই আগের নদীতে গোসল করতে পারবেন না; কেননা ততক্ষণে ঐ নদীর পানি বদলে গেছে। সেখানকার পানি পরিবর্তন হয়ে গেছে। একটু অদ্ভুত না! অদ্ভুতই বটে! কেননা আমরা তো সেই একই পানি দেখি তাহলে এটা পরিবর্তন হলো কীভাবে?

আর এখানেই হিরাক্লিটাসের এ বাণীর গভীরত্ব। আমরা যদি আমাদের দেহের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাবো যে, সেখানে প্রতিমুহূর্তে কোষ তথা সেলের পরিবর্তন হচ্ছে ও আবার তৈরীও হচ্ছে। কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে আমাদের দেহের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই যে, কই! আমার দেহের তো পরিবর্তন হয়নি! কিন্তু না, পরিবর্তন হচ্ছে ও আমাদের দেহ প্রতিনিয়ত পরিবর্তন ও নতুনরূপে আবির্ভূত হচ্ছে।

তবে এই পরিবর্তন টা হয় খুব ছোট ও সূক্ষ্ম স্কেলে। আর সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলো ক্রমাগত হতে হতে একটি সময় পর বৃহৎ আকারে আমাদের চোখের সামনে ধরা পড়ে। তখন আমরা বুঝতে পারি সত্যিই তো! আমার দেহের পরিবর্তন হয়েছে। এই উক্তিটিকে আইনস্টাইনের “Compound Effect” এর সাথে মিলিয়ে দেখলে এর তাৎপর্য আমরা বুঝতে পারি।

আর এই অল্প অল্প পরিবর্তন আমাদের যে বড় পরিবর্তন আনে ও আমাদের দৃষ্টিগোচর হয় তখন আমাদের এর নতুনত্ব সম্পর্কে ধারণা হয় কিন্তু আদতে তা ক্রমাগত পরিবর্তনেরই ফল ও নতুনত্বতারই ফল। যেমনঃ যখন কোন বালক কিশোর হঠাৎ করে লম্বা হয়ে যায়, তখন আমরা বলি, “কীরে অনেক লম্বা গেছিস দেখছি।” কিন্তু এটা তো আর হুট করে হয়নি। প্রতিনিয়ত একটু একটু করে বাড়তে বাড়তে লম্বা হয় ও একপর্যায়ে আমাদের নজরে আসে।

হিরাক্লিটাসের এই বাণীর সাথে বাঁগসোর “Elan Vital” প্রকৃতির সৃজনীশক্তির বিষয়টি মিলে যায়। এ প্রকৃতি হল এক অনন্তপ্রবাহ। এটা প্রতিনিয়ত সৃজন করে চলেছে। আর এই অনন্তপ্রবাহে কোন সৃষ্ট বস্তুই পুরাতন নয় তা সদা নতুন ও সজীব। আমরা হিরাক্লিটাসের এ বাণী থেকে অনেক কিছুই শিখতে পারি। শুধু তাই নয় এর থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা আমাদের জীবনকে আরও অর্থবহ করে তুলতে পারি।

নিচে আমি হিরাক্লিটাসের এই অমর উক্তি থেকে যে ৫টি শিক্ষামূলক দিক খুৃঁজে পেয়েছি তা তুলে ধরবঃ

১. ছকেবাঁধা জীবনের একঘেয়েমি দূর করে নতুনত্বতা প্রদানঃ

আমরা কাজ করতে করতে আমাদের জীবনে একঘেয়েমি এসে পড়ে। এর কারণ হিসেবে বলা যেতে পারে, আমাদের কাছে জীবনকে সেই একই ছকে বাঁধা জীবন হিসেবে মনে হয় ও আমরা কোন নতুনত্ব খুঁজে পাই না অথচ হিরাক্লিটাসের বাণী আমাদের বারবার সচেতন করে দেয় “এ বিশ্বের সবকিছুই নতুন কোনকিছু পুরাতন নয়” আমরা যদি এটা মনে রেখে আমাদের ছকেবাঁধা জীবনকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখি তাহলে আমরা আমাদের একঘেয়েমি কাটিয়ে উঠতে পারবো।

২. সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম বিষয়ের প্রতি মনোযোগী করে তোলেঃ

হিরাক্লিটাসের এ বাণী আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি কে প্রসারিত করে। আমাদেরকে সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম বিষয়ের প্রতি মনোযোগী করে তোলে। আমরা চোখ দিয়ে যা দেখি তার আরও গভীরে ভাবার প্রেরণা এই উক্তি আমাদের দান করে।

৩. অভ্যন্তরীণ উৎসাহ ও উদ্দীপনা জোগায়ঃ

এ উক্তিটির মাধ্যমে আমাদের ঘুম থেকে উঠে মনে হয় প্রতিদিন নতুন সকাল, নতুন এক ভোর, নতুন এক যাত্রা। আর এই মনোভাব আমাদের ভেতর থেকে অনেক উৎসাহ ও উদ্দীপনা জোগাতে সক্ষম।

৪. সৃজনশীল হবার প্রেরণা প্রদান করেঃ

উক্তিটি আমাদের সৃজনশীল হবার প্রেরণা প্রদান করে ও সৃষ্টির নতুনত্বের কথা বর্ণনা করে আমাদের সৃষ্টিশীল শক্তির স্ফূরণে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

৫. সজীব ও প্রাণবন্ততা প্রদান করেঃ

যদি আমরা সত্যি সত্যি হিরাক্লিটাসের এ বাণী জীবনে ধারণ করতে পারি “একই নদীতে দুইবার গোসল করা যায় না।” অর্থাৎ সবকিছুই নতুন কোনকিছুরই পুনরাবৃত্তি হয় না তাহলে আমাদের জীবনে আমরা সবকিছুকে আটকে রাখার মনোভাব থেকে মুক্ত হয়ে সদাসর্বদা মুক্ত হয়ে ও সজীব প্রাণবন্তভাবে চলার অভ্যাসে ব্রতী হতে পারব।

0Shares

নাজিউর রহমান নাঈম

আমিকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। কিন্তু সে যে কোথায় লুকাইলো ও এই লোকটি যে তা বড় আশ্চর্যের বিষয়! আমি হারিয়ে যা হল একে কীই-বা বলা যায় বলুন। এখন যাকে দেখছেন সে তো অন্য কাজ করে বেড়াচ্ছে, তার পরিচয়ও নিশ্চয়ই বদলে গেছে। তাহলে আপনি কাকে দেখছেন? দেখছেন আপনাকে আপনার চিন্তাকে যা আপনাকে আমাকে দেখাচ্ছে বা কল্পনা করাচ্ছে। তাহলে শুধু শুধু পরিচয় জেনে কী হবে বলুন। তার চেয়ে বরং কিছু সাইকোলাপ-ই পড়ুন ও নিজেকে হারিকেন নিয়ে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ুন। পথিমধ্যে হয়ত কোথাও দেখা হয়েও যেতে পারে!!! সে পর্যন্ত- কিছু কথা পড়ে থাকুক জলে ভেজা বিকালে খুঁজে চলুক এই আমি পিলপিল করে অনন্ত "আমি" র অদৃশ্য পর্দার আড়ালে

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *