দৌপ্রদীর বস্ত্রহরণ-মহাভারত

মহাভারতের মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র, তার পুত্র দূর্যোধন ও মামা শকুনী এ তিনজনই আকাম তো করতে চান কিন্তু আকামটা একা করে উঠতে পারেন না। এর পিছনের জটিলতা হলো মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের রাজ্য দখল করে রাখবার উচ্চাকাঙ্খা ও অভিলাষা তো আছে কিন্তু সেটা সম্পূর্ণরূপে স্বীকার করে তা বাস্তবায়ন করার হিম্মত নেই পাছে যদি তার বানানো ইমেজ ধ্বসে পড়ে। এদিক দিয়ে তিনি ভালোমানুষি, মনের বাসনা ও নিজের দূর্ভাগ্যের সাথে জড়িয়ে পড়ে সাইকোলজিক্যাল কমপ্লেক্সিটিতে ভুগছেন।

অন্যদিকে মামা শকুনী ছলাকলা, কপটতাতে মাস্টারক্লাস হলেও তার তা খাটানোর জন্য সম্পূর্ণ শক্তি নেই।

তাহলে বাকী থাকলো কে?

দূর্যোধন। এ বলদটার কাছে শক্তি আছে মাগার ঘটে বুদ্ধিও নাই, কপটতার জ্ঞানও নাই, নিজের কোন ব্যক্তিত্বও নাই; আছে খালি গায়ের জোড়, গোড়ামি আর একগুঁয়েমি।

এজন্য একে হাত করাও সহজ। যেটা মামা শকুনী বেশ ভালোভাবেই জানে ও সে অনুযায়ী তাকে পরিচালনা করে এবং ধৃতরাষ্ট্রের তার ছেলের প্রতি মোহ, (বরং একে বলা যায় তার নিজের আকাঙ্খার প্রতি) তাকে শকুনীর কথার দিকে বেশী আকৃষ্ট করে ফেলে। কেননা ছেলের উচ্চাকাঙ্খার মোহের পিঠে চড়ে তিনি নিজের মোহকে সফল দেখতে চান। তাই ধৃতরাষ্ট্র হল আমাদের সেসব পিতাদের মত যে তার নিজের আকাঙ্খা সন্তানের মাধ্যমে পূরণ করতে সন্তানদের স্বীয় ব্যক্তিত্ব গঠনে বাঁধার কারন হয়ে দাঁড়ায়।

তাই ধৃতরাষ্ট্র ও দূর্যোধনের এ ব্লাইন্ড স্পটে নেপো শকুনী মামা দই মারার সুযোগ পেয়ে যান। এভাবে আকাম করার সামগ্রিক উপাদান শক্তি, আকাঙ্খা, কুটিলতার সম্মিলন হয় এবং মিষ্টি কথার আড়ালে পান্ডবদের বিরুদ্ধে চলে ষড়যন্ত্র।

এবার আসা যাক পান্ডবদের দিকে এরা ধর্মীয়সম্পন্ন ব্যক্তিবর্গ। উত্তম একটা ভাব আছে কিন্তু এরাও তাদের উত্তম ভাবের নিচে বিভিন্ন প্যাঁচে জর্জরিত। তারা জানে দূর্যোধন, মামা শকুনীর চাল সম্পর্কে কিন্তু তাদেরও নিজস্ব নিজস্ব সমস্যা আছে, সূক্ষ্ম ক্ষোভ আছে।

দূর্যোধন দ্রৌপদীর অপমানের বদলা নেবার জন্য হস্তিনাপুরে পান্ডবপুত্রদের পাশা খেলার জন্য আমন্ত্রণ জানানোর পর কলঙ্কময় একটি অধ্যায়ের রচনা তৈরী হয়৷ এখানেই দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের মধ্য দিয়ে ভরতবংশী রাজইতিহাসের গায়ে কালিমা লেপন করে দেওয়া হয়। তবে দ্রৌপদী কৃষ্ণের দেওয়া বরের কৃপায় সে যাত্রায় চূড়ান্ত অনর্থ থেকে বেঁচে যায়।

এ ঘটনার মাঝে দ্রৌপদীর প্রশ্নের সামনে সবাই তাদের নীতি ও কর্মের বন্ধনে আটকা থেকে চুপ থেকে যায়। এবং যা কখনো ঘটেনি সেটাই ঘটে যায়।

মহাভারতের হস্তিনাপুরে যে নৈতিক আদর্শ ছিল তার ক্রান্তিলগ্নে এ ঘটনাগুলো ঘটতে থাকে৷ একদিক দিয়ে দেখলে দেখা যায় নীতি, নৈতিকতা হল ভঙ্গুর একটি জিনিস। এটি কোন নির্ধারিত করা কতিপয় নিয়ম-কানুনের সমষ্টি নয়, বরং এ নৈতিক নিয়মের অভ্যন্তরীণ যে প্রাণশক্তি, যে ভিত্তি ছিল এর ওপর ভর করেই এই ভরতবংশী রাজ্যের নৈতিক আদর্শ গড়ে উঠেছিল। কিন্তু ক্রমে ক্রমে যত দিন, কাল এগোতে থাকে এটার উপরের খোল অক্ষত থাকলেও এর ভেতরের যে প্রাণ ছিল, একটা সচেতন আভা ছিল তা ধীরে ধীরে মলিন হতে থাকলে এর আদর্শে মরচে ধরতে আরম্ভ করে। যার লক্ষণের প্রকট একটি রূপ আমরা দেখতে পাই দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের ঘটনায়৷

একটি লক্ষণীয় বিষয় এই যে, রীতি মেনে চলা সদ্ভাব সবগুলো চরিত্রের মধ্যে থাকলেও যত এই কাহিনী সামনে এগিয়েছে ততই এর নৈতিকতার ভেতরের প্রানশক্তি খর্ব হয়েছে। যার জন্য একটা সময়ে গিয়ে এ নীতির নতুন পুনর্জীবনের প্রয়োজন পড়ে তার ফল কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ। এজন্য নীতির ভেতরকার যে অভ্যন্তরীণ যে শৃঙ্খলা ছিল তা নাশের ফলই কুরুক্ষেত্র।
তাই নীতি নৈতিকতার রীতিগুলো সেকেন্ডারি, এর ভেতরে সদা সন্ঞ্চরণশীল প্রবাহটাই আসল ও এটার ভারসাম্যের জন্য সতত সচেতনতাই প্রাথমিক ও গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের মধ্য দিয়ে নতুন যুগের সূচনার প্রয়োজন হয়।

0Shares

নাজিউর রহমান নাঈম

আমিকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। কিন্তু সে যে কোথায় লুকাইলো ও এই লোকটি যে তা বড় আশ্চর্যের বিষয়! আমি হারিয়ে যা হল একে কীই-বা বলা যায় বলুন। এখন যাকে দেখছেন সে তো অন্য কাজ করে বেড়াচ্ছে, তার পরিচয়ও নিশ্চয়ই বদলে গেছে। তাহলে আপনি কাকে দেখছেন? দেখছেন আপনাকে আপনার চিন্তাকে যা আপনাকে আমাকে দেখাচ্ছে বা কল্পনা করাচ্ছে। তাহলে শুধু শুধু পরিচয় জেনে কী হবে বলুন। তার চেয়ে বরং কিছু সাইকোলাপ-ই পড়ুন ও নিজেকে হারিকেন নিয়ে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ুন। পথিমধ্যে হয়ত কোথাও দেখা হয়েও যেতে পারে!!! সে পর্যন্ত- কিছু কথা পড়ে থাকুক জলে ভেজা বিকালে খুঁজে চলুক এই আমি পিলপিল করে অনন্ত "আমি" র অদৃশ্য পর্দার আড়ালে

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *