দ্রৌপদী রাজনীতি – ওশো

পৃথিবীতে অনেক বড় বড় যুদ্ধের পেছনেই ছিলো একজন নারী। তা যেসব নারীদের কারণে যুদ্ধ পর্যন্ত ঘটে যায় তখন সেক্ষেত্রে আমাদের মাথায় রাখতে হবে এরা কোন যে সে নারী নয়, এদের ভেতরে এমন সব গুণ, রূপ ইত্যাদির সমাবেশ ছিল যার কারণেই মহাযুদ্ধ পর্যন্ত ঘটে যায়।

এই যেমন ধরুন ট্রয় যুদ্ধের হেলেন যদিও হেলেনের অত বুদ্ধি ছিলো না কিন্তু মাথা নষ্ট করা রূপ ছিলো এতেই সবার ফেটে গেলো। এরপর রামায়ণের সীতা বেচারা রাবণের বেছে বেছে সীতাকেই অপহরণ করতে হলো!! সো সেড! এরপর রাম ও হনুমান মিলে বাঁধিয়ে দিলেন লঙ্কাকান্ড।

ঠিক এইভাবে, পান্ডবরা কর্মটর্ম করে বিরান ভূমিকে ইন্দ্রপ্রস্থে রূপান্তরিত করে তুললেন। গড়ে তোলার পর সমস্ত রাজাদেরকে তাদের ইন্দ্রপ্রস্থের জন্য রাজযজ্ঞের অনুষ্ঠানের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হলে, সবাই সেখানে অংশগ্রহন করে। দূর্যোধন বেচারা অনিচ্ছাসত্ত্বেও সেখানে আসে। তারপর অনুষ্ঠান সমাপ্ত হয়ে গেলে ধীরে ধীরে অতিথিরা যে যার গন্তব্যে চলে যায় থেকে যায় কেবল দূর্যোধন ও তার সঙ্গীসাথীরা। তো একদিন দূর্যোধন ইন্দ্রপ্রস্থ রাজ্যের মায়ামহল পরিদর্শনে গেলে সেথায় ভুলবশত পানিতে পড়ে যায়। তাই দেখে দ্রৌপদী তো হেসেই কুটি কুটি!

আর এতেই দূর্যোধন অপমানে জ্বলতে থাকে ও পান্ডবদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে তার মামা শকুনীর সহযোগিতায় পান্ডবদেরকে হস্তিনাপুরে আনিয়ে জুয়াখেলায় যুধিষ্ঠিরকে পরাজিত করে ও দ্রোপদীর বস্ত্রহরন পর্যন্ত ঘটে যায়। এবং এতেই সূত্রপাত হয় কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ।

দ্রৌপদীর হাসিই কী একমাত্র ইন্ধন ছিল? যদি ব্যাপারটির আর একটু গভীরে যাওয়া যায় তাহলে দেখা যাবে ঐদিনের দ্রৌপদীর হাসি দূর্যোধনের ভেতরে সেইদিনের স্মৃতিচারণ পর্যন্ত করিয়ে ছেড়েছিল যেদিন স্বয়ম্বরে সে দ্রৌপদীর দেওয়া চ্যালেন্ঞ্জে হেরে গিয়ে তাকে বিবাহ করতে পারেনি ও চোখের সামনে দিয়ে অর্জুন দ্রৌপদীকে বিয়ে করে যায়। এই সামান্য হাসি তার মনের ভেতরের এই দুঃসহ স্মৃতির যে বারুদ ছিল তা জ্বালিয়ে দেবার কাজ করেছিল কেবল।

এখন আসি দ্রৌপদী কেমন নারী ছিল সে ব্যাপারে। মহাভারতের ঘটনা অনু্যায়ী দ্রৌপদী কোন যে সে নারী ছিলনা। অগ্নিকন্যা যাকে বলে দ্রৌপদী ছিল এমনই একজন। যে তার বস্ত্রহরণের ঘটনা ঘটার পর পুরো হস্তিনাপুর রাজ্যের গন্যমান্য সবার ওপর প্রতিবাদের আঙুল তুলতে জানে ও তাদেরকে চোখ রাঙানোর সাহস যেটা ঐসময় অনুযায়ী বিরলও বলা যায়। এমনকী সীতা যাকে মা সীতা পর্যন্ত বলা হয় সেও নিন্দার বোঝা মাথায় নিয়ে বনবাসে চলে যায়। অন্যদিকে দ্রৌপদী বিদ্রোহী ক্যাটাগরীর।

এজন্য ওশো বলেন যে, ভারতবাসীরা সীতাকে মা এর সমতুল্য বলে সম্মানিত করলেও ও তাকে একটা উঁচুতে স্থান দিলেও দ্রৌপদীকে কেবলমাত্র একজন বাদে সেরকম সম্মাননা দেওয়ার সাহস কেউ করেনি।
ওশো আরও বলেন যে, এখন এমন রূপে, গুণে ও সংকল্পে ভরা নারীর খবর ঐসময় সবাই জেনে থাকবে ও সে নারীকে পাবার বাসনা সব পুরুষের মাঝেই থেকে থাকবে। তাই দ্রৌপদীকে যখন পান্ডব পুত্র অর্জুন চ্যালেন্ঞ্জে জিতে তার মা কুন্তির কাছে নিয়ে আসলো ও মজা করার ছলে যখন বললো, “মা জিনিস নিয়ে এসেছি।” আর কুন্তিও তার স্বভাবশত বলল যে যা নিয়ে এসেছিস পাঁচজনে ভাগ করে নে। এরপর কৃষ্ণ এসে দ্রৌপদীর আগের জন্ম, কর্মফল ইত্যাদি যে মেলা কিছু বললো ব্যাপারটা এমন সহজ নয়।

এক্ষেত্রে ওশো বলেন যে, আমি ব্যাপারটাকে এভাবে দেখি না। আমি এটিকে একটি গভীর পলটিক্যাল এঙ্গেলে দেখি। যে দ্রৌপদীর এত রূপ, গুণ যার জন্য সবাই পাগল ও ক্রমে ক্রমে এর জন্য কুরুক্ষেত্র পর্যন্ত ঘটে যায়। সে দ্রৌপদীকে পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে ভাগ করে দেওয়াটাই তখনকার সময়ে পলিটিক্যালি সঠিক বন্দোবস্ত ছিলো। নাহলে যার কারণে কৌরব, পান্ডবের মাঝে যুদ্ধ লেগেছিল সেই একই কারণে পাঁচ পান্ডব ভাইদের মাঝেও যুদ্ধ লেগে যেত অর্থাৎ হস্তিনাপুর আরও পাঁচ খন্ডে বিভক্ত হয়ে যেত। এটা যাতে না হয় এইজন্য কুন্তির এই ব্যাবস্থা যুক্তিযুক্ত বলেই মনে হয়।

এভাবে ওশো দ্রৌপদীর ব্যাপারটিকে একটি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে ব্যাপারটিকে ব্যাখ্যা করেন তার গীতা দর্শনে।

এবার সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি দৃষ্টিকোন থেকে দ্রৌপদীকে দেখা যাক। এটাকে মহাভারত দেখতে দেখতে আমার কাছে মনে হয়েছে। এক্ষেত্রে আমি ইগোয়িক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করব। সুতরাং এটা উপরে উল্লেখ করা বিষয়াবলি থেকে ভিন্ন হবে। শুরু করা যাক –

দ্রৌপদীর সাথে বস্ত্রহরণের জন্য এরূপ ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটার পর তো সে আগুন দ্রৌপদীর মনে দাউ দাউ করে জ্বলা আরম্ভ করে দেয়। আর সে আগুন ক্রমাগত জ্বালাতে থাকে পাঁচ পান্ডবকেও। তাই ১২ বছরের বনবাসে থাকার পরও একদিনের জন্যও দ্রৌপদী তার কেশ বাঁধেনি বরং তা খুলে রেখে সামনে রেখেছে পাঁচ পান্ডবের কাপুরষতার নিদর্শন হিসেবে। যথারীতি যখন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। একে একে প্রিয়জনের লাশ পড়তে লাগল। তখনও দ্রৌপদীর মন জুড়ে রয়েছে ভীম কখন দূ্র্যোধন ও দুঃশাসনকে বধ করবে। এমনকী ভীষ্মকে পর্যন্ত তাচ্ছিল্য করতে সে বাদ রাখেনি।

দ্রৌপদীর সাথে যে ঘটনা ঘটেছে তা নিঃসন্দেহে নিন্দনীয় হলেও সেটা এতদিন ধরে পুঁষে রাখবার ফলে তার যে প্রতিশোধপরায়ন সসীম দৃষ্টিভঙ্গী এটা ছিলো দ্রৌপদীর ইগোয়িক যাতনা। যেখানে যুদ্ধের সময় এত এত মানুষ মারা যাচ্ছে সেখানে তার সমস্ত অস্তিত্বজুড়ে সেই একই ক্রোধের অনল। যার কারণে দ্রৌপদীর ভেতর একধরনের অস্থিরতা বজায় ছিল ও তার এ অস্থিরতা তাকে অন্যসবার প্রতি সহমর্মী দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করতে পারেনি ততক্ষন পর্যন্ত যতক্ষণ না দূ্র্যোধন ও দুঃশাসনের বধ হয়ে যায়।

দূ্র্যোধন ও দুঃশাসনের প্রতি যে সহমর্মীতা দেখাতে হবে ব্যাপারটা এমন নয় তবে সারাক্ষণ ধরে এইযে প্রতিশোধের যে ভাব ও এটা অন্যান্যদের ওপরও তার প্রভাব ছড়িয়ে দেওয়া এটা মাঝে মাঝে দ্রৌপদীর ইগোয়িক আচরনেরই বহিঃপ্রকাশ। এজন্য কৃষ্ণ একপর্যায়ে দ্রৌপদীকে ঝারিও দিয়েছিলেন।
তবে এও ঠিক যে মহাভারতে কৃষ্ণ বাদে প্রত্যেকেরই একটা না একটা বিষয়ে অস্থিরতা, যাতনা ছিলই। এদিক দিয়ে দ্রৌপদীর ইগোয়িক ব্যাপার স্যাপার থাকলেও তার এ বিদ্রোহ ঐ সময় অনুযায়ী একটা বলিষ্ঠ পদক্ষেপ রেখিছিল বলে বলা যায়।

আজ এ পর্যন্তই পরবর্তীতে কৃষ্ণের ব্যাপারে আলোচনা করা যাবেখন। আপাতত এটুকুই থাকুক। 😄😄😄

0Shares

নাজিউর রহমান নাঈম

আমিকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। কিন্তু সে যে কোথায় লুকাইলো ও এই লোকটি যে তা বড় আশ্চর্যের বিষয়! আমি হারিয়ে যা হল একে কীই-বা বলা যায় বলুন। এখন যাকে দেখছেন সে তো অন্য কাজ করে বেড়াচ্ছে, তার পরিচয়ও নিশ্চয়ই বদলে গেছে। তাহলে আপনি কাকে দেখছেন? দেখছেন আপনাকে আপনার চিন্তাকে যা আপনাকে আমাকে দেখাচ্ছে বা কল্পনা করাচ্ছে। তাহলে শুধু শুধু পরিচয় জেনে কী হবে বলুন। তার চেয়ে বরং কিছু সাইকোলাপ-ই পড়ুন ও নিজেকে হারিকেন নিয়ে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ুন। পথিমধ্যে হয়ত কোথাও দেখা হয়েও যেতে পারে!!! সে পর্যন্ত- কিছু কথা পড়ে থাকুক জলে ভেজা বিকালে খুঁজে চলুক এই আমি পিলপিল করে অনন্ত "আমি" র অদৃশ্য পর্দার আড়ালে

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *