হাবিবী – গ্রাফিক নভেল বুকরিভিউ

হাবিবী – গ্রাফিক নভেল বুকরিভিউ

আমি আগে গ্রাফিক নভেল পড়িনি, এই প্রথম পড়লাম । অনেকের মত আমিও গ্রাফিক নভেলকে কমিক বুক এর সাথে গুলিয়ে ফেলছিলাম । পরবর্তীতে খানিক রিসার্চের মাধ্যমে বুঝতে পারলাম দুইটা মধ্যে বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে যেটার বড় একটা অংশ জুড়ে রয়েছে Complex Storytelling এবং Thematic Messaging. মেইন প্লটের সাথে সাথে প্যারালালি কিছু সাব প্লট ও একি ধারাবাহিকতায় চলতে দেখা যায় মূলত গ্রাফিক নভেল এ ।

যাক আসল কথায় আসি, বলছিলাম Craig Thompson এর লিখা গ্রাফিক নভেল “Habibi” নিয়ে । হাবিবী শব্দের অর্থ আমার প্রিয়তমা বা My Beloved, বই এর নামের সাথে গল্পের সম্পূর্ণ স্বার্থকতা আমরা দেখতে পাই। “দোদলা” এবং “যাম” দুইজন মূল চরিত্র নিয়ে গড়ে উঠেছে হাবিবী গল্পের সম্পূর্ণ দৃশ্যপট । দোদলার যখন নয় বছর বয়স তখন পারিবারিক আর্থিক অসচ্ছলতার জন্যে তাকে বিয়ে দিয়ে দেয়া হয় এক বৃদ্ধ লোকের সাথে যে ছিল পেশাদার পত্রলেখক । তিনি দোদলাকে পড়তে, লিখতে শেখান, কোরআন শরীফের বিভিন্ন গল্পের সাথে তাকে পরিচয় করিয়ে দেন । কিন্তু হঠাত একদিন তাদের বাসায় ডাকাত হামলা করার পর দোদলার স্বামীকে ডাকাতরা হত্যা করে এবং দোদলা নিয়ে যায় দাসী হিসেবে বেচে দেয়ার জন্যে । তাকে বেচা-বিক্রির এক পর্যায়ে সে দেখে এক লোক এক কৃষ্ণাঙ্গ গোত্রের ছোট্ট বাচ্চাকে হত্যা করার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছে । তখন দোদলা সেই বাচ্চাটি তার ভাই হিসেবে পরিচয় দিয়ে তার কাছে রেখে দেয় যদিও তাদের মধ্যে বর্ণ বৈষম্য ছিল । সেই বাচ্চা ছেলেটাই হচ্ছে “যাম” এখান থেকেই গল্পের শুরু । যাম ও দোদলার এই অবস্থা থেকে পালিয়ে গিয়ে মরুভূমির মধ্যে এক পরিত্যক্ত জাহাজে আশ্রয় নেয়া, সেখানে টিকে থাকার লড়াই । ক্ষুধায় ছোট্ট যাম যখন খাবার চায় দোদলার কাছে, দোদলা তখন গল্প শুনিয়ে তাকে ভুলিয়ে রাখে, সেই গল্প যেগুলো সে তার স্বামীর কাছ থেকে শুনেছিল । ছোট্ট যাম তন্ময় হয়ে শুনতে থাকে গল্পগুলো । কিন্তু এভাবে আর কয়দিন চলবে? তখন দোদলা নেমে পড়ল খাবারের খোঁজে, সেখানেই কাফেলা যেত ব্যবসায়ীদের । দোদলা বুঝে গিয়েছিল তার খাবারের বিনিময়ে দেয়ার মত কিছুই নেই তার শরীর ছাড়া । এভাবেই সে তার শরীরকে বেচে দিত প্রতিটা কাফেলায় এবং ছোট্ট যামের জন্যে খাবার নিয়ে আসতো । যাম একদিন দেখে ফেলে দোদলা তার জন্যে এত কষ্ট করছে, সে তখন সিদ্ধান্ত নেয়, নিজেই কষ্ট করে খাবার জোগাড় করে আনবে যেন দোদলার কষ্ট না হয় । এই ছোট বয়সেই বাস্তবতার মুখোমুখি যাম পথ হারিয়ে ফেলে এবং একদিন ফিরে এসে দেখে দোদলা নেই তাদের ছোট্ট সুখের মহলে । তাদের মধ্যেকার এই বিচ্ছেদ এবং আলাদা আলাদা দুইজন মানুষের টিকে থাকার লড়াই, পৃথিবীর ক্রুর বাস্তবতার সাথে চলতে থাকে গল্প । শেষ পর্যন্ত দোদলা কি দেখা পাবে যাম এর? যাম কি শেষ পর্যন্ত ফিরতে পারবে দোদলার কাছে? তাদের মধ্যে কি শুধুই ভাই আর বোনের সম্পর্ক? শুধু পেটে ধারণ করলেই কি মা হওয়া যায়? দুইজন বিপরীত লিঙ্গের মানুষের একটা সুখী সম্পর্কে শারীরিক সম্পর্কের ঊর্ধ্বেও কি কিছু থাকতে পারে? এই সকল প্রশ্নের উত্তর দেয় “হাবিবী”
.
আমার ব্যক্তিগত অভিমত বলি, বইটা Visually Stunning! চোখের আরাম যাকে বলে । এত ডিটেল এ এত কমপ্লেক্স সব গল্প বলা সত্যি ই Praiseworthy কাজ করেছেন লেখক এখানে । লেখক যেভাবে আরবি ক্যালিগ্রাফিগুলো এঁকেছেন সাথে বিভিন্ন দৃশ্যপট ব্যখ্যা করার জন্যে আমাদের কোরআন শরীফের বিভিন্ন ঘটনার সাথে মিল রেখে । অসাধারণ! কি নেই এখানে?? ইব্রাহীম আঃ এর গল্প, নূহ আঃ এর গল্প, রাজা সোলাইমান ও বিলকিস এর গল্প, আদম ও হাওয়া এর গল্প, হযরত মুহাম্মাদ সা: এর মেরাজ ভ্রমণ এর গল্প, জান্নাত জাহান্নামের বর্ণনা!

শুধু যে ইসলাম ধর্মের গল্প ই বলা হয়েছে এমন ও নয়, এখানে উঠে এসে Jesus এর উত্থানের গল্প, খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের Old Testament এর কিছু গল্প । প্রতিটা গল্পকে এত সুন্দর এবং আর্টিস্টিক ওয়ে তে প্রেজেন্ট করা হয়েছে, গল্প রেখে মনে হয় শুধু আর্টগুলোর দিকে চেয়ে থাকি! এতটা ডিটেল এ আঁকা প্রতিটা পৃষ্ঠা!

কিন্তু বইটায় Nudity and Sexuality এর ব্যপারগুলো একটু বেশি বেশি দেখানো হয়ে গিয়েছে । মেয়েদেরকে রীতিমত ভোগ্যপণ্য হিসেবে দেখিয়েছেন লেখক এখানে । আমাদের মূল নায়িকা “দোদলা” বইটার প্রায় ৬০% সময় শুধু রেইপড হতে দেখা গেল । তার রেইপ হওয়ার শুরু হয়েছে তার ৯ বছর বয়সে বিয়ে হওয়ার পর থেকে, ৬৭২ পৃষ্ঠার একটা বইতে শুধু এইসব ই দেখা মিলবে, মেয়েদেরকে রীতিমত ভোগ্যপণ্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে । ওহ! পুরা ৬৭২ পৃষ্ঠার বইতে দোদলার সাথে শারীরিক সম্পর্ক কয়বার তার ইচ্ছায় হয়েছে বা Consent এ হয়েছে গেস করেন? “একবার!”
.
এছাড়া লেখক এখানে আগের সময়কার হেরেম এর রাজাদের অবস্থা খুব ই বাজে ভাবে দেখিয়েছেন যেটাকে তিনি রীতিমত জাস্টিফাই করেছেন, এইরকম একটা দৃশ্য ছিল, রাজা তার রাতের সঙ্গী বেছে নিত তার শত শত দাসীর মধ্যে একজনের সামনে রুমাল ফেলে! সিরিয়াসলি!! যদিওবা এইরকম টাইমলাইনের সম্পর্কে আমার ধারণা কম, কিন্তু আমার মনে হয় লেখক এখানে Myth গুলোকে ফ্যাক্ট হিসেবে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছেন । এবং লেখকের মেয়েদের শরীরের গঠন আঁকার সে কি পারদর্শিতা!! ভাবাগো!! মেয়েদের শরীরকে এত সুন্দর এত fine detail এ এঁকেছেন লেখক যেটা কিছু ক্ষেত্রে খুব ই বিরক্তিকর এবং অফেন্সিভ দিকে চলে যায় । So চটি এলার্ট 

কিন্তু বইটা পড়া শেষে আমি বলব, আর্টিস্টিং পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে তাকালে This is a gorgeous graphic novel. বইটা কতটা ইউনিক সেইটা যদি এক লাইনে বলি, লেখক পুরো গল্পটা বইয়ের জাস্ট কভারের মধ্যেই দিয়ে দিয়েছেন । অসাধারণ! আমি প্রথমে ভেবেছিলাম প্রতিটা পেজের আশেপাশের ফ্রেম লাইন গুলো হয়ত একবার এঁকে প্রতিবার কপি পেস্ট করে দেয়া হয়েছে, কিন্তু একটু ভালভাবে লক্ষ করলে দেখা যাবে প্রতিটা পেজের প্রতিটা কর্নার পর্যন্ত ভিন্ন ভিন্ন ডিজাইন!
.
শেষে একটা কথা বলব, অনেকে হয়ত ভাববেন এখানে হাবিবী হচ্ছে দোদলা । কিন্তু না, এখানে হাবিবী দিয়ে মূলত যামকে বুঝানো হয়েছে । এত সুন্দর একটা নভেল না পড়লেও শুধুমাত্র নিজের কালেকশন এ রাখার জন্যে হলেও কেনা উচিত । বুকশেলফ এর সৌন্দর্যতা বাড়ে।

 

কার্টেসীঃ এই অসাধারন গ্রাফিক নভেলটির চমৎকার রিভিউ করেছেন – আবির রায়হান 

0Shares

নাজিউর রহমান নাঈম

আমিকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। কিন্তু সে যে কোথায় লুকাইলো ও এই লোকটি যে তা বড় আশ্চর্যের বিষয়! আমি হারিয়ে যা হল একে কীই-বা বলা যায় বলুন। এখন যাকে দেখছেন সে তো অন্য কাজ করে বেড়াচ্ছে, তার পরিচয়ও নিশ্চয়ই বদলে গেছে। তাহলে আপনি কাকে দেখছেন? দেখছেন আপনাকে আপনার চিন্তাকে যা আপনাকে আমাকে দেখাচ্ছে বা কল্পনা করাচ্ছে। তাহলে শুধু শুধু পরিচয় জেনে কী হবে বলুন। তার চেয়ে বরং কিছু সাইকোলাপ-ই পড়ুন ও নিজেকে হারিকেন নিয়ে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ুন। পথিমধ্যে হয়ত কোথাও দেখা হয়েও যেতে পারে!!! সে পর্যন্ত- কিছু কথা পড়ে থাকুক জলে ভেজা বিকালে খুঁজে চলুক এই আমি পিলপিল করে অনন্ত "আমি" র অদৃশ্য পর্দার আড়ালে

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *