জীবন তুমি যেমন (পর্ব – ০২)

জীবন তুমি যেমন (পর্ব – ০২)

০৬

জীবন হচ্ছে এক শুদ্ধতম কান্না। প্রতিরাতে তুৃমি তোমার বিরহ নিয়ে ঘুমোতে যাও কিন্তু কেউ কেউ সকালে বেলা তা চোখ দিয়ে বের করে দেয়, কেউ ধরে রাখে, কেউ ভুলে যায়। তবে সবাই কান্না বয়ে বেড়ায়। এ কান্না কোন আপনজনের জন্য নয়, এ কোন পড়শীর জন্য উথলে পড়া আবেগ নয় কিংবা সহানুভূতি, অথবা মানবতা; এ হল নিজের অসহায়ত্বের কান্না, নিজের একাকীত্বের কান্না। তুমি যে আছো তা বুঝতে না পারার কান্না।

আমরা ছুটে যাই অন্যের দ্বারে কিন্তু কখনো অন্যের দ্বারে পৌঁছতে পারি না, ঘুরেফিরে নিজের দ্বারেই ফিরে আসি। এইতো আমার বিরহ, আমি কেন আমার কাছে ফিরে আসি? আমি কেন দূরে যেতে পারিনা। আমি কী কখনো পথ চলিনি, আমি কী কখনো তোমাকে ভালোবাসিনি!! তাহলে কী আমি তোমাকে ভালোবেসে শুধুই ভালোবেসে গেছি এই আমাকে!!! হায় কপাল আমার!! এজন্য সকালে প্রতিরাতে চোখে জমানো জল ছেড়ে দিয়ে বলি আমি চলে যাও, তুমি থেকে যাও।

০৭

জীবনের কোন জিনিসই পুরনো হয় না। পুরনো হয়ে যাও কেবল তুমি। তুমি একটা অর্ধগলা পঁচে যাওয়া নদী যে পুরনোকে আঁকড়ে ধরো, একই কথা বারবার বলো এবং ভাবো তুমি একটা সুনির্ধারিত নিয়মে ও ধারায় তোমার কথা, তোমার আওয়াজ এগুলোকে তুমি আওড়ে যাচ্ছো।

এভাবেই তুমি নিত্যনৈমিত্তিকভাবে পাঠ করে যাও তোমার বস্তাপঁচা ধর্মগ্রন্থগুলোকে, কিন্তু পাঠ করো না তোমার ভেতরে নাযিল হওয়া গ্রন্থ আল কোরআন, বাইবেল, তালমুদ, উপনিষদ, বেদ। তোমার ভেতরে থাকা সজীব, নতুনত্বকে সেই কবেই তুমি বিসর্জন দিয়ে বসে আছো ও পুরনো বুলি আওড়ে চলেছো এবং ভাবছো এই বুঝি তোমার নিয়তি, তোমার জীবন। আসলে তুমি জীবনকে বোঝোনি, তুমি জীবনকে দেখোনি।

তোমার ভেতরে প্রবাহিত হয়ে আসা কথাগুলোকে কী কখনো লেখায় রূপান্তরিত হতে দেখেছো? সেগুলোর মাঝে কোন মিল কী খুঁজে পেয়েছো। অন্তরে প্রবাহিত হয়ে আসা কথা ও তা লেখায় ভেসে ওঠা এ দুটির মাঝে কোনটি তোমার লেখা, আর কোনটিই বা তুমি? তা কী কখনো ভেবেছো? ভাবোনি তুমি, আর ভাববেই বা কেনো ভাবনাতেই তুমি গড়বড় করে ফেলো; বরং একটু চুপ থাকো, অন্তরে প্রবাহিত হওয়া আওয়াজের কুলুকুলু শব্দ শুনো, শব্দ না পেলে নীরবতাকেই শোনো; দেখবে তুমি নতুন হয়ে উঠবে, তোমার অর্ধগলা পঁচে যাওয়া নদী সজীব হয়ে সমুদ্রপানে যাত্রা করবে।

০৮

তোমার ভেতরের কথাগুলো ও বাইরের কথাগুলো এমন হয় কেনো? তোমার ভেতরের কথামালা স্বততঃ প্রবাহিত হয়ে চলেছে কিন্তু তুমি তা দেখছো না, কথা আসছে, চলে যাচ্ছে, কতটুকুই বা তুমি ধরতে পারছো কিংবা লিখতে পারছো?

তোমার কথাধরার হাত সেই গভীর কথার সমুদ্রকে সেচতে পারে না, এতটাই ক্ষুদ্র তোমার হাত। এরপরও কত বাসনা তুমি লিখে যেতে চাও বইয়ে, নোটবুকে, ডিজিটাল ডায়েরিতে। অনেকেই এই ব্যর্থতা উপলব্ধি করে কেবল বলে গেছেন, লিখে যাননি। কতটুকুই বা লেখা যায়! বলাটা বরং প্রাণবন্ত। তাই জীবন তোমার ওপর দিয়ে কিছু লেখে না, জীবন এতটা পুরনো নয়, জীবন সদা নতুন, প্রবাহিত। জীবন কথা বলে তা শোনো, তোমার কানকে পরিষ্কার করো, হৃদয়কে খোলো, সেই অমীয়ধারা তোমার মস্তক বেয়ে হৃদয়ে পড়তে দাও, শুনতে থাকো সেই অজানা নীরবতা। কুচক্রীদের মত কথাগুলো পুঁথি বানিয়ে পুরনো বানিয়ে বছরের পর বছর সেই নর্দমাযুক্ত কথাগুলোকে পুজো কোরো না।

তারচেয়ে বরং শোনো, পান করো এবং ভুলে যাও, মাঝে মাঝে বলো ও ভুলে যাও এবং সবশেষে পারলে লেখো এবং লেখার মালিকানা মন থেকে মুছে ফেলো। এভাবেই জীবনকে তোমার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতে দাও। এভাবেই একদিন জীবন তোমাকে তার পরমকথা শোনাবে যার জন্য তুমি এ ধরায় এসেছিলে। সে পর্যন্ত জীবনকে শোনো,এর নীরবতাকে শোনো।

০৯

জীবন যেন এক সঙ্গীত, সর্বত্র প্রবাহমান, নদীর ধারার মত। এ পৃথিবীতে এসে অনেকে এসে জীবনকে দেখে নিজেকে ভুলে গেছে। এর মোহনীয় মায়ার জালে বারবার আবদ্ধ হয়েছে। তোমরা কী জানো মাঝে মাঝে আমার পুনর্জন্মে বিশ্বাস করতে মন চায়, নিজেকে বলতে ইচ্ছে করে কে বলেছে জীবন একবারই! জীবন একবার বলে ধরে নিলেই তো আমার মাঝে তাড়াহুড়ো এসে পড়ে; কত তাড়াতাড়ি পারা যায় একে ভোগ করে নাও। কিন্তু ভাবো তো একবার এই বিশাল জীবনকে কী তাড়াহুড়ো করে ভোগ করা যায়?

একে ভোগের জন্য চাই সময়, ধৈর্য, প্রতীক্ষা, চাই পুনর্জন্মের প্রতি গভীর বিশ্বাস। মাঝে মাঝে এও মনে হয় কে জানে আমি হয়তো ভোগ করে ফেলেছি এ জীবন অনেকবার, কিন্ত জীবনের যে মায়া, এর রূপ সৌন্দর্য এতটাই মোহনীয় একে কাটাতে পারিনি বলেই তো এ পৃথিবীতে ফিরে আসি বারবার। তোমার আমার জীবনের চাকাগুলো চলতে থাকে, একবার ঘুরে তা আবার আগের জায়গায় ফিরে আসে। কিন্তু তুমি আর আমি ইচ্ছে করেই সেসব ভুলে যাই। আচ্ছা ভুলে যাও কেনো? ভুলে যাবো নাই বা কেন! ভুলে না গেলে আসব কীভাবে এ জীবনে, কে ঘোরাবে এ জীবনের চাকা! তাই ভুলে গিয়ে আমি নিজেকে তোমার জীবনের মায়ার টানে ফিরে আসি বারবার, আমার পুনর্জন্ম হয়; তোমার কী হয়না?

১০

একজন খুনীও চায় ভালোবাসা, একজন আস্তিকও চায় ভালোবাসা, একজন নাস্তিকও চায় ভালোবাসা, যে বিজ্ঞানী সেও চায় ভালোবাসা, ভালোবাসা তুমিও চাও, আমিও চাই। কেন চাচ্ছি এ ভালোবাসা?

সবযুগ পেরিয়ে গেছে, পেরিয়ে গেছে কত শতাব্দি, কত সহস্র, কত যুগ, আজ আমরা এখানে ভালোবাসার কাঙাল। সব কাঙালেরা তর্কে মেতেছি একে অপরের কাছ থেকে ভালোবাসা ছিনিয়ে নিবো বলে। ভালোবাসাকে আমি আমার মত করে পেতে চাই, আমি ছিনতাই করতে চাই ভালোবাসা। এজন্য আমি আঘাত করি, খুন করি, গাল দেই, ভদ্র ভাষায় কথা বলি, কূটনীতি করি, বিতর্ক, জ্ঞানের পসরা সাজাই কারণ আমি ভালোবাসার কাঙাল। সব মতবাদ, ধর্মে ঘুন ধরে গেছে…. কিন্তু ভালোবাসা নিয়ে নেই কোন মতবাদ, নেই কোন প্রতিবাদ, নেই কোন থিসিস এন্টিথিসিস। কারণ ভালোবাসা তুমি লুকিয়ে থাকো গভীরে, তোমাকে সহজে যায়না ধরা৷ তোমাকে ধরতে, এক ফোঁটা নির্যাসের আশায় আমাদের এই ষড়যন্ত্র। দেখো এ পৃথিবীর সব পঁচে গেছে কিন্তু ভালোবাসা পঁচেনি। সবকিছুর তত্ত্ব আছে ভালোবাসার তত্ত্ব নেই। তোমার প্রকাশ আছে কিন্তু তাতে কোন গোড়ামির স্পর্শ নাই। কেউ কী বলবে ভালোবাসা চাই না?

হ্যাঁ কাউকে তুমি বলতেই পারো, তোমাকে ভালোবাসি না, কেন বলো? তার কাছ থেকে তোমার ভেতরের অপূর্ণ ভালোবাসা পাওনা বলেই তো বলো। ভালোবাসাকে আবেগ বলো, বলো মিথ্যে ন্যাকাকান্না, হ্যাঁ বুদ্ধির কাছে ভালোবাসা মনে হয় দুর্বল, অচল ভিত্তিহীন। তবে এক কাজ কোরো একদিন…

প্রেমিক বা প্রেমিকা রাগ করলে তাকে বোঝাতে থেকো অনেক যুক্তি দেখাতে থেকো… এভাবে চলতে চলতে চোখের পলকে তার গালে একটা ভালোবাসাপূর্ণ চুমু খেয়ে দেখো, মুহূর্তে সব রাগ মুছে গিয়ে কিছু শব্দহীন ভালোবাসার আকুতি তোমাদের মাঝে ফুটে উঠবে। দুজন দুজনাতে প্রেম কোরো না, ভালোবাসো।

সবাই আমরা আলাদা, ভালোবাসাতে আমরা এক। এ এক এমন অনুভব প্রকাশে এ আরও রহস্যজনক হতে থাকে। ভিক্ষুকের মত দুয়ারে দুয়ারে ভালোবাসা খুঁজি। এ জীবনে এসেছি কেনো?

এ জীবনে যখন প্রথম এসেছিলাম আমি কেঁদেছিলাম, কারণ ভালোবাসা থেকে বন্ঞ্চিত হয়ে গিয়েছিলাম। সেই থেকে ভালোবাসা খুঁজেছি, দেখেছি কতভাবে, কতপ্রকারে ভালোবাসা যায়।

তুমি তো নিষ্ক্রিয় ছিলে, অথর্ব ছিলে, নির্বাক শিশু হয়েছিলে। তুমিও ভালোবাসার আকাঙ্খা এড়াতে পারোনি, পারোনি বলেই তোমারই তরঙ্গে ভালোবাসারূপী জীবন সৃষ্টি হয়েছে। তোমার প্রতি কৃতজ্ঞতা জীবনের এতকিছুর মাঝে ভালোবাসাকে তুমি কত রূপেই না দেখো। কতরূপেই তুমি ভালোবাসতে চাও। ভালোবাসার জোড়াতালি দিয়ে তুমি এ জীবনকে গেঁথে রেখেছো। তুমি এসেছিলে এ ভালোবাসার দরজা দিয়ে, চলে যাবেও ভালোবাসার দরজা দিয়ে। পবিত্রতম এ দরজা চির অমলিন, সবাই তার পেয়ালা ভরে নিতে চায় সেই অমৃত মদে, খালি পথ আলাদা। সেই ভালোবাসা তুমি এ জীবনে স্তরে স্তরে সাজিয়েছে উপর থেকে নীচে। সবাই সবার ভালোবাসা তার মত করে ভোগ করে কিন্তু তেষ্টা মেটে না তাই ঝগড়া করে, খুনোখুনি করে, তর্কাতর্কি করে, করে ভালোবাসার প্রতিযোগিতা, খেলে নানান খেলা।

এতকিছুর পরও যেন মেটে না আশা, কত সসীম ভালোবাসা এরপর দেখি তোমার ভালোবাসা নীরস শুষ্ক, মরুভূমি, সে ভালোবাসায় আমি একা, নিঃসঙ্গ, এভাবে আর কতদিন তাই ভালোবাসাচক্রকে জিইয়ে রেখে আসমান থেকে পাতালে তুমি পরিভ্রমণ করো, শয়তান থেকে ঈশ্বরে পৌছাও, ঈশ্বর থেকে তোমাতে, জীবন বানাও ভালোবাসা দিয়ে, মেরেও ফেলো সেই ভালোবাসা দিয়েই। এটাই তুমি, এটাই জীবন, এটাই জীবন তুমি যেমন।

0Shares

নাজিউর রহমান নাঈম

আমিকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। কিন্তু সে যে কোথায় লুকাইলো ও এই লোকটি যে তা বড় আশ্চর্যের বিষয়! আমি হারিয়ে যা হল একে কীই-বা বলা যায় বলুন। এখন যাকে দেখছেন সে তো অন্য কাজ করে বেড়াচ্ছে, তার পরিচয়ও নিশ্চয়ই বদলে গেছে। তাহলে আপনি কাকে দেখছেন? দেখছেন আপনাকে আপনার চিন্তাকে যা আপনাকে আমাকে দেখাচ্ছে বা কল্পনা করাচ্ছে। তাহলে শুধু শুধু পরিচয় জেনে কী হবে বলুন। তার চেয়ে বরং কিছু সাইকোলাপ-ই পড়ুন ও নিজেকে হারিকেন নিয়ে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ুন। পথিমধ্যে হয়ত কোথাও দেখা হয়েও যেতে পারে!!! সে পর্যন্ত- কিছু কথা পড়ে থাকুক জলে ভেজা বিকালে খুঁজে চলুক এই আমি পিলপিল করে অনন্ত "আমি" র অদৃশ্য পর্দার আড়ালে

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *