হিউম্যানল্যাব (বুক রিভিউ)

বইটা নিয়ে ২ মাস হল লিখব লিখব ভাবছিলাম, আজকে সেই লেখা লিখব বলে মনস্থ করেই ফেললাম। বইটি হল বিজনেস ফিকশন এবং এতে রয়েছে জটিলতা লঘুকরণের জন্য ২-৩ চামচ হিউমার। লেখকই মূলত দাবা খেলার জন্য কোন প্রতিপক্ষ না পেয়ে নিজের সাথেই দুটো চরিত্রে এক তিনি নিজে ও পাপড়ি নামক একজন মেয়েকে নিয়ে সাজিয়েছেন এই বিজনেস ফিকশন “হিউম্যান ল্যাব”
 
ফিনল্যান্ড থেকে আগত পাপড়ি নামক একজন ব্যক্তির সুবাদে লেখক প্রথম জানতে পারে বিজনেস ফিলোসফার পেশা নামটির সঙ্গে। এ ব্যাপারে কৌতূহলবশত হয়ে লেখক গুগল সার্চ করলে যতদূর পাওয়া যায় তা হল এই এই পেশাটি হল কনসালট্যান্ট + স্ট্র্যাটেজিস্ট এ দুয়ের সমন্বয়ে মিলিয়ে একটা পেশা যা শুধু কনসালট্যান্সি থেকে একটু আলাদা। এ ব্যাপারে পাপড়ি নিজে শুরুতেই লেখকের জানতে চাওয়ার আগ্রহে এই পেশাটি সম্পর্কে বিশদ একটি ব্যাখ্যা, (ওতে আর যেতে চাচ্ছি না এখন)।
 
ফিনল্যান্ড থেকে পাপড়ি এসে বাংলাদেশে একটি নতুন কোম্পানি খোলে নাম থ্রিপিবি ডট কম। যার মানে করলে দাড়ায় (Philosophy, Pursue, Papri and Business)। পাপড়ির এই কোম্পানি চক্করে ও অনেক দিন পর লেখকের তার সাথে দেখা হবার সুবাদে নানা রকমের ঘটনা ঘটতে থাকে। পাপড়ি তার কোম্পানির জন্য লেখক বলেন তাকে সাহায্য করার জন্য। লেখক তাতে রাজি হয়ে যান।
 
এরপর এভাবে বাংলাদেশের নানা জায়গায় বিশেষত ঢাকা শহরটিতে বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন কোম্পানির সাথে তাদের আলাপ আলোচনা হয় এবং বিজনেস নিয়ে বিভিন্ন চরিত্রের মুখ থেকে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির চিন্তাভাবনার প্রতিফলন বইটিতে লক্ষ্য করা যায়। কেবল বিজনেস নিয়ে নয় লেখকের নিজের জীবনের নিজস্ব কিছু চিন্তাভাবনা, আইডিয়া, পরিকল্পনার প্রতিফলনও আমরা খুঁজে পাবো এই বইটিতে। বাংলাদেশের বিজনেস কোম্পানিগুলোর ভঙ্গুরতার সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা রয়েছে এ বইটিতে।
 
মূলত বইটি বিজনেস নিয়ে। তবে এর দৃষ্টিভঙ্গিটি আমার কাছে আলাদা মনে হয়েছে। এর কারণ হিসেবে এই লাইনটি তুলে দেওয়া যায়-
 
“বিজনেসেরও একটি আধ্যাত্মিক এবং নান্দনিক এসেন্স আছে, যার সঙ্গে মানুষকে কানেক্ট করতে হবে। হয় প্রোডাক্ট অথবা সার্ভিস,বিজনেসের মৌলিক প্রস্তাবনা তো এটাই।”
 
এ লাইনটি থেকে যেটা বোঝা যায় যে এখানে বিজনেস কেবল প্রফিটের হিসেবে নয় এখানে অন্তর্নিহিত কিছুকে কানেক্ট করতে জানা অর্থাৎ বিজনেসের সাথে দর্শনকে যুক্ত করো। এটা এখন অনেক বাইরের দেশেও দেখা যায় এবং এখানেও কিছু কিছু রয়েছে। মানুষের সাথে এখন ম্যানিউপুলেটিংভাবে প্রফিট অর্জন নয় বরং তার জীবনে যদি আপনার বিজনেসটি কিছু ভ্যালু এড করতে পারে এ ধরনের বিজনেসের একটা ধারণা ব্যাপারটি বহন করে।
 
তবে এ বইয়ে যেটা ইন্টারেস্টিং লেগেছে আমার কাছে সেটা হল নিজেকে পাপড়ি ও লেখক এবং বিভিন্ন চরিত্রের মাঝে নিজেকে দাড় করিয়ে আইডিয়াগুলোকে কনস্ট্রাকশন ও ডিকনস্ট্রাকশন করাটা। মূলত লেখক বিভিন্ন চরিত্র হয়ে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে একেকটি আইডিয়ার দিকে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন এবং তর্ক বিতর্কের প্রসেসের মধ্য দিয়ে এ ফিকশনটি এগিয়ে গেছে। এ বইটিকে ফিকশন বলা হলেও ফিলোসফিই বেশী ছিল। হিউমার এবং উপন্যাসের খানিকটা থাকায় তিনটা একত্রে মিশে ভিন্ন ধরনের কিছু একটা তৈরী করেছে যা আমার কাছে একটু নতুন লাগলো। তবে চিন্তাভাবনার দিকগুলো অন্যান্য দুটি উপাদান থেকে ভালো ছিল।
 
কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর পলিসি মেকিং, ডিসশন মেকিং, লোক নিয়োগ ইত্যাদির ব্যাপারে বেশ ভালো ভালো আলোচনা, বলা যায় একপ্রকার তর্কবিতর্ক ছিল। বইটি পড়তে পড়তে কোন আইডিয়া দেখে আপনার মনে হতে পারে দারুণ আইডিয়া কিন্তু এরপরই হতাশ হতে হবে আপনাকে। কেননা ঐ আইডিয়ার পাল্টা আরেকটা যুক্তি দাড়িয়ে যাবে তখন মনে হবে এটাও তো ঠিক। এবং এটাই আমার কাছে ইন্টারেস্টিং লেগেছে এ বইয়ের। এতে সঠিক, বেঠিক নির্ধারণের কোন স্কোপ নেই বরং এটি আপনার ব্রেনকে চালু করাবে ও বিষয়টি সম্পর্কে একটা তর্কবিতর্কে নিয়ে যাবে।
 
কিছু চমৎকার আইডিয়াও রয়েছে যা বেশ ইউনিক লেগেছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ভালো প্রশ্নের জন্য পুরস্কার প্রদান করার আইডিয়াটা। আমাদের মাঝে অ্যাপ্রিসিয়েশন কালচার গড়ে ওঠেনি এবং এটা গড়ে ওঠা প্রয়োজন এদিকটা বেশ প্রয়োজনীয় মনে হয়েছে আমার কাছে।
 
পরিশেষে এ বইটি থেকে লেখকের বিজনেস, ফিলোসফি, নিজের জীবনের চিন্তাভাবনা ও অস্তিত্ব, ঠাঁকুরগাওয়ে যাওয়ার বাসনা এবং বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবা, হিউমার সবমিলিয়ে বইটা আপনাকে অনেক নতুন কিছুর সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে সক্ষম হবে। চাইলে এ বইয়ের অনেকগুলো লাইন নিয়ে আলাপ-আলোচনা কিংবা লেখা যায়। তাবে রিভিউ হিসেবে এটুকুই থাক।
 
বইমেলাতে লেখকের আরেকটি বই কেনার ইচ্ছা রয়েছে “মৌনতা ক্লাব”। দেখি ওটাতে কী পাওয়া যায়,,,
 
ও হ্যাঁ,,,লেখককে ধন্যবাদ অনেক দিন ধরে সন্ধান করেও খুঁজে না পাওয়া গানটির সন্ধান দেওয়ার জন্য যা এই বইটিতে হিউমার মিশ্রিত না হলে হয়ত পাওয়া যেত না। গানটি দিয়েই লেখা শেষ করি-
 
” আমার কী সুখে যায় দিন রজনী কেউ জানে না,
কুহু সুরে মনের আগুন আর জ্বালাইয়ো না,,,🔥🔥🔥
0Shares

নাজিউর রহমান নাঈম

আমিকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। কিন্তু সে যে কোথায় লুকাইলো ও এই লোকটি যে তা বড় আশ্চর্যের বিষয়! আমি হারিয়ে যা হল একে কীই-বা বলা যায় বলুন। এখন যাকে দেখছেন সে তো অন্য কাজ করে বেড়াচ্ছে, তার পরিচয়ও নিশ্চয়ই বদলে গেছে। তাহলে আপনি কাকে দেখছেন? দেখছেন আপনাকে আপনার চিন্তাকে যা আপনাকে আমাকে দেখাচ্ছে বা কল্পনা করাচ্ছে। তাহলে শুধু শুধু পরিচয় জেনে কী হবে বলুন। তার চেয়ে বরং কিছু সাইকোলাপ-ই পড়ুন ও নিজেকে হারিকেন নিয়ে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ুন। পথিমধ্যে হয়ত কোথাও দেখা হয়েও যেতে পারে!!! সে পর্যন্ত- কিছু কথা পড়ে থাকুক জলে ভেজা বিকালে খুঁজে চলুক এই আমি পিলপিল করে অনন্ত "আমি" র অদৃশ্য পর্দার আড়ালে

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *