মিথ্যাদর্শন – ঘরে ফেরার আলাপন

সবকিছুই যদি ঈশ্বর দ্বারা পরিচালিত হয়ে থাকে, তাহলে সমস্তকিছুকেই ঈশ্বর হতে হবে।

যদি ঈশ্বর একক, অদ্বৈত হয়ে থাকেন তাহলে সে ছাড়া সমস্তকিছুকে মায়া, শয়তান হতে হবে।

দুটোতেই কোনপ্রকার কমপ্রমাইজ চলবে না।

যদি সবকিছু ঈশ্বর হয়, তাহলে খুনী, পাপী, সৎ, অসৎ, হিটলার, চেঙ্গিস খান, ঠগবাজ, জোচ্চোর, গাছ, প্রকৃতি, চেয়ার, টেবিল, হাতুড়ি, ছুড়ি, কাঁচি, নর্দমার ময়লা, নিজেকে ইত্যাদি ইত্যাদি সবকিছুকে ঈশ্বর বলে স্বীকার করে নিতে হবে।

যদি ঈশ্বর এক, অদ্বৈত হয় তাহলে সবকিছু মায়া, মিথ্যা, অহং, শয়তান হিসেবে নিজে, সাধু, সন্ন্যাসী, প্রকৃতি, প্রাণী, ঋষি, নবী ইত্যাদি ইত্যাদি সবকিছুকে স্বীকার করে নিতে হবে।

দুটোই চরম অবস্থা।

আমরা আপাত বাস্তব জগৎ বলে যা বুঝে থাকি তা এ দুইয়ের শুদ্ধ স্বীকার বা মেনে নেওয়ার মাধ্যমে এর মাঝে সেগুলোকে সম্পূর্ণরূপে প্রয়োগ করা সম্ভব নয়।

অন্যদিকে দুটি ধারণা মেলাতে গেলে তৈরী হবে প্যারাডক্স। এবং প্যারাডক্সের চরমে গিয়েও আপাত বাস্তব জগতে তা পরিপূর্ণরূপে প্রয়োগ করা সম্ভব নয়।

প্রকৃতপক্ষে, সত্য দিয়ে কোন ঘর বাঁধা যায়না, যাবেও না। সত্যের চরমে যাওয়া মানে সমস্তকিছু ভেঙ্গে ফেলা। এজন্য সত্যকে অর্গানাইজ করা যায়না। সত্যের চূড়ান্ত কোন আদর্শিক মানদন্ড শুদ্ধতম অর্থে বিরাজ করেনা।

মানুষরা যে সত্যের কথা বলে তা অসংখ্য চরম সীমার মিশ্রণমাত্র, আধা অংশমাত্র। এখান থেকে কিছু, ওখান থেকে কিছু নিয়ে (যা মূলত মিথ্যা) তারা বাস্তব জগৎ গঠন করে ও তা প্রয়োগ করে। এখানেই তারা নানাধরনের খেলা খেলে।

ব্যাপারটা একটু হতাশাজনক লাগতে পারে, কেননা এভাবে কথাগুলো জানার পর কিছুটা আপনার মন এগুলোকে ধরে নিয়ে কল্পনা করে একটা অভিজ্ঞতার স্বাদ নেওয়া আরম্ভ করছে হয়তোবা।

যাইহোক, যারা চরম সীমায় চলে যায়, অর্থাৎ ঘরবাড়ি যাদের ভেঙ্গে যায় তারা যখন ফিরে আসে, তখন তারা কেন ফিরে আসে?

মিথ্যাতে যখন সত্যের বাড়ি লাগে তখন মিথ্যাও তরল হয়ে যায়। তখন সেই তরল মিথ্যা দিয়ে কতগুলো আদর্শ তৈরী হয় যার মাঝে সেই প্রাণ থাকে। তবে তাও চূড়ান্ত অর্থে সত্য নয়। কেননা সত্য দিয়ে ঘর বাঁধা যায়না তবে মিথ্যাকে তরল কিংবা বায়বীয় করে দেওয়া যায়। এজন্য শয়তান বা অহংকারকে হতে হয় সদা গতিশীল যা জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত স্থায়ী হয়।

এজন্য আমরা যখন সত্যের কথা বলি তখন সীমিত সত্যকে (যা প্রকৃত গভীর অর্থে মিথ্যা) স্বীকারের কথা বলি এবং যদি আমাদের সে সত্য বলার হিম্মত রাখি তখন চরম সত্যের মুখোমুখি হওয়ার একটা অনুসন্ধানে অভিমুখী হতে পারি যেখানে আমার সমস্ত ঘরই লন্ডভন্ড হয়ে যাবে। কারণ, সত্য দিয়ে ঘর বাঁধা যায়না।

সত্য দিয়ে ভালোবাসাও যায়না। সত্য, ভালোবাসা এগুলো প্রকাশমান ভাষা। কিন্তু সত্য শব্দটি জ্ঞানের প্রকাশমাত্রিক ভাষা, ভালোবাসা হলো গভীর আকাঙ্খাজনিত আনন্দের প্রকাশমান ভাষা। তবে ভালোবাসা হলো শুদ্ধতম আকাঙ্খা। চূড়ান্ত সীমায় থেকে শুদ্ধতমরূপে বায়বীয় মিথ্যারূপে প্রকাশিত হবার সুতো।

যখন সত্য সত্য নয়, ভালোবাসা নয়, তখন এক চূড়ান্ত নিঃসীম আঁধারে, নিস্তব্ধতায় ফুঁটে ওঠা শুদ্ধতম বাসনা হলো ভালোবাসা। সত্য দিয়ে যখন ঘর বাঁধা যায়না, ভালোবাসা তখন সাহস করে বাসনায় জড়ানো সুতো দিয়ে নানারকমের মিথ্যার দ্বারা জগতকে সাজাবার। এই সেই সচল স্বতঃস্ফূর্ততা, একটা অবস্থা যা সবাইকে জোড়া দিতে চায়। কিন্তু জ্ঞানস্বরূপ প্রকাশমান সত্যরূপী ভাষা আলাদা করে দেখতে চায়, এও একধরনের অবস্থা।

এইযে, একটা গতিশীল তরলতা, বায়বীয়তা তা একেক সময় একেক রকম হয়ে যায়। তাই আদর্শও চিরকাল আদর্শ থাকেনা, ভালোবাসার শুদ্ধতম বাসনা গড়িয়ে নিচে চলে আসে একবার আবার উপরে চলে যায়। এরূপ যে আকর্ষণ তার কারণে রদবদল ঘটে যায়, চিত্রপট পাল্টে যায়। সবখান থেকেই যুক্ত হওয়া যায়, সবখান থেকেই ছেড়ে বের হয়ে আসা যায়। তাই সত্যের সাথে কমপ্রমাইজ করা যায়না, নানাধরনের রাস্তা সেই চরমের মাঝে গিয়ে নিক্ষিপ্ত হয়। সকল আদর্শ, মতাদর্শ পাল্টে যায়। এখন হয়তে জগতের সবকিছুকে মিথ্যা বলে ফেলার ধারণাটা খুব ভালো লাগতে পারে কিন্তু কয়েক যুগ পর সেই ধারণাটা বদলে দিয়ে সবকিছু সত্য বলে ভাবতে খুব ভালো লাগতে চাওয়াটাও অস্বাভাবিক কিছু নয়।

এভাবেই শয়তান ও ঈশ্বর পর্যায়ক্রমে পাশাপাশি চলে। তারা একে অপরের পরিপূরক। কেননা এরা দুটোই তরল ও বায়বীয় মিথ্যা। একজনের বোধ আরেকজনের বোধে পরিপূর্ণতা দান করে।

তাহলে এসব নিয়ে আমার খেলা না ছাড়া কী উপায়ই বা পড়ে আছে?

আমাকে খেলতে হবে, নাচতে হবে, গাইতে হবে। দেখতে হবে আমার মিথ্যাটা কতটা বায়বীয় হতে পারলো, সূক্ষ্ম হতে পারলো। হয়তো একদিন চরমে গিয়ে সবটাই খুইয়ে ফেলতে হতে পারে, এমনকী ভেঙ্গে ফেলতে হতে পারে ভালোবাসার ঘর।

কারণ সত্য দিয়ে তো আর ঘর বাঁধা যায় না!

0Shares

নাজিউর রহমান নাঈম

আমিকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। কিন্তু সে যে কোথায় লুকাইলো ও এই লোকটি যে তা বড় আশ্চর্যের বিষয়! আমি হারিয়ে যা হল একে কীই-বা বলা যায় বলুন। এখন যাকে দেখছেন সে তো অন্য কাজ করে বেড়াচ্ছে, তার পরিচয়ও নিশ্চয়ই বদলে গেছে। তাহলে আপনি কাকে দেখছেন? দেখছেন আপনাকে আপনার চিন্তাকে যা আপনাকে আমাকে দেখাচ্ছে বা কল্পনা করাচ্ছে। তাহলে শুধু শুধু পরিচয় জেনে কী হবে বলুন। তার চেয়ে বরং কিছু সাইকোলাপ-ই পড়ুন ও নিজেকে হারিকেন নিয়ে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ুন। পথিমধ্যে হয়ত কোথাও দেখা হয়েও যেতে পারে!!! সে পর্যন্ত- কিছু কথা পড়ে থাকুক জলে ভেজা বিকালে খুঁজে চলুক এই আমি পিলপিল করে অনন্ত "আমি" র অদৃশ্য পর্দার আড়ালে

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *