জীবনের কোন উদ্দেশ্য নেই ‌‌- ওশো

প্রথম প্রশ্ন –

তুমি বলছো যে জীবনের কোন লক্ষ্য নেই, নেই কোন উদ্দেশ্য ; তথাপি “আলোকপ্রাপ্তি” কে আমাদের লক্ষ্য হিসেবে ধরে নিয়ে আজ আমরা এখানে। এই ব্যাপারে কিছু বলুন….

যদি তুুুমি আলোকপ্রাপ্তি কে তোমার লক্ষ্য হিসেবে ধরে নিয়ে তুমি এখানে এসে থাকো, তাহলে তুমি এখানে থাকতে পারবে না। শারিরীকভাবে হয়ত তুমি এখানে উপস্থিত থাকবে কিন্তু আমার সাথে তুমি থাকতে পারবে না। লক্ষ্য হল ভবিষ্যতে। আমি এখানে। এবং মন যা কীনা লক্ষ্য পিছনে সর্বদা গতিশীল তা অবশ্যই ভবিষ্যতে থাকতে বাধ্য। আমাদের সাক্ষাৎ কখনো হবে না।

আমি জানি, তুমি এখানে কিছু অর্জনের জন্য এসেছ। আর এই কারনে তুমি একে হারাচ্ছ। তোমার তথাকথিত ধারনা অথবা যাই হোক না কেন তা ঝেড়ে ফেলে দেওয়ার জন্য আমি এখানে তোমাকে প্ররোচিত করছি। আলোকপ্রাপ্তি, মোক্ষ, নির্বান, খোদাও এর অন্তর্ভুক্ত। যদি তুমি এই লক্ষ্য অভীষ্ট মনকে ফেলে দাও, এবং সেখানে কিছুই নেই এই লক্ষ্যে অভীষ্ট মন ছাড়া, সেখানে অন্য কোন মন ও নেই। যদি তুমি একে ফেলে দাও তবে তুমি আলোকপ্রাপ্ত।

আলোকপ্রাপ্তি কোন খোঁজ নয়, এটা হল একধরনের উপলব্ধি। এটা কোন লক্ষ্য নয়, এটা হলো জীবনের প্রকৃতির একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ। জীবন হিসেবে এটি নিজেই আলোকপ্রাপ্ত। এটির উন্নত হবার জন্য কোন কিছু যোগ করার প্রয়োজন হয় না। জীবন হলো পরিপূর্ণ। এটি অপরিপূর্ন থেকে পরিপূর্নের দিকে ধাবিত হয় না। এটি ধাবিত হয় পরিপূর্ণতা থেকে পরিপূর্নতার দিকে।

তুমি এখানে এসেছো কিছু অর্জনের জন্য। এর ধরনই হলো একধরনের বাঁধা। এই বাঁধা কে ফেলে দাও। শুধু এই মুহূর্তে থাকো। সব উদ্দেশ্যর কথা ভুলে যাও, জীবনের কোন উদ্দেশ্য থাকতে পারে না। জীবনই হলো উদ্দেশ্য। কীভাবে তাঁর আর অন্যকোন উদ্দেশ্য থাকতে পারে? অন্যথায় তুমি একটা অনন্ত প্রত্যাবর্তে ঘুরতে থাকবে।

তারপর সেই উদ্দেশ্যের পেছনে আরেকটি উদ্দেশ্য থাকবে। জীবনের কোন উদ্দেশ্য নেই। আর এ জন্যই জীবন এত সুন্দর। হিন্দুরা একে বলে থাকে “লীলা” – “এ প্লে”। এমনকী এটি কোন “গেম” ও নয়। পাশ্চাত্যে এই “গেম” শব্দটি এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গিয়েছে। এই “গেম” টাইটেল যুক্ত শতাধিক বই এই ২-৩ বছরের মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। The master game, the ultimate game, the game people play এবং আরো অনেক। কিন্তু “গেম” এবং “প্লে” এর মাঝে পার্থক্য রয়েছে। হিন্দুরা একে “প্লে” বলে “গেম” বলে না।

কারন একটি খেলাতেও কিছু না কিছু উদ্দেশ্যে থাকে – একটি ফলাফল থাকে যা অর্জন করতে হবে- জয়লাভ করতে হবে- প্রতিপক্ষকে হারাতে হবে। তখন এটি ‘প্লে’ হিসেবে থাকবে না ‘গেম’ এ পরিনত হবে। প্রাপ্তবয়স্করা ‘গেম’ খেলে। শিশুরা শুধু খেলে। কেবলমাত্র এরকম সক্রিয়তাই যথেষ্ট নিজের দিকে প্রবেশ করার জন্য। এর রয়েছে তার নিজস্ব লক্ষ্য। আর এখানে কোন লক্ষ্য যুক্ত করবার প্রয়োজন নেই।

জীবন হল ‘লীলা’ – এটা হল একটি খেলা। এবং যেই মুহূর্তে তুমি খেলার জন্য প্রস্তুত, ঠিক তখনই তুমি আলোকপ্রাপ্ত। একে একটু ভিন্ন দৃষ্টিকোন থেকে বোঝার চেষ্টা করা যাক। তুমি তাই-ই যা তুমি হবার জন্য চেষ্টা করছো। তুমি যতবারই চেষ্টা করো ঠিক ততবারই তুমি তা হারাও। তুমি সমস্ত চেষ্টা ছেড়ে দাও। সম্পূর্নভাবে নিজেকে মেনে নাও। কেবল তুমি তাই-ই হয়ে যাও। হঠাৎ করে পাবে এটা সেখানে। এটা সবসময় সেখানেই ছিল। কিন্তু তুমি এটা খুব গুরুতরভাবে খুঁজছিলে আর এটাই ছিলো তোমার একে হারাবার কারন।

তুমি এখানে এসেছো অর্জন করতে – এনলাইটেনমেন্ট, সমাধি, সাতোরি অথবা যেকোন কিছু। আমার কাছে এসব শব্দগুলো হল একেবার নিরর্থক। কেননা এটা আবার তোমাকে নতুন ধরনের আকাঙ্খার সূত্র তৈরী করে দিবে। এগুলো আবার বাসনার নতুন জানালা উন্মোচন করবে। তুমি এই পৃথিবীতে টাকা,ক্ষমতা,সম্মান ইত্যাদি পাবার বাসনা পোষন করো। তারপর তুমি এগুলোকে নিয়ে বিরক্ত হয়ে যাও। তারপর এইসব জিনিস তোমার কাছে আবর্জনা মনে হয়।এমনকী তুমি নিজেকে পাও যে, তুমি হেরে গেছো। এবং তোমার তখন এই অনুভব হয় যে এইসব জিনিস নিরর্থক, অর্থহীন। আর তখন তুমি নতুন খেলা খেলতে শুরু করো – এনলাইটেনমেন্ট, মেডিটেশন, ইয়োগা, পরজগত, পরকাল ইত্যাদি।

আবার মন আরাম পায়। একটি নতুন বাসনার বিশ্ব তখন খুলে যায়। এখন তুমি এইসব লক্ষ্যগুলোর পিছনে ছুটতে থাকো। এবং অর্থ যতটা না মায়াময় ততটা মায়াময় নয় যতটা না ধ্যান। এই জগত অন্তত বাস্তব। কিন্তু পরকাল, পরজগত এগুলো একদম কল্পনা ছাড়া কিছুই নয়। এখন তুমি আগের চেয়েও গভীর গর্তে পড়ে গেছো। প্রথমক্ষেত্রে তুমি হয়ত বুঝতে পারবে এটা নিরর্থক। কিন্তু এখন দ্বিতীয় ক্ষেত্রটির বেলায় তোমার লক্ষ্য জন্ম লেগে যাবে এটা বুঝতে যে এটাও নিরর্থক। কোনরকম আপত্তি ছাড়াই যখন কোন ব্যক্তি আবিষ্কার করতে সমর্থ হয় যে সকল লক্ষ্যই নিরর্থক, তারপর সেখানে কিছুই করার থাকে না।

একজনকে কেবল হতে হবে। একজন প্রশান্ত হয়। আর সে এত পরিপূর্নভাবে প্রশান্ত হয় যে সেখানে কিছুই করার থাকে না- সেখানে কোন টেনশন থাকে না। হঠাৎ করে তোমার সীমানা গলতে শুরু করে যেমনটা সকালবেলার তুষার গলে থাকে। কিছু না করার সাথে ‘তুমি’ হারিয়ে যাও। অহংকার হারিয়ে যায়। কিছু না করা- কোনকিছু না হওয়া- কিছু অর্জন না করা এগুলা ব্যতীত তুমি আর কীই বা হতে পারবে?তোমার সমস্ত পরিচয় উবে যায়।
এটাই ‘আলোকপ্রাপ্তি ‘।

তুমি তখন সম্পূর্ন এক নতুন ধরনের জীবন যাপন করতে শুরু করো। তুমি তখন আমোদপূর্ন হতে শুরু করে। তুমি তখন প্রতি মুহূর্তকে জীবন্তভাবে যাপন করতে শুরু করো। কোথাও যাবার নেই। জীবন তোমাকে যা দেয় তুমি তা এক গভীর কৃতজ্ঞতার সাথে গ্রহন করে নাও। তোমার দ্বারা তখন অনুগ্রহ ঘটিত হয়। এটাকেই আমি বলি ‘খোদা’ হয়ে যাওয়া। যখনি তুমি প্রতি মুহূর্তে খেলতে শুরু করে দাও, প্রতি মুহূর্তে বাস করতে শুরু করো, তুমি তখন ‘খোদা’ হয়ে যাও। আমি তোমাকে বোঝাতে চাচ্ছি যে তুমি-ই খোদা। এটা তোমার যাত্রা। আমি এটার সাথে সম্পর্কযুক্ত নই। আমি জানি তা কী। আমি এখানে কারন আমি তোমাকে বোঝাতে চাইছি যে তুমি তোমার নিজের চেহারার দিকে আবার ফিরে তাকাও। অন্তর্খোঁজ করো- এমন কিছুর খোঁজ করতে যেওনা যার কোন অস্তিত্ব নেই।

জীবন হলো উদ্দশ্যবিহীন খেলা, অসীম শক্তির খেলা। চমৎকার হবে যদি তোমার কোন ‘অর্জনলিপ্সু মন’ না থাকে। এটা নোংরা যদি তোমার উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকে- কিছু হবার, কিছু হতে, কিছু করার। শান্ত হও। ভবিষ্যৎ কে সম্পূর্নরূপে ছেড়ে দাও। কেবল এই মুহূর্ত অস্তিত্বশীল। এবং এই মুহূর্তই হলো শাশ্বত। এবং একমাত্র এই জীবনই সব যা সেখানে আছে। অন্য কিনারা সম্বন্ধে ভেবো না।

অন্য কোন একটি দিনে আমি চীনা রূপকাহিনী সম্পর্কে বলছিলাম। মানুষটি নদীর মাঝখান থেকে ফিরে আসে। কেন সে নদীর মাঝখান থেকে ফিরে আসে?কারন সেখানে কোন কিনারা নেই। এটাই (নদীর মাঝখান) একমাত্র কিনারা। এবং কেনই বা সে হাসতে শুরু করে? কারন সে হঠাৎ করে উপলব্ধি করে সে নিজেই ‘বুদ্ধ’, যাকে সে এতদিন ধরে খোঁজ করছিল। জেন মাস্টাররা তাঁদের শিষ্যদের শেখান যে ধ্যানের মধ্যে যদি কোনদিন ‘বুদ্ধ’ এর সাথে সাক্ষাৎ ঘটে, সাথে সাথে তাকে মেরে ফেলতে। এক মুহূর্ত যাতে দেরী না হয়। তাকে সাথে সাথে মেরে ফেলো! অন্যথায় সে তোমাকে ভস্ম করে দেবে। তাঁরা (জেন মাস্টার’স) সঠিক। যখন তুমি ধ্যান করো কৃষ্ণ আসে তার বাঁশি নিয়ে, যা খুবই চমৎকার। আবার তুমি স্বপ্ন দেখতে থাকো। আবার তুমি স্বপ্ন ও আকাঙ্খার ফাঁদে পড়ে যাও। এরপর যিশু খ্রিস্ট আসে এবং তুমি তোমার মনের জালের ফাঁদে পড়ে যাও। এটা হলো মাকড়সার জাল। এবং তারপর বুদ্ধ আসে- এবং তুমি নিজেকে ভুলে যাও। জেন মাস্টাররা বলে যে ‘বুদ্ধ’ কে সাথে সাথে মেরে ফেলো। রাস্তাকে বাঁধামুক্ত করো। সেখানে কাউকে প্রবেশাধিকার দিওনা। আর এটাই হলো কোন লক্ষ্যকে প্রবেশাধিকার না দেওয়া।

তোমার ভেতরের পরম বিশুদ্ধতায় কেবল ‘হও’পরিপূর্নএকাএটাই ‘আলোকপ্রাপ্তি’। আমার এটা পুনরায় বলা উচিত কারন আমি জানি তুমি এটা ভুলে যাবে……ভুলে যাবে এবং ভুলে যাবে। তুমি আসলে তাই-ই যা তুমি খুঁজছো। এটাকে তুমি তোমার মূল মন্ত্র হতে দাও। যদি তুমি এটা বুঝতে পারো, তাহলে সব বুঝে যাবে। এটাকে একবার চেষ্টা করে দেখো। লক্ষ্যের প্রতি তুমি যা কিছু দিচ্ছো, অসংখ্য জীবন জীবনে তুমি তা ইতিমধ্যেই দিয়ে ফেলেছো। এখন প্রতিমুহূর্তে জীবন কে যাপন করতে চেষ্টা করো। মনে করো যেনো কোনও ভবিষ্যৎ নেই। শুরুতে এটা কেবলই ‘যেনো এমন’ মনে হবে। কিন্তু ক্রমে ক্রমে এই ‘যেনো এমন’ -ই তোমার একমাত্র সত্যে পরিনত হবে।

শুরুর দিকে এটা কেবল অভিনয় বলে মনে হতে পারে। কিন্তু শীঘ্রই তুমি উপলব্ধি করতে পারবে যে এই অভিনয়-ই হলো একমাত্র সত্য। তুমি একটা লক্ষ্যের সাথে এসেছো। কিন্তু আমি তোমাকে তোমার লক্ষ্য নিয়ে থাকাকে মেনে নিবো না। যদি তুমি আমার কাছ থেকে পলায়ন না করো তাহলে লক্ষ্য চলে যেতে বাধ্য হবে। এটার সাথে কিছুক্ষন লেগে থাকো, লক্ষ্যকে চলে যেতেই হবে। হয় আমি তোমার এখানে থাকবো নয়তো তোমার লক্ষ্য। তোমাকে তা বেছে নিতে হবে।

0Shares

নাজিউর রহমান নাঈম

আমিকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। কিন্তু সে যে কোথায় লুকাইলো ও এই লোকটি যে তা বড় আশ্চর্যের বিষয়! আমি হারিয়ে যা হল একে কীই-বা বলা যায় বলুন। এখন যাকে দেখছেন সে তো অন্য কাজ করে বেড়াচ্ছে, তার পরিচয়ও নিশ্চয়ই বদলে গেছে। তাহলে আপনি কাকে দেখছেন? দেখছেন আপনাকে আপনার চিন্তাকে যা আপনাকে আমাকে দেখাচ্ছে বা কল্পনা করাচ্ছে। তাহলে শুধু শুধু পরিচয় জেনে কী হবে বলুন। তার চেয়ে বরং কিছু সাইকোলাপ-ই পড়ুন ও নিজেকে হারিকেন নিয়ে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ুন। পথিমধ্যে হয়ত কোথাও দেখা হয়েও যেতে পারে!!! সে পর্যন্ত- কিছু কথা পড়ে থাকুক জলে ভেজা বিকালে খুঁজে চলুক এই আমি পিলপিল করে অনন্ত "আমি" র অদৃশ্য পর্দার আড়ালে

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *