ধর্ম বনাম আধ্যাত্মিকতা – একটি সাম্প্রতিক সময়ের দ্বন্দ্বগত পার্থক্য

সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ম নিয়ে অনেক উন্মাদনা দেখা যাচ্ছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি একে একে ইসলাম ধর্ম, হিন্দু, খ্রিস্টান ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম, ইহুদি ধর্ম ইত্যাদি এগুলোর একটা উত্থান ঘটছে। কিন্তু সমস্যা হলো ধর্ম অনেক পবিত্রতা, শান্তির কথা বললেও বাস্তবে আমরা এর ফলাফলে উল্টোটাই দেখতে পাই। আমরা দেখতে পাই নানা ধর্মের মাঝে সংঘর্ষ, শান্তির বদলে অশান্তি।

কিন্তু এসব আসলে কেন?

এটা এই কারণে যে, ধর্ম সম্পর্কে আমরা জানিনা। আমাদের কোন স্পষ্ট ধারণা নেই। কেবলমাত্র কতগুলো গ্রন্থের বিশ্বাসই আমাদের তথাকথিত ধর্ম। আমরা ধর্মের যে রূপ সে রূপে কেবল অন্ধবিশ্বাস তথা ডগমাই দেখতে পাই। যেখানে ধর্মের মূল কথা ছিলো ধারণ করা। ধর্ম শব্দটি এসেছে প্রাচীন ল্যাটিন শব্দ Religare থেকে যার ইংরেজীতে অর্থ করলে দাঁড়ায় “To Bind” তথা একত্রিত করা, সংযুক্ত করা।

ধর্মের ইতিহাস বেশ প্রাচীন। অনেক কাল থেকেই ধর্ম চলে আসছে যা আজও তার প্রবাহ রয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ মানুষরা ধর্ম বলতে যা বুঝে থাকে তা আসলে কী?

এর উত্তর দিতে গিয়ে অনেক জ্ঞানীগুণী মানুষরা ধর্মের মূলস্রোতে গিয়ে এর একটা সামন্ঞ্জস্যপূর্ণ অর্থ দিতে পারেন। কিন্তু কথা হলো ধর্মের ব্যাপারে এ সংস্কারগত অর্থের সাম্প্রতিক সময়ে কোন ভিত্তি নেই বলেই আমার মনে হয়। অন্ততপক্ষে কোন কোন ব্যক্তির পক্ষে সে যদি এটার প্রকৃতঅর্থ অনুধাবন করে এটাকে এ নামে বুঝে নিয়ে স্বস্তি পেতেও চায় তা তার ব্যক্তিগত বিষয়৷ তবে সামাজিক প্রেক্ষাপটে অধিকাংশ মানুষ ধর্ম বলতে সেই প্রাচীনকালের মহামানবেরা যার গোড়াপত্তন করে গেছেন সে অর্থে বুঝে থাকেনা। তারা এটাকে অন্ধভাবেই বিশ্বাস করে বসে থাকে কোনপ্রকার নিজের বোধগত অভিজ্ঞতা লাভ ছাড়াই। তাই ধর্ম আর কিছুই নয় একটা ডগমাতে পরিণত হয়ে গেছে সাম্প্রতিক সময়ে।

এরমধ্যে কেউ কেউ আবার ধর্মের সাথে এর গুহ্য উপাদানগুলোকে মিশিয়ে এক করে দেখে এটাকে ধর্ম বলে ধরে নেন। এরফলে তাদের ধরে নেবার দ্বারা মোটাদাগে সমাজের অধিকাংশ মানুষ তাদের অন্ধবিশ্বাসের স্বপক্ষে একটা আধ্যাত্মিক ভ্যালু লাভ করে। যদিও আমরা সমাজের মেইনস্ট্রিমে যে ধর্মের অর্থ দেখি তা এসব গুহ্যতত্ত্বকে আমলে নেয়না।

তাই ভাবলাম যে, ধর্ম (Religion) ও আধ্যাত্মতা (Spirituality/Mysticism) এ দুটির মাঝে যে পার্থক্য সাম্প্রতিক সময়ে তৈরী হয়েছে তার একটা ধারণা এই আর্টিকেলে আপনাদেরকে শেয়ার করি। তাহলে চলুন জেনে নেই ধর্ম ও আধ্যাত্মতার কিছু বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য –

১. ধর্ম হল কোনকিছুকে কোন বিচার বিবেচনা ছাড়াই আগে থেকেই বিশ্বাস করা।

অন্যদিকে, একজন ব্যক্তির আধ্যাত্মতার পথে যাত্রা শুরু হয় ধর্মীয় বিশ্বাসকে প্রশ্ন করার মাধ্যমে।

২. ধর্মতে সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠীভিত্তিক সুনির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন, আচার-আচরণের কঠোর বিধি রয়েছে।

অপরদিকে, আধ্যাত্মতায় কোন সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা একক কোন ধর্ম নেই। এতে সকল ধর্মের গুহ্য ও মরমীয় বিষয়ের সারৎসার অন্তর্ভুক্ত। কোন ব্যক্তির তাই আধ্যাত্মতা পালন করতে কোন নির্দিষ্ট ধর্মের অন্তর্ভুক্ত হতে হয়না। তবে সে চাইলে অনুসন্ধানের দ্বারা তার ব্যক্তিগত পারসেনালিটি অনুযায়ী বিধি অনুযায়ী সাধনা করতে পারে যা কোন গ্রন্থ দ্বারা আরোপিত নয় বরং, নিজের ইচ্ছা দ্বারা সমর্থিত।

৩. ধর্মে একজন গডহেড থাকে ও তাকে মেনে নিয়ে সুনির্দিষ্ট রিচুয়াল পালন করা হয়।

কিন্তু আধ্যাত্ম তথা স্পিরিচুয়ালিটিতে গডহেড থাকেনা বরং এ উপলব্ধি থাকে যে, নিজের মাঝে গডের বিকাশ হওয়া সম্ভব।

৪. ধর্মীয় রিচুয়ালগুলো যারা পালন করেন তারা এর অন্তর্নিহিত বিষয় সম্বন্ধে অজ্ঞাত।

অন্যদিকে, আধ্যাত্মতায় ব্যক্তি এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য সম্পর্কে তার আপন জাগরণ দ্বারা তা বুঝতে পারে বা রেকগনাইজ করতে সমর্থ হয়।

৫. ধর্ম তার বাহ্যিক দিক তথা শরীয়ত দিকনির্ভর।

কিন্তু আধ্যাত্মতায় অন্তর্নিহিত দিক তথা মারেফতের দিকগুলো বেশী প্রাধান্য পায়। যা হলো সকল ধর্মের মূলভিত্তি। প্রতিটি মহামানবরাই প্রথমে তাদের রিয়ালাইজেশন ঘটেছে এরপর তারা মানবজাতির জন্য বাহ্যিক ক্রিয়াকান্ডের অবতারণা করেছেন। উদাহারণস্বরূপ, রাসূল (সাঃ) হেরা গুহায় ১৫ বছর ধ্যানমগ্ন ছিলেন। তারপর তিনি বিশ্বাস নিয়ে কথা বলেছেন। আর এ ধ্যানমগ্নতা হল আধ্যাত্মের গুপ্তদিক যা ধর্ম থেকে বরাবরই উপেক্ষিত।

এছাড়াও যিশুর ১৩-৩০ বছর বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ তথা অনুসন্ধান ও শিক্ষার পর তিনি ভালোবাসা ও ঈশ্বরের কথা বলেন তার আগে নয়। মূসার তুর পাহাড়ে গমন, ইব্রাহীমের আকাশের তারার দিকে চেয়ে অনুসন্ধিৎসা ইত্যাদি এ সবের ফলাফল ছিলো ধর্মীয় বাহ্যিক কাঠামো। কিন্তু ক্রমান্বয়ে এগুলো নানা মিথ্যার দ্বারা অন্ধবিশ্বাসের দ্বারা কলুষিত হয়ে গেছে। আধ্যাত্মতা হল এ কলুষতা, অন্ধবিশ্বাস থেকে সকল ধর্মের সারৎসার তথা গুহ্য অন্তর্দৃষ্টির প্রতি জাগরণ ও এ ব্যাপারে মুক্ত অনুসন্ধানের স্পৃহা।

৬. ধর্মতে যা বলা হয়েছে তাতে বর্ণিত ঘটনাগুলোর সরাসরি মিনিং ধরে নিয়ে মানুষরা ভুল করে থাকে।

অন্যদিকে, আধ্যাত্মতায় এ বোধ জাগরিত হয় যে, ধর্মগ্রন্থগুলোতে যা বলা হয়েছে তা রূপক আকারে বলা হয়েছে ও এর পেছনে গভীর তাৎপর্য রয়েছে যা কেবল মেনে না নিয়ে নিজের অন্তর্দৃষ্টির কষ্টিপাথরে বিবেচনা করে নিতে হয়৷

৭. ধর্মতে যারা বিশ্বাস করেন তারা মূলত তাদের গোষ্ঠীভিত্তিক একক ধর্মে বিশ্বাস করেন ও নিজের ধর্মের প্রতি অতিমাত্রায় টান থাকার ফলে এটা বদ্ধতার সৃষ্টি করে।

অন্যদিকে যারা আধ্যত্মচর্চা করেন তারা একক কোন ধর্ম নিয়ে পড়ে থাকেন না। তাদের কাছে সকল ধর্মের গুহ্য বিষয়াবলিই প্রধান হয়ে দাঁড়ায়। তার ধর্ম মানার নয় বরং যাপনের বিষয় হয়ে ওঠে। আধ্যাত্মে সকল ধর্মের গ্রহণযোগ্যতা থাকার ফলে এটি ব্যক্তিকে আবদ্ধ করেনা বরং মুক্ত করে।

৮. ধর্ম প্রাতিষ্ঠানিক; আধ্যাত্মতা প্রাতিষ্ঠানিক নয়।

৯. জন্মগতভাবেই কোন ব্যক্তি ধর্মের মাধ্যমে ইনডক্ট্রিনেট হয়।

কিন্তু আধ্যাত্মতায় ইনডক্ট্রিনেশন নেই। বরং ইনডক্ট্রিনেশন ভেঙ্গে এটি নিজের পথ গড়ে নেয়।

১০. হিন্দু ঘরে জন্মালে হিন্দু, মুসলমান ঘরে জন্মালে মুসলমান এভাবে যে ঘরে জন্মায় ব্যক্তি সে ধর্মের বলে তাকে চিহ্নিত করা হয়।

কিন্তু জন্ম থেকেই কেউ আধ্যাত্মিক হয়ে যায়না। অনুসন্ধান, উপলব্ধি, সাধনা, বোধ ইত্যাদি এসব দিয়ে ব্যক্তিকে তা ধারণ করে নিতে হয়।

১১. ধর্ম হল স্থূল বিষয়; আধ্যাত্ম হল সূক্ষ্ম বিষয়।

১২. ধর্ম হল গোষ্ঠীকেন্দ্রীক প্রধান। অপরদিকে আধ্যাত্মে ব্যক্তিগতকেন্দ্রীকতা প্রধান।

১৩. ধর্মতে নাস্তিকতাকে অগ্রাহ্য করা হয়। অপরদিকে একজন নাস্তিকের মাঝেও আধ্যাত্মতা পরিলক্ষিত হতে পারে। যেমনঃ বুদ্ধ, মহাবীর ইত্যাদি।

এরকম আরও নানারকম বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য তুলে ধরা যায়। নিজের ধর্মের মাঝে আধ্যাত্মতা টের পেলেও এটা কেবল ঐ একক ধর্মের মাঝে নয়। এই আধ্যাত্মতা অন্য সকল ধর্মেও ছিল। তাই যে আধ্যাত্ম পথে বিচরণ করে তার কাছে সমাজে প্রচলিত একক ধর্মের কোন মানে থাকেনা। এবং এ দিয়ে সে ব্যক্তি তার ধর্মকে জাস্টিফাইও করেনা। আধ্যাত্মের ধারা সবকালে সকল দেশ, মানুষের জন্য উন্মুক্ত। এখানে কোন সীমা নেই। অন্যদিকে ধর্মে নির্দিষ্ট সীমানা রয়েছে। যে সীমানায় কেবল নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর লোকেরাই বিচরণ করতে পারে।

ধর্মের সংজ্ঞা এখন যত গভীরই হোকনা কেন। বর্তমান প্রেক্ষাপট অনুযায়ী তার যথার্থতা নজরে আসেনা। তাই এটি অন্ধবিশ্বাসই বলা যায়। তবে কেউ যদি গভীর অর্থে ধর্মকে টানতে চান তাহলে প্রথমে তাকে প্রশ্ন, অনুসন্ধান ও তা থেকে তিনি যদি উপলব্ধিতে আসেন তাহলে সেটাকে তিনি গভীর অর্থে কোন নির্দিষ্ট ধর্মে যেমনঃ প্রকৃত ইসলাম, প্রকৃত সনাতন হিন্দু ধর্ম এসবে না টেনে বিভ্রান্ত না হয়ে তাকে আধ্যাত্ম দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে ব্যাপারটার জটিলতা দূর হয়।

এই ছিলো ধর্ম ও আধ্যাত্মতা নিয়ে কিছু সংক্ষিপ্ত আলোচনা ও এদের মধ্যাকার পার্থক্য। অবশ্য আধ্যাত্মিকতারও নানা ডাইমেনশন, সমস্যা, ডিল্যুশন আছে। যদিও এগুলো বেশ সূক্ষ্ম, প্যাঁচালো ও ধোঁয়াটে। এসব নিয়ে ভবিষ্যতে আরও অনেক কিছু লেখার ইচ্ছা রইল। আপাতত এ আশাবাদ ব্যক্ত করে এখনকার মত লেখাটি সমাপ্ত করলাম।

0Shares

নাজিউর রহমান নাঈম

আমিকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। কিন্তু সে যে কোথায় লুকাইলো ও এই লোকটি যে তা বড় আশ্চর্যের বিষয়! আমি হারিয়ে যা হল একে কীই-বা বলা যায় বলুন। এখন যাকে দেখছেন সে তো অন্য কাজ করে বেড়াচ্ছে, তার পরিচয়ও নিশ্চয়ই বদলে গেছে। তাহলে আপনি কাকে দেখছেন? দেখছেন আপনাকে আপনার চিন্তাকে যা আপনাকে আমাকে দেখাচ্ছে বা কল্পনা করাচ্ছে। তাহলে শুধু শুধু পরিচয় জেনে কী হবে বলুন। তার চেয়ে বরং কিছু সাইকোলাপ-ই পড়ুন ও নিজেকে হারিকেন নিয়ে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ুন। পথিমধ্যে হয়ত কোথাও দেখা হয়েও যেতে পারে!!! সে পর্যন্ত- কিছু কথা পড়ে থাকুক জলে ভেজা বিকালে খুঁজে চলুক এই আমি পিলপিল করে অনন্ত "আমি" র অদৃশ্য পর্দার আড়ালে

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *