সাইকেডেলিক পর্ব -০৪

সাইকেডেলিক পর্ব -০৪

যে সাধুটির কথা বলছিলাম তার সম্পর্কে একটু পরিচয় দেওয়া যাক।

সাধুটির মূল নাম ছিল লক্ষ্মী নারায়ণ শর্মা। তিনি উত্তর প্রদেশের আকবরপুর নামক এক গ্রামে ১৯০০ সালে দূর্গা প্রসাদ নামে এক ব্রাক্ষ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫৮ সালে তিনি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন ও পরবর্তীতে নীব কারোলি বাবা নামে খ্যাতি লাভ করেন। এই নামে গ্রামবাসীরা তাকে ডাকত বলে তিনি এই নামেই পরিচিত হন এখনও। ঘর ছেড়ে তার বেরিয়ে পড়া ও তার খ্যাতি লাভ হওয়ার মাঝে ঘটনাগুলো সম্পর্কে জানা যায় না।

তার জীবন বেশ সাদাসিধে ভাবেই কেটেছে। তিনি কারও কাছে কোন ধর্মের প্রচার করে বেড়াননি। অথচ তার কাছে বিভিন্ন ধর্মের লোকের সমাগম ঘটত। তার মূল কথা ছিল “Love all, Serve all, Feed all.” অর্থাৎ সবাইকে ভালোবাসো, সবাইকে সেবা করো ও সবাইকে খাওয়ায়। এমনকী তার ব্যক্তিগত কোন শিক্ষাপদ্ধতি ছিল না, সবসময় একটি কম্বল গায়ে জড়িয়ে রাখতেন। মারা যাবার আগে তিনি কোন মন্ত্র বা কোনকিছুর উল্লেখ করেও যাননি। তার আশেপাশে যে মানুষগুলো ছিল যারা তাকে ভালোবাসতো তারাই তাকে দেখাশোনা করতেন। তার শরীরও ছিল বেশ বিশাল। মনে হয় তিনিও ত্রৈলঙ্গস্বামীর মত খেতে ভালোবাসতেন। এই ছিল মোটামুটি তার পরিচয়। এছাড়াও লোকেমুখে তার অনেক গল্প প্রচলিত রয়েছে। তবে তা কতটুকু সত্য তা সম্পর্কে আসলে নির্ণয় করা বেশ কঠিন।

এখন রাম দাসে আমরা ফিরে আসি। রাম দাস তো নীব কারোলি বাবার সাথে ঐ ঘটনার পর থেকে পুরোপুরি পরিবর্তিত হয়ে যান। এবং এরপর সেখানে তিনি অবস্থান করা শুরু করেন। যেহেতু সাইকেডেলিক নিয়েই লেখাটা মূলত তাই এর সাথে জড়িত বিষয় নিয়ে একটি ঘটনার কথা এখন আমি এখানে উল্লেখ করব-

রাম দাসের যেহেতু সাইকেডেলিক কম্পোনেন্ট নিয়ে বেশ জানাশোনা ও গবেষণা ছিল সেহেতু তার সাথে তিনি LSD রাখতেন। তবে এর পিছনে একটি কারণ ছিল তিনি যখন হিপি হয়ে এনলাইটেন্টড হবার জন্য বের হয়ে পড়েন তখন তিনি এই LSD গুলো নিতেন এরজন্য যে কোন সাধু বা সত্য জানতে পারে বলে মনে হয় এমন কারুর সঙ্গে দেখা হলে তার ওপর এটার আছড় কেমন পড়ে এটা দেখার জন্য।

তো একদিন নীব কারোলি বাবা রাম দাসকে তলব করলে পরে তিনি বাবার কাছে গেলেন। যাবার পর বাবা হিন্দীতে বললেন তোমার সাথে আনা মেডিসিনগুলো বের কর। রাম দাস তখন বুঝলেন কোন মেডিসিনের কথা বাবা বলছেন। তখন তিনি পাশে থাকা একজন লোককে বললেন যে তিনি কী এলএসডির কথা বলছেন। নীব কারোলি বাবা তখন বললেন যে আচ্ছা ওটাই বের করো। এরপর রাম দাস যথারীতি এক এক করে এলএসডি বের করতে লাগলেন। ৩০০ মি.গ্রা এর ৩ টা এলএসডি রাম দাস বাবা কে দেওয়ার পর তিনি একসাথে তিনটা মুখের ভেতর চালান করে দিলেন।

রাম দাস শুধু দাড়িয়ে দাড়িয়ে ঘটনা দেখছিলেন ও মনে মনে ভাবছিলেন যে কী ঘটে দেখা যাক। কিছুক্ষণ যাবার পর দেখা গেল যে, বাবার কোন প্রতিক্রিয়াই নেই। তিনি তখন বললেন যে কই কিছুই তো হয়নি। তখন রাম দাসের মনে সন্দেহ উঁকি মেরে উঠল যে, তিনি যেভাবে তার হাত, মুখকে ঢাকার মত করে কাছে টেনে এনে তিনটা এলএসডি মুখে দিলেন,,, তিনি আবার হাতের ফাঁকে দিয়ে তা আবার ফেলেটেলে দেননি তো। দিয়ে আবার বলছেন নাতো যে তার কিছুই হয়নি। এগুলো তিনি মনে মনে ভাবতে লাগলেন। ঐদিনের মত ঘটনা ঐপর্যন্তই।

কিন্তু এরপর আবার যখন রাম দাস ভারত ভ্রমণে আসেন তখন বাবার সাথে দেখা হলে তিনি তাকে বললেন, “তুমি যে আমাকে মেডিসিন দিয়েছিলে আমি যে তা খেয়েছিলাম তোমার মনে আছে?” তখন রাম দাস উত্তর দিলেন, “আমার তো তাই মনে হয়।” তখন বাবা বললেন, “কী হয়েছিল এরপর?”
রাম দাস কোন উত্তর দিলেন না। এরপর বাবা তাকে সাইকেডেলিক দেবার কথা বললেন। এবার রাম দাস তাকে এক এক করে ৩০০ মি.গ্রা. এর চারটা এলএসডি দিলেন। এবার বাবা এক অদ্ভুত কান্ড করে বসলেন। তিনি প্রতিটা এলএসডির বড়ি একদম জিহ্বার ওপর রেখে মুখের ভেতর যে চালান করে দিচ্ছেন তা স্পষ্টভাবে তাকে দেখিয়ে দেখিয়ে তা গিলতে লাগলেন। এরপর সেইসাথে তিনি বিচিত্র মুখভঙ্গী করতে লাগলেন। রাম দাসের মনে একেবারে ১২০০ মি.গ্রা. এলএসডি দিয়ে খেয়ে এমন করছেন না তো আবার!! কিন্তু না, কিছুক্ষণ পর বুঝলেন বাবা তার সাথে মজা করছেন, তার কিছুই হয়নি। রাম দাস বুঝতে পারলেন যে বাবা বোধহয় তার সেই সময়কার সন্দেহটি মুখের ভাবভঙ্গী দেখে বুঝতে পেরে গিয়েছিলেন। তাই তিনি আবার এই এলএসডি গ্রহণ করলেন।

এরপর নীব কারোলি বাবা তার আঙ্গুল নিজের দিকে ইশারা করে রাম দাসকে বললেন, “It’s in you.” তুমি যা খুঁজছো এটা তোমার ভেতরেই আছে। যে অভিজ্ঞতা তুমি লাভ করো এটা কয়েক ঘন্টার জন্য,,, তাই এই কয়েক ঘন্টার জন্য যিশু খ্রিস্টের(এখানে রূপক আকারে ব্যাবহৃত হয়েছে) সাথে সাক্ষাৎ করার থেকে তুমি বরং যিশু খ্রিস্টই হয়ে যাও।”

এই ঘটনাটি ছিল রিচার্ড আলপোর্টের রাম দাসে পরিণত হবার আগে বাবার সাথে দুইবার এলএসডি নিয়ে সাক্ষাৎ হবার ঘটনা। এরপর রিচার্ড আলপোর্ট শিষ্য হয়ে যান নীব কারোলি বাবার এবং বাবা তাকে নাম দেন “রাম দাস”। এরপর রাম দাস ” Be here now” নামে একটি বই প্রকাশ করেন যেখানে তার হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির প্রফেসর থাকাকালীন জীবন, সাইকেডেলিক নিয়ে তার গবেষণা, নীব কারোলি বাবার ঘটনা ও স্পিরিচুয়ালিটির দিকে অভিযাত্রা এগুলোর বর্ণনা রয়েছে।

রাম দাসের এই “Be here now” বই স্টিভ জবস ও ড্যানিয়েল কোটকে পড়ার পর তাদের মাথায়ও হিপি হয়ে ভারত ভ্রমণে বের হবার ভূত চেপে বসে। এরজন্য তারা ভারতের নীব কারোলি বাবার মন্দিরে যান। কিন্তু ততদিনে বাবা গত হয়ে গিয়েছেন। এটা ছিল স্টিভ জবসের “অ্যাপল” প্রতিষ্ঠার আগের কাহিনী।

এরপর স্টিভ ভারত ভ্রমণ শেষ করে ফিরে আসলে “অ্যাপল” এর কাজ করা শুরু করেন। স্টিভ জবস তার বায়োগ্রাফার ওয়াল্টার আইজ্যাকসনকে তার জীবনে এলএসডি’র প্রভাব সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেন,

 

“Taking LSD was a profound experience, one of the most important things in my life. LSD shows you that there’s another side to the coin, and you can’t remember it when it wears off, but you know it. It reinforced my sense of what was important—creating great things instead of making money, putting things back into the stream of history and of human consciousness as much as I could.”

 

এছাড়াও বিল গেটসের এক ইন্টারভিউতে তিনি বলেন যে স্টিভ ও সে অ্যাসিড নিতেন (LSD কে Acid নামেও ডাকা হয়)। যদিও স্টিভ বেশী নিতেন এ কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

তবে সেসময় হিপি আন্দোলনের সংস্পর্শে এসে জবস আরেকটি বইয়ের কথাও উল্লেখ করে গেছেন তার মৃত্যুর আগে আর সে বইটি হল “An autobiography of a yogi” – এই বইটির সাথে জবসের সম্পর্ক বিষয়ক কথা আমি এ বইয়ের রিভিউটতে আলোচনা করেছিলাম।

ইংরেজ ঔপন্যাসিক Aldous Huxley ও তার “Brave new World” উপন্যাসে সাইকেডেলিকের কথা উল্লেখ করেছেন। এমনকী তার “Psychedelics” নামক একটি বইও রয়েছে। তার এ নিয়ে কিছু কথা আমি (পর্ব – ০২) এ উল্লেখ করেছিলাম।

এর পাশাপাশি তখনকার সময়ের বিখ্যাত ব্যান্ড, ব্যক্তিত্ব এদের সাথে সাইকেডেলিকের সাহচর্যতা ছিল। যার মধ্যে রয়েছে বিটলস, পিঙ্ক ফ্লয়েড দুটি বিখ্যাত ব্যান্ডের নাম। এছাড়া অ্যালেন গিন্সবার্গ, জন লেনন, জর্জ হ্যারিসন ইত্যাদি ব্যক্তিরাও হিপি আন্দোলন এবং সাইকেডেলিক দ্বারা প্রভাবিত ছিলো। আর সেই সূত্র ধরে ওয়েস্টার্ন মানুষরা ইস্টের মিস্টিকদের প্রতি কিংবা বলা যায় ইস্টের অাধ্যাত্মিক ট্রাডিশনের দিকে আগ্রহী হওয়া শুরু করে।

কেবলমাত্র এলএসডি-ই সাইকেডেলিকের অন্তর্গত নয়। এর পাশাপাশি ম্যাজিক মাশরুম, ম্যাসকেলাইন, আইবোগেন, আয়াহুয়াস্কা, এমডিএমএ (MDMA বা Ecstasy) ইত্যাদি এসব সাইকেডেলিকের অন্তর্গত।

0Shares

নাজিউর রহমান নাঈম

আমিকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। কিন্তু সে যে কোথায় লুকাইলো ও এই লোকটি যে তা বড় আশ্চর্যের বিষয়! আমি হারিয়ে যা হল একে কীই-বা বলা যায় বলুন। এখন যাকে দেখছেন সে তো অন্য কাজ করে বেড়াচ্ছে, তার পরিচয়ও নিশ্চয়ই বদলে গেছে। তাহলে আপনি কাকে দেখছেন? দেখছেন আপনাকে আপনার চিন্তাকে যা আপনাকে আমাকে দেখাচ্ছে বা কল্পনা করাচ্ছে। তাহলে শুধু শুধু পরিচয় জেনে কী হবে বলুন। তার চেয়ে বরং কিছু সাইকোলাপ-ই পড়ুন ও নিজেকে হারিকেন নিয়ে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ুন। পথিমধ্যে হয়ত কোথাও দেখা হয়েও যেতে পারে!!! সে পর্যন্ত- কিছু কথা পড়ে থাকুক জলে ভেজা বিকালে খুঁজে চলুক এই আমি পিলপিল করে অনন্ত "আমি" র অদৃশ্য পর্দার আড়ালে

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *