কৃষ্ণ দ্যা ব্যালেন্স ফ্যাক্টর

কৃষ্ণ দ্যা ব্যালেন্স ফ্যাক্টর

মহাভারতের কৃষ্ণের দিকে যদি আমরা তাকাই তাহলে দেখতে পাবো যে, সে কৌরব ও পান্ডবদের মাঝে যুদ্ধে তথা কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে সর্বদা একটা ব্যালেন্স ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছেন। এই মহাভারতে কৌরব ও পান্ডবদের মধ্যে যতগুলো চরিত্র ছিলো এরা প্রত্যেকেই কোন না কোন কিছু নিয়ে চিন্তিত ও বিমর্ষ ছিলো। যেমনঃ ভীষ্মের ছিলো তার দুইটা প্রতিজ্ঞা নিয়ে যাতনা, দূর্যোধনের ছিলো অজ্ঞতা ও নির্বুদ্ধিতার উথাল-পাথাল, দ্রৌপদীর ছিলো তার প্রতি করা অপমানের আগুন, ভীমের ছিলো দ্রৌপদীর ওপর করা অপমানের বদলা নেবার আগুন, কর্ণের ছিলো অর্জুনকে হারিয়ে নিজেকে শ্রেষ্ঠ তীরন্দাজ হিসেবে প্রমাণ করার আগুন ইত্যাদি ইত্যাদি।

এখন কৃষ্ণের সাথে এদের প্রত্যেকেরই দেখা-সাক্ষাৎ হয় এবং কৃষ্ণকে দেখা যায় প্রতিবারই প্রতিটি চরিত্রের সাইকোলজি বুঝে তাদের সমস্যার দিকটি চিহ্নিত করে তাদেরকে নানা তরিকায় ব্যাপারগুলোর দিকে ইশারা করা।

এছাড়া কৃষ্ণকে দেখা যায় যে তিনি পান্ডবদের পক্ষ হয়ে যুদ্ধ করলেও অর্জুন যখন তারই প্রতিপক্ষ কৌরব সদস্য কর্ণকে কটুক্তি করে তখন সে তাকে একটু শক্ত কথা বলে অর্জুনের ভুলের দিকটা ধরিয়ে দিয়ে ব্যাপারটা ব্যালেন্সে নিয়ে আসে। পান্ডব সদস্যদের এটা মনে হতে পারে যে, তারা ঠিক আছে বলে কৃষ্ণ তাদের পক্ষ হয়ে যুদ্ধ করছেন বা তারা ভালো বলে করছেন তাহলে ব্যাপারটি মোটেও তা নয়। কৃষ্ণ বরাবরই বলে এসেছেন যে, তিনি ধর্ম যে পক্ষে রয়েছে তার পক্ষ নিচ্ছেন কেবল।

এখানে মূলত মূল বিষয়টা ধর্ম নয়, ব্যাপারটা হলো ঐ সময় অনুযায়ী সভ্যতা কিংবা কালের গতিধারার যে প্রাকৃতিক ব্যালেন্স যেটার দিকে ধাবিত হচ্ছে কৃষ্ণ তারই পালস বুঝে পান্ডবদের পক্ষ নেয়।

অর্থাৎ কৌরব, পান্ডবদের মধ্যে কে কেমন কারা পূণ্যবান বা অধিকতর ভালো এ ব্যাপার ভেবে কৃষ্ণ পক্ষপাতিত্ব করেননি; বরং একটি পূর্ণাঙ্গ সিস্টেমের সন্ঞ্চালনের গতির যেদিকে দাড়ালে ব্যাপারটা ব্যালেন্স হয় কৃষ্ণ সেদিকেই দাঁড়িয়েছিলেন কেবল ও তার বেলায় এটি ছিল স্বতঃস্ফূর্ত প্রক্রিয়া। এজন্য দেখা যাবে যে, তিনি যেখানে যে চরিত্রের মুখোমুখি হয়েছেন তাদের প্রত্যেকের সাইকোলজির প্যাটার্ণ বুঝে তাদেরকে সেরূপেই জবাব দিয়েছেন। আর এটা করতে গিয়ে যারা সসীম দৃষ্টি দিয়ে কৃষ্ণকে দেখতে গেছে তারা মূলত কৃষ্ণের এই ব্যালেন্সের ব্যাপারটা না ধরতে পেরে কৃষ্ণকে একেকজন একেকভাবে ধরে নিয়েছেন। এবং তা যে ধরবে এটাই স্বাভাবিক।

কেননা আমাদের মন দ্বৈতভাবে কাজ করতে পছন্দ করে অর্থাৎ হয় এটা নয় ওটা; এরকম একটা উত্তর পেতেই পছন্দ করে। কিন্তু যখনই এর ভিন্ন কিছু দেখে সে হযে যায় কনফিউজড৷ কৃষ্ণের এরূপ কনফিউজিং ক্যারেক্টার ধরতে না পেরেই চরিত্রগুলোর এই দশা।

কৃষ্ণের স্বতঃ রজঃ তমঃ গুণের যে ব্যাখ্যা রয়েছে এতে ব্যাপারটা বোঝা যায়। আমাদের মাঝে এ তিনটি গুণ একেকজনের একেক মাত্রায় বিভিন্ন অনুপাতে রয়েছে। যে ব্যক্তি সচেতন হয় সে তখন এ গুণের কোনটির প্রতি সরাসরি বিভাজন করে না, বরং এ তিনটি গুণের ব্যালেন্স করেন। এবং এটা করতে যেটা করতে হয় তিনি তা করেন।

এভাবে কৃষ্ণকে মহাভারতে দেখলে মনে হবে তার কোন উপস্থিতিই নেই, তিনি থেকেও যেনো নেই। এরূপটা মনে হবার কারণ হতে পারে যে, অন্য সবাইকেই দেখা যায় কতটা দুঃসহ যাতনার মাঝ দিয়ে তাদের সময় পার হচ্ছে। অথচ কৃষ্ণ সে জায়গায় নির্ভার, লীলা করছেন।

এজন্যই তার আচরণগুলো যেন একটি সুন্দর ব্যালেন্সে পড়ে যাচ্ছে। এখানে বাইরে থেকে তো মনে হবে তিনি পক্ষপাতিত্ব করছেন এবং সসীম দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায় তিনি তা করছেন ও এটা তাকে করতেই হতো। তবে প্রকৃতপক্ষে তিনি এটাকে ধর্মযুদ্ধ বলে এটা বোঝাতে চান যে, এ দুনিয়ার লীলায় সে পান্ডবদের পক্ষ নিলেও তার কাছে পান্ডব, কৌরব মূলত কিছুই নয় তিনি আসলে এই পুরো একটি অন্তর্জাগতিক সিস্টেমের ব্যালেন্স যেদিকে নির্দেশ করছে তারই জন্য যুদ্ধ করছেন।

এজন্যই মহাভারতে সবাই সংঘর্ষে লিপ্ত হলেও এর ভেতরের ব্যালেন্সের একটি অন্যতম ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছেন শ্রীকৃষ্ণ। এজন্যই তিনি হলেন মহাভারতের ব্যালেন্স ফ্যাক্টর।

0Shares

নাজিউর রহমান নাঈম

আমিকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। কিন্তু সে যে কোথায় লুকাইলো ও এই লোকটি যে তা বড় আশ্চর্যের বিষয়! আমি হারিয়ে যা হল একে কীই-বা বলা যায় বলুন। এখন যাকে দেখছেন সে তো অন্য কাজ করে বেড়াচ্ছে, তার পরিচয়ও নিশ্চয়ই বদলে গেছে। তাহলে আপনি কাকে দেখছেন? দেখছেন আপনাকে আপনার চিন্তাকে যা আপনাকে আমাকে দেখাচ্ছে বা কল্পনা করাচ্ছে। তাহলে শুধু শুধু পরিচয় জেনে কী হবে বলুন। তার চেয়ে বরং কিছু সাইকোলাপ-ই পড়ুন ও নিজেকে হারিকেন নিয়ে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ুন। পথিমধ্যে হয়ত কোথাও দেখা হয়েও যেতে পারে!!! সে পর্যন্ত- কিছু কথা পড়ে থাকুক জলে ভেজা বিকালে খুঁজে চলুক এই আমি পিলপিল করে অনন্ত "আমি" র অদৃশ্য পর্দার আড়ালে

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *