জীবন তুমি যেমন (পর্ব -০১)

জীবন তুমি যেমন (পর্ব -০১)

০১

জীবনের মজাটা হল একে নানাভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। যদিও জীবন এক, তবুও এর থেকে বেরিয়ে বিচিত্রভাবে জীবনের বুকে প্রতিমুহূর্তে রংতুলি দিয়ে নানারঙে রাঙানোর মাঝে একধরনের পূর্ণতার স্বাদ পাওয়া যায়। এজন্য অপূর্ণ জীবন পূর্ণতার দিকে বারবার ছুটে চলে যার কোন সীমা নেই। এই আজীবন চলতে থাকা জীবনের স্রোতকে তাই সে বিভিন্নভাবে নিজের ভেতর ধারণ করে বইয়ে নিয়ে গিয়ে নতুন নতুন ব্যাখ্যা সৃষ্টি করে পূর্ণতার স্বাদ আস্বাদন করে বারবার পরিতৃপ্ত হয়। এ যেন এক অপূরণীয় তৃপ্তি যার চোখ পূর্ণতার দিকে কিন্তু হায়! তা কী আর পাওয়া যায় বরং এর কাছাকাছি তাকে ছুঁয়ে দিকে আমি ফিরে আসি জীবনের দিকে ও মৃত্যুকে বলি আসো আমাকে বাড়ি নিয়ে যাবে না!!!

০২

সত্য এক ছিলো, যখন এতে কিছু ছিলো না, কিম্ত ক্রমে ক্রমে যখন এ থেকে বৈচিত্র্য সৃষ্টি হতে লাগলো তখন এর নানা প্রকার দরজা খুলতে লাগলো। তাই যখন আমরা মুখে হয়তো বলি সত্য এক কিংবা অন্তরের গভীর কোণে একটা একত্বকে লালন করি তবে তা তার মূলরূপ থেকে বৈচিত্র্য আকারে প্রকাশিত হতে হতে এখন আমরা যখন তার কাছে একত্ব নিয়ে এবং সবকিছু, সমস্ত পথ, মত, ধারাকে এক সুতায় গেঁথে একত্ব মনে করে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করছি, সেক্ষেত্রে প্রত্যেকের পথ হবে ভিন্ন ভিন্ন; অজানা, অনির্দিষ্ট।

অনুসন্ধানীকে তার নিজের মত করে খুঁজে নিতে হবে। কেননা একত্ব হয়ে আসা এ বৈচিত্র্যময় পৃথিবীতে এসে সে তার একত্ব হারিয়ে বহুধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে। তাই আবার মূলে ফিরে যেতে প্রত্যেকে তাই এক হয়ে সাগরে ঝাঁপ দেবে না, বরং তার মত করে সে ঝাঁপ দেবে এবং বহুত্ব নিয়ে একত্বে সমাহিত হবে।

আর এ কারণেই আমরা সবাই এক হবার ধারণা পোষণ করলেও এবং তা আমাদের গভীরে থাকলেও, যাত্রা হবে প্রতিটি মানুষের জন্য বৈচিত্র্যপূর্ণ ইংরেজীতে বললে ইউনিক। এ বিশ্ব সংসারে আমরা কেবল একে অপরের সহযোগী, বন্ধু হতে পারি। তাকে সংসর্গ দিতে পারি। কিন্তু সত্যের বহু জানালার সাগরে তাকে তার মত করে অনুসন্ধান করে, চিন্তন, মনন, সাধন করে তাকে ঐ একত্বকে তার মত করে পেতে হবে। এরপর সেখান থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা এ জগতকে নতুন কিছু দান করবে যা প্রতিনিয়ত চিরনতুন, শাশ্বত, মনোহর।

এখানেই জগতের সার্থকতা ও আদিতে থাকা নিঃসঙ্গ জৌলুসহীন সত্যের ব্যর্থতা। কেননা এ নিম্নগামী সত্য আদি উর্ধ্বগামী সত্যকে মহিমা দিয়েছে। তার বিরক্তি কাটিয়ে তরতাজা করতে পেরেছে এবং করে যেতে থাকবে হয়তোবা কিংবা আবার আদিতে গিয়ে নিঃসঙ্গতার জৌলুসহীনতায় নিপতিত হয়ে তার পূর্ণচক্রের প্রাপ্তি ঘটাবে।

এরপর হয়তো আবার পুনরায় সে নিম্নে নেমে এসে আবার তার বিরক্তি কাটানোয় রত হবে। এটাই খেলা, বিশ্রাম, আবার খেলা, একাকীত্বের খেলা, মায়ভ্রম হয়ে দ্বৈত, অদ্বৈত হয়ে খেলা; প্রেমিকা না থেকেও প্রেমের খেলা, একত্বের মাঝে বহুত্ব নিয়ে খেলা; বহুত্বের মাঝে এক কে টেনে নেওয়া। এবং এটাই প্যারাডক্স। এটাই আমি, এবং আমি না, তুমি আবার তুমি না। কথা কিংবা কথা না; নির্বাক মৌনতায় ডুবে থেকে পেয়ালা তৈরীর মাধ্যমে আঙুরের রস আস্বাদন করা।

০৩

শয়তানকে তুমি ঘৃণাই করে গেলে, তাকে কখনও তুমি ভালোবাসোনি, তুমি শুধু তোমার প্রেমময় অনুভূতিকে বুঝেছো শয়তানের যন্ত্রণাকে বোঝোনি। শয়তানকে তুমি বারবার দূরে ঠেলে দিতে চেয়েছো, তার তোমার কাছে আসবার আকুতি তুমি দেখোনি। তুমি শয়তানকে মৃত নরক মনে করেছো, দেখেছো তার মাথায় দুটো শিং, কিন্তু সেই শিং এর মাঝে তুমি চিরুনী দেখতে পাওনি যা দিয়ে তুমি তোমার চুলকে আচড়াতে পারো।

শয়তান তোমার অংশ নয় ভেবে তুমি শয়তানকে দূরে ঠেলে দিয়েছো, কিন্তু সে তোমারই অংশ, সে তোমারই হতে চেয়েছে। অথচ তোমার ঘৃণা, তোমার তাকে গ্রহণ না করা, স্বীকৃতি না দেওয়ার জন্য সে তোমার ওপর চড়ে বসেছে এবং খুব রুষ্ঠভাবেই তোমার ওপর বসেছে। কেননা সে অসহায়, সেও ভালোবাসার কাঙ্গাল, ভালোবাসা পেলে সেও তোমার প্রেমে বর্তে যেতো, সেও তোমার কথা শুনতো; বিক্রমাদিত্য রাজার পিঠে চড়া বেতালের মত গল্প শোনাত,,, কিন্তু হায়, তুমি তাকে তাকে কখনও তার গল্প বলতেই দাও নি,, ভয়ংকর ভেবে বারবার দূরে ঠেলে দিয়েছো; কখনও তাকে ভালোবাসোনি। তাই সে তোমার মাথার ওপর চড়ে কাঁঠাল ভেঙ্গে খায়।

এজন্য শয়তানে হৃদয়ে আজো বেদনার আগুন দাও দাও করে জ্বলে এবং সে আজও বলে, “আমি তোমাদের কাছে আসতে চাই কিন্তু তোমরা আমাকে কুৎসিত বলে দূরে ঠেলে দাও; তোমরা তোমাদের প্রেমটাই বোঝো, আমার ভালোবাসতে না পারার যন্ত্রণাটা বোঝোনা, আমি যে ভালোবাসারই কাঙ্গাল, আমিও ভালোবাসতে চাই। কিন্তু কেউ আমাকে ভালোবাসেনি। আর যে বেসেছে তখন আমি আর আমি থাকিনি ভালোবাসাই হয়ে গিয়েছি।”

০৪

আমাদের সমস্যা পাশ্চাত্য কিংবা প্রাচ্য নয়। আমাদের সমস্যা হল প্রাচ্য, পাশ্চাত্য আমরা দেখে ফেলেছি। এখন এদেরকে বিবাহ বন্ধনে কীভাবে গাঁথা যায় সেটা নিয়েই সমস্যা। কেউ বলছে পাত্রের নাক উঁচা তো কেউ বলছে পাত্রীর চোখ ট্যারা। এখন উদ্ভূত এই বিবাদ মিটিয়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ না করতে পারার যে শূন্যতা এটাই আমাদেরকে ভোগাচ্ছে।

এবং এটা বেশ স্বাভাবিক। পরিবর্তন কঠিন, যখন প্রাচ্য, পাশ্চাত্য দেখে বর, কনে, পাত্রপক্ষ, পাত্রীপক্ষ নিজের দিকেই তাকানো আরম্ভ করে তখন সেসহ পুরো সভ্যতা তাদের কাঠামো হারিয়ে শূন্যতার গহ্বরে পরে যায়।

তবে এটা কোন আতঙ্কের কারণ নয়। কারণ শূন্য থেকে যেমন এক, দুই, তিন আসে ঠিক তেমনি করে এই শূন্যতা থেকেই নতুন কিছু ঘটবে ও এর জন্য সময়, ধৈর্য, স্থিরতা তো লাগবেই। এভাবেই প্রতি মুহূর্তে প্রকৃতি নিজেকে সজীব করে, নতুন অর্থ জীবনকে প্রদান করে।

০৫

সবসময় কথার পৃষ্ঠে কথা বলতে নেই, মাঝে মাঝে অন্যের কথাগুলো একটু বসে বসে শুনো, সেকী বলতে চায়, তার ভাষাগুলো, তার অনুভূতিগুলো, সে হয়তো একটা কমলালেবু নিয়েই কথা বলছে যা তুমিও জানো, সেও জানে, তবু সে যখন বলে, তুমি একটু তার কথা শুনো, তার কথাগুলোকে খাঁচামুক্ত হতে দিও। এটা ভেবো না যে তুমি বন্ঞ্চিত হলে, তুমি মোটেই বন্ঞ্চিত হওনি। বরং সে তোমাকে অনেক কিছুই দিতে পারে। যদি তুমি জিজ্ঞেস করো সে কী দিবে তোমায়?

তাহলে শোনো বলি তোমায়, “সে দিবে তোমায় তার সন্ঞ্চিত অনুভূতি, দুঃখ, আনন্দ কিংবা, রাগ, হিংসা,, এগুলো শুনে ভয় পেয়ো না। এগুলোরও তো অনেক প্রকার হয় তুমি তার জানালা ওগুলো যদি দেখতে পাও তোমার কিছু বলার বাসনা রহিত হয়ে যাবে। তখন তুমি শুনতে চাইবে তার গল্প, প্রবেশ করবে তার জানালা দিয়ে।”

মাঝে মাঝে সে তোমাকে প্রশ্ন করে উত্তর পাবার জন্য নয়, নিজের অনুভূতিটাকেই প্রশ্নের আঁকড়ে বেঁধে তোমার বিচারের কারাগার ফটক ভেদ করে তা হৃদয়ে পৌঁছিয়ে সে তোমাকে নিশ্চুপে বোঝাতে চায় তার কথা।

সে এও চায় তুমি এর প্রতিউত্তর করবে রাজা বিক্রমাদিত্যের মত। কিন্তু তবুও যে তোমাকে উত্তর দিতে হবে বেতালের তো এটাই দাবী। তাই তোমাকে নিঃশ্চুপ থেকে, সেই মৌনতায়ই জবাব দিতে হবে। এভাবে তুমি কেবল তাকে স্বাধীনতা দিলে না, সেইসাথে নিজেকেও স্বাধীনতা দিলে। তোমার উথাল পাতাল উত্তর, প্রতিউত্তর অন্যের সাথে যোগাযোগই করতে দেয়না।

তাই তুমি জীবন, অন্য জীবনকে শোনো, মগ্ন হয়ে শোনো, দেখো তারা কী বলে, তাদের রাজ্যটাকে দেখো। এভাবেই তুমি একদিন তোমার রাজ্য, তোমার জীবনকে খুঁজে পাবে।

0Shares

নাজিউর রহমান নাঈম

আমিকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। কিন্তু সে যে কোথায় লুকাইলো ও এই লোকটি যে তা বড় আশ্চর্যের বিষয়! আমি হারিয়ে যা হল একে কীই-বা বলা যায় বলুন। এখন যাকে দেখছেন সে তো অন্য কাজ করে বেড়াচ্ছে, তার পরিচয়ও নিশ্চয়ই বদলে গেছে। তাহলে আপনি কাকে দেখছেন? দেখছেন আপনাকে আপনার চিন্তাকে যা আপনাকে আমাকে দেখাচ্ছে বা কল্পনা করাচ্ছে। তাহলে শুধু শুধু পরিচয় জেনে কী হবে বলুন। তার চেয়ে বরং কিছু সাইকোলাপ-ই পড়ুন ও নিজেকে হারিকেন নিয়ে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ুন। পথিমধ্যে হয়ত কোথাও দেখা হয়েও যেতে পারে!!! সে পর্যন্ত- কিছু কথা পড়ে থাকুক জলে ভেজা বিকালে খুঁজে চলুক এই আমি পিলপিল করে অনন্ত "আমি" র অদৃশ্য পর্দার আড়ালে

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *