বইপোকা ওশো

ওশো রজনীশ আধ্যাত্মিক গুরু হিসেবে সুপরিচিত। কিন্তু এর বাইরেও তার আরেকটি পরিচয় রয়েছে। সেটি হল তিনি একজন বইপ্রেমিক। যাদের বইপড়ার বাতিক আছে তারা এ লোকটির বইপড়ার কথা শুনলে রীতিমত অবাক না হয়ে পারবেন না। আজকে এটা নিয়ে কিছু কথা বলব।  এই ব্লগটির ভিডিও দেখতে এই লিঙ্কটিতে ক্লিক করুন।

ওশোর তার একটি বক্তৃতায় নিজের জীবনের বইপড়া সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেন যে, ছোটবেলা থেকেই তিনি বইপড়া খুব পছন্দ করতেন। তার বাবা যখন ব্যাবসার কাজে শহরে যেতেন তখন তিনি তার সন্তানদেরকে বলতেন তোমাদের কী কী লাগবে?
ওশোর চাইবার পালা আসলে তিনি বলতেন আমার জন্য তুমি বই নিয়ে এসো। এখান থেকে তার বইপ্রীতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তার বইপড়ার নেশা এমন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল যে, ঘর একটা লাইব্রেরিতে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। এ নিয়ে তার বাবা একটি মন্তব্য করেন, “আগে আমাদের ঘরের মধ্যে একটি লাইব্রেরি ছিল, আর এখন আমাদের লাইব্রেরির মধ্যে একটি ঘর আছে!!”

কেউ এসে তার বইয়ের ওপর আন্ডারলাইন করুক এটা তিনি পছন্দ করতেন না। এ নিয়ে একটা একটা কাহিনী আছে –

ওশোর বাবার শ্যালক যিনি সেসময়ের কোন এক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ছিলেন। যেহেতু তিনি একজন অধ্যাপক ছিলেন সেহেতু তার নোট করার প্রবণতা থেকে তার বই আন্ডারলাইন করার অভ্যাস ছিল। তাই একদিন তিনি ওশোর বইয়ের ওপর আন্ডারলাইন করে তার নোট নিয়েছিলেন। এরপর যখন এটি কিশোর ওশো রজনীশের দৃষ্টিগোচর হল তখন তিনি তাকে বললেন, “এ বইয়ের টাকা দিয়ে আপনি এই বইটা নিয়ে যান। আমি চাই না এই একটা নষ্ট বই এখানে থাকুক। কারও অনুমতি ব্যতীত তার বই আন্ডারলাইন করাটা কী মানায়।  কারণ –

“To me a book is not just a book, but it is a Love Affair.”

ওশো যখন মেট্রিকুলেট পাশ করেছিলেন সে সময়ের মধ্যে তিনি তলস্তয়, গোর্কি, দস্তয়েভস্কি, চেকভ, গীতাঞ্জলি, মীরদাদ, তুর্জিনেভ, কাহলিল জিবরান ইত্যাদি সব লেখকদের বইগুলো পড়ে ফেলেছিলেন। আর যখন তিনি ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্র সে সময়ের মধ্যে তিনি সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টটল বার্ট্রান্ড রাসেল, কার্ল মাক্স ইত্যাদি সব বিখ্যাত দার্শনিকদের বইগুলো যে যে লাইব্রেরীতে পেয়েছিলেন কিংবা কারো কাছ থেকে ধার করে হলেও পড়ে শেষ করেছিলেন। তার আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে শোনা যায় যে, তখনকার সাগর ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরির সমস্ত বই পড়ে তিনি শেষ করে ফেলেছিলেন।

তার নিজের সংগ্রহে রয়েছে ১ লক্ষ ৫০ হাজার দূর্লভ সব দর্শন, উপন্যাস, কবিতাসহ বিভিন্ন ধরনের বই। অবাক করা বিষয় এই যে, তিনি এগুলোর সবগুলো বই পড়েছেন!!! ওশোর সংগ্রহে থাকা প্রতিটা বই শেষে তিনি তার নিজের হস্তাক্ষর করে রাখতেন।

তার আত্মীয়স্বজনদের থেকে জানা যায় যে, তিনি প্রতিদিন ৩ টা করে বই পড়তেন কিংবা তারও বেশী বই পড়তেন।

এখন কথা হলো, ১৫০০০০ হাজার বই একটি মানুষ এক জীবনে কীভাবে পড়ে? আমার এ নিয়ে একটু সন্দেহ জন্মেছিল। তাই পাক্কা ২ ঘন্টা ঘাটাঘাটির করার পর অনেক তথ্য পেলাম। কিন্তু তারপরও কোন সুরাহা করে উঠতে পারলাম না। যাই হোক কী কী পেলাম বলি,

একটি স্পীড রিডারের পক্ষেও তার সারাজীবনে ৩০ হাজার কিংবা খুব বেশী ধরলে ৪০০০০ হাজারের বই পড়া সম্ভব (যদি সে ডাইহার্ড পাঠক হয়)

ওশো বেঁচেছিলেন ৫৮ বছর। আর তার এক ভিডিওতে তিনি বলেছিলেন যে, ৫০ বছর বয়সে তিনি তার বই পড়া থামিয়ে দেন।

এক সাক্ষাৎকারী তাকে বইপড়া বন্ধের ব্যাপারে কথা বললে তিনি জানান যে, “বই আমি কোন উদ্দেশ্য নিয়ে পড়িনি, বই পড়তাম কেননা আমি এটাকে উপভোগ করতাম। এভাবে পড়তে পড়তে একদিন আমি আমার সত্য খুঁজে পেলাম এবং বইগুলোকে, আমার তখন জন্ঞ্জাল বলে মনে হচ্ছিল। এভাবে যখন সময় বাড়তে থাকল বইপড়া আমার কাছে অর্থহীন হয়ে উঠল। মাঝে মাঝে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের কয়েক পাতা আলোচনা করার দরকার পড়লে তখন তা আনা হয়।

কিন্তু তারপরও এইসব বইগুলো আমার একটুও সচেতনতা বৃদ্ধি করবে না। তাই আমি এখন কোন বই, সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশন এগুলো দেখিনা। আর যদি আমি এখনও ক্রমাগত পড়ে যেতাম তাহলে হয়ত আমি এই পৃথিবীর সবচেয়ে শিক্ষিত ব্যক্তি বলে গণ্য হতে পারতাম। যদিও মাঝে মাঝে আমার সন্ন্যায়াসীনরা আমাকে দুএকটি সিনেমা যদি তারা তা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে যে আমাকে তা দেখানো দরকার তা দেখবার জন্য অনুরোধ করে। তখন সিনেমা দেখা হয়।

যেমন যখন ফিওদর দস্তয়েভস্কি’র ব্রাদার কারমাজোভ গল্পটি অবলম্বনে সিনেমা তৈরী হল তখন আমি তা দেখেছিলাম। আর তোমাকে আমি এটা বলতে চাই যে, ব্রাদার কারমাজোভ বইটিকে আমি বাইবেলের থেকেও শ্রেষ্ঠ বলে মনে করি। কারণ এতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সব অন্তজ্ঞানের বিষয়াবলি রয়েছে।”

যাই হোক, যেকথা বলছিলাম,,,

একজন ব্যক্তি যদি তার জন্মের প্রথম দিন হতে ৫৮ বৎসর পর্যন্ত প্রতিদিন একটি করেও বই পড়ে তাহলে তার ১৫০০০০ বইপড়ার টার্গেট পূরণ করতে ৪০০ বছর লেগে যাবে। যদি প্রতিদিন ৮ কিংবা তার বেশী বই পড়া যায় তাহলে তার এ লক্ষ্য পূরণ হবে। কিন্তু একটা মানুষ টানা কীভাবে পড়তে পারে। তার তো অন্যান্য কাজও রয়েছে।

ঘাটাঘাটি করে দেখলাম একেকজন এ ব্যাপারে একেক কথা বলছে। কেউ বলছে ওশো পড়ার কথা শুধু বলেছেন, বইযে তিনি শেষ করেছেন তা তিনি বলেননি সেক্ষেত্রে তিনি সব বইগুলো পড়েছেন হয়ত গুরুত্বপূর্ণ কয়েক হাজার বই শেষ করেছেন আর বাকীগুলো থেকে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো পড়েছেন। এভাবে তিনি ১৫০০০০ বই পড়েছেন।

আবার কেউ বলছেন ওশোর ফটোগ্রাফিক রিডিংয়ের দক্ষতা ছিল। ফটোগ্রাফিং রিডিং হল বইয়ের পাতা উল্টে যাওয়া এবং বইয়ের তথ্যগুলো অটোমেটিকভাবে আমাদের সাবকনসাস মাইন্ডে ফিট হয়ে যাবে। এখন এ পদ্ধতি নিয়ে ইউটিউবে ভিডিও আছে তাহলে জানতে পারবেন। যদিও এ পদ্ধতি কতটুকু কার্যকর তা নিয়ে সন্দেহ আছে। তবে অনেকেই পারেন, কীভাবে পারেন আমি জানি না।

এক্ষেত্রে ওশোর আশেপাশে যারা ছিলেন তার সাথে যারা থেকেছেন তারাও ওশোর ১৫০০০০ বইপড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তাছাড়াও ওশোর ভাষ্যমতে তিনি বলেন আমি যত বই পড়েছি তা যদি গোণা হয় তাহলে কম করে হলেও এটা ১ লক্ষের নিচে হবে না। এ সম্বন্ধে আরেকটি তথ্য পাওয়া যায় যে, তিনি বইয়ের পেজের দিকে এক ঝলক তাকালেই সে পেজের তথ্যগুলো তিনি পেয়ে যেতেন। এটা কী কোন জন্মপ্রদত্ত প্রতিভা কীনা আল্লাহ মালুম!!! যেমন ছোটবেলায় শুনেছিলাম শেরেবাংলা এ.কে ফজলুল হক নাকী বইয়ের পৃষ্ঠা পড়তেন আর পাতা ছিঁড়ে ফেলতেন। নাকী তার স্মৃতিশক্তির প্রখরতা বোঝাতে এ কাহিনী উদ্রেক করা হয়েছিল কে জানে!!

অবশ্য তিনি যে প্রচুর বই পড়েছেন এটার প্রমাণ তিনি তার বাস্তব জীবনেই দিয়ে গেছেন। তিনি টানা ৩৫ বছর ধরে বিভিন্ন ধর্ম, দর্শন, গুরুত্বপূর্ণ সব ব্যক্তি ও নানা ধরনের বিষয়ে বক্তৃতা দিয়েছেন। তার ৫০০০ ঘন্টার বক্তৃতার রেকর্ডিং ওশো ইন্টারন্যাশনাল নামক প্রতিষ্ঠানটিতে আছে। এর ওপর তার বই রয়েছে ৬৫০ এরও অধিক যেসবের মধ্যে রয়েছে বৌদ্ধ, জেন, কান্ট, হেগেল, সক্রেটিস, প্লেটো, মহাবীর, লাওৎসু, মার্ক্স, বার্ট্রান্ড রাসেল, হিউম, চুয়াং তাজু, মিলারেপা, সুফীজম, নীটশে, জ্যাঁ পল সার্ত্র ইত্যাদিদের নিয়ে আলোচনা। এ থেকে তার বই পড়ার পরিধি সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যায়।

এখন যদি মনেও করি তিনি গুল মারছেন। তাহলেও অন্তনপক্ষে তিনি ৫০০০০ কিংবা ৬০০০০ বই নিশ্চিত পড়েছেন৷ তাও কম নয়!!! এজন্য এ লোকটির সম্বন্ধে যত ভাবি ইনি আমার ভেতরকার বই পড়ার ইচ্ছাটা বারবার জ্বালিয়ে দেন। যদিও তার কাছে বইপড়া অর্থহীন কেননা যিনি ১ লক্ষ ৫০ হাজার বই ঘেটেছেন তিনি তো একথা বলবেনই৷ বই পড়তে পড়তে ক্লান্ত হলে আসল বই এসে ধরা দেয়, সেটা হল সবচেয়ে বড় বই জীবন বই। এটাই পড়া আসল ব্যাপার৷ তবে তা বোঝার জন্য এসব বই পথ নির্দেশক মাত্র। এবং আনন্দ নিয়ে বই পড়লে বই বোঝা হয়না বরং তা থেকেও সুঘ্রাণ পাওয়া যায় যা ওশোর বইপড়া অভিজ্ঞতালব্ধ ও অন্তর্জ্ঞানমূলক মিশ্রিত বক্তৃতা থেকে উঠে এসেছে।

 

0Shares

নাজিউর রহমান নাঈম

আমিকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। কিন্তু সে যে কোথায় লুকাইলো ও এই লোকটি যে তা বড় আশ্চর্যের বিষয়! আমি হারিয়ে যা হল একে কীই-বা বলা যায় বলুন। এখন যাকে দেখছেন সে তো অন্য কাজ করে বেড়াচ্ছে, তার পরিচয়ও নিশ্চয়ই বদলে গেছে। তাহলে আপনি কাকে দেখছেন? দেখছেন আপনাকে আপনার চিন্তাকে যা আপনাকে আমাকে দেখাচ্ছে বা কল্পনা করাচ্ছে। তাহলে শুধু শুধু পরিচয় জেনে কী হবে বলুন। তার চেয়ে বরং কিছু সাইকোলাপ-ই পড়ুন ও নিজেকে হারিকেন নিয়ে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ুন। পথিমধ্যে হয়ত কোথাও দেখা হয়েও যেতে পারে!!! সে পর্যন্ত- কিছু কথা পড়ে থাকুক জলে ভেজা বিকালে খুঁজে চলুক এই আমি পিলপিল করে অনন্ত "আমি" র অদৃশ্য পর্দার আড়ালে

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *