স্পিনোজার দর্শন প্রসঙ্গ – ০১

দর্শনে যদি কারও জীবনযাপন থেকে অনুপ্রেরণা নেবার থাকে তিনি হলেন বেনেডিক্ট বারুচ স্পিনোজা। তাকে যদিও বুদ্ধিবাদী দার্শনিক বলে আখ্যা দেওয়া হয় তবুও দর্শনের কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক দিকই নয় তার সাথে তিনি ভালোবাসা তথা মানবের সাথে জড়িত যে রসসিক্ত ধারা রয়েছে তারও একটা সমন্বয় ঘটিয়েছেন। স্পিনোজার মাঝে যে প্রজ্ঞার স্ফুরণ ঘটেছিল তাতে কেবল শুধু বুদ্ধিই নয়, একধরনের আত্মিক সম্পর্কযুক্ততাও ছিলো। যা তিনি তার জীবনকে যাপন করা ও তার কর্মের মাধ্যমে দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। তিনি হলেন এমন একজন দার্শনিক যার জীবনধারা ছিল মিস্টিকীয় ধারাসম্পন্ন সন্তদের মত। যা আমরা তার দর্শন আলোচনা করলেই দেখতে পাবো। তার দর্শনের দিকে তাকালে আমরা গভীর একটা মেলবন্ধন দেখতে পাবো যা আজকের সময়ধারাতেও সমামভাবে প্রাসঙ্গিক।

তাই স্পিনোজাকে নিয়ে তিনটি পর্বে কিছু ধারাবাহিক আলোচনা করার উদ্দেশ্য নিয়েই এই আর্টিকেল। সেইসাথে ভবিষ্যতে স্পিনোজা দর্শনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ভিডিও বানানোর চেষ্টা করব।

এই ধারাবাহিক তিন পর্বের প্রথম পর্বতে থাকছে স্পিনোজার সংক্ষিপ্ত পরিচয় ও তার দর্শনের উৎসগুলো নিয়ে আলোচনা। তাহলে চলুন আলোচনা শুরু করা যাক –

স্পিনোজার সংক্ষিপ্ত পরিচয়ঃ

স্পিনোজার জন্ম হয়েছিল ১৬৩২ খ্রিস্টাব্দের ২৪ নভেম্বর হল্যান্ডের আর্মস্টাডার্ম নগরে। পর্তুগাল থেকে নির্যাতিত ও বিতাড়িত হয়ে ইহুদীদের একটি দল হল্যান্ডে আশ্রয় নিয়েছিল। স্পিনোজার পরিবার ছিলো সেই দলের অন্তর্ভুক্ত। তার বাবা ছিলেন তদানীন্তন ইহুদী সম্প্রদায়ের একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যাবসায়ী। এ কারণেই শৈশব থেকে স্পিনোজা উপযুক্ত শিক্ষার সবরকমের সুযোগ পেয়েছিলেন।

১৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে আর্মস্টাডার্মে ইহুদীদের জন্য একটি স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। স্পিনোজা সেই স্কুলে পড়ালেখা শুরু করেন। যদিও সেখানে কেবল ধর্মীয় বিষয়াদিতেই শিক্ষা সীমিত ছিল। প্রথমে তিনি ইহুদী ধর্ম সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেন। এরপর তিনি ইবনে এজরা ও মাইমোনাইডিস-সহ বিভিন্ন ইহুদী দার্শনিকদের জীবনী ও রচনার সঙ্গে পরিচিত হন। ইহুদীদের মিস্টিক ধারা “কাবালা”- এর সাথেও তিনি পরিচিত ছিলেন। স্কুলের বাইরে তিনি ধর্ম বিষয় ছাড়াও আরও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করতেন। তিনি ভাষা শিক্ষার ব্যাপারে প্রশংসনীয় দক্ষতার পরিচয় দেন। তার পারিবারিক ভাষা ছিল স্প্যানিশ। এছাড়াও তিনি ল্যাটিন, পর্তুগীজ, ইটালিয়ান, ওলন্দাজ ও ফরাসি ভাষা শিখেছিলেন। ফ্রান্সিস ভেন-ডেন-এন্ডেন নামক এক পন্ডিতের কাছে তিনি ল্যাটিন ভাষা শিখেন। আর এ পন্ডিতের মাধ্যমেই স্পিনোজা ব্রুনো ও দেকার্তের রচনাবলির সাথে পরিচিত হন। শৈশব থেকেই স্পিনোজা বিদ্যাচর্চায় যে অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় দেন, তাতে সেদিনের অসহায় ইহুদী সম্প্রদায়ের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিরা খুবই আনন্দিত ও আশান্বিত হয়েছিলো। তারা ভেবেছিলেন যে, স্পিনোজা তাদের ইহুদী ধর্মের জয়গান করবেন।

তবে সে আশার গুড়েবালি। মাত্র তেইশ বছর বয়স থেকেই স্পিনোজা গোঁড়া ইহুদী ধর্মের বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের যথার্থতা সম্পর্কে সংশয় প্রকাশ করেন। তার ধর্মবিরোধী মতামত প্রকাশ্যে প্রচার না করার বিনিময়ে তাকে ১০০০ ফ্লোরিনস প্রদানের প্রস্তাব দেওয়া হলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। ফলে তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয় ও তাকে নাস্তিক বলে সাব্যস্তও করা হয়। আর যখন এতকিছু করেও তারা স্পিনোজাকে তাদের দলে টেনে নিতে পারছিলো না, তখন তারা তাকে নিজ সম্প্রদায় থেকে বহিষ্কৃত করে।

কিন্তু এতসব কিছু হবার পরও স্পিনোজা এটিকে বেশ শান্তভাবেই গ্রহণ করে নেন ও বলেন যে, তার ওপর যে এমনকিছু করা হবে তা তিনি আগে থেকেই জানতেন। এখানে আমরা তার সহনশীল মনোভাবের পরিচয় খুঁজে পাই যা অনন্য। তার সাথে এ ঘটনা ঘটার পর তিনি তার ছোটবেলার নাম ” বারুচ” পরিবর্তন করে এরই ল্যাটিন প্রতিশব্দ বেনিডিক্টাস রাখেন।

মানুষ হিসেবে স্পিনোজা ছিলেন সহজ, সরল, সদালাপী একজন মানুষ। তিনি অত্যন্ত সাদাসিধেভাবে জীবনযাপন করতেন। অগাধ পান্ডিত্যের অধিকারী হয়েও তিনি ছিলেন অহমিকালেশশূন্য একজন অমায়িক মানুষ। অপরকে তিনি কখনও তার মত গ্রহণে বাধ্য করার চেষ্টা করেননি। প্রত্যেকেরই যে নিজস্ব মত প্রকাশের এবং অন্যের মত গ্রহণ বা বর্জনের স্বাধীনতা রয়েছে, এ কথা তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন। সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হবার পর তিনি আমস্টাডার্মে নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করেন। আর সেখানে তিনি এক দম্পতি তাকে আশ্রয় দান করে সেখানে থেকে তিনি চশমার কাঁচ পরিষ্কার করাকেই পেশা হিসেবে গ্রহণ করে নেন।

তবে পেশা হিসেবে তিনি যাই করুন না কেন তার জ্ঞানচর্চা অব্যাহত ছিলো। তারই ফলস্বরূপ আমরা তার বিখ্যাত গ্রন্থ “Ethics” তথা “নীতিবিদ্যা” – এর সন্ধান লাভ করি। এছাড়াও তিনি ১৬৬৩ খ্রিস্টাব্দে কজিটা মেটাফিজিকা শিরোনামে দেকার্তের প্রিন্সিপিয়া ফিলোসফিয়্যার দ্বিতীয় খন্ডের একটা সারসংক্ষেপ প্রকাশ করেন। এর পাশাপাশি তার ট্র্যাকটাটাস থিওলজিকো – পলিটিকাস ও ট্র্যাকটাটাস পলিটিকাস তার গ্রন্থাবলীর মধ্যে বিখ্যাত। ১৬৭৪ সালে তিনি তার “এথিকস” গ্রন্থের পান্ডুলিপি রচনা সম্পন্ন করেন ও ১৬৭৫ সালে তা প্রকাশের কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু পরে তা আর করা হয়ে ওঠেনি। মৃত্যুর পর গ্রন্থটিকে অসংখ্য চিঠিপত্র ও অপ্রকাশিত রচনাবলির সঙ্গে তার কক্ষে পাওয়া যায়। এ সবই ছিল স্পিনোজার অমূল্য সম্পদ, তার সারাজীবনের সন্ঞ্চয়।

স্পিনোজা তার জীবনে কোন বিবাহ করেননি। শোনা যায় তিনি এক মেয়েকে ভালোবাসতেন এবং বেশ গভীরভাবেই ভালোবাসতেন কিন্তু দূর্ভাগ্যক্রমে তাকে আর তার পাওয়া হয়ে ওঠেনি। হয়তো এরই ফলস্বরূপ তার জীবনে আর অন্য কারও সাথে গাঁট ছাড়া বাঁধা হয়ে ওঠেনি।

১৬৭০ খ্রিস্টাব্দে তিনি হেগ – এ বাস করতে শুরু করেন। ওখানেই ১৬৭৭ সালের নভেম্বর মাসে যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি প্রাণত্যাগ করেন।

স্পিনোজা তার দর্শনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন উৎস থেকে প্রভাবিত হয়েছেন ও এসব ধারা বা উৎস তাকে তার নিজস্ব দর্শন স্থাপনে ভূমিকা রেখেছে। এখন আমরা সেটা সম্পর্কে কিছু আলোচনা করব –

স্পিনোজা দর্শনের উৎসঃ

স্পিনোজার দার্শনিক প্রেরণার উৎস ছিলো একাধিক। ইহুদী দার্শনিক ঐতিহ্য যে তার ওপর বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেছিল তাতে কোন সন্দেহ নেই। মাইমোনাইডিস ও এববিসেব্রন প্রমুখ ইহুদী দার্শনিকদের সূত্র ধরে তিনি আরবীয় এরিস্টটলবাদ এবং সক্রিয় বুদ্ধি সম্পর্কে মুসলিম দার্শনিক মতের সঙ্গে পরিচয় লাভ করেন। ব্রুনোর মতের সাথেও তিনি বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন। ব্রুনোর মতে পৃথিবীর সব পদার্থ একই আদিম পদার্থ থেকে উৎপন্ন। সমগ্র জগৎ এক ও অভিন্ন। বহুর মাঝে এক কে দেখা ও তাতে আরোহণ করা দর্শনের মূল লক্ষ্য।

ব্রুনোর এ মতের প্রতিধ্বনি স্পিনোজা দর্শনেও শোনা যায়। প্রাচীন গ্রীক দর্শনের সঙ্গেও স্পিনোজার পরিচয় ছিলো। সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টটল, ডেমোক্রিটাস, এপিকিউরাস, লিউক্রেসিয়াস ও স্টোয়িক দর্শন তিনি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে পাঠ করেছিলেন। তবে প্লেটো ও এরিস্টটলের চেয়ে পরমাণুবাদী দার্শনিক ডেমোক্রিটাস ও লিউক্রেসিয়াস এবং এপিকিউরাস মতবাদ দ্বারাই তিনি বেশী প্রভাবিত হয়েছিলেন। তবে স্টোয়িক দর্শনের প্রতি তিনি তেমন আকৃষ্ট হননি।

একপর্যায়ে দেকার্তের দার্শনিক মত দ্বারাও তিনি গভীরভাবে অভিভূত হয়েছিলেন। বিশেষ করে দার্শনিক জ্ঞানানুশীলনে গাণিতিক পদ্ধতি প্রয়োগে দেকার্তের প্রেরণাকে তিনি গ্রহণ করেছিলেন। একথা অবশ্য ঠিক যে, দার্শনিক প্রয়োগপদ্ধতির ব্যাপারে দেকার্তের সাথে একমত হলেও দেকার্তের সিদ্ধান্তবলির সঙ্গে তিনি একমত হতে পারেননি। ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে তিনি যখন আমস্টার্ডার্মে প্রত্যাবর্তন করেন, তখন থেকেই স্বাধীন ও নির্ভীক দার্শনিক হিসেবে তিনি প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিলেন।

বার্ট্রান্ড রাসেল স্পিনোজার দার্শনিক দক্ষতা সম্পর্কে বলেন যে,

“Intellectually some others have surpassed him, but ethically he is Supreme.” – Bertrand Russel
(History of Western Philosophy – Page : 552)

অর্থাৎ,

 

“দার্শনিক দক্ষতার দিক থেকে কেউ কেউ হয়তো স্পিনোজাকে অতিক্রম করে থাকতে পারেন, কিন্তু নীতিনিষ্ঠার দিক থেকে তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ।”

 

0Shares

নাজিউর রহমান নাঈম

আমিকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। কিন্তু সে যে কোথায় লুকাইলো ও এই লোকটি যে তা বড় আশ্চর্যের বিষয়! আমি হারিয়ে যা হল একে কীই-বা বলা যায় বলুন। এখন যাকে দেখছেন সে তো অন্য কাজ করে বেড়াচ্ছে, তার পরিচয়ও নিশ্চয়ই বদলে গেছে। তাহলে আপনি কাকে দেখছেন? দেখছেন আপনাকে আপনার চিন্তাকে যা আপনাকে আমাকে দেখাচ্ছে বা কল্পনা করাচ্ছে। তাহলে শুধু শুধু পরিচয় জেনে কী হবে বলুন। তার চেয়ে বরং কিছু সাইকোলাপ-ই পড়ুন ও নিজেকে হারিকেন নিয়ে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ুন। পথিমধ্যে হয়ত কোথাও দেখা হয়েও যেতে পারে!!! সে পর্যন্ত- কিছু কথা পড়ে থাকুক জলে ভেজা বিকালে খুঁজে চলুক এই আমি পিলপিল করে অনন্ত "আমি" র অদৃশ্য পর্দার আড়ালে

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *