শূন্যতাচক্র

শূন্যতাচক্র

একদিন সন্ধ্যায় শুনশান রাস্তায় নেমে হাঁটতে হাঁটতে তার চোখ পড়ে যায়, শার্টের বুকপকেটের দিকে,
তৎক্ষণাৎ সে তাকাল তার দিকে দেখে পকেটটি তার মতই ফাঁকা, শূন্য;
সেই করুণ চোখ নিয়ে সে পকেটটি দেখতে লাগল,,
ক্রমে ক্রমে তার মনে পড়ে যায় হারানো স্মৃতিগুলো, যা পড়ে ছিল তার শূন্যতার অন্তরালে,
তার মা, তার বাবা, তার সঙ্গীনি স্ত্রী, আদরের এক কন্যা,, কেউ নেই সাথে,
কোথায় গেছে তারা আজ, সে জানেনা, সমস্ত স্মৃতি লোপ পেয়েছে তার,
ভাবে সে মনে মনে বুক পকেট তো তার ভরাই ছিল, খালি হল কী করে,
আবারো থম মেরে আসে অবলুপ্ত হয়ে যাওয়া বিরহ, অস্ফুট গোঙানি।

সে একটি ছাতা নিয়ে হাঁটছিল, সম্ভবত বৃষ্টি পড়তে পারে এইভেবে। কিন্তু বৃষ্টি আর পড়েনি। রাস্তাঘাট, শুকনো, কোথাও কোন জনমানব নেই। দূর হতে ভেসে আসছে চাপা কিছু শব্দ, কিন্তু শব্দগুলোর নাম সে জানে না, কারণ তার বুক পকেট আজ খালি। কী করে সে আজ তার বাড়ি যাবে। এক কদম হাঁটছে তো মনে হচ্ছে হাজারটা পাহাড়কে পদদলিত করে সে সামনে এগুচ্ছে। সময় আছে, জায়গাও আছে, তবু কেন সে নেই; সে কেবল আজকে এটাই ভাবছে। ঘুরে ফিরে বারবার তার মনে পড়ছে বিভিন্ন স্মৃতি, অথচ স্মৃতির ব্যাপারে তার কোন জ্ঞান নেই। চোখের মাঝে বিদ্যুতের মত একেকটা ঘটনা চলে আসছে। বিচিত্র শব্দে মাথা ধরে যাবার মত অবস্থা হচ্ছে তার। হঠাৎ করে কে যেন বলে উঠল, “আব্বু তুমি এখানে দাড়িয়ে আছো কেন?” সে মনের অজান্তেই উত্তর দেয়, “কই রে মা আমি তো চলছি, দেখছিস না! কত পথ হেঁটে ফেলেছি আমি। তুই কী তার কিছুই দেখছিস না?”

মেয়েটি হেসে হেসে বলতে থাকে, “তুমি যেভাবে হাটঁছো ওকে কী চলা বলে, ওভাবে চলে তো তুমি আমার কাছে পৌঁছতেই পারবে না। আমি যে বহুদূরে বসে বসে তোমাকে দেখছি, সাথে মাও আছে; কিন্তু সে তোমাকে ঝাড়ি দেবার জন্য প্রস্তুত হয়ে বসে রয়েছে। কিছু একটা বলতে যাবে সেই মুহূর্তে আবার বুক পকেটে ঘিরে থাকা শূন্যতা দেখতে লাগলো সে, ও বিড়বিড় করতে লাগল, ” আমি কোথায়? নড়তে পারছি না, চলতে পারছি না, কিন্তু চলছি; এ আমি কোথায়, আমার চারপাশে কুয়াশার ধোঁয়া কেন, এরা কারা?
আমি তো বিয়ে করিনি এরা কারা, এরা কী তবে আমার স্মৃতি? কিন্তু স্মৃতি সে তো হারিয়ে গেছে বহুকাল আগে, তবুও এরা কারা? আমার কল্পনা, আমারই কণা দিয়ে গড়া পৃথিবী, সম্পর্ক, কন্যা, স্ত্রী!!! এরা কারা?

গভীর এক বেদনা নিয়ে বসে আছে সে। কিছু করবার নেই, কোথাও যাওয়ার নেই, অস্ফুট বেদনায় চেয়ে চেয়ে এই বুক পকেটের শূন্যতার দিকে চেয়ে থাকা।

হঠাৎ শূন্য পকেটে কিছু একটা নড়ে উঠতে দেখা গেল, তা ক্রমে ক্রমে ফুলে ফেঁপে উঠতে লাগল, জলোচ্ছ্বাসের মত; এখনি উপচে পড়া ঢেউয়ের মত জল গড়িয়ে পড়বে পকেট থেকে যেন। সে অবাক হয়ে দেখলো এতদিন ধরে বসে থাকার পর এ জল তবে কীসের, কেনইবা বাম পকেট থেকে গড়িয়ে পড়ছে!!! শূন্যতা বিরহে চুইয়ে পড়া জল নয়তো!!! সে একটু চেখে নিয়ে দেখলো বেশ মিষ্টি এ জল এবং সিদ্ধান্ত নিল এ জলেই একদিন সে পৃথিবীকে ভরাবে, এ জলেই ডোবাবে, এ বহুল ইচ্ছাকৃত জলে সে ধরনীকে ভরিয়ে তুলবে, খেলবে, শূন্যতা দূর করবে, নানা রূপলাবণ্যে তার কন্যা, স্ত্রী খেলে বেড়াবে, দৌড়ে বেড়াবে আর সে বুক পকেটের জলে চেয়ে চেয়ে দেখবে তারা খেলছে। এভাবে তার বিরহ শূন্যতা ঘুচবে। সে এই জলের নাম দিল ভালোবাসা। নিজের শূন্যতাকে ভালোবেসে বুকে জড়িয়ে সে একটু ভালোবাসবে তার কন্যাকে, তার স্ত্রীকে, তার মাকে, তার বাবাকে, পুরো পরিবারকে।

বহুকাল পর,,,

চোখ পিটপিট করে তাকালো সে এবং চারপাশটা দেখে নিয়ে সে চেঁচাতে লাগল ও বলতে লাগল, “কোথায় গেল সে ভালোবাসা? কোথাও গেলো আমার কন্যা, আমার স্ত্রী, আমার বাবা, আমার মা, আমার পুরো পরিবার,,, হায়!!! ঈশ্বর, ভগবান, খোদা, প্রভু কোন নামেই রক্ষা পেলোনা তারা, সবশেষ হয়ে গিয়েছে, সমস্ত কিছু তছনছ হয়ে গিয়েছে, ভেঙ্গে গিয়েছে আমার তাসের ঘর, ব্যর্থ হয়েছে খেলা, আবার আমি একা,,,, আমার বুক পকেটের জলগুলো পড়ে গিয়েছে, ভাবিই নি যে তা শতছিন্ন আঘাতে ফুটো হয়ে গিয়েছে। কত লক্ষ কোটি বছর ধরে আমি জোড়াতালি দিয়েছিলাম আমার এ পকেট, যাতে একটু একটু করে বিরহের শূন্যতা তাতে জমে। জমে গিয়ে যাতে হয় ভালোবাসা। কিন্তু হায় একী হল আবার সেই আমি! শতছিন্ন আঘাতে জর্জরিত এ পকেট, দেখছি শূন্যতা, স্মৃতিগুলো হারিয়ে যাচ্ছে, ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে, সব ডুবে যাচ্ছে, অস্ফুট মৌনতায়। কেউ দেয়নি আমায় ভালোবাসা, শূন্যতা থেকে করতে পারেনি উদ্ধার না খোদা, না ঈশ্বর, না ভগবান, না তুমি, না আমি তাহলে কে করেছে?

দূর থেকে ভেসে এলো আওয়াজ, “কেউ না, মৌন বুকপকেট।”

0Shares

নাজিউর রহমান নাঈম

আমিকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। কিন্তু সে যে কোথায় লুকাইলো ও এই লোকটি যে তা বড় আশ্চর্যের বিষয়! আমি হারিয়ে যা হল একে কীই-বা বলা যায় বলুন। এখন যাকে দেখছেন সে তো অন্য কাজ করে বেড়াচ্ছে, তার পরিচয়ও নিশ্চয়ই বদলে গেছে। তাহলে আপনি কাকে দেখছেন? দেখছেন আপনাকে আপনার চিন্তাকে যা আপনাকে আমাকে দেখাচ্ছে বা কল্পনা করাচ্ছে। তাহলে শুধু শুধু পরিচয় জেনে কী হবে বলুন। তার চেয়ে বরং কিছু সাইকোলাপ-ই পড়ুন ও নিজেকে হারিকেন নিয়ে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ুন। পথিমধ্যে হয়ত কোথাও দেখা হয়েও যেতে পারে!!! সে পর্যন্ত- কিছু কথা পড়ে থাকুক জলে ভেজা বিকালে খুঁজে চলুক এই আমি পিলপিল করে অনন্ত "আমি" র অদৃশ্য পর্দার আড়ালে

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *