বুক রিভিউঃ Courage To Be Disliked

এই বইটির লেখক বলেন, “এই বইয়ের যে বিষয়বস্তু তা যদি কেউ ৪০ বছর বয়সে পড়ে তার এ বইটি বুঝতে সময় লাগবে ২০ বছর। আর যদি তরুণ বয়সে পড়া শুরু করে তাহলে বুঝতে সময় লাগবে লাগবে ১০ বছর বা তার আরও কম সময়।”

বইটি কয়েকদিন আগে একজন বন্ধু সাজেস্ট করেছিল। ভাগ্যিস সাজেস্ট করেছিল। নাহলে এত সুন্দর বই পড়া মিস হয়ে যেত আমার। যদিও এ বইটা সেলফ হেল্প বই বলে মনে হতে পারে, কিন্তু যতই আপনি এই বই পড়তে থাকবেন ততই আপনার মনে হবে “It’s not a self help book, it’s a self destroying book”। কী আজব কথা! তাহলে এই বই পড়ব কেন? এইজন্যই পড়বেন এটা আপনাকে ভাঙবে তারপর নতুন “আমি” এর পথ দেখাবে।

এই বইটি লিখেছেন দুইজন জাপানি লেখক (ইচিরো কিশিমি ও ফুমিতাকে কোগা)। এদের দুজনেরই পরিচিতি ঘটে এমন একজন লোকের সাথে যে কীনা তাদের জীবনে প্রচুর প্রভাব ফেলেছিল। লোকটি হলে আলফ্রেড এডলার। ইনি ছিলেন একজন সাইকোলজিস্ট। তিনি ছিলেন ফ্রয়েড, কার্ল ইয়ুং এদের মত বিখ্যাত সব সাইকোলজিস্টদের সমসাময়িক। তবে এই এডলার তিনি একটু লোকচক্ষুর একটু অন্তরালেই ছিলেন বলে মনে হয়। তার যে সাইকোলজি একে বলা হয় এডলারিয়ান সাইকোলজি। বইটি মূলত এর উপর ভিত্তি করে লেখা৷

এই বইটিতে দর্শন ও মনোবিজ্ঞানের এক অপূর্ব সম্মিলন সাধিত হয়েছে। সক্রেটিস যেমন তার ডায়লগের মাধ্যমে তরুণদের সাথে কথা বলতেন আর এভাবে তর্ক বিতর্কের মাধ্যমে একেকটা বিষয় সম্পর্কে ভাবাতেন জট খুলতেন এখানেও সেরকম জট খোলার চেষ্টা করা হয়েছে। আর জটটি মূলত আমরা কীভাবে সুখী হব? আমরা কী আসলেই সুখী হতে পারি? সুখী হওয়া এত কঠিন কেন? এ জীবন এত কঠিন কেন? আমরা সুখী হতে পারি না কেন?আমাদের মনের এরকম আরো অনেক প্রশ্ন করেছে একজন তরুণ একজন দার্শনিককে।

আর দার্শনিকও ধীরেসুস্থে উত্তর দেয় তরুণটিকেঃ হ্যা, আমরা সুখী হতে পারি, সুখী হওয়া খুবই সহজ, আর এ জীবনও অনেক সহজ, আমরা সুখী হতে চাই না তাই সুখী হতে পারি না। তরুণটির বিপরীতে অবস্থান নেওয়া দার্শনিকের সাথে এভাবেই ডায়লগটি শুরু হয়। তরুণও বলে দেয় দার্শনিককে তোমাকে আমি আমার প্রশ্ন দিয়ে ঘায়েল না করা পর্যন্ত আমি তোমাকে ছাড়ছি না।

আর এভাবে প্রশ্নের পর প্রশ্ন চলতে থাকে, আর দার্শনিকও তার জবাব ও ব্যাখ্যা দিতে থাকে। এভাবে তরুণটি এমন এমন কতগুলো বিষয়ের মুখোমুখি হতে থাকে যার জন্য সে মোটেও প্রস্তুত ছিল না, সে হজম করতে পারছিলো না দার্শনিক তাকে যা বলছিল কিন্তু তারপরও সে তো দমবার পাত্র নয়,,, সে দার্শনিক হারিয়ে তবেই দম নেবে।

বইটিতে ৫ টি রাত জুড়ে(টানা নয়) তরুণ ও দার্শনিক এ দুজনের মাঝে কথোপকথন চলে। আর এই ৫ টি রাত ধরে তারা মানুষে জীবন নিয়ে আলোচনা করতে থাকে, তর্ক করতে থাকে।

দার্শনিক বলেন যে, “এডলারিয়ান সাইকোলজি মতে তুমি এখনই সুখী হতে পারো।”
এ শুনে তরুণটি বলে ওঠে কী বলে এই লোকটা! কীভাবে সম্ভব? আমি তো সুখী নই,,, তুমি দেখছো না!! আচ্ছা সুখ কী হাতে বানানো মোয়া যে হয়ে গেলাম। আচ্ছা এটা বলো যে ব্যক্তি তার ছোটবেলায় ভয়ানক পরিস্থিতির মাঝ দিয়ে বড় হয়েছে সে চাইলেই সুখী হবে কী করে। যদি অতীতের ঘটনাগুলো ঠিক হতো তাহলে তো সুখী হওয়া যেত। তাছাড়া ফ্রয়েডীয় মতে ব্যক্তির অসুখী হওয়ার পেছনে তার অতীত কারণের ভূমিকা রয়েছে। যার জন্যই সে আজ দুঃখী৷

উত্তরে দার্শনিক বলেন যে তুমি যা বলছো তা ফ্রয়েডের ইটিওলজি টার্মে পড়ে। আর এ অনুযায়ী পড়ে থাকলে কেউ কোনদিন সুখী হতে পারবে। কিন্তু এডলারিয়ান সাইকোলজি মতে অতীত কোন বিষয়ই নয়। তুমি এই অবস্থাতেই সুখী হতে পারো কিন্তু তুমি তাহলে কেন সুখী হচ্ছো না? কারণ তুমি চাও না সুখী হতে,,,

তরুণ বলে, “থামো থামো পৃথিবীর প্রতিটা মানুষই সুখী হতে চায়, আর আমিও সে হিসেবে সুখী হতে চাই। আর তুমি বলছো আমি সুখী হতে চাই না!

দেখো প্রত্যেকেই একটা লক্ষ্য পূরণের উদ্দেশ্যে কাজ করে,, এইযে তুমি অতীতকে দোষারোপ করছো ফ্রয়েডকে টেনে আনছো এর দ্বারাও তুমি তোমার একটা লক্ষ্য হাসিল করতে চাচ্ছো।

কী সেই লক্ষ্য?

আসলে মানুষ চায় না সুখী হতে,, যেমন তুমি চাও কোন মেয়ের সাথে খোলাখুলি কথা বললে তোমার লজ্জা কেটে যাবে আর তোমার মেয়েদের সাথে কথা বলার জড়তাটা কেটে যাবে কিন্তু তুমি তা করছো না, তুমি অতীত পরিবেশ টেনে আনছো, তোমার ছোটবেলার পারিপার্শ্বিক অবস্থা টেনে আনছো বা তুমি বয়েজ স্কুলে পড়তে না পড়লে হয়তো তুমি মেয়েদের সাথে কথা বলতে পারতে, অস্বস্তি হতো না,, এরকম অনেক অতীত কারণ ব্যপার দাড় করাচ্ছো।

আর এর পেছনে লক্ষ্য হলো তুমি ইচ্ছে করেই এ চিন্তাগুলো করছো যাতে তোমার মেয়েদের সাথে কথা বলার সময় যে অস্বস্তি হয় তার মুখোমুখি না দাড়াতে হয় আর তুমি তোমার কমফোর্ট জোনে নিশ্চিন্তে থাকতে পারো। এ জন্যই তুমি চাও না সুখী হতে। সুখী হওয়ার জন্য অতীত কোন বিষয়ই নয়। তুমি তো আর অতীত বদলাতে পারবে না, পারবে কী? কিন্তু তুমি যা বদলাতে পারবে যা তোমার এখন হাতে আছে আর যখন তুমি এটা দেখা শুরু করবে তখন তুমি বদলে যাবে, সুখী হবে,, আর এরজন্য প্রয়োজন Courage(হিম্মত)।

এরকম আরও অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এডলার বলেন আমাদের সমস্ত সমস্যা ইন্টারপারসোনাল রিলেশনশীপ সমস্যা। এভাবে ডায়লগের মাধ্যমে ধীরে ধীরে আলোচনা অগ্রসর হতে আরো অনেক বিষয়ের অবতারণা হয়ঃ জীবনটা কোন প্রতিযোগিত নয়, প্রকৃত মুক্তি কী? আমরা কীভাবে নিজেকে অ্যাকসেপ্ট করতে পারি, কীভাবে একজন বাবা-মা তার সন্তানের জীবন গঠনে কেমন ভূমিকা রাখতে পারে বা কী করা উচিত এরকম আরও অনেক কিছু,,,

আর একটি চমৎকার বিষয় এখানে আছে সেটি হলো ইনফেরিওরিটি কমপ্লেক্স ও সুপেরিওরিটি কমপ্লেক্সের ব্যাপারে। এটা নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক।

আমরা মানুষ হিসেবে আমাদের সবার মাঝে ইনফেরিওরিটি কাজ করে। এখন এটার মানে হলো আমাদের ভেতর সবসময় একটা অভাববোধ কাজ করে,, আমার ভেতর কিছু কম আছে,,, এটা নাই, ওটা নাই এরকম। আর একটা বিষয় বলা ভালো এই যে “Inferiority” শব্দটি যেটা বর্তমান সাইকোলজিতে ব্যাবহার করা হয় থা মূলত এডলার থেকে এসেছে।

এখন এই যে কিছু একটা নাই নাই ভাব বা নিজেকে মূল্যহীন মনে হওয়া এটা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ব্যাপার। ধরুন আপনার হাইট তূলনামূলক অন্য সবার থেকে খাটো,, এখন আপনার বারবার নিজেকে নিয়ে ইনফেরিওরিটি তৈরী হবে যে আমি কেন লম্বা না? আমি মনে হয় যোগ্য এরকম নানা ধরনের চিন্তা হবে। কিন্তু একটু ভেবে দেখলে দেখা যায় এগুলো আর কিছুই নয় আপনি নিজেকে অন্যের সাথে তুলনা করছেন এজন্যই এটা আপনার মাঝে তৈরী হচ্ছে।

ধরুন আপনি ছাড়া আর কেউ আপনি একা আছেন তখন আপনার এরকম ভাব কাজ করবে না। সুতরাং এটা আপনার ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি যে আসলে আপনি এটাকে আসলে কী মূল্য দিতে চান। যেহেতু এটা ব্যক্তিগত আপনি চাইলে আপনার এই খাটো হওয়া কে আপনার ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকেও চিন্তা করে দেখতে পারেন। আর এখান থেকে ডায়লগ বলে যে আমরা হয়ত বাইরের কিছু পরিবর্তন করতে পারব না কে কী বলল কিন্তু আমাদের ব্যক্তিগত বিষয়গুলোর মূল্যায়নের চয়েস সব আমাদের হাতে রয়েছে। আর মজার ব্যাপার আমরা এই ব্যাক্তিগত পৃথিবীতে বাস করি। এজন্য একজন একটি জিনিসের যে অর্থ দেয় তা অন্যজন থেকে ভিন্ন হয়। আর এ থেকে আসে নিজেকে বদলানো সম্ভব এবং তা এখনই।

তারপর তরুণটি বলে যে ইনফেরিওরিটি যদি একটি সমস্যা হয় কিন্তু পরিপূর্ণ তো এর নির্মূল হলো না। যেমন যারা অলিম্পিকে গোল্ড মেডেল পায় তারাও তাদের অর্জন নিয়ে সন্তুষ্ট নয়। তারাও তাদের অর্জন নিয়ে ইনফেরিওরিটি বোধ করে।

জবাবে দার্শনিক বলেন যে, “এডলার এই ইনফেরিওরিটি সবার মাঝে লক্ষ্য করেছেন। আর এটাকে খারাপ ভাবার কিছু নেই। ”
এই পৃথিবীতে সবাই অসহায়ভাবেই ভূমিষ্ট হয়। আর মানুষের রয়েছে বিশ্বজনীন একটি আকাঙ্খা যাতে করে এই অসহায় অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে পারে। আর এডলার এটাকে বলে “Pursuit of Superiority”।

তরুণটি এটা শুনে একটু চমকে যায়, বলে এইটা আবার কী জিনিস!!

দার্শনিক বলতে থাকে,,, এটাকে তুমি এভাবে বলতে পারো যে ” Hoping to improve” অর্থাৎ উন্নতি সাধনের আশা অথবা বলা যায় “Pursuing an ideal state” অর্থাৎ একটা আদর্শগত অবস্থায় পৌঁছানোর তাড়না। আর আজকের মানের যে ইতিহাস তা এই তাড়বার উপরই দাড়িয়ে আছে – নিজেকে ক্রমাগত একটা আদর্শের দিকে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা। আর এ অনুযায়ী সবাই চায় নিজেকে ইমপ্রুভ করতে। যদিও একজন তার আদর্শগত স্থানে পৌঁছায় না সবসময় একটু কমতি থেকেই যায়। এটা হলো এমন যে একজন রাঁধুনি বিখ্যাত হবার পরও সে তার রন্ধনশৈলীকে পরবর্তী মাত্রায় নিয়ে যেতে চায়।

তাই এডলার বলেন যে এটা একদমই খারাপ নয় যদি এটাকে সঠিক পথে ব্যবহার করা যায়৷ তাহলে এটা আমাদের বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়। এটা একটা launch pad এর মত। একজন তার নিজের ইনফেরিওরিটি কাটানোর জন্য নিজেকেই বারবার ছাড়িয়ে যেতে থাকে। একজন তার বর্তমান অবস্থা নিয়ে মোটেই সন্তুষ্ট নয়। বরং সে চায় এক কদম হলেও সে এগিয়ে চলবে অর্থাৎ তার নিজেকে একটু হলেও সে ছাড়িয়ে যাবার চেষ্টা করে। এতে কোন সমস্যা নেই বরং এটা আপনাকে উন্নয়নের পথে আরও অগ্রসর করে।

এখন তরুণটি বলে উঠে যদি ইনফেরিওরিটি এরকম শক্তিশালী হয়ে থাকে তবে এই আমি যে ভালো না, আমার দ্বারা কিছু হবে না, এরকম চিন্তা যে আসে তাহলে এটা কী? এটা কী ইনফেরিওরিটি না!!

দার্শনিক তখন বলেন, “না এটা ইনফেরিওরিটি না – এটা হলো ইনফেরিওরিটি কমপ্লেক্স।

লও ঠ্যালা এইটা আবার কী জিনিস!!

দার্শনিক আবার বলে সতর্ক থেকো এটাকে বর্তমান বিশ্ব যা বুঝে এটা সেটা না। এটা শুনে মনে হয় এটাও ফিলিং অফ ইনফেরিওরিটি কিন্তু না।

ইনফেরিওরিটি আর ইনফেরিওরিটি কমপ্লেক্স সম্পূর্ণ আলাদা। ইনফেরিওরিটি তে সমস্যা নাই তবে কমপ্লেক্সে সমস্যা আছে। এডলার বলেন যে ইনফেরিওরিটি আমাদের অগ্রগতির ট্রিগার হিসেবে কাজ করে কিন্তু ইনফেরিওরিটি কমপ্লেক্স অন্যদিকে (যেমনঃ আমি ভালো না, আমি শিক্ষিত না, আমার বিয়ে করার যোগ্যতা নাই) এগুলা হলো অজুহাত। যখন আমাদের যুক্তি এমন হয় যে ‘ক’ হয় নাই দেখে ‘খ’ হয় নাই এটা অজুহাত ছাড়া কিছুই না। আর এটাই ইনফেরিওরিটি কমপ্লেক্স এডলারের ভাষায়।

এডলারের ভাষায় এর কারণ হলো তুমি তোমার বর্তমান বাস্তবতার সম্মুখীন হতে ভয় পাচ্ছো সেজন্য তুমি মিথ্যা অজুহাত দেখিয়ে যাচ্ছো আমার তো এটা নাই ওটা নাই। আর এরকমটার কারণ হচ্ছে তুমি চাও তোমার এখনকার অলস জীবনযাপন ছেড়ে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে আর এ লক্ষ্য পূরণের উদ্দেশ্যে তুমি ইনফেরিওরিটি কমপ্লেক্স হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছো।

দার্শনিকের এ কথাগুলো তরুণের গায়ে হুলের মতো বিঁধতে থাকে (আগেই বলেছি This is a self destroying book)।

এখন তর্কাতর্কির এক পর্যায়ে দার্শনিক তরুণের মনে আবার একটা হাতুড়ি মারে। সে বলে ইনফেরিওরিটি কমপ্লেক্স কে আরো এক ধাপ নিয়ে গেলে নতুন আর একটা বিষয়ের উৎপত্তি হয়।

সেটা কী?

সেটা হলো সুপেরিওরিটি কমপ্লেক্স।

চাপ সামলাও এবার,,,!!

দার্শনিক বলেন যখন একজন ব্যক্তি তার তীব্র ইনফেরিওরিটি কমপ্লেক্স সহ্য করতে পারে না তখন সে এটার ক্ষতিপূরণ হিসেবে অন্য রাস্তা খুঁজে নেয়, তখন সে নিজেকে সুপেরিওয়র(বড় ভাবা) ভাবতে শুরু করে আর এই জালের মাঝে জড়িয়ে পড়ে।

আমরা আমাদের সমাজে অনেক ধরনের লোক দেখি যারা তাদের অর্জন নিয়ে গর্ব করে বেড়ায়। কেউ আছেন তারা তাদের অতীতের বীরত্বগাথা সাথে সংযুক্ত হয়ে যায়। আর সবসময় সেগুলোকে বলে বেড়ায় যখনই তার মোক্ষম সুযোগ আসে। এইসব মানুষের মাঝে সুপেরিওরিটি কমপ্লেক্স রয়েছে।

তখন তরুণ বলে একজন মানুষের অর্জন থাকলে সে বলতেই পারে যদিও একটু কর্কশ ভাব থাকতে পারে কিন্তু সে তো এটা অর্জন করেছে নাকী! সে হিসেবে সে অবশ্যই বড়। আর তুমি কীনা বলছো এটা তার একধরনের ছলনাময় সুপেরিওরিটির অনুভূতি।

দার্শনিক বলেন তুমি আবার ভুল বুঝলে,,, যারা কীনা তাদের জিনিস নিয়ে গর্ব করে বেড়ায় তাদের নিজেদের কোন আত্মবিশ্বাসই নেই। এডলার বলেন যে গর্ব করে বেড়ায় সে এটা তার ধ্বংসাত্মক ইনফেরিওরিটি থেকে করে। যদি কারও আত্মবিশ্বাস থেকেই থাকে তার গর্ব করার কিছু নেই। যার এই ধরনের ইনফেরিওরিটি যত বেশী প্রবল সে তত বেশী গর্ব করে। একজন তাই ভয় পায় যদি সে এই গর্ব না করে তাহলে গ্রহণ করতে ইচ্ছুক হবে না। আর এরা হলো পূর্ণ সুপেরিওরিটি কমপ্লেক্স।

দার্শনিক আরেকটা উদাহারণ দিয়ে বলেন যে, যে ব্যক্তি খালি গর্ব করে বেড়ায় সে ব্যক্তির জীবনে যদি অনেক জটিলতা, সমস্যা এসে থাকে আর কেউ যদি তাকে সান্ত্বনা কোনকিছু করার উপদেশ দেয়,,, সেই ব্যক্তিটি সাথে সাথে তা প্রত্যাখ্যান করে বলবে যে তুমি বুঝবে না আমি কী জ্বালা অনুভব করছি।

আর এই ধরনের মানুষ নিজেদেরকে সবসময় ‘স্পেশাল’ দেখাতে চায় হোক সেটা তার দূর্ঘটনার বিষয়। আর সে তার একটা খারাপ ঘটনাকেও সবার থেকে উপরে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করবে। ধর, কেউ খাটো বলে একজন তাকে সান্ত্বনা দিতে আসলো,,, এখন ঐ খাটো লোকটি তার সান্ত্বনা কে প্রত্যাখ্যান করে বলবে যে তুমি কী বুঝবে আমার খাটো হবার জ্বালা এই বলে সে কান্নায় ভেঙ্গে পড়বে। আর ঠিক তখন লোকটির চারপাশের মানুষ তার সাথে এমন ব্যবহার করা শুরু করবে যেন সে একটা ফুটন্ত অগ্নি এখনই সে ফেটে চৌচির হয়ে যাবে তাই সবাই তার সাথে খুব সতর্কতার সাথে ব্যবহার করার চেষ্টা করবে।

আর এর দ্বারা সে অন্যের থেকে সুপেরিওর হয়ে গেল এবং সবার নজর এখন তার দিকে ও সে খাতিরে সে এখন ‘স্পেশাল’ একজনে পরিণত হলো। আর এইসব আচরণ বেশী দেখা যায় যখন কেউ অসুস্থ থাকে বা মানসিক রোগাক্রান্ত থাকে অথবা যখন ছ্যাঁক(ব্রেক আপ) খায়।

আর এইরকম ইনফেরিওরিটি অনুভূতি প্রকাশ করে তারা তাদের সুবিধা অর্জনের চেষ্টা করে নিজেকে মিথ্যা বড় বানানোর নেশায় মত্ত থাকে।তারা কতটা দুঃখে আছে, তাদের জীবনে কী সর্বনাশ ঘটে গেছে এর বাড়াবাড়ির দ্বারা তারা আশেপাশের মানুষকেও চিন্তিত করে তোলে। তাই বলা যায় দুর্বলতাও অনেক শক্তিশালী। এখন একটা চরম টুইস্ট আছে এই দুর্বলতা নিয়ে,,

আমরা যদি একটু তাকাই তাহলে দেখতে পাবো যে আমাদের এ সমাজে সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তি কে? এডলারের মত অনুযায়ী ও যুক্তিযুক্ত উত্তর হবে ‘শিশু’। একটা শিশু শাসন করে শাসন করা ছাড়াই। আর সে তার বড়দের উপর হুকুমদারী চালায় তার দুর্বলতা দিয়ে। আর এই দুর্বলাতার জন্য কেউ তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করতে পারে না।

তখন তরুণ বলে (এভাবে তো ভেবে দেখিনি!!)

দার্শনিক বলেন, “অবশ্যই একজন কষ্ট পেলে যে বলে তুমি বুঝবে না আমি কীরকম জ্বালা বোধ করছ – এরমাঝে সত্যতা রয়েছে। আর একজন হয়ে অন্যজনের জ্বালা যন্ত্রণা বা অনুভূতি সম্পূর্নরূপে বুঝতে পারা এ সামর্থ্য একজনের নেই। তবে যতক্ষণ পর্যন্ত কোন ব্যক্তি তার দূর্ভাগ্য বা দূর্বলতাকে নিজের সুবিধার জন্য অর্থাৎ ‘স্পেশাল’ হবার কাজে লাগাবে তখন সে ব্যক্তির সবসময়ই সেই দূর্ভাগ্যেরই প্রয়োজন হবে।

এতক্ষণ অনেক বকবক করলাম। হয়তোবা অনেকেই এতদূর পর্যন্ত লেখাটার আসতে পারেননি, তবে এসে থাকলে সাধুবাদ জানাই। আসলে এটি এমন একটি বই এটি বলে শেষ করা যাবে না। এটি নিয়ে রীতমত গবেষণা করা উচিত। আমাদের সাইকোলজি অনুষদগুলোতে তে এই বই পাঠ্য করা উচিত।এই বইটিতে যা বলা হয়েছে সেগুলো আমাদের বাস্তব জীবনে অনুধাবন ও সমাধানের উপায়গুলো চর্চার ফলে আমাদের জীবনকে সত্যিই সুখী করা সম্ভব। তখন সুখী হওয়া আসলে সহজ ও জীবনটাকেও সহজ বলে মনে হবে। অনেকেই সাহস পাবে নতুন উদ্যমে আরেকবার নিজেকে চিনে সামনে পা ফেলার।

এই বইয়ের একটা সুন্দর প্রবাদ রয়েছে, “তুমি হয়ত ঘোড়াকে পানির কাছে নিয়ে যেতে পারো, কিন্তু তাকে পানি খাওয়াতে পারবে না।”

অর্থাৎ এই বই হয়ত তোমাকে তোমার জীবন বদলানোর দিশা দিতে পারে কিন্তু বদলাতে যে তোমাকেই হবে৷ কেউ তোমার জন্য এসে তোমার পৃথিবী বদলে দিয়ে যাবে না। তোমার পৃথিবী তোমাকেই বদলাতে হবে।

এভাবে সব বলে বইটি সবকিছু একাত্ম করে বর্তমানের দিকে টেনে নিয়ে গিয়ে ইশারা দেয় – এটাতেই তুমি আছো অতীত, ভবিষ্যৎ ভুলে একবার নিজেকে ভাঙ্গো, তারপর দেখবে তুমি নতুন সাজে সেজেছো ঠিক যেন ভোরবেলার শিশিরের মতন, সদা নতুন, সজীব। মনে পড়ে যায় হিরাক্লিটাসের অমর বাণী –

“এক নদীতে দুইবার গোসল করা যায় না।”

0Shares

নাজিউর রহমান নাঈম

আমিকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। কিন্তু সে যে কোথায় লুকাইলো ও এই লোকটি যে তা বড় আশ্চর্যের বিষয়! আমি হারিয়ে যা হল একে কীই-বা বলা যায় বলুন। এখন যাকে দেখছেন সে তো অন্য কাজ করে বেড়াচ্ছে, তার পরিচয়ও নিশ্চয়ই বদলে গেছে। তাহলে আপনি কাকে দেখছেন? দেখছেন আপনাকে আপনার চিন্তাকে যা আপনাকে আমাকে দেখাচ্ছে বা কল্পনা করাচ্ছে। তাহলে শুধু শুধু পরিচয় জেনে কী হবে বলুন। তার চেয়ে বরং কিছু সাইকোলাপ-ই পড়ুন ও নিজেকে হারিকেন নিয়ে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ুন। পথিমধ্যে হয়ত কোথাও দেখা হয়েও যেতে পারে!!! সে পর্যন্ত- কিছু কথা পড়ে থাকুক জলে ভেজা বিকালে খুঁজে চলুক এই আমি পিলপিল করে অনন্ত "আমি" র অদৃশ্য পর্দার আড়ালে

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *