ডার্ক – একটি ফিলোসফিক্যাল রিভিউ

এ রিভিউটির শুরুই হলো শেষ, আর শেষটা হলো শুরু। তাহলে শেষ থেকে রিভিউটি শুরু করা যাক। 😁

ডার্ক এর মূল কেন্দ্রীয় চরিত্রই হলো জোনাথন ও মার্থা। অন্যান্য সবকিছুর মতই এখানে সবকিছুরই একটা উৎপত্তি, কীভাবে, কেমন করে কী হলো এবং সেইসাথে সময়ের লুপিং ইফেক্ট ও অন্যান্য মিক্স মশলা মিশিয়ে বানানো এই ডার্ক চকোলেট থুক্কু ডার্ক এর নাম শুনলেই আমার চকোলেটের কথা মনে পড়ে যায়।

যাই হোক, আমি যখন দেখা শুরু করলাম তখন প্রথম আট এপিসোড পর্যন্ত আমি আসলে বেকুবের মত হা করে চেয়ে ছিলাম ও চিন্তা করতেছিলাম এই ঘোড়ার ডিমগুলো আসলে করতেছেটা কী! আর একটু পরপর চমকাইয়া উঠতেছে কেন? যেহেতু এইসব সময় ও সময়ের ওপারে হেনতেন বিষয় নিয়া একটু জানাশোনা ছিলো তাই এই আট এপিসোড পর্যন্ত চরিত্রগুলোর সাথে নিজের অনুভূতি মিলাতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। পরে অবশ্য হঠাৎ করে চরিত্রগুলোর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা শুরু করলাম তখন আসল মজাটা পাওয়া শুরু করলাম। তখন বুঝতে পারলাম যে, যদি সত্যি সত্যিই বাস্তবে কেউ গুহার ভেতর থেকে বের হয়ে এসে আমার সামনে বলে আমি অতীত থেকে এসেছে তখন আমি চমকে উঠতাম না? অবশ্যই উঠতাম।

কিন্তু এই জায়গায় এই চমকে উঠবার ব্যাপারটা না ঘটার পেছনে কারণ হলো আমি রীতিমত একটা অবজেক্টিভ লেন্স নিয়ে সিরিজটা দেখছি, তাই কিছুক্ষণ পরপর একজন আরেকজনকে দেখে ভূত দেখার মত চমকে উঠাটা কেমন জানি শুরু শুরুতে অদ্ভুত লেগেছিল। অবশ্য পরে গিয়ে বিভিন্ন চরিত্রে নিজেকে কল্পনা করার পর বেশ লেগেছে সিরিজটা।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সময় ও এর সাথে অতীত ও ভবিষ্যতের রিলেশন তথা – “Everything Is Connected”. আমি যাই করিনা কেন এই বৃহৎ সময়ের জালে যা ঘটছে তা ঘটবেই এরকম একটা ব্যাপারস্যাপার। এ সিরিজ দেখে আমার একটা বিষয় উপলব্ধি হয়েছে যা অনেক আগে একবারও স্বল্প মাত্রায় হয়েছিল সেটা হলো অতীত ও ভবিষ্যত পানির মত পরিষ্কারভাবে না জানাই ভালো কেননা এটা যদি আপনি জানেন আর আপনি যদি তা সামলাতে না পারেন যেমনটা ডার্কের সবগুলো চরিত্রের সাথে ঘটেছে তাহলে আপনার সুখের বারোটা ওই জায়গাতেই ঘটে যাবে৷

এই সিরিজটির চরিত্রগুলো যতক্ষণ পর্যন্ত জানতো না এ ব্যাপারটা তখন যে সমস্যার মাঝে ছিল জানার পর তাদের মানসিক অবস্থা আরও বিগড়ো যায় এবং এটাও এত হা হুতাশের পেছনে অন্যতম লক্ষণ। এখানে তারা আমাদের একটা ব্যাপার দেখিয়ে দিচ্ছে অতীত ও ভবিষ্যৎ জানতে পারলে আসলে ম্যাজিকাল কিছুই হয়না, বরং একলাইন বেশী বোঝার ফলে শান্তি নষ্ট হয়। সিরিজটির চরিত্রগুলো যখন এসব ব্যাপারে জানতে পারলো তখন তারা তাদের ব্যক্তিগত বাসনা অনুযায়ী মরিয়া হয়ে উঠল যদি সেগুলোর একটা সুরাহা করা যায়। আর এতেই লেগে গেলো প্যাঁচ।

যদি বাসনাটা একজনের হতো তাহলেও ঠিক করে নেওয়া যেত কিন্তু বাসনাটা সবার ও একেকজনের একেক প্রকার। কেউ তার ক্লডিয়া তার মেয়ে রেজিনাকে বাঁচাতে চায়, এডাম চায় তার পৃথিবীকে বাঁচাতে, ইভা চায় তার পৃথিবীকে বাঁচাতে, নোয়াহ চায় তার মেয়েকে খুঁজে বের করতে ইত্যাদি ইত্যাদি। এভাবে সবার বাসনা ও চাওয়া-পাওয়া একত্রিত হয়ে গিয়ে একটা জাল বানিয়ে ফেলে যেখানে সবারই কর্ম অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। আর এ কারণেই এ থেকে উৎপত্তি হয় নানা রকমের ফলাফল। কিন্তু দেখা যায় কারও বাসনাতেই কিছু হয়না, যা হওয়ার তা ঘটেই।

এভাবে আমরা যদি আমাদের বাসনার দিকে তাকাই তাহলে দেখবো যে, বাসনা আমি করতে পারলেও তা কেবল আমার নয়, সবাই তা করে এবং সে অনুযায়ী একটা কর্মজাল সৃষ্ট হয় ও তা থেকে ফল উৎপন্ন হয় এবং সেটা হতে পারে যেকোন কিছু। তবে মাঝে মাঝে কিছু কিছু আমাদের প্রত্যেকের সাথে মিলে গেলে তখন আমাদের কাছে মনে হয় আমাদের মত করে পূরণ হলো৷ কিন্তু এ পূরণ হওয়াটাও এই সিস্টেমের একটা অংশ অর্থাৎ ঘটবে বলেই ঘটেছে। আমরা কেবল এটাকে ধরে নিতে পারি।

ডার্ক সিরিজের চরিত্রগুলো একে একে সময়ের এই খেলগুলো জানতে থাকে ও আমরাও এটা ধীরে ধীরে দেখি ও কাহিনীতে প্রবেশ করি। কিন্তু বাস্তবে আমরা আসলে অতীত সম্পর্কে জানিনা, বরং বলা চলে প্রাকৃতিক সিস্টেমে আমরা এটাকে ভুলে যাই। আর এটা এক হিসেবে যে কতটা ভালো একটা ব্যাবস্থা তা ডার্ক না দেখলে আর বোঝা হতো না। আমার পূর্বজন্ম ছিলো কীনা তা জানি না বলেই কিংবা থাকলেও বিস্মৃত হয়ে আছে বলেই এখনকার জীবনের ভারগুলো কোনমতে সামলানো পারি। নাহলে এই জন্মের জমানো স্মৃতি নিয়ে হিমশিম খেতে হয় তার উপর আরেক জন্মের কিচ্ছাকাহিনী!

এছাড়াও ভাবুন তো গত জন্মের অতীতে যে আপনার প্রেমিকা ছিলো তা যদি পরবর্তী জন্মে আপনার কন্যা হয়ে যায়, আর এটা যদি আপনি একটা টাইম মেশিন দিয়ে ভ্রমণ করে বা যেকোনভাবে বুঝতে পারেন তাহলে আপনার মানসিক অবস্থাটা কী হবে!

এজন্য আমাদের মন নামক যন্ত্রে একটা অতীব সুন্দর একটি প্রোগ্রাম হলো ভুলে যাওয়া। আমরা ভুলে যেতে পারি বলেই জগতটা এত সুন্দর লাগে। সবকিছু মনে থাকলে জীবন হয়ে যেত একটা বস্তা।

এ সিরিজে আরেকটি চমৎকার যেদিকটি দেখানো হয়েছে তা হলো অতীত, ভবিষ্যৎ, জোনাসের জগৎ, ইভার জগৎ এসবের ভেতরের ঘটনাগুলো যুগপৎভাবে ঘটে চলেছে। এ থেকে কিছু চিন্তাভাবনার উদ্রেক হলো সেগুলো সম্পর্কে কিছু বলা যাক –

জন্ম, মৃত্যু যেন একইসাথে ঘটে চলেছে। গতি, স্থিরতা আলাদা কোন ঘটনা নয় বরং এ যেন একইসাথে মিশ্রিত হয়ে আছে। যাকে দেখে মনে হয় গতিশীল তার পেছনে স্থিরতা যেন ঘাঁপটি মেরে থাকে। প্রশ্ন হলোঃ

যদি এটা এরকম হয়ে থাকে কোনভাবে তাহলে এভাবে থাকার প্রয়োজনটাই বা কেনো? এক রহস্যপূর্ণ দ্বন্দ্বের মাঝে প্যাঁচিয়ে থাকার প্রয়োজনীয়তাটাই বা কোথায়?

এ নিয়ে যদি আমরা অনুসন্ধানে নামি ও আমাদের দিকে একটু তাকাই তাহলে দেখতে পাবো যে, আমরা আসলে একইভাবে চিরকাল থাকতে পারিনা অর্থাৎ একটা গতিময়তা লাগবে। যেমনঃ মিঃ করিমের মনে হলো সে আজীবন সন্ন্যাসীর মতো এক জায়গায় স্থির হয়ে চিরকাল বসে থাকবে। এজন্য সে পাহাড়ে গেলো এবং বসে থাকলেও কিন্তু সে চাইলেও কী একনাগাড়ে বসে থাকতে পারবে আর যদি পারেও সে কী থাকবে এ দুনিয়াতে? তার ভেতরে থাকা কল্পনা থেকে কী কোন ইচ্ছা বা তরঙ্গ জাগ্রত হবে না?

যেমনটা অণু-পরমাণুদের বেলায় হয়, যেহেতু সব একে অপরের সাথে সম্পর্কযুক্ত। এখন কথা হলো মিঃ করিম যদি একেবারেই স্থির হয়ে যায় একেবারে মনের তল থেকে। তাহলে তিনি কিছুই করতে পারবেন না যা তিনি আগে করতেন। কিন্তু দেখা যাবে যে, এই মহাবিশ্বের যুগপৎ প্রকৃতির জন্য তার ভেতরে একটা গভীর ইচ্ছাও জন্ম হয় প্রকাশের। এখন তা করতে হলে তো আর স্থির থাকা যাচ্ছেনা। তাহলে প্রশ্ন হলো, কীভাবে এই দুটোকেই একসাথে ভোগ করা যায়?

এরজন্য সবকিছুকে সংযুক্ত করে এ জগৎও তৈরী হলো যাতে যেখান থেকে উৎসরিত হয় সব সেটা সবকিছুকে একই মুহূর্তে ভোগ করতে পারে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এর কাছে সবকিছুই মনে হবে মায়া বলে, একটা স্বপ্ন, তবে খুব প্রয়োজনীয় স্বপ্ন। কেননা এটি না সৃষ্টি করে রাখতে পারলে আবার এটি নিজতার মাঝে থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে পড়বে। তাই যাতে সবকিছুকেই এক করে পাওয়া যায় এর কিছু অংশ নিরাকার এ থাকে ও কিছু অংশ প্রকাশে থাকে, একই মুহূর্তে। আর এটি করার জন্য কোনকিছুই চরমভাবে একদিকে হেলে পড়ে যেতে পারেনা, প্রয়োজন হয় ব্যালেন্সের।

আর এই যে, ব্যালেন্স এটা যিনি বোঝেন সে তখন এ অতীত, ভবিষ্যৎ নিয়ে মাথা ঘামায় না, একটা স্বীকারোক্তিমূলক ভাব তার মাঝে স্বতঃপ্রবাহিত থাকে যা আমরা ডার্ক সিজনের শেষে গিয়ে দেখতে পাই। ক্লডিয়া যখন প্রথমবারের মত উপলব্ধি করতে সক্ষম হয় যে, আমি যাই করিনা কেন, এটা ঘটবেই; তাহলে এ থেকে বের হবার উপায় কী? তখন সে তৃতীয় রাস্তাটি খুঁজে পায়। আর এই তৃতীয় রাস্তা সিরিজে মূল অরিজিনে নিয়ে গেলেও আমার কাছে মনে হয়েছে এটা হলো সেই নীটশের “আমর ফাতি” যখন আমি এই সব চক্রজাল পর্যবেক্ষণ করে উপলব্ধি করি আমার মেনে নেওয়া ছাড়া কোন রাস্তা ঠিক তখনই আমি তৃতীয় রাস্তা তথা ব্যালেন্স খুঁজে পাই, আর ঠিক তখনই আমি ভালোবাসার মাঝে পড়ে যাই যেটা কীনা আমি নিজেই, আমার পরম আমি, বর্তমান মুহূর্ত।

এখন কথা হলো এভাবে বোঝাটা খুব কম মানুষের ক্ষেত্রে ঘটে। কেবল বোঝা নয়, হয়ে ওঠাটাও এর সাথে জড়িত রয়েছে৷ আর যারা এটি হয়ে উঠেন তাদের আমরা সম্মান করে বলি আলোকপ্রাপ্ত মানুষ। তারা তখন মহাবৈশ্বিক ব্যালেন্স অংশ হয়ে রয়ে যান। কিন্তু বাকীদের কী হবে, তারাও থাকেন জাগতিক ব্যালেন্সের অংশ হয়ে। এভাবে সবকিছু আকার, নিরাকার, রূপ, অরূপে যুগপৎভাবে একসাথে থাকে ও গতি, স্থিরতা, ভোগ-উপভোগের লীলাখেলা চলে। কেননা যতগুলো উপায়ে সম্ভব প্রতিটি সম্ভাবনা নিয়ে এটি চলে আর তা করতে হলে এভাবে পরিকল্পনা, নকশা করাটা অতীব জরুরী নাহলে এককের এরকম প্রকাশ ও ভোগ সম্ভব নয়। এখন এটা যদি রহস্যও হয় তাহলে এটাও একটা প্রকাশ ও এটি একক ভোগ করে।

এর পাশাপাশি আরেকটি বিষয় এসে যায় তা হলো, একেবারে শুরুতে কী ছিলো? যদি এটি এককই হয়ে থাকে ও যেভাবে সবাই বলেন আনন্দস্বরূপ ছিলো এটি, তাহলে এটি ঐভাবেই থেকে গেলো না কেন? এ প্রশ্নটি করা আসলে বোকামি। কারণ আমাকে যদি বলা হয় আপনি তো চুপচাপ বসে থেকে শান্ত হয়েই আনন্দে ছিলেন তাহলে আবার শুধু শুধু কষ্ট করে এসব বানাতে গেলেন কেনো; তখন আমি বলব, “এটা আবার কেমন প্রশ্ন?” বিষয়টা এরকই সবকিছুর পূর্বে এটা যেমন প্রকারেই থাকুক না কেন এক্সপেরিমেন্ট করে দেখার সাধ জাগতেই পারে। তবে এটা করতে হলে যে কিছু ত্যাগেরও প্রয়োজন। তাই বহু বানাতে হলো। এবং ঘাত, প্রতিঘাতের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে বিভিন্ন ধারণা আসল এটা সুখ, এটা দুঃখ কিন্তু আদপে এটি হলো সেই তৃতীয় রাস্তা, ব্যালেন্স।

এভাবে জাগতিক সিস্টেমে প্রতিমুহূর্তে ভোগ করতে গিয়ে এর কাঁটার ডায়েল এদিক ওদিক নড়ে যায়, তাই একটা গতি লাগে ও সেটা প্রতিমুহূর্তে করে ব্যালেন্স। আর মহাবৈশ্বিক দিকেও এর ব্যালেন্স। বলা যায় বড় ব্যালেন্সের মাঝে, ছোট ব্যালেন্স, এরপর আরও ব্যালেন্স এভাবে অসংখ্য ব্যালেন্স করা যায়। আবার এটাকে একসাথে জুড়ে দিলে শুধু ব্যালেন্স, বলা যায় মহাব্যালেন্স; তখন একটু শান্তি শান্তি লাগে। এতটুকু মাথায় আর কত কোটি ব্যালেন্সের হিসেব মাথায় ঢুকবে৷ এক ডার্ক দেখেই রিভিউ লিখতে লিখতে কোথা থেকে কোথায় এসে পড়েছি৷ আর আপনিও যদি এসে পড়ে থাকেন, পাগলে পাগলে মিলিয়া চলে হ্যান্ডশ্যাক করে একটু চা বিরতি নেওয়া যাক।

চা বিরতি

(১০ মিনিট পর)

আমরা সবাই হলাম গিয়ে ঘরছাড়া পথিকের মত। আমাদের যে আকুলতা, একটা টান পরস্পরের প্রতি তা ক্ষুদ্র গন্ডিতে হোক কিংবা বৃহৎ গন্ডিতে হোক এটাকে যে আমরা বুঝতে পারছি নানা কিছু সৃষ্টির মাধ্যমে এখানেই হলো এর সৌন্দর্য। এডাম চেয়েছিলো যে, এই বারবার একই ঘটনা হবার প্রক্রিয়াটা না হোক, সবকিছু ভেঙ্গেচুরে চুরমার হয়ে যাক। ধরে নিলাম যে, তার মত হলো এ সবকিছু কিন্তু এরপর কী হবে আসলে? এ পৃথিবীতে যাই হোক না কেন আমরা কেবল একটু ভিন্নভাবে করার চেষ্টা করি মাত্র, কিন্তু এর মূলস্রোত তো সদা একই থাকে। তবুও এই যে, আমাদের বিভিন্ন চাওয়া, পাওয়াগুলো এগুলো আমাদের ধীরে ধীরে প্রাজ্ঞ হতে শেখায়। আর এটাও হয়তো হতো উপযুক্ত সময় না হলে হয়না। নাহলে কেনইবা জোনাসের এডাম এ এসেই বুঝতে হবে বা এডামকে কেনো তৃতীয় রাস্তার খোঁজে বেরিয়ে পড়তে হবে।

আচ্ছা হঠাৎ করে এইসব কী হচ্ছে! চা খাওয়ার পর দেখি লেখা থিওরী না হয়ে অন্যকিছু হয়ে যাচ্ছে। 😅

যাইহোক, ডার্ক সিজনে সকল চরিত্রই তাদের সাথেকার সম্পর্কগুলোর বন্ধনের কারণে ও এটা যাতে হারিয়ে না যায় এর জন্য যন্ত্রণার শিকার হচ্ছিল বারবার এবং হতেই থাকতো যদি অরিজিনে শেষমেষ না গিয়ে থাকতো। যদিও অরিজিনটা হলো একটা রূপক।

অর্থাৎ সময়ের পারে চলে যাওয়া, বর্তমানে ফিরে আসা। এজন্য শেষের দুটি এপিসোড বিশেষ করে শেষের এপিসোডটা অসাধারণ লেগেছে। আসলে একটা সময় এ বিশ্বের ভেতর থেকে আমরা যতকিছুই করিনা কেন, সেটা আমরা পাপ-পূণ্য, ন্যায়-অন্যায়ের কষ্টিপাথরে মাপিনা কেন সবকিছুই যেন ভালোবাসাতে এসে মিশে যায়। আর এই মিশে আসাটাও কত অনন্য, ভাবলেই মাথা নত হয়ে যায়। সকলে মিশবে কিন্তু একা হয়ে, ভালোবাসার প্রবেশ অত্যন্ত ছোট, এত ছোট যে, বিন্দুমাত্র অন্য কাউকে নিয়ে প্রবেশের অগ্রাধিকার নেই। তবে এ দরজা দিয়ে সবকিছুকে পার হয়ে যখন একা কেউ প্রবেশ করে তখন সেখানে যেন সবাই থাকে। এর দরজা ছোট হলেও ভেতরের পরিধি বিশাল, অনন্ত; যেখানে মিশে জোনাস, মার্থা, সবার অতীত, ভবিষ্যৎ, বর্তমান, আর পরে থাকে সেটাই যা থাকার কথা। শেষের এপিসোডটা দেখে এটাই মনে হয়েছে আমার।

এডাম চেয়েছিলো ধ্বংস করে তার এই এটাচমেন্টের জ্বালা ভুলতে, আর ইভা চেয়েছিলো অন্তত কিছু ক্ষণিক মুহূর্তকে আবার ফিরে পেয়ে তা দিয়ে নিজের যন্ত্রণা মিটাতে। এ সিরিজে সম্পর্কগুলো নিয়ে যে হাহুতাশ দেখানো হয়েছে তা দেখে একপ্রকার দূর্বোধ্য দূর্বোধ্য ঠেকবে যে হুদাই এ ওকে পাওয়ার জন্য দৌড়াদৌড়ি করছে। আসলে বাস্তবে আমাদের ব্যাপারটাও এরকমই। কিন্তু এটা উপর থেকে দেখলে এমনটাই লাগে যেমনটা সিরিজে আপনি ঘটনাকে একধরনের ভিউ এঙ্গেল থেকে দেখেছেন। তবে আমরা হয়তো অনেকেই বলব জীবনটা তো আর টিভি সিরিজ বা সিনেমা নয়। আসলে জীবনটা তো একপ্রকার সিনেমাই কিংবা টিভিসিরিজ। নাহলে এগুলো আসলো কোথা থেকে!

কিন্তু আমরা এগুলো দেখার সময় ব্যাপারগুলো বুঝলেও, নিজের জীবনে এটাচমেন্টের সাথে এতটাই যুক্ত হয়ে যাই তখন আর এটা সিনেমা লাগেনা, হয়ে ওঠে সিরিয়াস জীবনযুদ্ধ। এখন আমি যদি ঘুম থেকে উঠে দেখি যে আমি যে দুনিয়ায় ছিলাম ওটা ভুয়া, ডার্কের সিরিজটাই আমার জীবনে আসলে ঘটে চলছে তখন আমার পুরো চিন্তার জগত টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙ্গে যাবে। এখান থেকেই আপনি একটা ঝটকা খাবেন। ঝটকা খেলেই তো বোঝা যাবে কত মৃত্যুতে কত জীবন!

এখানে আরেকটি বিষয় হলো যে, ভাগ্য। যা ঘটার তা ঘটবেই। আসলে এই ভাগ্য কোন নির্ধারিত কোন বিষয় নয়। প্রতিটি পদক্ষেপে ভাগ্য রচিত হয়, যখন কিছু ছিলো না, ছিলো তখন ভাগ্যের বীজ। যখন হতে আরম্ভ করলো তখন গতিপ্রাপ্ত হয়ে প্রতিমুহূর্তে ভাগ্যের ছক বদল হচ্ছে। এ অনুযায়ী ভাগ্য জ্ঞাত হচ্ছে সবসময়, প্রতিমুহূর্তে। আর এই ছক পরিবর্তন মানে ভাগ্য পরিবর্তনও হচ্ছে গতির মধ্য দিয়ে সবসময়, প্রতিমুহূর্তে৷ এবং দুটি মিলে গিয়ে এটি সবসময়, প্রতিমুহূর্তে জানছে, বুঝছে, নিজেকে। এভাবে আমরাই ভাগ্য, গড়ছি, ভাঙ্গছি প্রতিমুহূর্তে নিজেকে, সবসময়, সর্বক্ষণ।

এ সিরিজটির শেষেও ছিলো সেই তিনের ব্যাপার। আসলে এ সংখ্যাটাও একটা রহস্য। সবকিছুর মাঝে তিনের ছড়াছড়ি। এক, দুইয়ে কাজ না হলে, তিনে সবকিছু অদ্ভুতভাবে মিলে যায়। আবার একসাথে মিশে গিয়ে কোথা থেকে যেন কোথায় চলে যায়।

অবশেষে সিরিজটির শুভ পরিণতি দেখে ভালো লেগেছে। কয়েকটা চরিত্রের কান্ডকারখানা আবাহুল্য লেগেছে বিশেষ করে ম্যাগনাস, ফ্রান্সিসকা। যদিও ভবিষ্যতে একটা ভূমিকা থাকলেও এ দুটি চরিত্রকে সিরিজে যে কেনো রেখেছে সেটাই বিদঘুটে লেগেছে আমার কাছে।

সর্বোপরি, ব্যাপারটা ডার্ক হলেও এটা আসলে লাইট, আল্ট্রালাইট। তবে এরজন্য বিরাট মূল্যও চুকাতে হবে। সেটা হলেই দেখা যাবে –

“Dark is not so bad, but it’s so good that you will forget everything. Then who cares what’ll happen next or was previous! It’s all forever, now & here, every time without blinking it’s eye, forever seeing, you, I and us.

 

0Shares

নাজিউর রহমান নাঈম

আমিকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। কিন্তু সে যে কোথায় লুকাইলো ও এই লোকটি যে তা বড় আশ্চর্যের বিষয়! আমি হারিয়ে যা হল একে কীই-বা বলা যায় বলুন। এখন যাকে দেখছেন সে তো অন্য কাজ করে বেড়াচ্ছে, তার পরিচয়ও নিশ্চয়ই বদলে গেছে। তাহলে আপনি কাকে দেখছেন? দেখছেন আপনাকে আপনার চিন্তাকে যা আপনাকে আমাকে দেখাচ্ছে বা কল্পনা করাচ্ছে। তাহলে শুধু শুধু পরিচয় জেনে কী হবে বলুন। তার চেয়ে বরং কিছু সাইকোলাপ-ই পড়ুন ও নিজেকে হারিকেন নিয়ে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ুন। পথিমধ্যে হয়ত কোথাও দেখা হয়েও যেতে পারে!!! সে পর্যন্ত- কিছু কথা পড়ে থাকুক জলে ভেজা বিকালে খুঁজে চলুক এই আমি পিলপিল করে অনন্ত "আমি" র অদৃশ্য পর্দার আড়ালে

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *