শেখো, ভুলে যাও, আবার শেখো

শেখো, ভুলে যাও, আবার শেখো

এ উদাহারণটি হয়তো অনেকেই শুনে থাকবেন, জ্ঞানের তিনটি ধাপ আছে –

প্রথমে যখন আমরা জ্ঞান নেওয়া শুরু করি তখন আমাদের ভেতর একধরনের অহংকার কাজ করে। তখন মনে হয়,,  আরেহ! আমি তো বিশাল জ্ঞানী! ব্যাপারটা ঠিক এরকম যে,  অল্পবিদ্যা ভয়ংকরী এরকম ব্যাপার স্যাপার আরকী।

কিন্তু যখন ক্রমে ক্রমে এ জ্ঞান চর্চা আমরা বাড়াতে থাকি তখন ধীরে ধীরে দ্বিতীয় ধাপে আসি। তখন জ্ঞান নিয়ে ঔদ্ধত্য আগের মত তেমন কাজ করে না। তখন ধীরে ধীরে বুঝে আসে আসলে জানার আরও অনেক কিছুই রয়েছে। তারপর যখন আরও এক ধাপ অগ্রসর করি আমরা তখন আসে তৃতীয় ধাপ।

এ ধাপে এসে মনে হয় আমি তো আসলে কিছুই জানি না। তখন একজন জ্ঞানের ব্যাপারে বিনয়ী হয়। মাথা নিচু করে দেয় ঠিক তেমনভাবে যেমনভাবে গাছে যখন ফল হয় তখন তা আপনভারে নুইয়ে পরে। তার ঔদ্ধত্য মস্তক তখন ভারে নুইয়ে পড়ে। এখানে সক্রেটিসের এ কথাটি উল্লেখযোগ্য হল – যে জেনেছে যে আমি কিছুই জানি না সেই প্রকৃত জ্ঞানী।

উপরোক্ত তিনটি ধাপ প্রতিটি মানুষ যখন জ্ঞানের পথে পা বাড়ায় তার কমবেশী মোকাবিলা করতে হয়।  এখন আমরা পুরো মানবজাতির দিকে খেয়াল করলে দেখতে পাবো যে এখন আমরা এমন একটি যুগে বসবাস করছি যেখানে তথ্য ও জ্ঞানের অভাব নেই। অথচ ২০-৩০ বছর আগেও এত পরিমাণ তথ্য, জ্ঞান মানুষের করায়ত্ত হয়নি। আর এর ফলে যা হয়েছে তা হল তথ্য, জ্ঞান সবকিছুই এখন অনেক সহজলভ্য হয়ে গেছে। সবাই কিছু না কিছু জানে।  আর এখন গুগল, ইউটিউব তো আছেই কিছু সার্চ করলেই জ্ঞান হাজির হয়ে যাচ্ছে। তাহলে সমস্যাটা কোথায়?

সমস্যা হল এই যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিস্ফোরণ এর মাধ্যমে আমরা অনেক তথ্য, জ্ঞান নিজের মাথায় নিচ্ছি, ধারণা করছি ও চিন্তা করছি। কিন্তু এত এত জ্ঞানের মাঝে ডুব দিতে দিতে আমরা নিজেদের বড্ড ভারি করে ফেলছি। আর এর আবরণকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে আমাদের ইগো। এই যুগে জ্ঞান থাকাটা কোন আহামরি বিষয় নয়,  বরং আমার থেকে গুগল, ইউটিউবই বেশী জ্ঞান ধারণ করে এবং বলা যায় মহাজ্ঞানী।

জন্মের শুরু হতেই আমাদেরকে  জ্ঞানী বানানোর প্রক্রিয়া  শুরু হয়ে যায়। আমরা নানা বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করি। কিন্তু আমাদের এখন এই একবিংশ শতাব্দী তে এসে সবচেয়ে বড় চ্যালেন্ঞ্জ হলো জ্ঞান শেখাটা নয়,  কারণ যে কেউ চাইলেই হরেকরকম জ্ঞান নিতে পারে। এ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় চ্যালেন্ঞ্জ হল জ্ঞান ভুলে যাওয়া। নিজেকে জ্ঞানভার মুক্ত করা। কিন্তু আমরা জ্ঞানভার মুক্ত করতে চাই না; কেননা এই জ্ঞানের আবর্তকে কেন্দ্র করেই তো আমার অহংকার,  আমার দখলদারিত্ব,  আমার আইডেনটিটি আমি তৈরী করে ফেলেছি।

তাই এখন আমরা জ্ঞানী হয়েছি বটে, তবে আমাদের পরবর্তী ধাপ এটাকে ভুলে যাওয়াও শিখতে হবে তথা জ্ঞানের বোঝাকে আঁকড়ে না রেখে ছেড়ে দিতে হবে। তারপর আমরা তো বোঝামুক্ত হলাম এবার।  কিন্তু বোঝামুক্ত হবার পর সে শান্তিতে বসে থাকলেও চলবে না।  কেননা ওই অবস্থায় থাকতে থাকতে ওখানেও আমরা আমাদের ইগোর বাড়িঘর গড়ে তুলব। তখন হয়ত “আমি কিছুই জানি না” এর অহংকার গড়ে ফেলব আমরা। তাই যখনই উপযুক্ত বিশ্রাম নেওয়া হয়ে যাবে তখন আবার শেখার সাহস করতে হবে। এভাবে চক্রাকারে শেখা, ভুলে যাওয়া, আবার শেখা এর মাঝে সমন্বয় তৈরীর মাধ্যমে আমরা হয়ত তখন প্রজ্ঞার পর্যায়ে উন্নীত হতে পারব। ব্যাপারটাকে একটা উদাহারণের সাহায্যে স্পষ্ট করা যাক –

পাহাড়ের চুড়োয় উঠবার জন্য  সাজ-সরঞ্জাম না নিয়ে যাত্রা করা যায়না। তাই এই শুরুর দিকে সাজ-সরঞ্জাম হলো আমাদের জ্ঞান। এখন শুধু সাজ-সরঞ্জাম নিয়ে তো টানা যাত্রা করা সম্ভব নয়। মাঝখানে বিশ্রামের প্রয়োজন। তাই সাজ-সরঞ্জাম এগুলো একপাশে সরিয়ে বিশ্রামেরও প্রয়োজন। কিন্তু এখন বিশ্রাম করতে বসে ওখানে বসে থাকলেও তো চূড়ায় ওঠা সম্ভব নয়। তখন আবার সাজ-সরঞ্জাম কাঁধে তুলে আবার রওনা দিতে হবে। এভাবে সাজ-সরঞ্জাম কাঁধে তুলে নেওয়া, এরপর তা নামিয়ে রেখে বিশ্রাম ও আবার তা কাঁধে তুলে নেওয়ার মাধ্যমে একদিন ঐ পাহাড়ের চূড়ায় আমাদের পৌঁছানো সম্ভব হবে।

আর এই বিশ্রাম বা ভুলে যাওয়া আমাদের পুরনো জ্ঞানকে সজীব করে এর মাঝে সজীবতা প্রদান করে। তাই যতবার আমরা ভুলে যাই,  জ্ঞানের দখলদারীত্ব ছেড়ে দেই ততই পরবর্তীতে জ্ঞান শিক্ষার ভেতর এক ধরনের সজীবতা আসে, নতুনত্ব আসে, তখন প্রজ্ঞার জন্ম হয়। এভাবে পরম সত্য একদিন কাছে এসে হয়ত আমাদের বলবে, “কী! বলেছিলাম না যতই ভুলিবে ততই শিখিবে।”

0Shares

নাজিউর রহমান নাঈম

আমিকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। কিন্তু সে যে কোথায় লুকাইলো ও এই লোকটি যে তা বড় আশ্চর্যের বিষয়! আমি হারিয়ে যা হল একে কীই-বা বলা যায় বলুন। এখন যাকে দেখছেন সে তো অন্য কাজ করে বেড়াচ্ছে, তার পরিচয়ও নিশ্চয়ই বদলে গেছে। তাহলে আপনি কাকে দেখছেন? দেখছেন আপনাকে আপনার চিন্তাকে যা আপনাকে আমাকে দেখাচ্ছে বা কল্পনা করাচ্ছে। তাহলে শুধু শুধু পরিচয় জেনে কী হবে বলুন। তার চেয়ে বরং কিছু সাইকোলাপ-ই পড়ুন ও নিজেকে হারিকেন নিয়ে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ুন। পথিমধ্যে হয়ত কোথাও দেখা হয়েও যেতে পারে!!! সে পর্যন্ত- কিছু কথা পড়ে থাকুক জলে ভেজা বিকালে খুঁজে চলুক এই আমি পিলপিল করে অনন্ত "আমি" র অদৃশ্য পর্দার আড়ালে

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *