ভয়ানক অস্তিত্ব – একটি অসহনীয় ভূতের গল্প

ভয়ানক অস্তিত্ব – একটি অসহনীয় ভূতের গল্প

ছোটবেলায় একটা ভূতের গল্প পড়েছিলাম যা সে সময়ের শিশুমনকে প্রচন্ড নাড়া দিয়েছিলো। আজ জীবনপ্রবাহের স্রোতে এসে এই গল্পটি যেন স্মৃতির অতল থেকে বেরিয়ে এসে এই নিশুতি শিরশির করা রাতে নতুন এক হীমশীতল অনুভূতি দিয়ে গা ঠান্ডা করে দিয়ে গেলো। গল্পটি ছিল এরকম –

আমরা তখন খুব ছোট। মামাবাড়ি গিয়েছি আনন্দফূর্তি করব বলে। বিচ্ছু বাচ্চারা একসাথে গেলে যা হয় সবাই দস্যিপনায় মত্ত হয়ে বাড়ি মাথায় তুলে ফেলেছি। হঠাৎ করে সবার মাথায় নতুন ফন্দী চেপে বসল যে বাড়ি থেকে এক দেড় কিলোমিটার দূরে থাকা নদীতে কাউকে না বলে চুপিচুপি অমাবস্যার ঘোর অন্ধকারে নৌকা নিয়ে নদীর অপরপ্রান্তের গ্রামে যাব। এতে করে বাড়ির বড়দের আচ্ছারকম টেনশনে ফেলা যাবে। আর কে বা জানে যদি কোন ভূতের সাক্ষাৎ হয়ে যায় তাহলে তো কথাই নেই একটা প্রমাণও জোগাড় করা যাবে। মোটামুটি এরকম এক রহস্যময় অভিযানে আমি সহ পল্টু, বিল্টু, গুগলি চারজনই রীতিমত উত্তেজিত কখন অমাবস্যা হবে আর কখন আমরা নদীর তীরে পৌঁছে নৌকা নিয়ে দিবো এক চম্পট।

যথারীতি সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এসে গেল। আমরা কাউকে কিছু না বলে পা টিপে টিপে সবাই যে যার জিনিসপত্র সমেত বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলাম। ঘোর অমাবস্যায় পুরো থমথমে পরিবেশ কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছিলাম না। তাই ব্যাগ হাতড়ে টর্চ খুঁজলাম কিন্তু ততক্ষণে টের পেলাম টর্চখানা ভুলে বাড়িতেই রেখে এসেছি। এরইমধ্যে পল্টু বলল চিন্তা নেই ওস্তাদ আমার কাছে এই ছোট লাইটটা দিয়ে আপাতত আমাদের কাজ চলে যাবে। ভোর হলেই তো ঐপারে চলে যাব তখন আর এসবের দরকার পড়বেনা। তখন আমরা কেবল খেল দেখব খেল।

– যাক, পল্টু তোর জয় হোক।

পল্টুকে বেশ একচোট পিঠ চাপড়ে দিয়ে বাকী সবাইকে সাথে নিয়ে আমাদের কাঙ্খিত নদীতীরে পৌঁছলাম ও পরিকল্পনা অনুযায়ী একটা ছইওয়ালা নৌকা ও পাড়ার হারান মাঝিকে আগে থাকতেই ব্যাবস্থা করে রেখেছিলাম। সবাই মিলে সেই নাওয়ে চড়ে বসলাম ও সময় কাটানোর জন্য পল্টুর ঐ ক্ষীণ বাতি দিয়েই লুডো খেলতে আরম্ভ করলাম। নৌকাটা অনবরত দুলছিল, মনে মনে বেশ আনন্দ হচ্ছিলো কাল কী হবে ভেবে। বড়রা কতই না আতঙ্কিত হয়ে যাবে আমরা নেই দেখে। এই করতে করতে কখন যে সকাল হয়ে এলো টেরও পেলাম না।

তারপর চোখ পিটপিট করে দিনের আলো সয়ে নিতে নিতে নৌকা থেকে আমরা সবাই বাইরে পা রাখতেই দেখি বাড়ির সবাই রাগ রাগ চেহারা করে আমাদের সবার ওপর চোখ বোলাচ্ছেন। এতে করে আমরা সবাই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বড়দের ভয় পাওয়াতে গিয়ে আমরা নিজেরাই কেমন ভয় পেয়ে গেলাম। দেখলাম নৌকার নোঙর এখনও করাই আছে নৌকা একচুলও আগায়নি। তাহলে সারারাত নৌকা যে বাইছিলো সে কোথায় গেলো, আমাদের হারান মাঝি!

পরে জানতে পেরেছিলাম, হারান মাঝির মৃত্যু আরও ১২ বছর আগেই হয়ে গিয়েছে। এই শুনে আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েছিলাম। সারাটা রাত আমরা ভাবলাম নদীর ওইপাড়ে যাচ্ছি কিন্তু একইপাড়ে পড়ে ছিলাম। মাঝি ভূতটা নেহাত ছোট বলে সেদিন ছেড়ে দিয়েছিলো। লোকের মুখে পড়ে জানতে পেরেছিলাম ছোটদের নাকী এই ভূত কিছুই করেনা, বড়রা উঠলেই মাঝি হারান তাদের সর্বনাশ করে ছাড়েন তখন কেউ আর এ জগতে থাকতে পারেনা, তার জগতে চলে যায়।

এই হল গল্প। এটা ভাবছি আর অন্ধকার রাতের এই নিস্তব্ধ নীরবতা আমাকে আরও আতঙ্কিত অস্তিত্বের ঘূর্ণিপাকে নিয়ে গিয়ে ফেলছে। প্রতিটি মুহূর্তে ভাবি জীবনের ঐপারে কিছু একটা আছে, এই আশা করে করে পথিমধ্যে কতকিছু করে করে সময় কাটাই। অতঃপর যখন আমার সময় আসে আলো ফোটে তখন দেখি আমি এক পাও আগাইনি। মনে মনে হয়তো হাজার হাজার মাইল পার করে ফেলেছি কিন্তু আমার নৌকার নোঙরই তোলা হয়নি, নৌকা যেভাবে আছে সেভাবেই থেকে যায়। কোন এক অদ্ভুত হারান মাঝি আমার নৌকার নোঙরের দিকে তাকাতে দেয়না। আর যতক্ষণে আমি তাকাই আমি অজ্ঞান হয়ে অস্তিত্বের গহ্বরে পড়ে যাই সেখান থেকে ফিরে আসতে পারিনা, এক নিঃসীম ঘূর্ণাবর্তে আমার পুরো শরীর সংকুচিত হয়ে যায়, কোন এক অজানা নুপূরের অমবস্যা রাতের অদৃশ্য ঝঙ্কারের মত আমার সর্বাঙ্গে অস্তিত্বজাত ভয়ের শিহরণ খেলে যায়। আমি তখন সকাল দেখে কেঁপে উঠি, হারান মাঝির কাছে জবাব চাইব সে অদৃশ্য হয়ে যায়, তখন আমার সামনে কেবলই জনকোলাহল, হারান মাঝি যেন এক আতঙ্কের নাম। আমি তাকে ভুলতে পারিনা। কোথায় নিয়ে গিয়েছিল সেদিন সে, নাকী একই জায়গায় ঘুরপাক খাইয়ে আমার কল্পনা, আমার খেলাঘরকে নিয়ে আমায় ফেলে দিতে চেয়েছিলো সেই পাঁকে যার সম্মুখীন আমি কোনদিনই হতে চাইনি, শুধু আমি কেন কেউই হতে চায়না। সবাই হারান মাঝিকে ভয় পায়, কিন্তু কোন এক অমাবস্যার নিশুতি রাতে সে সবাইকে সাক্ষাৎ দিতে আসে, আসবে ও কিছু না বলেই বলে দিয়ে যাবে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর কথা – মিয়াভাই মনে মনে নৌকার দাঁড় বাইয়া কী অইব, নৌকার নোঙরই তো তোলা হয় নাই!

0Shares

নাজিউর রহমান নাঈম

আমিকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। কিন্তু সে যে কোথায় লুকাইলো ও এই লোকটি যে তা বড় আশ্চর্যের বিষয়! আমি হারিয়ে যা হল একে কীই-বা বলা যায় বলুন। এখন যাকে দেখছেন সে তো অন্য কাজ করে বেড়াচ্ছে, তার পরিচয়ও নিশ্চয়ই বদলে গেছে। তাহলে আপনি কাকে দেখছেন? দেখছেন আপনাকে আপনার চিন্তাকে যা আপনাকে আমাকে দেখাচ্ছে বা কল্পনা করাচ্ছে। তাহলে শুধু শুধু পরিচয় জেনে কী হবে বলুন। তার চেয়ে বরং কিছু সাইকোলাপ-ই পড়ুন ও নিজেকে হারিকেন নিয়ে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ুন। পথিমধ্যে হয়ত কোথাও দেখা হয়েও যেতে পারে!!! সে পর্যন্ত- কিছু কথা পড়ে থাকুক জলে ভেজা বিকালে খুঁজে চলুক এই আমি পিলপিল করে অনন্ত "আমি" র অদৃশ্য পর্দার আড়ালে

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *