যে বইগুলোকে আমি ভালবেসেছি – ওশোর প্রিয় ১৬৭টি বই

পর্ব – ০১

সাল – ১৯৮৪, লাওৎসু হাউজ, রজনীশপুরম

অতিথি, আয়োজক, সাদা চন্দ্রমল্লিকা,,, এই মুহূর্তগুলো, সাদা গোলাপগুলো, যখন অতিথি কিংবা আয়োজক কারুরই কথা বলা উচিত নয়,,, শুধু
নীরবতা।

কিন্তু নীরবতা তার নিজস্ব ভঙ্গীতে কথা বলে, গায় তার নিজের আনন্দের, শান্তির, সৌন্দর্যের এবং আশীর্বাদের গান। এটা না হলে ডাও ডে চিং (Tao Te Ching) হত না, থাকত না সেখানে কোন সারমন অন দ্য মাউন্ট (Sermon on the mount)। আমি এগুলোকে আসল কবিতা বলে গণ্য করি। যদিও এগুলোকে কাব্যিক আকারে রচনা করা হয়নি। এগুলো হলো আগন্তুক। এদেরকে বাইরে রাখা হয়েছে। এটি একদিক থেকে সত্যঃ এদেরকে প্রথাগত নিয়ম, সাধারনতার মাঝে অন্তর্ভুক্ত করা যায় না। কোনপ্রকার মাপকাঠির মাঝে এগুলোকে বাঁধা যাবে না। এগুলো সকল নিয়মের উর্ধ্বে। আর তাই এগুলোকে এড়িয়ে যাওয়া যেতে পারে।

ফিয়োদর দস্তয়েভস্কি’র ব্রাদার কারমাজভ(Brother Karamazov) এর কিছু অংশ একদম খাঁটি কবিতা, এমনকী একইরকমভাবে  পাগল ব্যক্তি নীটশের দাজ স্পেক জরথুস্ত্রেরও(Thus spake Zarathustra) কিছু অংশকেও তা বলা যায়। এমনকী নীটশে যদি আর কোনকিছু না লিখে যদি তার দাজ স্পেক জরথুস্ত্র লিখে রেখে যেত তাহলেও সে এই মানব জাতির জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, চরম উপকার সাধন করে যেতে পারত যা কোন মানুষের কাছ থেকে এর চেয়ে বেশী আশা করা যায় না। কারণ জরথুস্ত্রকে মানুষ প্রায় ভুলেই গিয়েছিল। নীটশে-ই ছিল একমাত্র ব্যক্তি যে কীনা তাকে আবার ফিরিয়ে এনেছিল। যে কীনা আবার তাকে জন্ম দিয়েছিল, এ যেন এক পুনরুজ্জীবন। “দাস স্পেক জরথুস্ত্র” ভবিষ্যতের বাইবেল হতে চলেছে।

এটা কথিত আছে যে জরথুস্ত্র হেসেছিল যখন তার জন্ম হয়। এটা কল্পনা করা বেশ কঠিন যে একটি সদ্য জন্ম নেওয়া শিশু খিল খিল করে হাসছে। শুধু হাসি হলেও মেনে নেওয়া যায় কিন্তু তাই বলে খিল খিল করা হাসি? যে কেউ এটার ওপর বিস্মিত হয়ে যায়, এটা কী,,, কেননা খিল খিল করে হাসার তো একটা কার্যকারণ থাকতে হবে নাকী।

পর্ব – ০২

আসলে কোন কৌতুকের ওপর শিশু জরথুস্ত্র হাসছিলো? মহাজাগতিক কৌতুক, এটা হলো সেই কৌতুক যা হলো এই পুরো অস্তিত্ব।

হ্যাঁ, তোমার নোটে এই মহাজাগতিক কৌতুক নামটি লেখো এবং এটাকে আন্ডারলাইন করো। এইতো বেশ। তুমি যে আন্ডারলাইন করেছো আমি এটা পর্যন্ত শুনতে পারি। এটা চমৎকার। দেখেছো আমি কত ভালো শুনতে পারি। যখন আমি চাই তখন আমি আঁকিবুঁকি, একটি পাতা এসবের আওয়াজও শুনতে পাই। যখন আমি দেখার ইচ্ছা পোষণ করি তখন আমি অন্ধকার,,ঘন অন্ধকারের মাঝেও দেখতে পারি। কিন্তু যখন আমি শোনার ইচ্ছা পোষণ করিনা তখন আমি না শোনার ভান করি কেবলমাত্র তোমাকে এটা বোঝানোর জন্য যে সবকিছু ঠিকঠাক চলছে।

জরথুস্ত্র তার জন্মের সময় হাসছে! আর এটা ছিল কেবল তার শুরু। সে তার সারাটি জীবন ধরে খালি হেসেই গিয়েছে। তার পুরো জীবন ছিল হাস্যকৌতুকে ভরা। এরপরও মানুষরা তাকে ভুলে গেছে। ইংরেজরা তো তার নামই বদলে দিয়েছে। তারা তার নাম দিয়েছে জরোস্টার ‘Zoroaster’। কী রাক্ষুসেপনা! ‘জরথুস্ত্র'(‘Zarathustra’) নামটিতে রয়েছে গোলাপের পাপড়ির মত কোমলতা, আর অন্যদিকে ‘জরোস্টার'(‘Zoroaster’) শব্দটি লাগে বিশাল বড় মেশিনের ঝনঝনানির মত। জরথুস্ত্র হয়তো হেসে কুটিকুটি হতেন এই ‘Zoroaster’ নামটি শুনে। কিন্তু নীটশের পূর্বে সে বিস্মৃতই ছিলো। এটা হবারই ছিলো।

মোহাম্মদের অনুসারীরা জরথুস্ত্রের সকল অনুসারীদের জোর করে মুসলিম বানিয়েছিলো। কেবলমাত্র কিছু সংখ্যক, বেশ কম সংখ্যকই পালাতে পেরেছিলো ভারতবর্ষের দিকে। তারা আর কোথায়ই বা পালাবে। ভারতবর্ষ ছিল এমন একটি জায়গা যেখানে যেকেউ বিনা পাসপোর্টে কিংবা ভিসায় কোনপ্রকার ঝামেলা ছাড়াই প্রবেশ করতে পারত। কেবলমাত্র জরথুস্ত্রের কিছু সংখ্যক অনুসারীরা মুসলিম অত্যাচারীদের কবল থেকে পালাতে পেরেছিল। ভারতে তাদের সংখ্যা খুব বেশী নয়, মাত্র এক লাখ। এখন কে এই এক লাখ অনুসারীর ধর্ম নিয়ে মাথা ঘামাবে। এছাড়া তাদের প্রায় লোকেরাই ভারতের সমস্ত জায়গা জুড়ে নয় বরং একটি মাত্র শহর বোম্বের আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাস করে। এমনকী তারা পর্যন্ত জরথুস্ত্রকে ভুলে গিয়েছে। তারা হিন্দুদের সাথে আপোষ করে নিয়েছে যাদের সাথে তাদের বসবাস করতে হয়। তারা কুয়ো থেকে পালিয়ে এসে এখন গর্তে পড়েছে, একটা গভীর গর্তে! একদিকে কুয়ো আর অন্যদিকে গর্ত। এবং এর মাঝ বরাবর চলে গিয়েছে রাস্তা – বুদ্ধ যাকে বলেছে মধ্যম পথ(Middle way) – একেবারে মাঝখানে, যারা বেঁধে দেওয়া শক্তদড়ির ওপর দিয়ে হাঁটে ঠিক তাদের মত।

আধুনিক বিশ্বের সাথে জরথুস্ত্রকে পরিচয় করিয়ে দেয়াটা ছিল নীটশের মহৎ অবদান। তার সবচেয়ে বড় অহিতসাধনটি ছিল হিটলার। সে দুটোই করেছে। অবশ্য হিটলারের কর্মের জন্য সে দায়ী নয়। নীটশে’র ‘সুপারম্যান’ কে ঠিকভাবে না বুঝতে পারাটা ছিল  হিটলারের নিজেরই ভুল। এ ব্যাপারে নীটশে কীইবা করবে? যদি তুমি আমাকে ভুল বোঝো আমি এ ব্যাপারে কীইবা করতে পারি? ভুল বোঝার ব্যাপারে তোমার বরাবরই স্বাধীনতা রয়েছে। হিটলার ছিল সাধারণ, মন্দীভূত, সত্যিকার অর্থে কুৎসিত একজন তরুণ। শুধুমাত্র তার চেহারা স্মরণ করো- সেই ছোট আকৃতির গোঁফ, সেই ভয়ার্ত চোখগুলো তাকিয়ে আছে যেন সেগুলো তোমাকে ভয় পাওয়ানোর চেষ্টা করছে এবং চিন্তায় ভাঁজ হয়ে থাকা সেই কপাল। সে এতটাই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিল যে তার সারাজীবনেও সে কারও সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যাবহার করে উঠতে পারেনি। কারও সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ হবার জন্য একজনকে একটু শান্ত হতে হয়।

হিটলার ভালোবাসতে পারেনি যদিও সে  এটা একনায়কতান্ত্রিকভাবে চেষ্টা করেছিল। সে চেষ্টা করেছিল যেমনভাবে অসংখ্য স্বামীরা দূর্ভাগ্যবশতভাবে নারীদেরকে শাসন করে, হুকুম করে, তাদেরকে কাঠপুতুলের মত নাচায়। কিন্তু এরপরও সে ভালোবাসতে ছিল অক্ষম। ভালোবাসার জন্য দরকার বুদ্ধিমত্তা। সে তার প্রেমিকাকে পর্যন্ত তার সাথে কক্ষে একা থাকতে দেবার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপণ করেছিল। এতটা ভয়! সে ভীত ছিল এজন্য যে যখন সে ঘুমিয়ে থাকবে কেউ বলতে পারেনা, তার প্রেমিকা হয়ত একজন মহিলা গুপ্তচর হতে পারে; এমনও হতে পারে সে  একজন শত্রুদলের এজেন্ট হিসেবে কাজ করছে। সে তার সারাটি জীবন একা একা ঘুমিয়ে কাটিয়েছে।

কীভাবে এডলফ হিটলারের মত একজন মানুষ ভালোবাসতে পারে? তার কোন মায়ামমতা ছিল না, না ছিল কোন অনুভূতি, তার মধ্যে হৃদয় বলতে কিছু ছিল না, তার মাঝে নারীত্বের কোন অংশই ছিলনা। সে তার নিজের ভেতরের নারীত্ব গুণটিকেই হত্যা করে ফেলেছিল তাহলে কীভাবে সে বাইরের কোন নারীকে ভালোবাসবে? বাইরে থাকা একজন নারীকে ভালোবাসতে হলে তোমাকে আগে তোমার ভেতরকার নারীত্বকে ভালোবাসতে হবে। কেননা একমাত্র সেটিই যা তোমার অন্তরে রয়েছে তা তোমার কর্মের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

আমি এটা শুনেছি যে হিটলার তার একজন প্রেমিকাকে নিছক একটি ক্ষুদ্র কারণের জন্য তাকে গুলি করেছিল। সে তাকে হত্যা করেছিল কারণ হিটলার তার প্রেমিকাকে বলেছিল যেন সে তার মায়ের বাড়িতে না যায়, কিন্তু যখন সে বাইরে বেরিয়ে যায় তার প্রেমিকা তার মায়ের বাড়িতে চলে যায়; যদিও মেয়েটি হিটলার চলে আসার আগেই ফিরে এসেছিল। পরবর্তীতে সে তার গার্ডের মাধ্যমে জানতে পেরেছিল যে তার প্রেমিকা বাইরে বের হয়েছিলো। আর এটাই প্রেমের সম্পর্কটি শেষ করে দেবার জন্য যথেষ্ট ছিল; শুধুমাত্র প্রেম নয় সেইসাথে নারীটিকেও! সে তাকে গুলি চালাতে চালাতে বলেছিল, “যদি তুমি আমার কথা না মানো তাহলে তুমি আমার শত্রু।”

তার যুক্তি ছিল এইরকমঃ যে তোমার কথা মানে সে তোমার বন্ধু; যে তোমার কথা মানে না সে তোমার শত্রু। যে তোমার পক্ষে তুমিও তার পক্ষে আর যে তোমার পক্ষে না তুমি তার বিপক্ষে। এরকমটা যে হতেই হবে তার কোন আবশ্যকতা নেই – কেউ কেউ শুধুমাত্র নিরপেক্ষও হতে পারে, না তোমার পক্ষে না তোমার বিপক্ষে। সে তোমার বন্ধু নাও হতে পারে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে সে তোমার শত্রু।

পর্ব – ০৩

আমি দাজ স্পেক জরথুস্ত্র বইটিকে ভালোবাসি।কিছুসংখ্যক বই-ই আছে যেগুলোকে আমি ভালোবাসি; এবং সেগুলোকে আমি আমার আঙ্গুলের সাহায্যে গুনতেও পারব,,,,

দাজ স্পেক জরথুস্ত্র এই লিস্টের মধ্যে থাকা প্রথম বই। (Thus Spake Zarathustra)।

দ্য ব্রাদার্স কারামাজোভ হল দ্বিতীয়। (The Brothers Karamaov)

তৃতীয় বইটি হল দ্য বুক অব মিরদাদ। (The Book Of Mirdad)

চতুর্থটি হল জোনাথান লিভিংস্টোন সীগাল। (Jonathan Livingston Seagull)

পন্ঞ্চমে যে বইটি রয়েছে সেটি হল লাওৎসু’র তাও তে চিং। ( Tao Te Ching By Lao Tzu)।

ষষ্ঠ বইটি হল দ্য প্যারাবলস অব চুয়াং তাজু (The Parables Of Chuang Tzu)। সে ছিল সবচেয়ে প্রীতিজাগানো একজন মানুষ, আর এটা হল সবচেয়ে প্রীতিজাগানো একটি বই।

সপ্তম বইটি হল দ্য সারমন অন দ্য মাউন্ট ( The Sermon On the Mount) – শুধুমাত্র দ্য সারমন অন দ্য মাউন্ট পুরো বাইবেল নয়। পুরো বাইবেল হল গাঁজাখুরি একমাত্র দ্য সারমন অন দ্য মাউন্ট বাদে।

অষ্টম… আমার গণনা কী ঠিক হচ্ছে? বেশ ভালো। তাহলে তুমি অনুভব করতে পারছো যে আমি এখনও আমার পাগলামীর মাঝে রয়েছি।
অষ্টম বইটি হল ভগবত গীতা (  Bhagavadgita) – কৃষ্ণের দৈবগীত। যাইহোক “খ্রিস্ট” (Christ) হল “কৃষ্ণ” (Krishna) এরই ভুল উচ্চারণ যেমনটা জরথুস্ত্র (Zarathustra) এর জরোস্টার (Zoroaster) নামে উচ্চারণ। “কৃষ্ণ” (Krishna) মানে হল চেতনার সর্বোচ্চ শিখর এবং ভগবত গীতায় কৃষ্ণের গীত সত্তার সর্বোচ্চ শিখরে গিয়ে পৌঁছায়।

নবম, গীতাঞ্জলি। এর মানে হল গীত নিবেদন। এটা হল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নির্মাণ যার জন্য সে নোবেল পেয়েছে।

এবং দশম বইটি হল  The songs of Milarepa – The One Thousand Songs Of Milarepa –  তিব্বতে একে এভাবেই ডাকা হয়।

কেউ কথা বলে বলেনি।

আয়োজক,

অতিথি,

না এই সাদা চন্দ্রমল্লিকা

আহহহ!… কী চমৎকার… এই সাদা চন্দ্রমল্লিকা। আআহহহ, কী চমৎকার। শব্দ এতটাই অসহায়। আমি বলে বোঝাতে পারব না আমার সামনে কী এসে উপস্থিত হয়েছে।

সাদা চন্দ্রমল্লিকা

কেউ কথা বলেনি

আয়োজক,

অতিথি,

এই সাদা চন্দ্রমল্লিকা

ভালো। এই সৌন্দর্যের কারণে, এমনকী আমার কান এই কোলাহলের আওয়াজ পর্যন্ত শুনতে অসমর্থ হয়ে পড়েছে, আমার চোখ অশ্রুতে ভরে উঠছে।

অশ্রু হল একমাত্র শব্দ যার দ্বারা অজানা কথা বলতে পারে,

এটাই নিঃশব্দতার ভাষা।

0Shares

নাজিউর রহমান নাঈম

আমিকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। কিন্তু সে যে কোথায় লুকাইলো ও এই লোকটি যে তা বড় আশ্চর্যের বিষয়! আমি হারিয়ে যা হল একে কীই-বা বলা যায় বলুন। এখন যাকে দেখছেন সে তো অন্য কাজ করে বেড়াচ্ছে, তার পরিচয়ও নিশ্চয়ই বদলে গেছে। তাহলে আপনি কাকে দেখছেন? দেখছেন আপনাকে আপনার চিন্তাকে যা আপনাকে আমাকে দেখাচ্ছে বা কল্পনা করাচ্ছে। তাহলে শুধু শুধু পরিচয় জেনে কী হবে বলুন। তার চেয়ে বরং কিছু সাইকোলাপ-ই পড়ুন ও নিজেকে হারিকেন নিয়ে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ুন। পথিমধ্যে হয়ত কোথাও দেখা হয়েও যেতে পারে!!! সে পর্যন্ত- কিছু কথা পড়ে থাকুক জলে ভেজা বিকালে খুঁজে চলুক এই আমি পিলপিল করে অনন্ত "আমি" র অদৃশ্য পর্দার আড়ালে

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *