মৌনতাক্লাব (বুক রিভিউ)

  • মৌনতাক্লাব (বুক রিভিউ)
ভার্সিটি জীবন থেকেই রাজনীতিতে যুক্ত আরশাদ ভার্সিটি থেকে বেরিয়েও রাজনীতিকেই ক্যারিয়ার হিসেবে নিয়েছিল, চাকরিসূত্রে হয়েছিল প্রভাবশালী এক মন্ত্রীর পিএস। মাত্র ৩২ বছর বয়সেই ঢাকায় তিনটি ফ্ল্যাট, চারটি দামি গাড়ি আর বিভিন্ন ব্যাংক মিলিয়ে জমা করেছিল প্রায় ১০০ কোটি টাকা।
 
ক্ষমতার এই অন্তহীন সুখের জীবনে বাগড়া বাঁধায় এক পলিটিক্যাল মার্ডারের ঘটনা যেটা তখন সারাদেশে আত্মহত্যা বিষয়ে চালানো হয়। এ ঘটনাটি আরশাদের মনে একটি তীব্র ধাক্কা দেয়। সে তখন গৌতম বুদ্ধের মত ঘর ছাড়ার পরিকল্পনা করে।
 
আরশাদ টার্গেট নেয় সে ১ হাজার ১০০জন মানুষের তালিকা বানাবে। পরবর্তী চারবছরে সেই মানুষগুলোর বাড়িতে যাবে ও প্রত্যেকের বাড়িতে দুই-তিন দিন থেকে অন্য কারও বাড়ির উদ্দেশ্য রওনা হবে। যে বাড়িতে থাকবে সমস্ত খরচপাতি অন্যজন বহন করবে তার কাছে কিছুই থাকবে না। তার সাথে কেবল থাকবে একগুচ্ছ কাগজ যেখানে পরিচিত মানুষদের নাম ও ফোন নাম্বার থাকবে।
 
এভাবে আরশাদ পরিকল্পনা নেয় স্বেচ্ছানির্বাসনের। অবশেষে ২০১০-এর ১ সেপ্টেম্বর সে একখানা কাপড় পড়ে বেরিয়ে পড়ে, পকেটে ১ হাজার টাকা, আর সেই কাগজ; পেছনে পড়ে থাকে অন্যায়, অভক্তি আর বৈচিত্র্যহীনতার ৩২ বছরের ইতিহাস।
 
২০১৯-এর ২৮ জুলাই আরশাদ তখন ৩৭ পেরিয়ে ৪১ এ অর্থাৎ মাঝে পেরিয়ে গেছে ৯ টি বছর ৩২-৪১। এ জীবনে আরশাদ ঘুরে বেরিয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ পরিবার, ঘুরেছে ৫৮টি জেলা। ৩২ বছরে থাকা অবস্থায় তার মনে হয়েছিল তার ৩৭ বছরে বুঝি মৃত্যু ঘটবে। কিন্তু ৩৭ এসেও যখন তার মৃত্যু হলো না তখন সে ভেবেছিল স্বেচ্ছানির্বাসন ত্যাগ করে কী সে আবার ফিরে যাবে নিজের জীবনে।
 
কেন? এর জবাব স্পষ্ট না থাকায় আরও প্রায় পাঁচ বছর ভবঘুরেমি জীবনযাপনের পর আগের জীবনে ফিরবে কী ফিরবে না নৈতিক দ্বন্দ্বে জর্জরিত আরশাদকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে অজন্তা হালদার নামক একজন রমণী। তার সাথে আরশাদ ভাগাভাগি করে নেয় সমস্ত নৈতিক দ্বন্দ্ব। এভাবে তারা পরস্পর একসাথে বসবাস করতে থাকে।
 
কিন্তু এই ঘরে বসে থাকা আরশাদের আর ভালো লাগছিল না। মানুষের সাথে যোগাযোগহীনতার দমবন্ধ অনুভূতি তাকে কাবু করে ফেলছিল। তাই সে অজন্তাকে প্রস্তাব দেয় বেউথা নদীর ওপারে একটি চায়ের দোকান খুলবে।
 
সেই চায়ের দোকানটিতে থাকবে ২৫ রকমের চা। কেউ যদি একবার ৫০ টাকা দিয়ে ফেলে সে সারাদিন যতইচ্ছা চা নিক আলাদা করে দাম দিতে হবে না। এককথায় নানা বৈশিষ্ট্যে পরিপূর্ণ থাকবে এই চায়ের দোকান। মানুষ আসবে চা খাবে, আড্ডা দিবে এবং আরশাদ সে সকল মানুষদের নানারকম গল্প শুনবে ও নিজের গল্প তাদেরকে শোনাবে।
 
চায়ের দোকানের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল চায়ের দোকানে যেই আসুক না কেন তারা প্রত্যেকেই হবে আরশাদের মত দেখতে। তাই চা-পায়ীরা যতই শোরগোক করুক তা হবে নিজের সাথেই নিজের কথপোকথন। এভাবেই চায়ের দোকানটির নাম হয়ে দাড়ায় “মৌনতা ক্লাব”।
 
অজন্তার সাথে এ ব্যাপারে শেয়ার করলে সে উৎসাহী হয়ে রাজি হয়ে যায় ও চায়ের দোকানের সমস্ত দেখাশোনার ভাড় বহন করে। অন্যদিকে আরশাদ আপনমনে বসে বসে নানারকম দৃষ্টিভঙ্গীর গল্প ও কথা শোনাতে থাকে আমাদের।
 
তার কথার মাঝে উঠে আসে নানা ধরনের বিষয়। এরমধ্যে রয়েছে মানুষ চেনার চাহিদা, সিদ্ধান্ত নামের তেলাপোকা, উদ্দেশ্যের উদ্দ্যেশ্যহীনতা, মুগ্ধতা ব্যাধি, সত্যবিভ্রম ইত্যাদি সব ইরেশনালিস্টিক সব কথাবার্তা। কেননা এ বইটির মূল প্লটই হল ইরেশনাল থিংকিং। মাঝপথে চা বিরতির সময় লেখক নিজে কিছু কথা বলেন যা বইটিতে তিনি দ্বিতীয় বন্ধনীর মাঝে প্রকাশ করেন।
 
তো যা বলছিলাম,,,
 
আরশাদ(যদিও এখানে আরশাদ বলছে কিন্তু মনে হবে লেখক যেন আরশাদকে দিয়ে তার মনের অভিব্যক্তিগুলো বলিয়ে নিচ্ছেন, এটা তিনি লেখক অংশটিতে উল্লেখও করেছেন) সরল মানুষ সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলে যে, ” সরল মানুষ হবার জন্য মেধা থাকা একেবারেই জরুরী নয়। পৃথিবীর কয়জন মানুষ গোল্ডেন রেশিওর নাম শুনেছে বা বিগ ব্যাঙ থিওরি না বুঝলে কী আসে যায়!
 
কারা সেই সরল মানুষ?
 
যারা অত্যন্ত তুচ্ছ কারণে খুশি হতে পারে, তার চেয়েও তুচ্ছ কারণ দিয়ে আরেকজনকে খুশি করতে পারে। ‘তুচ্ছ’ ব্যাপারটাও তো ব্যক্তিসাপেক্ষ নির্বাচন। কেউ বৃষ্টিতে ভেজাকে বিশাল রোমান্টিকতা গণ্য করে, কারও কাছে সর্দির ভয়, কেউবা বলবে বেটাগিরি দেখানো।
 
তুচ্ছকে তাই এভাবে দেখি, যা সরাসরি কোন কাজে আসে না।”
 
মেধা সম্পর্কেও একটি চমৎকার লাইন রয়েছে তা হল এই-
 
“মেধা হলো যৌবনবতী নারীর মতো, দেখলে আকর্ষণ অনুভূত হয়, কিন্তু সেই আকর্ষণের স্থায়িত্ব সাময়িক। অন্যদিকে সারল্য হলো নারীর হাসির মতো; প্রতিবার বিনিময়েই মন সতেজ হয়ে ওঠে।” অনবদ্য।
 
অস্তিত্ব প্রশ্নে, এই যেমন আমি কে, আমি কোথা থেকে এসেছি এটাকে আরশাদ মনে করে এগুলো হল তোতাপাখির বুলি। এজন্য সার্ত্রে, কিয়ের্কেগাদসহ অস্তিত্ববাদী দার্শনিকদের ওপর তার ক্ষোভ ঝাড়ে সে। সে মহৎ, অমরতা এগুলোকেও পাত্তা দেয় না। আদপে হয়ত এমন নয়। এখানে একটু নঞর্থকভাবে এসব বিষয়গুলোকে নির্দেশ করা হয়েছে বলেই মনে হয়। অনেক জায়গায় এসবক্ষেত্রে কথাগুলো নতুন ভাবনার জন্মও দেয়।
 
সুপেরিওরিটির কমপ্লেক্সের ব্যাপারে আরশাদের মন্তব্য হল-
 
“সৃষ্টির সেরা জীব’ বাক্যের মধ্যেই সুপেরিওরিটি কমপ্লেক্সের উৎকৃষ্টতম দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। একটি গরু বা বন্য শূকর যে মানুষের তুলনায় নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করে না তার নিশ্চয়তা কী?
 
তবে আরশাদ মানুষ যে শ্রেষ্ঠ না এটা তুমি মানুষই বলছ গরু, শূকর তো এগুলো বলছে না। এমনকী গরু, শূকর কথাগুলোও মানুষই প্রকাশ করছে। ওরা তো পারছে কিংবা পারলেও ঐইভাবে জানছি না।
 
তারা স্বীকৃতিটা মানুষের মনে দিতে পারছে না। আমরা মানুষরা এলিয়েনকে নিয়ে ভাবছি। ওরা কী আমাদের নিয়ে ভাবে নাকী এগুলো কল্পনার জাল কে, কাকে বলছি শ্রেষ্ঠত্বের কথা। একদিক দিয়ে শ্রেষ্ঠ অন্যদিক কিছুই না সাধারণ। তাহলে কেন বলছি এগুলো? তাহলে মানুষের এই ধারণাগুলো কী পুতুলখেলা!!!
 
মিথ্যা সম্পর্কে আরশাদের বক্তব্য হলো-
 
“মিথ্যা অনেক বেশী মানবিক ও বিশ্বাসযোগ্য। মানুষ কোন বক্তব্য বা ঘটনাকে অবিকৃত অবস্থায় হুবুহু ব্যাখ্যা বা উপস্থাপন করতে পারে না, অনিচ্ছায় হলেও সেখানে বিচ্যুতি ঘটে যায়। বিচ্যুতিকে আমরা মিথ্যা বলি না যদি মূলভাবটি বদলে না যায়। কিন্তু ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীস্বার্থ চরিতার্থ করতে মানুষ প্রায়শই নিজের মতো করে ঘটনা বা বক্তব্যকে উপস্থাপন করে।”
 
সত্য সম্পর্কে তার মত হল-
 
সত্যকে প্রায়োরিটি দেওয়ার বাহানায় মানুষ মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে। সত্তা আর স্বত্ব – এই দুটো বোধকে আবিষ্কার করতে চাইলে সত্যের বিভ্রম থেকে মুক্তি খুঁজতে হবে মানুষদের।
 
সত্যকে অবজ্ঞা করা মানেই মিথ্যাকে অবলম্বন করা নয়। কারণ মিথ্যার নিজস্ব ধরন আর বিস্তৃতি রয়েছে, সত্যকে কোন ধরনে ধারন করা যায় না। এখানেই সত্যের প্রধান অযোগ্যতা।” এক্সিলেন্ট!!!
 
আরশাদের বলার মাঝে মাঝে চা বিরতিতে লেখক নিজে বলেছেন বিভিন্ন বিষয়ে সাকিব-আল-হাসান এর পারসোনালিটি বিশ্লেষণ ছিল, ছিল ডাব বিক্রেতার সাথে কথা চালাচালি, জীবনানন্দ, শাহাদুজ্জামান, আখতারুজ্জামানের ইলিউশন নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা।
 
এ বইয়ের কথাগুলোর মাঝে ছিল কনট্রাডিকশন, কিছু কিছু স্বীকৃত বিষয় আশয়ের প্রতি উল্টো প্রতিক্রিয়া। তবে মনে হলো যেন উল্টো হয়েও উল্টানো নয়, সোজাই আছে। এ যেন ইররেশনালিটির পাগলামী। কিছু কিছু কথা বেশ ইন্টারেস্টিং যেমনঃ কদম কদবেলগাছের, অন্ডকোষের পাউরুটি ইত্যাদি।
 
এরকম কথাবার্তা হয়ত মানুষের মনের চিন্তারেখায় উঁকিঝুঁকি দেয় হয়ত রেশনাল জায়গা থেকে অদ্ভুত হওয়ায় তা ফিল্টার হয়ে যায় অবচেতনে। একটা ঘোরলাগা কল্পনাজগতে ঢুকলে হয়ত অদ্ভুত অদ্ভুত বেখাপ্পা বোগাস কথাগুলো তল থেকে বেরিয়ে আসে এর একটা আভাস যেন পাওয়া যায় এ থেকে।
 
শেষমেষ আরশাদের “মৌনতা ক্লাব” কে কেন্দ্র করে প্রাতিষ্ঠানিক শাখা গজাতে থাকে দেশের নানাপ্রান্তে। চা-পায়ীদের আড্ডাস্থল রূপায়িত হয় ভক্তির ব্যাবসাকেন্দ্রে। এমনি একটি সময় আরশাদ আবার উধাও হয়ে যায়। লেখক তখন অারশাদহীন “মৌনতা ক্লাব” টিতে চানাচুরওয়ালা হাতেম আলীর সাথে আড্ডা ভঙ্গ করে অজন্তা হালদারের অসমাপ্ত ইন্টারভিউ নিতে চলে যায়।
 
এ বইটিতে যে বিষয়গুলো নিয়ে আলাপ আলোচনা করা হয়েছে তা কোন সমাধান হয়তো আপনাকে দিবে না বরং চিন্তায় একটা আলোড়ন জাগাতে পারে। কোনকিছুর সমাধান পেলে তো মন সেটাকে আঁকড়ে ধরে রেখে দেবে। এজন্য এ বইটির কথাগুলো এক চিন্তা থেকে আরেক চিন্তায় নিয়ে যায়। এবং পাঠককে চরিত্রের সাথে একটি আলাপনের সুযোগ করে দেয়।
 
সবশেষে বলা যায় এটা আপনাকে নতুন নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে চেনাঅচেনা বিষয়গুলোকে ভাবাতে প্রেরিত করবে। এমনও হতে পারে পড়তে পড়তে আপনি এ বইয়ে বাইরে আপনার নিজের স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি আবিষ্কার করে ফেলতে পারেন!
0Shares

নাজিউর রহমান নাঈম

আমিকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। কিন্তু সে যে কোথায় লুকাইলো ও এই লোকটি যে তা বড় আশ্চর্যের বিষয়! আমি হারিয়ে যা হল একে কীই-বা বলা যায় বলুন। এখন যাকে দেখছেন সে তো অন্য কাজ করে বেড়াচ্ছে, তার পরিচয়ও নিশ্চয়ই বদলে গেছে। তাহলে আপনি কাকে দেখছেন? দেখছেন আপনাকে আপনার চিন্তাকে যা আপনাকে আমাকে দেখাচ্ছে বা কল্পনা করাচ্ছে। তাহলে শুধু শুধু পরিচয় জেনে কী হবে বলুন। তার চেয়ে বরং কিছু সাইকোলাপ-ই পড়ুন ও নিজেকে হারিকেন নিয়ে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ুন। পথিমধ্যে হয়ত কোথাও দেখা হয়েও যেতে পারে!!! সে পর্যন্ত- কিছু কথা পড়ে থাকুক জলে ভেজা বিকালে খুঁজে চলুক এই আমি পিলপিল করে অনন্ত "আমি" র অদৃশ্য পর্দার আড়ালে

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *