মহাভারত ক্লাসিক সিরিজ রিভিউ

অতঃপর অতি উৎসাহ, উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে মহাভারত সিরিয়ালটি শেষ করে ফেললুম। সিরিয়ালটি অতি দীর্ঘ ও সময়সাপেক্ষ হলেও প্রতিটি এপিসোডই বেশ তৃপ্তি নিয়ে দেখেছি। মোট ৯৪ টা এপিসোড প্রতিটি প্রায় ৪৫ মিনিট করে দীর্ঘ ছিল।

এ মহাভারত আমার কাছে কাব্যের থেকেও সাইকোলজিক্যাল উপাখ্যান বলে বেশী মনে হয়েছে। এখানে বিভিন্ন মানসিক স্তরের চরিত্রের দেখা পাই আমরা। এদের প্রত্যেকেরই রয়েছে তাদের নিজস্ব সমস্যা, বাসনা ও প্রতিজ্ঞার চক্রে আবদ্ধ দুঃখ, কষ্ট। এইসব চরিত্রদের প্রত্যেকটির মানসিক দিকগুলো পর্যবেক্ষণ করে দারুণ দারুন সব ইনসাইট পাইতে পাইতে কোনটা রেখে কোনটা শেয়ার করবো তার শিহরণে না দাঁড়াতে পারিয়া একটা বাদে আর কোনটিই শেয়ার করিয়া উঠিতে পারি নাই…ঠাগ লাইফ!!😓😓

মহাভারতের প্রতিটি চরিত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে যদি এটার বিভিন্ন ঘটনাগুলি যদি পর্যবেক্ষণ করা যায় তাহলে এখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ সব বিষয় খেয়াল করতে পারা যাবে। এছাড়াও গীতার যে অংশটুকু দেখলাম এখানেও মনে হয়েছে যে, কৃষ্ণ কোন ধর্মবাণী শোনাচ্ছেন না অর্জুনকে বরং অর্জুনের সাইকোলজিক্যাল অ্যানালিসিস করছেন। সেইসাথে গীতাতে উল্লেখিত কর্মযোগের বিষয়টি বেশ প্রেরণা যুগিয়েছে, বিষয়টি আরও পরিষ্কারভাবে ধরা পড়েছে এই সিরিয়ালটা দেখার পর।

একটা ব্যাপার এরই সাথে একটু যোগ করতে চাই –

মহাভারতের এই সিরিয়ালটি দেখার পাশাপাশি ওশোর “গীতা দর্শন” – এর ভলিউম ১ ও ২ এর মোট ১৮ টা পর্ব, সবমিলিয়ে প্রায় ২৫ ঘন্টা হবে দেখা শেষ করি( অতি উৎসাহ জাগলে যা হয় আরকী…🐸🐸🐸)। তো এই দুটি জিনিসের মিশ্রণে এক অনবদ্য সময় কাটিয়েছি।

যাই হোক মূল কথায় ফিরে আসি –

মহাভারতের উল্লেখযোগ্য চরিত্রদের মধ্যে ছিলোঃ গঙ্গাপুত্র ভীষ্ম, মহামন্ত্রী ভিদুড়, কৃষ্ণ, বলরাম, কুন্তি, কুন্তির ছয় পুত্র কর্ণসহ, দূর্যোধন, দুঃশাসন, মাতা গান্ধারী, শকুনী, কুলগুরু কৃপাচার্য, দ্রোণাচার্য, অশ্মত্থামা দ্রৌপদী, অভিমন্যু, হঠাৎ বৃষ্টি বেদব্যাস…😁😁 ইত্যাদি ইত্যাদি ওওও এটা না বললেই নয় শূদপুত্র কর্ণ….🙂🙂🙂 কর্ণকে এভাবে শূদপুত্র বলে অর্জুন যে কতবার আঘাত করেছে বেচারাকে তা আর কী বলব…😓😓….সর্বনাশ!!! মহাভারতের মূল আহাম্মকের নামটাই তো নেওয়া হলো না মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র… যাক শান্তি পেলাম। 😌😌

আরও অনেকেই ছিলো তবে এতসব চরিত্রদের মধ্য থেকে আমার কাছে ভীষ্মকে ও মহামন্ত্রী ভিদুড়কে অনবদ্য লেগেছে। আর শকুনী মামার অভিনয়টা যিনি করেছেন ও এর পেছনে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকটা যে দিয়েছে তাকে স্যালুট। শকুনী মামা যখন বলে, “ভান্ঞ্জে.. ভান্ঞ্জে ইতনে বেয়াকুল মাত হো , মুঝে সোচনে দো”…. আহা অনবদ্য অভিনয়। এছাড়া কৃষ্ণের ও দূর্যোধনের ভূমিকায় যারা অভিনয় করেছেন তাদেরকে পারফেক্টলি ম্যাচ করে গেছে।

ভীষ্মের কথা একটু বলি… বেচারা পিতার মোহে পড়ে সেই যে দুইটা প্রতিজ্ঞা নিল ওটাই তার কাল হয়ে দাঁড়াল। তবে শেষমেষ এটা দেখে শান্তি লাগল যে শেষমেষ তার মোক্ষপ্রাপ্তি ঘটে। ভীষ্মের কাছ থেকে যে বিষয়টি শেখার রয়েছে সেটা হলো ইচ্ছাশক্তি। এই ব্যক্তির প্রবল উইল পাওয়ার ছিল যা ভীষ্মকে একটা দৃঢ় ব্যক্তিত্ব প্রদান করেছে।

অন্যদিকে মহামন্ত্রী ভিদুড়ের তো কোন জবাব নেই। এই মহাভারতে এই একমাত্র ব্যক্তি যার অন্যান্যদের তুলনায় ঝামেলা সম্ভবত কমই পোহাতে হয়েছে৷ তার বিচক্ষণতা, চিন্তাভাবনা করে কথাবলা এটা ধীরস্থিরতার সাথে সবকিছু পরিচালনা করার ব্যাপারে একটা শিক্ষা অর্জন করা যায়। এছাড়াও ডিপ্লোম্যাসিরও একটা ধারণা নেওয়া যায় এখান থেকে।

এরপর মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের ব্যাপারে কী আর বলব… একে আমার সবচেয়ে বিরক্তিকর লাগছে। এর চেয়ে দূর্যোধন শতগুণ ভালো। কেননা দূর্যোধনের তবুও সাহস, বিক্রমতা ছিল। অন্যদিকে ধৃতরাষ্ট্র একসাথে দুই নৌকা ঠিক রাখতে যেয়ে, দুই নৌকা বললে ভুল হবে,,,, বরং বলা ভালো নিজের নৌকার দিকটা বেশী ঠিক রেখে অপরের সদগুণের সহায় নিয়ে মহৎ রাজার ভেকধরে একের পর এক অন্যায়ের প্রশয় দেওয়া ও দ্বিধাহীনতায় ভোগা এক বলদ রাজার প্রতিনিধির প্রতীক এই রাজা ধৃতরাষ্ট্র। ধৃতরাষ্ট্রের কাছ শিক্ষার ব্যাপারটি হল অধিক মোহে তাঁতী নষ্ট। পরে এই মোহের ঠেলায় সে একা হয়ে পড়ে।

সর্বোপরি মহাভারতের প্রতিটি চরিত্রের বিভিন্ন দিকগুলোর দিকে তাকালে এ মহাভারত আপনাকে অনেক ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি দিবে ও প্রতিটি চরিত্রের জায়গায় নিজেকে বসিয়ে দেখলে তো ব্যাপারটি আরও ইন্টারেস্টিং হয়ে ওঠে৷ সবমিলিয়ে লকডাউনের সময়টাতে এই সিরিয়াল দেখে বেশ ভালো একটা সময় কাটালাম। ফুল্লি স্যাটিসফাইড।

0Shares

নাজিউর রহমান নাঈম

আমিকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। কিন্তু সে যে কোথায় লুকাইলো ও এই লোকটি যে তা বড় আশ্চর্যের বিষয়! আমি হারিয়ে যা হল একে কীই-বা বলা যায় বলুন। এখন যাকে দেখছেন সে তো অন্য কাজ করে বেড়াচ্ছে, তার পরিচয়ও নিশ্চয়ই বদলে গেছে। তাহলে আপনি কাকে দেখছেন? দেখছেন আপনাকে আপনার চিন্তাকে যা আপনাকে আমাকে দেখাচ্ছে বা কল্পনা করাচ্ছে। তাহলে শুধু শুধু পরিচয় জেনে কী হবে বলুন। তার চেয়ে বরং কিছু সাইকোলাপ-ই পড়ুন ও নিজেকে হারিকেন নিয়ে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ুন। পথিমধ্যে হয়ত কোথাও দেখা হয়েও যেতে পারে!!! সে পর্যন্ত- কিছু কথা পড়ে থাকুক জলে ভেজা বিকালে খুঁজে চলুক এই আমি পিলপিল করে অনন্ত "আমি" র অদৃশ্য পর্দার আড়ালে

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *