শামস তাবরীজের ভালোবাসার ৪০ সূত্র

জালালুদ্দিন রুমি ছিলেন একজন পারসিয়ান কবি, আধ্যাত্ববাদী। তারই শিক্ষক বা গুরু ছিলেন শামস তাবরীজ। এ দুজনের উপর ভিত্তি করে তুর্কি-ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক  Elif Shafak লিখেছেন “The Forty Rules Of Love”। এখন এই বই থেকে শামস তাবরীজের ভালোবাসার ৪০টি সূত্র নিচে এক এক করে দেওয়া হলঃ

সূত্র – ০১

যেভাবে আমরা খোদার ব্যাপারে মনে করি থাকি তা হল  নিজেদের ব্যাপারে যা মনে করে থাকি তারই সরাসরি প্রতিফলন। যদি খোদার চিন্তা বেশীরভাগ সময় মনে ভয় ও দোষ বয়ে নিয়ে আসে, তাহলে এর মানে হল আমাদের মাঝে অনেক ভয় এবং দোষ বাসা বেঁধে রয়েছে। যদি আমরা খোদাকে পরিপূর্ণ ভালোবাসারূপে ও সহমর্মি দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখি তাহলে আমরাও তেমনই হয়ে উঠি।

সূত্র – ০২

সত্যের পথে যাত্রা করা হল হৃদয়ঘটিত শ্রম, মস্তিষ্কঘটিত নয়। তাই তোমার হৃদয়কে তোমার পথপ্রদর্শক বানাও! তোমার মস্তিষ্ককে নয়। প্রতিকূলতা কে মোকাবিলা কর এবং পরিশেষে তোমার নকরো তোমার হৃদয় দিয়ে। তোমার অহংকার কে জানো এটা তোমাকে খোদার জ্ঞান অবধি পৌঁছে দিবে।

সূত্র – ০৩

তুমি খোদার ব্যাপারে জানার জন্য এ বিশ্বরে সবকিছু এবং  সকল ব্যক্তিদের তুমি মাধ্যম হিসেবে ব্যাবহার করতে পারো, কেননা খোদা মসজিদ, সিনাগগ, অথবা চার্চের মাঝে আবদ্ধ নয়। কিন্তু এত কিছু করার পরও যদি তোমার সাধ থেকে থাকে যে আসলে সে কোথায় থাকে? তাহলে সেখানে একটিমাত্র পথই রয়েছে তাকে খুঁজবার আর তা হল একজন সত্যিকার প্রেমিকের হৃদয়ের মাঝখানে।

সূত্র – ০৪

বুদ্ধি এবং হৃদয় দুটি ভিন্ন বস্তু দিয়ে গড়া। বুদ্ধি মানুষকে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখে ও এটি কোন ঝুঁকি নিতে চায় না, কিন্তু ভালোবাসা সকল জটকে দ্রবীভূত করে দেয় এবং সবকিছুতেই ঝুঁকি নেবার সাহস করে। বুদ্ধি সবসময়ই সতর্ক প্রকৃতির এবং এটি উপদেশ দেয়, ‘অতিরিক্ত উল্লাসের ব্যাপারে সাবধান’। অন্যদিকে ভালোবাসা বলে, ‘ওহ, কিছু মনে করো না!  ঝাঁপ দাও।’ বুদ্ধি সহজে ভাঙ্গতে চায় না। অপরদিকে ভালোবাসা অনায়াসে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। কিন্তু গুপ্তধন ধ্বংসস্তুপের মাঝেই লুকিয়ে থাকে। একটি ভগ্ন হৃদয় মাঝেই গুপ্তধন লুকিয়ে থাকে।

সূত্র – ০৫

এই পৃথিবীর বেশীরভাগ সমস্যার প্রধান কারণ হলো ভাষাগত ভুল এবং ভুল বোঝাবুঝি। কখনই শব্দকে প্রাধান্য দিও না। যখন তুমি ভালোবাসার পরিসীমায় ঢুকবে তখন ভাষা, যা আমরা জানি তা অচল হয়ে যায়। যাকে শব্দ দিয়ে উপলব্ধি করা যায় না তাকে একমাত্র নিরবতা দিয়ে উপলব্ধি করা যায়।

সূত্র – ০৬

নিঃসঙ্গতা ও একাকীত্বতা হল দুটি ভিন্ন জিনিস। যখন তুমি নিঃসঙ্গ হয়ে যাও, তখন নিজের সাথে প্রতারণা করা খুবই সহজ এটা বিশ্বাস করার মাধ্যমে যে তুমি সঠিক পথে রয়েছ। একাকীত্বতা আমাদের মহত্তর, এর মানে হলো কোনরকম নিঃসঙ্গতা অনুভব করা ছাড়াই একাকীত্বতা অনুভব করা। কিন্তু অবশেষে এটা সবচেয়ে ভালো হয় যদি তুমি একজনকে খুঁজে বের কর যে হবে তোমার নিজেরই প্রতিফলন (আয়না)। মনে রেখো একমাত্র অন্য আরেকজন ব্যক্তির হৃদয়ের মাঝেই তুমি প্রকৃতপক্ষে নিজেকে দেখতে পাবে এবং নিজের মাঝে খোদার উপস্থিতি উপলব্ধি করতে পারবে।

সূত্র – ০৭

তোমার জীবনে যাই ঘটুক না কেন, যত কঠিনই তোমার অবস্থা মনে হোক না কেন, কখনই আশেপাশে থাকা হতাশার মাঝে প্রবেশ করো না। এমনকী যখন সব দরজা বন্ধ হয়ে যায়, খোদা তখন তোমার জন্য নতুন পথ তৈরী করে দিবে। কৃতজ্ঞ হও! এটা খুবই সহজ কৃতজ্ঞ থাকা যখন সবকিছু ভালো চলে। একজন সূফী সবসময় কৃতজ্ঞ থাকে শুধুমাত্র যা তাকে প্রদান করা হয়েছে সেইজন্য নয় বরং যা তাকে প্রদান করা হয়নি তার জন্যও।

সূত্র – ০৮

ধৈর্য মানে এই না যে সবকিছু নিষ্ক্রিয়ভাবে সহ্য করে যাওয়া।এর মানে হল একটি প্রক্রিয়ার শেষ পর্যন্ত দেখা। ধৈর্য মানে আসলে কী? এর মানে হল কাটার দিকে তাকিয়ে থাকা এবং সেইসাথে গোলাপকে দেখা, রাতের দিকে দৃষ্টিপাত করা এবং সেখানে দিনকে দেখা। অধৈর্যতা মানে হল অদূরদৃষ্টি সম্পন্ন না হওয়া এমন যে ফলাফল কী তা দেখতে সমর্থ না হওয়া। যারা খোদাকে ভালোবাসে তাদের ধৈর্য কখনও ফুরিয়ে যায় না, এই জন্য যে তারা জানে অমাবস্যা কেটে পূর্ণিমা চাঁদের আলো ফুটে উঠার জন্য  সময়ের প্রয়োজন রয়েছে।

সূত্র – ০৯

পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর কিংবা দক্ষিণ এর তফাৎ সামান্যই। তোমার গন্তব্য যেটাই হোক না কেন,  কেবল এতটুকু নিশ্চিত থেকো যাতে তোমার প্রতিটি যাত্রা হয় একটি অন্তর যাত্রা।  যদি তুমি অন্তর যাত্রা করতে পারো তাহলে তুমি সমস্ত বিশ্ব এবং এর উর্ধ্বেও ভ্রমণ করতে পারবে।

সূত্র – ১০

ধাত্রী জানে যে যখন কোন বেদনা উঠে না, বাচ্চা বের হবার পথ রুদ্ধ হয়ে যায় এবং মা বাচ্চা প্রসব করতে পারে না। ঠিক তেমনি ভাবে, নতুন সত্ত্বার প্রসব হবার জন্য কষ্ট প্রয়োজন রয়েছে। যেমনভাবে মাটির পাত্রের তীব্র তাপের মধ্য দিয়ে পার হতে হয় তেমনভাবে ভালোবাসাও একমাত্র কষ্টের মাধ্যমে পরিশুদ্ধ হয়।

সূত্র – ১১

ভালোবাসার জন্য খোঁজ অনুসন্ধানকারীকে পরিবর্তন করে দেয়। এমন কোন অনুসন্ধানকারী নেই যারা ভালোবাসার খোঁজে বের হয়ে পরিপক্কতা লাভ করেনি। যেই মুহূর্তে তুমি ভালোবাসার খোঁজ করো সেই মুহূর্তেই তুমি নিজের ভেতরে ও বাইরের দিক দিয়ে পরিবর্তন হওয়া শুরু করে দাও।

সূত্র – ১২

এই মহাকাশে যতগুলো তারা দৃশ্যমান আছে তার থেকেও বেশী এই পৃথিবীতে আছে ভন্ড সাধু এবং ভন্ড শিক্ষক। প্রকৃত শিক্ষকদের সাথে  শক্তি কব্জাকারী ও আত্মম্ভরি মানুষদেরকে মিলিয়ে ফেলে দ্বন্দ্বে পরোনা। একজন প্রকৃত আধ্যাত্মিক শিক্ষক কখনও সরাসরি তোমার মনোযাগ আকর্ষণে সচেষ্ট হবে না এবং কখনও তোমার কাছ থেকে কোনপ্রকার আনুগত্য ও প্রশংসা কামনা করবে না। আর তিনি এসব করার চেয়ে বরং তোমাকে সাহায্য করবে তোমার ভেতরের যে সত্ত্বা আছে তার মূল্যবৃদ্ধি করবে ও প্রশংসা করবে। প্রকৃত শিক্ষকগণ হয় কাঁচের মত স্বচ্ছ।তারা তাদের মাঝ দিয়ে খোদায়ী জ্যোতি প্রবাহিত হতে দেন।

সূত্র – ১৩

তোমার পথে যে পরিবর্তনই আসুক না কেন তাকে বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা করো না। বরং জীবনকে তোমার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হতে দাও। আর তোমার জীবনের যে জোয়ার-ভাটা ঘটে চলেছে তা নিয়ে চিন্তিত হয়ো না। তুমি কীভাবে জানো যে যেটাতে তুমি অভ্যস্ত ছিলে তা অধিকতর ভালো তার থেকে যা তোমার সামনে আসতে চলেছে।

সূত্র – ১৪

খোদা তোমার কাজ পরিপূর্ণ করতে সদা ব্যস্ত রয়েছেন, বাইরে এবং ভেতর উভয় দিক থেকেই। সে তোমার সাথে পরিপূর্ণরূপে বিজরিত হয়ে আছে। প্রতিটি মানবসত্ত্বাই অগ্রগতির দিকে ধাবিত হচ্ছে যা বেশ ধীর কিন্তু তা অপ্রতিরোধ্যভাবে পরিপূর্ণতা সাধনের দিকে ধাবিত হচ্ছে।আমরা প্রত্যেকেই শিল্পের একটি অসম্পূর্ণ অংশ যারা কীনা অপেক্ষা করছি ও সংগ্রাম করছি পরিপূর্ণ হবার জন্য। খোদা আমাদের প্রত্যেকের সাথেই আলাদা আলাদাভাবে আচরণ করে থাকেন কেননা মানবজাতি হল দক্ষ লিখনশৈলীর একটি শিল্পকলা যেখানে চিত্রের জন্য প্রত্যেকটি বিন্দু সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র – ১৫

এটা খুব সহজ একজন পরিপূর্ণ খোদাকে ভালোবাসা, যে কীনা নিষ্কলঙ্ক ও অভ্রান্ত। যেটা এর থেকেও কঠিন তা হল সমস্ত অপূর্ণতা ও ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও একজন মানুষকে ভালোবাসা। মনে রেখো একজন কেবল আরেকজনকে  জানতে পারে যে সে আসলে ভালোবাসতে কতটুকু সমর্থ। ভালোবাসা ব্যতীত কোন প্রজ্ঞা নেই। যদি আমরা খোদার সৃষ্টিকে ভালোবাসতে না পারি তাহলে প্রকৃতপক্ষে না আমরা ভালোবাসতে পারব না আমরা খোদাকে জানতে পারব।

সূত্র – ১৬

প্রকৃত বিশ্বাস হলো সেটা যা অভ্যন্তরীণ। আর বাকী সব হলো ধুয়ে ফেলা যায়। এমন এক ধরনের ময়লা রয়েছে যা বিশুদ্ধ কোন পানি দিয়ে পরিষ্কার করা যায় না, যেটি হল আত্মাকে ঘৃণা ও ধর্মান্ধতা দিয়ে কলুষিত করার দাগ। তুমি তোমার শরীরকে স্বল্প আহার ও রোযা রাখার মাধ্যমে বিশুদ্ধ করতে পারো, কিন্তু শুধুমাত্র ভালোবাসাই পারবে তোমার হৃদয়কে বিশুদ্ধ করতে।

সূত্র – ১৭

এই পুরো মহাবিশ্ব একজন একক ব্যক্তির মধ্যে বিরাজ করে- তুমি। তুমি তোমার চারপাশে যা কিছু দেখে থাকো তার ভেতর  হয়ত অনেক কিছু তোমার পছন্দের নয়, এমনকী তুমি যাদের অবজ্ঞা করো ও ঘৃণা করো তারাও তোমার মাঝে কোন না কোন দিক দিয়ে অবস্থান করে। তাই শয়তানকেও তোমার বাইরে খুজেঁফিরে বেড়িয়ো না। শয়তান কোন আহামরি শক্তি নয় যা তোমাকে বাইরে থেকে আক্রমণ করবে। এটা হলো তোমার ভেতরের অতি নগন্য একটি আওয়াজ। যদি তুমি তোমাকে সম্পূর্ণ জানার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়তে চাও তাহলে সততা ও দৃঢ়তার সাথে এগিয়ে চলো।

সূত্র – ১৮

যদি তুমি অন্যেরা তোমার সাথে যেভাবে আচরণ করে তা পরিবর্তন করতে চাও, তাহলে প্রথমেই তোমার উচিত হবে সম্পূর্ণভাবে ও একাগ্র হয়ে নিজের সাথে নিজের আচরণ করার মাঝে পরিবর্তন আনা। এছাড়া আর কোন রাস্তা নেই যার জন্য তোমাকে কেউ ভালোবাসবে। একবার যদি তুমি এই অবস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়ে যাও, যাই হোক না কেন, কৃতজ্ঞ থাকো সেইসকল কাটার আঘাতের জন্য যা অন্যরা হয়ত তোমাকে উদ্দেশ্য করে ছুড়েছিল। এটাই হলো লক্ষণ যে তোমার উপর শীঘ্রই গোলাপের বর্ষণ করা হবে।

সূত্র – ১৯

অস্থির হয়ো না রাস্তা তোমাকে যেখানেই নিয়ে যাক না কেন। বরং মনোযোগী হও তোমার প্রথম পদক্ষেপের উপর। এটাই হল সবচেয়ে কঠিন অংশ এবং এটাই হলো সেটা যার জন্য তুমি দায়বদ্ধ।  একবার যখন তুমি তোমার পদক্ষেপ নিয়ে ফেলবে আর সবকিছুকে তার মত করে স্বাভাবিক ভাবে কাজ করতে দাও এবং বাদবাকী সবকিছু তখন আপনাআপনি অনুসরণ করা শুরু  করবে। কখনও স্রোতের সাথে চলো না। বরং স্রোতে পরিণত হও।

সূত্র – ২০

আমাদের প্রত্যেকেই তার রূপের সুরতে বানানো হয়েছে। তথাপি আমরা প্রত্যেকেই অনন্য ও আলাদাভাবে সৃষ্ট। দুইজন মানুষ একই রকম হয় না। তাদের হৃদয়ের আওয়াজ একই ছন্দে স্পন্দিত হয় না। যদি খোদা চেয়ে থাকতেন যে সবাই একই রকম হবে তিনি হয়ত তা তৈরী করতেন। তাই অমর্যাদা করার মাঝে পার্থক্য রয়েছে এবং তোমার চিন্তা অন্যের উপর খাটানো হল ততটুকু পরিমাণ অমর্যাদা করা যতটুকু পরিমাণ অমর্যাদা  খোদার পরিকল্পনার উদ্দেশ্যে  করলে হয়।

সূত্র – ২১

যখন একজন প্রকৃত খোদার  প্রেমিক একটি শুঁড়িখানার মধ্যে প্রবেশ করে তখন সেই শুড়িঁখানাটি তার প্রার্থনাস্থলে পরিণত হয়ে যায়। কিন্তু একজন মদ্যপ যখন সেই একই শুড়িঁখানায় প্রবেশ করে তখন এটা তার সরাইখানায় পরিণত হয়। আমরা যা কিছুই করি না কেন এটা হল আমাদের হৃদয় যা পার্থক্য তৈরী করে, আমাদের বাইরের বেশভূষা নয়। সূফীরা কখনও অন্য মানুষের চেহারা ও তারা পরিচয় কী সেটা নিয়ে মাথা ঘামায় না। যখন একজন সূফী কারও দিকে তাকায় তখন সে তখন সে তার দুই চোখ বন্ধ করে রাখার পরিবর্তে তৃতীয় নেত্র খোলে – এটা সেই চোখ যা দেখতে পায় অন্তর্জগত।

সূত্র – ২২

জীবন হলো একটি ক্ষণস্থায়ী দেনা এবং এ পৃথিবী বাস্তবতার একটি প্রতিচ্ছবি ব্যতীত আর কিছু না। একমাত্র বাচ্চারাই একটি খেলনাকে আসল জিনিস বলে ভুল করতে পারে। তবুও মানুষ হয় এই খেলনা নিয়ে মত্ত মোহাবিষ্ট হয়ে আছে নাহয় এটাকে যাচ্ছেতাই ভাবে ভাঙ্গছে এবং একে ছুড়ে ফেলে দিচ্ছে। জীবনে সকল প্রকার চরমপন্থা থেকে দূরে থেকো কেননা এগুলো তোমার অভ্যন্তরীণ সমতাকে ধ্বংস করে দিবে। সূফীরা চরমপন্থার দিকে অগ্রসর হয় না। একজন সূফী সবসময় থাকে কোমল এবং মধ্যমপন্থী।

সূত্র – ২৩

খোদার সৃষ্টির মাঝে মানুষের রয়েছে এক অনন্য মর্যাদা। “আমি আমার রুহ তার রুহে ফুঁকে দিলাম,” – খোদা বলেন। আমাদের প্রত্যেককেই এই পৃথিবীতে তাঁর প্রতিনিধি করে পাঠানো হয়েছে। নিজেকে জিজ্ঞাসা করো, কোন কোন সময় তুমি একজন প্রতিনিধির মত আচরণ করো, তুমি কী তা আদৌ করেছ? মনে রেখো এটার দায়িত্ব আমাদের প্রত্যেকের উপর বর্তায় যেন আমরা ঐশ্বরিক সত্তার অনুসন্ধান করি এবং তার উপর আমাদের জীবন নির্বাহ করি।

সূত্র – ২৪

জাহান্নাম এখানে এবং এই মুহূর্তেই রয়েছে। আর জান্নাতও  ঠিক তেমনিভাবে রয়েছে। জাহান্নামের ব্যাপারে দুঃশ্চিন্তা করা ও জান্নাতের ব্যাপারে স্বপ্ন দেখা ছেড়ে দাও, যেহেতু এ দুটোই এই মুহূর্তের মাঝেই উপস্থিত রয়েছে। যেই সময়ে আমরা ভালোবাসা পতিত হই ঠিক সেই সময় আমরা জান্নাতের দিকে আরোহণ করি। আর যেই সময়ে আমরা ঘৃণা, হিংসা, কারো সাথে যুদ্ধ করি ঠিক সেই মুহূর্তে আমরা গড়িয়ে গড়িয়ে সোজা জাহান্নামের আগুনের মধ্যে পড়ে যাই।

সূত্র – ২৫

প্রত্যকে পাঠক কোরআন কে বিভিন্ন স্তরে  তার নিজস্ব বোঝার গভীরতা  অনুযায়ী ধারণ করে থাকে। অন্তর জ্ঞানের চারটি স্তর রয়েছে। প্রথম স্তর হল জাহেরী বা বাহ্যিক এবং এটাতেই বেশীরভাগ মানুষ বিজরিত। পরবর্তী ধাপ হল বাতেনী – যা হল অভ্যন্তরীন স্তর। তৃতীয়টি হল ভেতরেরও ভেতরের স্তর। এবং চতুর্থ স্তরটি এতটাই গভীর যে এর উপর কোন শব্দকে আরোপণ করা যায় না।  আর এজন্যই এটি  বর্ণতাতীত।

সূত্র – ২৬

এই মহাবিশ্ব হল একটি একক সত্ত্বা। সবকিছু ও সকলেই একটি অদৃশ্য গল্পের বুনটের দ্বারা পরস্পরের  সাথে সম্পর্কযুক্ত। আমরা এর ব্যাপারে সচেতন হই বা না হই আমরা সবাই একটি নীরব কথোপকথনের মধ্যে আছি। কোন ক্ষতি কোরো না। সহানুভূতির অনুশীলন করো। এবং কারো গীবত কোরো না – এমনকী কোন তথাকথিত নির্দোষ মন্তব্যও কোরো না! যে শব্দরাশি আমাদের মুখ দিয়ে বের হয় তা কখনও নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় না, বরং তারা এই অসীম মহাকাশে প্রতিনিয়ত সংরক্ষিত হয় এবং তা যথাসময়ে আমাদের কাছে ফিরে আসে। একজন মানুষের ব্যাথা আমাদের সবাইকে ব্যাথিত করে। আর একজনের আনন্দ আমাদের সবাইকে আনন্দিত করে।

সূত্র – ২৭

তুমি যা কিছুই বলো না কেন, ভালো কিংবা খারাপ তা কোন না কোনভাবে তোমার কাছে ফিরে আসবে। এজন্য কেউ যদি তোমাকে নিয়ে কেউ খারাপ ধারনা পোষণ করে থাকে, আর তুমিও যদি তার ব্যাপারে অনুরূপ খারাপ ধারনা পোষণ করে থাকো এটা বিষয়কে আরো খারাপ করে তুলবে। তুমি তখন একটা বিদ্বেষপরায়ণ চক্রের মাঝে খাবি খেতে থাকবে। তার থেকে তুমি বরং  চল্লিশ দিন তার ব্যাপারে সুন্দর সুন্দর কথা বলো এবং চিন্তা করো। ৪০ দিন পর সবকিছুই বদলে যাবে কেননা তুমিও তোমার ভেতর দিক থেকে বদলে যাবে।

সূত্র – ২৮

অতীত হল নিতান্তই একটি ধারনা। আর ভবিষ্যৎ হল মরীচিকা। এই পৃথিবী সময়ের মধ্য দিয়ে চলে না যেমনটা একে মনে হয় এটি অতীত থেকে ভবিষ্যতে একটি সোজা রেখা ধরে এগোচ্ছে। বরং সময় এর এবং আমাদের মধ্য দিয়ে চলে, একটা অবিরাম ঘূর্ণির মত। নিত্যতা মানে অসীম সময় নয়, বরং সহজভাবে বলা যায় এটি হল অসীমতা।যদি তুমি নিত্যতার আলোকে উদ্ভাসিত হতে চাও তাহলে তোমার মনকে অতীত ও ভবিষ্যৎ থেকে দূরে রাখো এবং বর্তমানের মাঝে থাকো।

সূত্র – ২৯

ভাগ্যের মানে এই না যে তোমার জীবন পূর্বনিয়ন্ত্রিত। তাই সবকিছু ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেওয়া এবং সক্রিয়ভাবে এই মহাবিশ্বের ঐকতানের সাথে তাল না মেলানো হলো সম্পূর্ণ অজ্ঞতা। এই মহাবিশ্বের সব জায়গা জুড়ে রয়েছে এর সমস্ত রকম সুর ও এটা ৪০ টি বিভিন্ন স্তরে এটি গ্রথিত হয়ে আছে। তোমার ভাগ্য হলো সেটাই যেই স্তরে তুমি তোমার সুর বাজাচ্ছো। তুমি হয়তোবা তোমার বাদ্যযন্ত্র পরিবর্তন করতে পারবে না কিন্তু কত ভালোভাবে তুমি সুর বাজাবে এটা সম্পূর্ণ তোমার উপর নির্ভর করে।

সূত্র – ৩০

একজন সূফীর প্রকৃতি এমন হয় যে যখন তার উপর মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়, আক্রমণ করা হয় এবং তাকে সবদিক দিয়ে রুদ্ধ করে দেওয়া হয়; সে ধৈর্য ধরে তা সহ্য করে যায়, বিন্দুমাত্র খারাপ শব্দ উচ্চারণ করে না তার সমালোচকদের বিরুদ্ধে। একজন সূফী কখনও কাউকে দোষ দেয় না। আগে কীভাবেই বা প্রতিযোগী, প্রতিদ্বন্দ্বী বা এমনকী অন্য কেউ থাকতে পারে যেখানে কোন নিজস্ব সত্ত্বাই (Self) নেই। কীভাবেই বা অন্য কাউকে দোষ দেওয়া যেতে পারে যেখানে কেবলমাত্র একজনই আছে।

সূত্র – ৩১

যদি তুমি তোমার বিশ্বাসকে শক্তিশালী করতে চাও, তাহলে তোমাকে ভেতর দিক থেকে কোমল হতে হবে। তোমার বিশ্বাসকে পাথরের মত শক্তপোক্ত করার জন্য তোমার হৃদয় হতে হবে অত্যন্ত নরম, একটি পালকের মত। রোগব্যাধি, দুর্ঘটনা, কাউকে হারানোর শোক অথবা ভয় পাওয়া, এরকম আরও অনেক ঘটনা রয়েছে যার আমরা সম্মুখীন হই; এগুলো আমাদের শেখায় কীভাবে নিঃস্বার্থ, অধিক দয়ালু এবং উদার হতে হয়। এরপরও আমাদের আমাদের কিছু লোক রয়েছে যারা এগুলো থেকে শিক্ষা নেয় ও তারা আরও নম্র হয়,  যেখানে অনেকেই আছে তারা আগের থেকে আরও খারাপ অবস্থায় পর্যবসিত হয়।

সূত্র – ৩২

তোমার এবং খোদার মাঝখানে কিছুই নেই। না ইমাম, পুরোহিত, রাবাঈ এবং অন্য যেকোন নৈতিক অথবা ধর্মীয় নেতা। এমনকী কোন আধ্যাত্মিক গুরু এবং তোমার বিশ্বাসও নয়। তোমার নীতি, নৈতিকায় বিশ্বাস রাখো কিন্তু এগুলো নিয়ে কারো উপর প্রভুত্ব ফলিয়ো না। যদি তুমি অন্য মানুষের বিশ্বাস ভাঙ্গো তাহলে তুমি ধর্মীয় যা দায়িত্ব যাই-ই পালন করে থাকো না কেন এসবের কোন মূল্য নেই। সকল প্রকার অন্ধভক্তি থেকে দূরে থাকো, যা তোমার দূরদর্শিতা কে ঘোলা করে দিবে। খোদা, একমাত্র খোদাকেই তোমার পথপ্রদর্শক রূপে গৃহীত হতে দাও। সত্যকে শিক্ষা করো, আমার বন্ধু কিন্তু সতর্ক থেকো তোমার সত্যেকে অন্ধভক্তির পাত্র বানিয়ে ফেলো না যেন।

সূত্র – ৩৩

যখন এই পৃথিবীর সবাই কোন না কোন জায়গায় ও হবার জন্য কাতরাচ্ছে,  যা কেবল তাদের মৃত্যুর পর ধুলিসাৎ হয়ে যাবে; এই অবস্থায় তোমার একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত সর্বোচ্চ শূন্যতায় পৌঁছানোর। এই জীবনটাকে যাপন করো এইভাবে যেন এটি একদম খালি এবং যেন এটি হলো সংখ্যা শূন্যের মত। আমরা  একটি পাত্র থেকে মোটেই আলাদা নই। এটা বাহিরের কোন সাজসজ্জা নয় বরং এটা হলো অভ্যন্তরীণ শূন্যতা যা আমাদেরকে সোজা করে ধরে রেখেছে। ঠিক এরকম ভাবে যা অর্জন করার জন্য আমরা কাতরাই এটা তা নয় বরং এটা হলো শূন্য অবস্থার সচেতনতা যা আমাদের পরিচালিত করে।

সূত্র – ৩৪

হার মেনে নেওয়া মানে এই নয় যে তুমি দূর্বল বা নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছো। এটা না কোন অদৃষ্টবাদ না কোন আত্মসমর্পণের দিকে তোমাকে নিয়ে যাবে। বরং  এটি এর বিপরীত। সত্যিকারের শক্তি হার মেনে যাওয়ার মাঝে থাকে যা ভেতর থেকে আসে। যারা জীবনের সেই দিব্য সত্তার কাছে নতি স্বীকার করে নিয়েছে তারা দৃঢ়, সাম্য এবং শান্তিপূর্ণ ভাবে জীবন নির্বাহ করবে যতই এই পুরো বিশ্ব দাঙ্গাহাঙ্গামার মধ্য দিয়ে যাক না কেন।

সূত্র – ৩৫

এই পৃথিবীতে অভিন্নতা বা গতানুগতিকতা আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায় না বরং বৈপরীত্য তা করে।আর এই মহাবিশ্বের সমস্ত বৈপরীত্য আমাদের প্রত্যেকের মাঝেই রয়েছে। আর এজন্য বিশ্বাসী কে অবিশ্বাসীর সাথে মিলিত হতে হবে এবং অন্তঃস্থিত ভাবে পাশাপাশি রেখে চলতে হবে। এবং অবিশ্বাসীকে জানতে হবে তার মধ্যকার নীরব বিশ্বস্ততা। যতদিন না পর্যন্ত একজন ইনসানে কামেল এই স্তরে পৌঁছাচ্ছে, একজন পরিপূর্ণ মানুষে, ঠিক ততদিন পর্যন্ত বিশ্বাস হল একটি গতানুগতিক ধারা এবং যা একজন কে তা করতে বাধ্য বা জোর করে এটা হল ঠিক তার বিপরীতঃ অবিশ্বাস।

সূত্র – ৩৬

এই পৃথিবী ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া নীতির উপর ভিত্তি করে দাড়িয়ে আছে। এক বিন্দু পরিমাণ দয়া ও এক বিন্দু পরিমাণ মন্দ এর কোনটাই অফেরতযোগ্য থাকবে না। কোন প্রকার কৌশল, ধোঁকা বা অন্যের উপর চাল খাটানোর জন্য এটি নয়। যদি কেউ একটি ফাঁদ কারো জন্য তৈরী করে, মনে রেখো এটা খোদারই কাজ। সে হল সবচেয়ে বড় কুশলী। তাঁর নির্দেশ ছাড়া গাছের একটি পাতাও নড়ে না। সহজ এবং পরিপূর্ণরূপে এটার উপর বিশ্বাস রাখো। খোদা যাই-ই করুক না কেন তা তিনি করেন চমৎকারভাবে।

সূত্র – ৩৭

খোদা হলেন একজন  সুবিবেচক নির্মাতা। তাঁর আদেশ এতটাই নির্ভুল যে এই পৃথিবীতে যা কিছুই ঘটছে না কেন তা তার নিজস্ব সময় অনুযায়ী চলছে। না  এক মিনিট আগে না এক মিনিট পরে৷ এবং তা সকলের জন্য কোন রকম ব্যাতিক্রম ছাড়াই, ঘড়িটি নিখুঁতভাবে কাজ করে। প্রত্যেকের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট সময় আছে ভালোবাসার এবং মারা যাবার।

সূত্র – ৩৮

এখনও সময় আছে নিজেকে এটা জিজ্ঞাসা করার, “আমি এখন যে জীবন যাপন করছি তা পরিবর্তন করতে কী আমি প্রস্তুত আছি? আমি কী আমার অন্তঃস সত্ত্বাকে পরিবর্তন করতে প্রস্তুত?” এমনকী একটি দিনও যদি তোমার পূর্বের গত হয়ে যাওয়া দিনের মত হয় তাহলে এটা সত্যিই খুব দুঃখজনক। প্রতি মুহূর্তে এবং প্রতি নিঃশ্বাসে একজনের উচিত বারবার সতেজ ও নতুন হয়ে ওঠা। নতুন জীবন লাভের জন্য কেবলমাত্র একটি পথই খোলা রয়েছে; আর তা হল মৃত্যুর আগে মরে যাওয়া।

সূত্র -৩৯

যেখানে অংশের কোন পরিবর্তন হয় সেখানে সমগ্র সবসময় একই অবস্থায় থাকে। প্রত্যেক চোর যারা এই পৃথিবী থেকে গত হয়ে যায়,  একজন নতুনের আবার সেখানে জন্ম হয়। এবং একজন গোষ্ঠীভিত্তিক ব্যক্তি যিনি গত হয়ে যান তার সেখানে একজন নতুন ব্যক্তির দ্বারা তার জায়গা প্রতিস্থাপিত হয়। আর এইভাবে কোন কিছু যেমন একইরকম থাকে না তেমনি কোনকিছুর আসলে কোন পরিবর্তনও হয় না। প্রত্যেক সূফীই যারা মারা যায়, অন্যজনের কোথায় না কোথাও জন্ম হয়ে যায়।

সূত্র – ৪০

ভালোবাসা ছাড়া জীবনের কোন মূল্য নেই। নিজেকে জিজ্ঞাসা কোরো না কোন ধরনের ভালোবাসা তোমার সন্ধান করা উচিতঃ আধ্যাত্মিক অথবা বস্তুকেন্দ্রিক, ঐশ্বরিক নাকী পার্থিব, প্রাচ্য কিংবা পাশ্চাত্য। বিভাজন কেবল কেবল আরও বিভাজনের দিকে নিয়ে যায়। ভালোবাসার কোন লেবেল নেই, নেই কোন সংজ্ঞা। এটা যা এটি হল তাই, পবিত্র ও সাধারণ। ভালোবাসা হল এ জীবনের প্রাণ। আর ভালোবাসাই হলো আত্মার আগুন! এই মহাবিশ্ব তখনই ভিন্নভাবে পরিচালিত হয় যখন আগুন পানিকে ভালোবাসে।

0Shares

নাজিউর রহমান নাঈম

আমিকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। কিন্তু সে যে কোথায় লুকাইলো ও এই লোকটি যে তা বড় আশ্চর্যের বিষয়! আমি হারিয়ে যা হল একে কীই-বা বলা যায় বলুন। এখন যাকে দেখছেন সে তো অন্য কাজ করে বেড়াচ্ছে, তার পরিচয়ও নিশ্চয়ই বদলে গেছে। তাহলে আপনি কাকে দেখছেন? দেখছেন আপনাকে আপনার চিন্তাকে যা আপনাকে আমাকে দেখাচ্ছে বা কল্পনা করাচ্ছে। তাহলে শুধু শুধু পরিচয় জেনে কী হবে বলুন। তার চেয়ে বরং কিছু সাইকোলাপ-ই পড়ুন ও নিজেকে হারিকেন নিয়ে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ুন। পথিমধ্যে হয়ত কোথাও দেখা হয়েও যেতে পারে!!! সে পর্যন্ত- কিছু কথা পড়ে থাকুক জলে ভেজা বিকালে খুঁজে চলুক এই আমি পিলপিল করে অনন্ত "আমি" র অদৃশ্য পর্দার আড়ালে

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *