ফ্রী উইল নাকী ফেইট?

ফ্রী উইল নাকী ফেইট?

আমাদের কী ফ্রী উইল আছে নাকী আমরা ফেইট দ্বারা পরিচালিত হচ্ছি এ নিয়ে বিতর্ক চলে আসছে সেই সুদূর অতীত থেকে। আসলে বিষয়টি কোন সিদ্ধান্তে আসা নিয়ে নয় যে যেকোন একটা নির্ধারণ করে ফেললাম ও উত্তর নিয়ে বাসায় চলে গেলাম। এ বিষয়টি সহজভাবে যেমন ব্যাখ্যা করা যায় তেমনি এটি প্যারাডক্সের মত বেশ জটিল। তো এই জটিল একটা বিষয় নিয়ে আজকে এখানে কিছু আলোকপাত করার চেষ্টা করব –

ফেইটঃ

ফেইট বলতে আমরা সচরাচর যা বুঝে থাকি তা হল সবকিছুই ভাগ্যের চক্রে ঘুরছে, আমাদের স্বাধীন ইচ্ছা এখানে অনুপস্থিত। আমরা দিনরাত যা করি খাইদাই, ঘুমাই সব ভাগ্যের হাতে ঘটে চলেছে এর পিছনে আমাদের কোন হাত নাই।

ফ্রী উইলঃ

ফ্রী উইল হলো আমাদের স্বাধীন ইচ্ছা আছে। সবকিছু ভাগ্যের চক্রে ঘটে না। আমরা চাইলে নিজ ইচ্ছার দ্বারা অনেক কিছু করতে পারি।

এই গেল সাধারণ ধারণা। একটু চিন্তা করলে দেখা যাবে ব্যাপারটা বেশ লিনিয়ার এর মাঝে কোন গভীরতা নেই। এছাড়া আমাদের ফ্রী উইল ও ফেইটের ধারণাও অনেক সীমাবদ্ধ। অনেক দার্শনিক বিতর্ক আছে এ নিয়ে। অনেকে আবার এ বিতর্ক এড়াতে গিয়ে দুটোকে সমন্বয় করার চেষ্টা করেন। এটা এমন যে, আমরা বাইরের কোন অবস্থার ওপর আমাদের ইচ্ছা না কাজ করলেও, আমরা নিজেদের ব্যাপারে যে সিদ্ধান্তগুলো নেই তার ব্যাপারে আমরা স্বাধীন ইচ্ছা প্রয়োগ করতে পারি। এভাবে এক ধরনের ইন্টারডিপেন্ডেনসির মাধ্যমে ফ্রী উইল ও ভাগ্য সমন্বিত হয়ে কাজ করে।

এখন এইযে আমরা বলছি যে, আমার স্বাধীনতা আছে। এখানটায় এসে সত্যিই একটু লক্ষ্য করা দরকার যে, এই যে আমি “আমার ফ্রী উইল” বলছি এই “আমি” তথা সেলফটা দিয়ে কাকে বোঝাতে চাচ্ছি আমি। আমরা যে সবসময় বলি আমার ফ্রী উইল এই “আমি” টা গড়ে উঠল কীভাবে। এই “আমি” র সীমা আমি কতটুকু ধরে রেখেছি। আমি আমার শরীরের অনেক কিছুই নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনা। আমার হার্ট কাজ করছে, প্রতিনিয়ত রক্ত সন্ঞ্চালিত হচ্ছে এগুলো তো আমি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না। তাহলে যেটাকে “আমি” বলে সম্বোধন করছি সে আসলে কী কী করতে পারে একটা সীমারেখা উঠে আসে।

এখন হয়তো আমি বলতে পারি,, কেন আমি শরীরের ক্রিয়া পরিচালনা না করতে পারলেও আমি খাবার দোকান থেকে আমার খাবার পছন্দমত কিনতে তো পারছি। সেক্ষেত্রে তো আমার স্বাধীনতা রয়েছে। কিন্তু আপনি যে স্বাধীন ইচ্ছাতে খাবার কিনছেন এর নিশ্চয়তা কী? আপনার আশেপাশে টিভি, নেটে চালানো বিজ্ঞাপনগুলো আপনার মনের সাবকনশাসে প্রবেশ করে আপনাকে ঐ জিনিসটিই কিনতে বাধ্য হচ্ছেন যেটাকে আপনি আপনার ফ্রী উইল বলে বিভ্রান্তিতে পড়ে যাচ্ছেন।

এছাড়াও আরও অনেক ফ্যাক্টর রয়েছে, যেমনঃ আপনার বংশগতির ধারা, আপনার সংস্কৃতি, পরিবেশ এগুলোর প্রভাবেও আপনি অনেক সিদ্ধান্ত আপনার ইচ্ছার অগোচরেই নিয়ে ফেলেন। তাছাড়া আপনার শরীরের প্রতিটি কোষ সারাক্ষণ অনবরত কাজ করে চলেছে ব্যাকগ্রাউন্ডে এবং সেখান থেকে যে ফল লাভ আপনি করছেন তার দেখে আপনি অতিদ্রুত এটাকে আপনি নিজের ফ্রী উইল দ্বারা কৃত কাজ বলে ধরে ফেলছেন। এনিয়ে একটা টেস্ট করতে পারেন নিজের সাথে। টেস্টটি হল –

কিছুক্ষণের জন্য আপনি চিন্তা না করার চেষ্টা করবেন। এটা করতে গেলে দেখবেন আপনি চিন্তা থামাতে পারছেন না। এখন এ থেকে আপনি বুঝতে পারবেন যে চিন্তা আসলে যে আপনি ভাবছেন এবং মনে করছেন যে আপনি চিন্তা করেন এবং সে অনুযায়ী ফ্রী উইল দিয়ে সিদ্ধান্ত নেন এটা আসলে তা নয়। কেননা দিনে আপনার মনে হাজার হাজার চিন্তা আসে এবং এর কোনটাই আপনি ইচ্ছা দিয়ে চেয়েও থামাতে পারেন না এবং তা যদি না পারেন তাহলে যে “আমি” ফ্রী উইলের কথা বলছেন তা আদৌও ফ্রী উইল নয়। আপনি ইনভলান্টারিলি চিন্তাগুলো থেকে সিদ্ধান্ত তৈরী হচ্ছে ও আপনি তাতে চালিত হচ্ছেন।

তাহলে আদৌ আমরা যাকে “আমি” বলে গণ্য করছি এটা কী তাহলে নিছক মায়া বা ইলিউশন? আপনি যখন এভাবে দেখা শুরু করবেন তখন আপনি একটা শক খাবেন কেননা যে সেলফ এর ফ্রী উইল নিয়ে ভাবছেন সেটার আদৌও কোন ভূমিকা নেই বরং সে সেলফ আপনাকে দিনকে দিন বোকা বানিয়ে বুঝিয়েছে “You have free will!” তাহলে ফ্রী উইল না থাকলে সব যদি এমনি এমনি ঘটে চলে, তাহলে আমি কালকেই একটা খুন করে ফেলব এবং বলব এটাও ভাগ্যের দ্বারাই ঘটেছে।

হ্যাঁ এরকম অভিযোগ অনেক উত্থাপিত হয়েছে। আর এ অভিযোগ ওঠার ফল হলো আমরা আমাদের সেলফ এর ব্যাপারে সচেতন হয়ে উঠতে পারিনি কিংবা ট্রু সেলফের অনুসন্ধানে বের হয়নি এ কারণে। এতক্ষণ যা বলা হলো তা ফেইট বা ভাগ্যের পক্ষ হয়ে গুণগাণ গাওয়া হল। এটা করা হলো এ কারণে যে আমরা অনেকেই আমাদের যে সেলফ রয়েছে তার ব্যাপারে প্রশ্ন উঠাই না। যার ফলে কোন পুঁথি থেকে যখন আমরা পাই আমাদের ফ্রী উইল আছে কিংবা ভাগ্যই সব তখন এ দুটিকেই আমরা আমাদের সেই মিথ্যা সেলফ এর সাথে সংযুক্ত করে এটাকে ভুলদিকে মোড় দেবার একটা চেষ্টা করি। আমাদের যে গতানুগতিক সেলফ সে চায় যেকোন একটা সিদ্ধান্তে আসতে। সে অনুসন্ধান চালাতে ইচ্ছুক নয় তথা প্রশ্ন করতে ইচ্ছুক নয়। সে এর গভীরে যেতে চায় না।

এখন আমাদের অধিকাংশেরই সেলফ এর ধারণা খুব সসীম আকারের যার ফলে একদিক দিয়ে দেখলে মনে হবে তাদেরকে ভাগ্যই পরিচালিত করছে। কেননা “আমি”র ধারণাটা তাদের খুব ছোট এবং এটা সর্বদাই একটা ক্রেডিট নিতে চায়। যেমন আপনার শরীরকে সুস্থ্য রাখার জন্য লক্ষ লক্ষ কোষ প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে, আপনার হাত নাড়ানোর পিছনে অজস্র ফ্যাক্টর প্রতিনিয়ত কাজ করে চলেছে আর সেগুলোকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে বলবেন যে “আমি” করেছি। এইখানে এসে আপনার আমি নামক সেলফের সীমাটা বোঝা যায়। যখন এটা আপনি বুঝবেন তখন ধীরে ধীরে একে প্রশ্ন করবেন। এরপর প্রশ্ন আসবে সংশয় এবং সংশয় থেকে একদিন আবিষ্কার করবেন “Your whole life is a lie.” এভাবে আপনার ভেতর একটা জাগরণ আসবে এবং আপনি ধীরে ধীরে এওয়ার হওয়া শুরু করবেন।

তাহলে, এ পর্যন্ত আপনার সবকিছু যে ভাগ্যের উপর চলে এটা বলার এই কারণটা হল আপনার এই ফলস সেলফ একটা ঝাঁকুনি দেওয়া।

এরপর আপনি যখন ধীরে ধীরে সেলফ তথা “আমি” খোঁজে বের হবেন তখন এটাকে অনুসন্ধান করতে গিয়ে আপনি সচেতন হওয়া শুরু করবেন ও এই সচেতন হবার প্রবণতাটা যত বাড়তে থাকবে আপনি ততই দেখবেন ফ্রী উইল আপনার কাজ করছে। কেননা আপনার যে ক্ষুদ্র “আমি” আপনি এতদিন ধরে রেখেছেন সেটা তার সীমানা ছাড়িয়ে আপনার এওয়ারনেসের আলো আপনার শরীরের কোষ, প্রকৃতি, হার্ট ইত্যাদিকে “আমি” ভেতর অন্তর্ভুক্ত করা শুরু করবে।

এটা হলে যেই “আমি” কে আপনি এতদিন ক্ষুদ্র সীমানায় দেখতেন সেই আমি ধীরে ধীরে আপনার শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করলে এটা বড় হওয়া শুরু করবে ও বিশ্বজনীন যে একটা ইচ্ছাশক্তি আছে সে ইচ্ছাটাই আপনার সেই বৃহৎ “আমি”র ইচ্ছা হয়ে যাবে যেটা আপনি এতদিন বিস্মৃত হয়ে ছিলেন। এদিক দিয়ে দেখলে আপনি যেটাকে ভাগ্য বলে জানতেন সে ভাগ্যটা হল এই বিশ্বজনীন ইচ্ছা যার যেটা আপনি বিস্মৃত হয়ে গিয়ে ক্ষুদ্র ” আমি”র সাথে সংযুক্ত করে যে ফ্রী উইলের বাসনা করছেন তা মূলত ভ্রম। এবং সেই ভ্রম থেকে বেরিয়ে এসে “আমি” সচেতনতার গন্ডি বৃদ্ধি বৃদ্ধি পেতে পেতে যখন বিশ্বজনীন ইচ্ছার সাথে একাত্ম হয় তখন ওই সেই ইচ্ছাটাই আপনার ইচ্ছা হয়ে যায় ও এর অসীম স্বাধীনতার প্রাপ্তি ঘটে,,,ও সেই অনুযায়ী ফ্রী উইল যে আছে বলা যেতে পারে।

আসলে এটাকে আমার ফ্রী উইল আছে এভাবে না বলে বলা যেতে পারে ফ্রী উইল তথা স্বাধীন ইচ্ছা রয়েছে এবং ইচ্ছাশক্তি রয়েছে। এভাবে বলার একটাই কারণ আমাদের “আমি” এর ভেতর অনেক গোলমাল আছে ও বিভ্রান্তি আছে। এজন্য মহাভারতে যখন দেখা যায় বলে যে সবকিছু মহাকালের ইচ্ছাতেই ঘটে তখন মূলত এই “আমি” নামক ভারী বস্তুটা সরিয়ে দেওয়া হয় ও তার স্বাধীন ইচ্ছার কাছে নিজের মিথ্যা আমিকে সমর্পিত করা যায়। এটা একটা টুলস ছাড়া আর কিছুই নয়। আবার “আমি” কে বৃদ্ধি করে করে সচেতন হয়ে আপনি সার্বজনীন একটা ইচ্ছার সাথে একত্রিত হলে সে অনুযায়ী আপনার ফ্রী উইল আছে এটাও বলা যায় এবং এটাও একটা টুলস।

আসলে ফ্রী উইল নাকী ফেইট এটা নিয়ে তত্ত্বগত সিদ্ধান্তে আপনি যতই আসতে চান না কেন এটা একটা প্যারাডক্সের মতই মনে হবে। বরং এ দুটোকে আমরা ব্যাবহারিক পদ্ধতিরূপে কাজে লাগালে ও সচেতন হয়ে যদি বুঝি কোন অবস্থায় ফ্রী উইলকে কাজে লাগাবো কিংবা ইচ্ছাশক্তিটাকে কাজে লাগাবো এবং কোন অবস্থায় ভাগ্যকেই মেনে নিব এটা বোঝা। আর এটা বোঝা যাবে তখনই একমাত্র সচেতন হলে বা এওয়ার। আমরা যত এওয়ার হব ততই আমরা এ বিশ্বের প্রাকৃতিক ভারসাম্যের সাথে একাত্ম হতে পারব(কেননা আমরাও তো বৃহৎ প্রকৃতির অংশ) ও বৃহৎ পরিকল্পনার ইচ্ছার সাথে এক হয়ে যে আমি গঠিত হল সেই আমিরূপেই স্বাধীন ইচ্ছা প্রয়োগ করতে পারব।

প্রাচীনকালের ঋষিরা যখন বলে সবকিছু মহাকাল ঘটাচ্ছে – এর দ্বারা আসলে মানসিক যে ইগোর বা ফলস সেলফ এর একটা বোঝা ছিল তা থেকে রিলিফ পাওয়া যায় ও একটা শান্তি মেলে ও এটা ধরে কেউ যদি এগোতে থাকে চূড়াম্ত পর্যায়ে গিয়ে সে সমপর্ন করে দেয় এ বিশ্বজগতের কাছে। এদিক থেকে এটা ব্যাবহারিক। কিন্তু এটাকে কলুষিত করেছে ইগো এবং এজন্য আসলো ফ্রী উইল। এখন ফ্রী উইলেরও যখন মঙ্গলজনক দিকের বিচ্যুতি ঘটল, তখন এটাকে ভাঙ্গার জন্য একটা নিয়তি দিকে বিষয়টি এনে তা দিয়ে সরাসরি এবার নিজের সেলফ এর দিকে তাক করাটাই বোধহয় এসময় ব্যাবহারিক হতে পারে। এতে করে একটা আত্মানুসন্ধানে আমরা যাত্রা করা শুরু করতে পারব। অবশেষে একদিন হয়ত বুঝে যাবো ফ্রী উইল ও ফেইট কিছুই নয়, একই মুদ্রার এপিঠ, ওপিঠ।

যখন আমরা বৃহৎ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি তখন আমার ফ্রী উইল রয়েছে ও সেখান থেকে সাজানো নিয়তির খেলার চাবিকাঠি সম্বন্ধে আমি সচেতন থাকি।

যখন আমরা সসীম হয়ে দেখি তখন আমাদের সসীম দৃষ্টিভঙ্গী পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে ভাগ্য নাকী ফ্রী উইল -এর দোলনায় দুলতে থাকে।

যখন আমরা এ সসীম দৃষ্টিভঙ্গী সম্পর্কে জাগ্রত হই তখন আমরা অধিকতর বৃহৎ দৃষ্টিভঙ্গির সাথে অগ্রসর হতে থাকি ও সে অনুযায়ী এ দ্বন্দ্বের সমন্বয় হতে থাকে।

সবশেষে একদিন হয়ত আমরা শূন্যে প্রবেশ করব যেখান থেকে ভালোবাসার আকাঙ্খাজনিত প্রথম ইচ্ছাতরঙ্গ জেগেছিল ও তা বিশ্বজগতে প্রকাশ করতে গিয়ে ভাগ্যচক্র বা ফেইট – এর খেলার উদ্ভব হয়েছিল।

0Shares

নাজিউর রহমান নাঈম

আমিকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। কিন্তু সে যে কোথায় লুকাইলো ও এই লোকটি যে তা বড় আশ্চর্যের বিষয়! আমি হারিয়ে যা হল একে কীই-বা বলা যায় বলুন। এখন যাকে দেখছেন সে তো অন্য কাজ করে বেড়াচ্ছে, তার পরিচয়ও নিশ্চয়ই বদলে গেছে। তাহলে আপনি কাকে দেখছেন? দেখছেন আপনাকে আপনার চিন্তাকে যা আপনাকে আমাকে দেখাচ্ছে বা কল্পনা করাচ্ছে। তাহলে শুধু শুধু পরিচয় জেনে কী হবে বলুন। তার চেয়ে বরং কিছু সাইকোলাপ-ই পড়ুন ও নিজেকে হারিকেন নিয়ে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ুন। পথিমধ্যে হয়ত কোথাও দেখা হয়েও যেতে পারে!!! সে পর্যন্ত- কিছু কথা পড়ে থাকুক জলে ভেজা বিকালে খুঁজে চলুক এই আমি পিলপিল করে অনন্ত "আমি" র অদৃশ্য পর্দার আড়ালে

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *