স্পিনোজা দর্শন প্রসঙ্গ – ০২

স্পিনোজা তাঁর দর্শনে বিশেষ করে তার “এথিকস” গ্রন্থে অনেক কিছু সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। এসব বিষয়গুলোর মধ্যে থেকে তাঁর দ্রব্য, ঈশ্বর, জ্ঞানতত্ত্ব, শুভ-অশুভের ধারণা, আবেগ, অমরত্বের ধারণা এসব উল্লেখযোগ্য। আমরা এখন তাঁর দার্শনিক আলোচনায় এসব বিষয় নিয়েই বিস্তারিত আলোচনা ও বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করব।

দ্রব্যঃ

স্পিনোজা দর্শনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল তাঁর দ্রব্য সম্পর্কিত আলোচনা। এখানে তিনি তার দ্রব্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে কতগুলো স্বতঃসিদ্ধ নিয়মের অবতারণা করেন যা আমরা জ্যামিতির ক্ষেত্রে দেখে থাকি। আর এ স্বতঃসিদ্ধ সূত্রগুলো থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সিদ্ধান্ত নিঃসৃত হয়।

স্পিনোজা তাঁর দ্রব্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেন যে,

“By substance I mean that which is exists in itself and it conceived through itself, a other words, that of which a conception can be formed independently or any other conception.”

অর্থাৎ,

 

“যা নিজে নিজেই অস্তিত্বশীল এবং যাকে নিজের সাহায্যেই বোঝা যায়, অন্যভাবে বলা যায় যে অপর কোন ধারণার সাহায্য না নিয়ে যার সম্পর্কে ধারণা গঠন করা যায়, তাকেই দ্রব্য বলা হয়।” 

স্পিনোজার এ দ্রব্য হল অনন্ত, অসীম, এক। এর মাঝেই সকলকিছুর অবস্থান। আর তাই এটি কারও উপর নির্ভরশীল নয় বরং এটি স্বনির্ভর। এখন প্রশ্ন আসতে পারে সকলকিছুর মাঝে এর অবস্থান হলে পৃথিবীতে তো অনেক বৈচিত্র্য আমরা দেখতে পাই। কেউ সাদা, কেউ কালো, কেউ শ্যামবর্ণের। আবার ছোট, বড়, মাঝারী ইত্যাদি তফাৎ তো রয়েছেই।

এখানে এসে স্পিনোজা বলেন এটিও সেই দ্রব্যেরই অংশ; তবে এটি অসীম দ্রব্যের সসীম প্রকাশ। আর এ সসীম প্রকাশের নাম দিলেন তিনি প্রত্যংশ।

প্রত্যংশঃ এখন প্রত্যংশকে সহজভাবে আমরা বলতে গেলে আমরা বলতে পারি যে, যদি আমাদের পুরো দেহকে আমরা দ্রব্য হিসেবে ধরি তাহলে এ দেহের হাত, পা, চোখ, নাক, মুখ, কান ইত্যাদি আলাদা আলাদাভাবে হল একেকটি প্রত্যংশ বা অংশ বলতে পারি। কিন্তু শুধু হাত সম্পূর্ণ নয় বরং এটি সীমিত। একমাত্র পুরো দেহটাই যাকে আমরা দ্রব্য বলে মনে করছি তাই-ই অসীম ও পূর্ণাঙ্গ হতে পারে।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে যে এই অসীম বস্তু সসীম বস্তুতে কীভাবে আসতে পারে বা এই জগতের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে?

স্পিনোজা এ সমস্যা সমাধানের জন্য বলেন সকল প্রত্যংশ তার মূল স্বরূপগত দিক দিয়ে অসীম অর্থাৎ দ্রব্যেরই মাঝে রয়েছে। যেমনঃ একটি টেবিল, একটি চেয়ার, এদের প্রত্যেকের আকার আকৃতি আলাদা এবং এরা সেই পরমদ্রব্যের একটি প্রত্যংশ তারপরও এ দুটির মাঝে যে পরমদ্রব্য তা একই ভিন্ন ভিন্ন নয়। অর্থাৎ একই সাথে এটি অসীমের মাঝে সসীমরূপে প্রকাশিত হলেও এটি মূলগত রূপে অসীম। কারণ অজ্ঞানতাবশত আমরা যখন সসীমভাবে চিন্তা করি তখন আমরা এর পরিপূর্ণতা দেখতে পাই না। কিন্তু যখন প্রজ্ঞার আলোকে উদ্ভাসিত হই তখন আমরা এর অসীম রূপ দেখতে পাই।

স্পিনোজার দ্রব্যের যে প্রত্যংশ তা আলাদা আলাদা করে সকল কিছুতে প্রকাশিত হয়েছে এক প্রকৃতিগত ধারাপ্রবাহের মাধ্যমে যাকে বার্গসোঁর “Elan Vital” এর সাথে তুলনা করা যেতে পারে। এ প্রকাশ চির বহমান এবং তা ঐ সকল প্রত্যংশের সমষ্টিগতরূপে যে অখন্ড দ্রব্য তার থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রবাহিত হয়ে আসছে। আর এই সর্বোচ্চ ও অখন্ড পরমদ্রব্যই হল স্পিনোজার ঈশ্বর।

ঈশ্বরঃ

স্পিনোজার ঈশ্বর থেকে এ স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রবহমান প্রত্যংশগুলো এ বিশ্বে সকল জায়গায় বিন্দু বিন্দু পরিমাণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বৈচিত্র্য সৃষ্টি করে এবং এ বৈচিত্র্য প্রকৃতির মাধ্যমে প্রকাশিত হয়ে চলে। এ জন্য স্পিনোজা দর্শনে ঈশ্বর, প্রকৃতি ও দ্রব্য এক ও অভিন্ন। এদের মাঝে কোন পার্থক্য নেই।

এ ঈশ্বর আমাদের অতি নিকটে, আশেপাশে সমস্ত জায়গায় আমরা দেখতে পাই। আমরা যখন আমাদের আশেপাশের প্রকৃতির দিকে তাকাই তখন তা দেখতে পাই। এমনকী এটি সকল জায়গায় চির বিদ্যমান। তাই স্পিনোজার এ দর্শনকে সর্বেশ্বরবাদী মতবাদ বলা হয়। স্পিনোজার সব জায়গাতেই বিদ্যমান বলে এটি কোন নির্দিষ্ট কোন আকৃতি বা সীমায় আবদ্ধ নয়; যার কারণে এটি সমগ্র থেকে পৃথকভাবে অবস্থান করতে পারেনা। যেহেতু এটি পরিপূর্ণ, একক সত্তা; সেহেতু এটির এককত্বের মাঝে সবকিছু অন্তর্ভুক্ত। যার কারণে এটিকে আমরা আমাদের ব্যক্তিগত দোষগুণের সাথে অন্তর্ভুক্ত করতে পারিনা। তাই এটি আমাদের ব্যক্তিগত সসীম গন্ডির উর্ধ্বে। যখন আমরা আমাদের সসীম গন্ডি পেরিয়ে এই উর্ধ্বগামী দৃষ্টিকোণ থেকে সমস্ত অস্তিত্বকে দেখতে পারি তখন আমরা ঈশ্বরকে জানতে পারি ও বুঝতে পারি।

তখন আমরা ঈশ্বর যেভাবে চিন্তা করেন এবং জানেন, সেভাবে আমাদের ভেতরে বোধ জাগ্রত হয়। এখানে একটা বিষয় মনে রাখতে হবে যে, এ ঈশ্বর আমাদের ধারণাকৃত কোন পৃথক ব্যক্তি নন বরং এটি সমগ্রসত্তা ও আমাদের ক্ষুদ্র গন্ডিকে যখন আমরা এই বৃহৎ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে সমর্থ হই তখন আমরা বুঝতে পারি ঈশ্বর আর আমার মাঝে কোন ফারাক নেই। অর্থাৎ এটা একটা অবস্থা, এবং সে মুহূর্তের জন্য অতিবাস্তব একটি ঘটনারূপে আমার বোধে ধরা দেয়। এই বোধটাই হলো পরমবোধ, স্পিনোজামতে বুদ্ধির উর্ধ্বে গিয়ে স্বজ্ঞায় গিয়ে পৌঁছনো। তাই ঈশ্বর যেভাবে চিন্তা করেন এবং সব ব্যাপার সম্বন্ধে জানেন সেভাবে চিন্তা করা ও জানার অর্থই হলো নিজের আত্মচেতনা ও ব্যক্তিত্বকে অতিক্রম করা – আর এ কথাটা স্পিনোজা জোর দিয়ে বলেছেন।

তার এই ধরনের দুঃসাহসিক মত প্রকাশের জন্য তার বিরুদ্ধে নাস্তিকতার অভিযোগ আনা হয়েছিল।

স্পিনোজা এ সম্পর্কে আরও বলেন যে, মানবমন যতই ঈশ্বরের অনন্ত বুদ্ধির সঙ্গে একাত্ম অনুভব করবে, সে ততই বেশী সুখ লাভ করবে। স্পিনোজা তার “অন দ্যা এমেন্ডমেন্ট অব দ্যা আন্ডারস্ট্যান্ডিং” গ্রন্থে বলেন যে, সমগ্র প্রকৃতির সঙ্গে মনের যুক্ত হওয়ার জ্ঞানই মানুষের পক্ষে একমাত্র যথার্থ শুভ। প্রকৃতির অবশিষ্ট অংশে, বিশেষ করে মানুষের বেলায়, আমাদের এই জ্ঞানের প্রয়োগই শুভজীবন ও নৈতিক আচরণের ভিত্তি। সর্বোপরি এ জ্ঞান আমাদের মুক্তির সন্ধান দেয়। এর সাহায্যেই আমরা সর্বপ্রকার বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে যথার্থ মানবীয় পর্যায়ে উত্তীর্ণ ও দিব্যমনের সঙ্গে একাত্ম হতে পারি।

স্পিনোজার ঈশ্বর নিয়ে গতানুগতিক ধারণার বাইরে এরকম ধারণা থাকার জন্য আলবার্ট আইনস্টাইন স্পিনোজার ব্যাপারে বলেছিলেন যে,

“I believe in Spinoza’s God, who reveals Himself in the lawful harmony of the world, not in a God who concerns Himself with the fate and the doings of mankind.” – Albert Einstein

 

অর্থাৎ,

“আমি স্পিনোজার ঈশ্বরে বিশ্বাসে যিনি কীনা মানবজাতির ভাগ্য ও কর্ম নিয়ে উদ্বিগ্ন নন বরং বিশ্বের ন্যায়সম্মত সম্প্রীতির মাধ্যমে যে নিজেকে প্রকাশ করে থাকেন।” – আলবার্ট আইন্সটাইন

জ্ঞানতত্ত্বঃ

স্পিনোজা তাঁর দর্শনে জ্ঞানতত্ত্ব নিয়েও আলোচনা করতে গিয়ে বলেন যে, জ্ঞান অর্জনের তিনটি স্তর রয়েছে। যথাঃ

১.ইন্দ্রিয়
২.বুদ্ধি
৩. স্বজ্ঞা

প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের লক্ষ্যে আমাদের এ তিনটি স্তর ধাপে ধাপে অতিক্রম করতে হয়।

আমরা প্রথমে আমাদের পন্ঞ্চইন্দ্রিয় তথা হাত,পা,কান,নাক,চোখ এর মাধ্যমে সংবেদনের ফলে বিভিন্ন ধরনের ধারণা পেয়ে থাকি। এর ফলে আমাদের এক প্রকার জ্ঞান হয় তবে এ জ্ঞান প্রকৃত জ্ঞান নয়, সীমিত জ্ঞান।

এরপর বুদ্ধির মাধ্যমে আমরা কার্যকারণ ও বিচার বিশ্লেষণের দ্বারা বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে জ্ঞানলাভের চেষ্টা করে থাকি। এরূপ চেষ্টা আমরা আধুনিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে দেখে থাকি। এভাবে বুদ্ধির সাহায্যে ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের দ্বারা অনেক কিছুই বিজ্ঞান হয়ত আবিষ্কার করতে সফল হয়েছে; তারপরও সকলকিছুকে বুদ্ধির কষ্টিপাথরে মাপাও যায় না।

এ পর্যায়ে এসে স্পিনোজা বলেন স্বজ্ঞার কথা যা বুদ্ধিকে অতিক্রম করে স্বতপ্রতীতভাবে যে জ্ঞান হবে তাই প্রকৃত জ্ঞান। এ পর্যায়ে এসেই একজন ব্যক্তি প্রকৃত জ্ঞান লাভ করে।

0Shares

নাজিউর রহমান নাঈম

আমিকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। কিন্তু সে যে কোথায় লুকাইলো ও এই লোকটি যে তা বড় আশ্চর্যের বিষয়! আমি হারিয়ে যা হল একে কীই-বা বলা যায় বলুন। এখন যাকে দেখছেন সে তো অন্য কাজ করে বেড়াচ্ছে, তার পরিচয়ও নিশ্চয়ই বদলে গেছে। তাহলে আপনি কাকে দেখছেন? দেখছেন আপনাকে আপনার চিন্তাকে যা আপনাকে আমাকে দেখাচ্ছে বা কল্পনা করাচ্ছে। তাহলে শুধু শুধু পরিচয় জেনে কী হবে বলুন। তার চেয়ে বরং কিছু সাইকোলাপ-ই পড়ুন ও নিজেকে হারিকেন নিয়ে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ুন। পথিমধ্যে হয়ত কোথাও দেখা হয়েও যেতে পারে!!! সে পর্যন্ত- কিছু কথা পড়ে থাকুক জলে ভেজা বিকালে খুঁজে চলুক এই আমি পিলপিল করে অনন্ত "আমি" র অদৃশ্য পর্দার আড়ালে

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *