কনশাসনেস কী – একটি মাল্টিপার্সপেক্টাইভাল ব্যাখ্যা

কনশাসনেস বিষয়টি নিয়ে দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক, ধর্মতত্ত্ববিদ, আধ্যাত্মবাদী, মনস্তত্ত্ববিদ এদের থেকে শুরু করে বিভিন্ন পাড়ার লোকজন বিভিন্নভাবে একে ব্যাখ্যা করেছেন। কনশাসমেসকে নিয়ে এদের বিভিন্ন ধারণার মাঝে অনেক প্যাঁচ দেখা যায়। একজন কনশাসনেস বিষয়টিকে যে অর্থে বুঝিয়ে থাকেন তো অন্যজন তা ভিন্ন অর্থে ব্যাবহার করে থাকেন। এতে করে বিষয়টি নিয়ে অনেক জল্পনা, কল্পনা হয়ে গেছে এবং হচ্ছে। তাই আজকের এই লেখাটিতে আমি বিভিন্ন দিক থেকে কনশাসনেসের ধারণাগুলোকে ব্যাখ্যা করার পাশাপাশি আমারও কিছু মতামত দেবার চেষ্টা করবো এই লেখাটিতে। তাহলে চলুন কনশাসনেসের জটিলতার মাঝে প্রবেশ করা যাক।

কিছু গুরুত্বপূর্ণ শব্দঃ Consciousness, wakefulness, awareness, unconsciousness, sub-consciousness, ego, beyond, pure consciousness, altered states of consciousness, super consciousness, cosmic consciousness, collective consciousness, collective unconsciousness, Being, Isness, duality, nonduality, Advaita vedanta, zen, silicon consciousness, mysticism, theosophy, God, theology, Material, nonmaterial, Artificial intelligence, intellect, intelligence, subjectivity, objectivity, multiple personality, Absolute reality.

 

কনশাসনেস নিয়ে বৈজ্ঞানিকদের ধারণাঃ

 

বিজ্ঞান কোয়ান্টাম ফিজিক্সের মাধ্যমে অবঅণু পর্যায়ে গিয়ে অনেক কিছুই ইতোমধ্যে আবিষ্কার করে ফেলেছে৷ আবিষ্কারের এই ক্রমধারার মধ্য দিয়ে কনশাসনেস বিষয়টি নিয়েও এর আগ্রহ দানা বেঁধে উঠেছে৷ বিশেষ করে নিউরোলজিক্যাল ক্ষেত্রে মানুষের ব্রেন পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পেরেছে যে, প্রাচীনকালে প্রচলিত বিভিন্ন মিরাকল টাইপের ঘটনা আসলে কিছুই নয় সব ব্রেনের কারসাজি। ব্রেনের নির্দিষ্ট কিছু অংশ উদ্দীপিত হলে ব্রেন আমাদেরকে একধরনের অতিলৌকিক অভিজ্ঞতা দেবার চেষ্টা করে। এছাড়া ব্রেনের মাধ্যমে সে নিজের সম্পর্কে সচেতন হতে পারে ও এ জগত সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করে। মানুষ কীভাবে আত্মসচেতন হয় ও সে তারও যে একটা অস্তিত্ব আছে এ সম্পর্কে আত্মবোধের উৎপত্তি মূলত ব্রেন থেকে।

এ থেকে এ সম্ভাবনাও জন্মেছে যে, আমরা এ বিজ্ঞানের সাহায্যে ভবিষ্যতে কনশাসনেস তৈরী করতে পারবো এবং এমন রোবটও তৈরী করতে সক্ষম হতে পারবো যে যারা কীনা হবে মানুষের মতই আত্মসচেতন। এ ব্যাপারে মিচিও কাকু, সদগুরু ও অন্য আরও দুজন ব্যক্তির সাথে একটি কনফারেন্সে আলোচনা চলাকালীন মিচিও কাকু আশঙ্কা করেন যে, যদি রোবটরা মানুষের মত আত্মসচেতন হয় ও তাদের এভাবে তৈরী করা যায় তাহলে আমাদের সামনে রোবটের সাথে একপ্রকার সন্ধিচুক্তিতে আসতে হবে। কেননা তখন তাদেরও মানুষের মত বুদ্ধিমত্তা ও কনশাসনেস তথা আত্মসচেতনা থাকবে। যার ফলে মানুষদের জন্য এটা বেশ নির্বুদ্ধিতাপূর্ণ কাজ হবে রোবটের সাথে যুদ্ধ করা। যেমনটা অনেক ফিকশনাল কাহিনীতে আমরা বর্তমানে দেখি। মিচিও কাকু মনে করেন আমাদের উচিত হবে রোবটদের সাথে মানিয়ে নেওয়া। তবে এ সম্ভাবনা আসতে বেশ দেরী আছে।

অন্যদিকে সদগুরু অবশ্য কনশাসনেস নিয়ে ভিন্ন কথা বলেন। আমি এখনই তার ব্যাখ্যাতে আসছি না। আপাতত বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে কনশাসনেসের ব্যাপারটা দেখা যাক।

কনশাসনেস নিয়ে যদি নিউরোলজিক্যাল ব্যাখ্যা বা মডেলের দিকে যাওয়া যায় তাহলে বিভিন্ন মডেল ও থিওরীর সমাবেশ ব্যাখ্যা না করে মোটাদাগে একটা সাধারণ বিষয়ে জানতে পারা যায় যে, কনশাসনেসের ব্যাপারটা মূলত ব্রেনকেন্দ্রিক ও ব্রেনই এর উৎপাদনের কারখানা। এখন এর পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ব্যাখ্যার মাঝে অনেক জটিল ও সূক্ষাতিসূক্ষ্ম ব্যাপার রয়েছে। ওদিকে নাই-বা গেলাম। ব্রেনের এ কনশাসনেস জাগ্রত করার ফলে অতীতে ধর্মতত্ত্ববিদ তথা থিওলজিয়ানদের যে এটা নিয়ে একটা রহস্যময়তা ছিলো তা বিজ্ঞানীরা মনে করছেন যে তারা সমাধান করে ফেলছেন। এছাড়াও তাদের ধারণা করা যে, আত্মা নামক বিষয়টি আছে এরও সমাধান ঐ ব্রেনের মাঝে লুকিয়ে আছে। ব্রেন আমাদেরকে এ অনুভূতি প্রদান করে যে আমার শরীরের বাইরেও আরেকটা কিছু আছে যা অতীতের মানুষকে একধরনের অলৌকিক টাইপের অনুভূতি প্রদান করতো। এই আত্মাকে অবশ্য প্রাচ্যের আধ্যাত্ব ধারাগুলোতে যেভাবে ব্যাখ্যা করা হয় তা বিজ্ঞানের ধারণা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। সে ব্যাপারে পরে আলোচনা করবো।

এখন এই যে ব্রেনের ব্যাপারে এত এত চমকপ্রদ জিনিস বেরিয়ে আসছে এ থেকে এমন এমন সব সম্ভাবনা তৈরী হচ্ছে যে, ভবিষ্যতে হয়তো টেলিপ্যাথি, টেলিকাইনেসিস, এমনকী মৃত্যুর পরেও আমার ব্রেনের ভেতর থাকা মেমোরীকে মানুষরা কম্পিউটারের মাধ্যমে সংরক্ষন করে একঅর্থে মানুষরা অমরত্ব লাভ করতে পারবে। এছাড়াও মিচিও কাকু তার “Future Of the impossible” বইয়ে ৩ টাইপের সিভিলাইজেশনের কথা বলেছেন যা ক্রমে ক্রমে এগোতে থাকলে আমাদের কাছে বিভিন্ন অলৌকিক টাইপের বিষয়গুলো আমরা বাস্তবে বিজ্ঞানের দ্বারাই বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হবো।

কনশাসনেসের ব্যাপারে মিচিও কাকু মনে করেন যে, কনশাসনেসের তিনটি স্তর আছে। প্রথম স্তর হলো প্রাণী। এ স্তরে প্রাণীরা তাদের স্পেস তথা দেশগতভাবে সচেতন হতে পারে ও এখানে ফিডব্যাক লুপ কাজ করে। তবে এই ফিডব্যাকলুপ অতটা জটিল নয়। তারপর দ্বিতীয় স্তরে তিনি বলেন বানরের কথা। যারা কীনা স্পেস ও অন্য বানরের কিংবা প্রাণী এদের ব্যাপারে সচেতন এবং তাদের ফিডব্যাক লুপ প্রথম স্তর থেকে জটিলতর। এরপর তৃতীয় স্তরে এসে তিনি বলেন মানুষের কথা। মানুষ স্পেসসহ, অন্যান্য প্রাণী ছাড়াও নিজের ব্যাপারে সচেতন হতে পারে ও সেইসাথে সে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ব্যাপারে পরিকল্পনা করতে পারে বা ভাবতে পারে অর্থাৎ সে কোনকিছুকে প্রেডিক্ট করতে পারে। আর এ স্তরে এসে ফিডলুপও বেশ জটিল হয়ে পড়ে। এই হলো তার কনশাসনেসের তিনটি স্তর।

তবে তার এই ব্যাখ্যাটা তেমন একটা মনোঃপূত মনে হয়নি আমার কাছে। কেননা অনেক প্রাণী ক্ষেত্রে দেখা যায় তারা তাদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে খাদ্য সন্ঞ্চয় করে রাখে৷ সাপরা ভূমিকম্প আসার অনেক আগেই ধারণা করতে পারে যে, ভূমিকম্প ঘটতে চলেছে। যদিও তিনি এমত ৪-৫ বছর আগে দিয়েছিলেন।

এখন অবশ্য বিভিন্ন প্রাণীর কনশাসনেস এমনকী এলিয়েনের কনশাসনেস নিয়েও অনেক জল্পনা কল্পনা হচ্ছে। প্রাণীদেরও যে কনশাসনেস আছে মানে তারা তাদের ব্যাপারে যে সচেতন এমনটি অনেক পরীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে৷ যেমন মিচিও কাকুর একটি কথা এখানে বেশ মজার। সেটা হলো –

 

“You see, Dog’s are confused, because they think we are dogs.” – Michio Kaku, 2019

 

অর্থাৎ, এমনও তো হতে পারে কুকুর মনে করছে আপনি নিজেই একটা কুকুর। কেননা, বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেছেন যে, প্রত্যকেরই তাদের আলাদা আলাদা জগত আছে। যেমনঃ কুকুরের অভিজ্ঞতায় তাদের জগত তারা মাপে গন্ধ দিয়ে। বাদুড়রা চোখে দেখে না, তাই তাদের কাছে জগৎটা হলো শব্দের প্রতিফলন ও ফ্রিকোয়েন্সী। এ থেকে এমন মনে হতে পারে যে, আপনি যে বিড়ালটা নিয়ে খেলছেন, সে বিড়ালও তার জগতের সাপেক্ষে আপনাকে নিয়ে খেলছে!

এভাবে দেখা যাচ্ছে যে, বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এই সচেতনতাটা বিভিন্ন প্রাণী থেকে শুরু এলিয়েন এমনকী রোবটের মাঝেও হওয়া সম্ভব! আর যদি হয় তাহলে আমাদের তাদের ভাষাগুলোও রপ্ত করার একটা সম্ভাবনা রয়েছে৷ এলিয়েনদের ভাষা আমাদের ভাষার মত নাও হতে পারে। সেক্ষেত্রে যদি তাদের সাথে আমাদের সাক্ষাৎ হয়েই যায় তাহলে আমাদের তাদের ভাষা শিখতে হবে যোগাযোগ করার জন্য৷

তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, রাজা সোলায়মান যে পাখিসহ বিভিন্ন প্রাণীর ভাষা বুঝতে পারেন তা আসলে একভাবে সম্ভব!

রাজা সোলায়মানের কথা বলে আর অলৌকিকতা না বাড়াই। পথে ফিরে আসা যাক।

নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী রজার পেনরোজ মনে করেন কনশাসনেসকে কম্পিউট করা সম্ভব নয়। এটার মাঝে এমনকিছু বিষয়াদি রয়েছে যার জন্য তার কাছে মনে হয় এটা নন-কম্পিউট্যাশনাল। এছাড়া তিনি এও বলেন যে, বর্তমান কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যার থেকেও আরও নতুন কিছুর প্রয়োজন এই কনশাসনেস বিষয়টি বোঝার জন্য। যদিও তিনি এ ব্যাপারে স্পষ্ট করে কিছু বলেননি।

কনশাসনেসের আরেকটি ইন্টারেস্টিং পার্ট হলো অলটারড স্টেট অব কনশাসনেস (Altered state of consciousness)। এই ধরনের অভিজ্ঞতা হলে একজন ব্যক্তি রিয়েলিটিকে ভিন্ন আঙ্গিকে উপলব্ধি করে। যেমনঃ সাইকেডিলক জাতীয় দ্রব্য নেওয়ার ফলে অনেকের কাছে তার চোখে দেখা দৃশ্যমান বাস্তবতা বদলে গিয়ে সে বিভিন্ন মাত্রার এক অতিবাস্তবিক জিনিস প্রত্যক্ষন করে।

সাইকেডেলিক নিয়ে বিস্তারিত জানতে নিচে দেওয়া লিঙ্কের এই ধারাবাহিক সিরিজমূলক আর্টিকেলগুলো পড়ে ফেলতে পারেন। 👇👇👇

 

সাইকেডেলিক বিষয়ক ব্লগ সিরিজ

 

তবে এ ব্যাপারগুলোকে নিউরোসায়েন্টটিস্টরা ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন। তারা এসব ঘটনাবলিকে ব্রেন দিয়েই ব্যাখ্যা করেন। সেই সাথে সাথে তারা বিভিন্ন মহাপুরুষের সাথে ঘটা প্রত্যাদেশমূলক মিরাকুলাস ঘটনাগুলোর ব্যাখ্যা ব্রেনের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে দিতে সক্ষম হতে পেরেছেন। অনেকের ধারণা এগুলো মস্তিষ্কপ্রসূত বিভ্রম। যেমনঃ মানুষ তার মনে মনে নিজের সাথে নিজে কথা বলে কিন্তু এই কথা বলাটাকে যখন সে মনে অন্যকেউ তাকে বলছে, তখন সে ডুয়েল পারসোনালিটি তৈরী করে ফেলে। আর এটার পেছনেও ব্রেন রয়েছে। এভাবে স্কিজোফ্রেনিয়া রোগীরা মাল্টিপল পার্সোনালিটিও তৈরী করে ফেলতে পারে।

এ থেকেই মহাপুরুষদের বিভিন্ন প্রত্যাদেশমূলক ঘটনা আসলে মস্তিষ্কজনিত সমস্যা বলে অনেকের ধারণা। এসব ঘটনাকে অদ্ভুত ঘটনা বলে আখ্যা দেওয়ার কোন কারন নেই।

মোটকথা, আধুনিক বিজ্ঞান অনুযায়ী কনশাসনেস বলতে তারা বুঝে থাকে মানুষের সাধারণ সচেতনতাকে। আমি বলে যে মানুষ একটা আইডেনটিটি তৈরী করেছে বা সেলফ তৈরী করেছে এটাকে সে টের পায়। এই টের পাওয়া ও হুশে থাকাটা বিজ্ঞান মনে করছে কনশাসনেস। যার কারণে এনাসথেসিয়া প্রয়োগ করে কোন ব্যক্তির কনশাসনেসকে লাইটের সুইচের মত অন-অফও করা যায়। এ থেকে বিষয়টা আরও পরিষ্কার হয় যে, আপনি যে চোখ খুলে এটা ওটা দেখছেন ও জানছেন এই হলো আপনার কনশাসনেস। যদি আপনাকে মাথায় হাতুড়ি দিয়ে বাড়ি মারা হয় আপনার কনশাসনেস চলে যাবে, আপনি আনকনশাস হয়ে পড়বেন। এ থেকে কনশাসনেসের অনেক প্রকার ও নানা ধরনের প্রকরণও তারা অনুমান করছেন এলিয়েন কনশাসনেস, সিলিকন কনশাসনেস ইত্যাদি অনেক কিছু। এর ওপর সাব কনশাস, আনকনশাস অবস্থা তো রয়েছেই। তবে ওটাও ব্রেনেরই শক্তি বাঁচানোর ধান্ধা। কেননা ব্রেনের এত মেমোরী একজন ব্যক্তির পক্ষে সচেতন হতে হলে তার প্রচুর এনার্জি ব্যয় হবে। তাই শক্তিকে অপচয় ও সংরক্ষণের জন্য খুব শতাংশই আমাদের কনশাস পার্টে থাকে ও বাকী সাবকনশাস, ও আনকনশাসে চলে যায়।

তাহলে এখানে এসে আমরা দেখতে পাই যে, বিজ্ঞানের কাছে কনশাসনেসের ধারণাটা হলো মানুষের সাধারণ সচেতন অবস্থা। তাই অনেক স্প্রিরিচুয়ালিস্ট, ধার্মিক, আধ্যাত্ববাদীরা কনশাসনেসের কথা শুনে লাফ দিয়ে যখন বিজ্ঞানের কনশাসনেসের সাথে তাদের কনশাসনেসের জোড়াতালি দিতে চায় তখন আসলে সমস্যা সৃষ্টি হয়। কেননা তাদের কনশাসনেসকে নিয়ে করা ধারণা বিজ্ঞানের ধারণাকৃত কনশাসনেস থেকে ভিন্ন। তাই গুলিয়ে না ফেলে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রের নিজস্ব ধারণা অনুযায়ী দেখলে সমস্যাগুলো সৃষ্টি হয়না। অনেক ধর্মতাত্ত্বিক তো এই বিজ্ঞানের এই কনশাসনেসকে গড বলে টান দিয়ে ফেলেছে। কিন্তু বিজ্ঞান এই কনশাসনেসকে ব্রেনের সাথে সম্পৃক্ত করেই দেখে ও এটি তার কার্যকারিতার ব্যাপারে সচেতন, তথা একটা আমি আমি যে ব্যাপার রয়েছে সেই আইডেনটিটিকেই কনশাসনেস বলে মনে করে।

তবে বিজ্ঞানের এই কনশাসনেসের ব্যাপারটা যদি সাধারণ সচেতনতা দিয়েই তারা ব্যাখ্যা করতে চান তা তারা করতেই পারেন। কিন্তু তাদের যদি এ ধারণা হয়ে থাকে যে, কনশাসনেস নিয়ে অনুসন্ধান চালাতে চালাতে তারা একে কনক্রিট তথা ফিজিক্যাল কিছু হিসেবে হাতেনাতে ধরে ফেলবেন তাহলে এক্ষেত্রে তাদের একটু ভুল হয়ে যাচ্ছে বলেই আমার মনে হয়। সামনে আমি এগুলো নিয়ে বিস্তৃতভাবে বলার চেষ্টা করবো।

আপাতত অতি সংক্ষেপে বিজ্ঞানের কনশাসনেস সম্পর্কে ধারণা যতটুকু বুঝেছি দেওয়ার চেষ্টা করলাম। যদিও এখানে দেওয়া প্রসঙ্গগুলোর আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যার প্রয়োজন রাখে। তবে যেহেতু আমাদের আলোচ্য বিষয় হলো কনশাসনেস। তাই ঐসব বিষয়ে নির্দিষ্ট করে বিস্তারিত না বলাটাই শ্রেয় বলে মনে হলো। এছাড়া আর্টিকেলের শেষে বিভিন্ন ভিডিওর লিংক দিয়ে দেওয়া হবে সেখানে চাইলে আপনারা বিষয়গুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা জেনে নিতে পারেন।

এখন আমরা চলে যাবো কনশাসনেস নিয়ে দার্শনিক ও মনোবৈজ্ঞানিকেরা কী মনে করেন তার দিকে।

 

কনশাসনেস নিয়ে মনোবিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের ধারণাঃ

 

দর্শনের ক্ষেত্রে কনশাসনেস শব্দটি অনেক আগে থেকেই প্রচলিত। তবে কনশাসনেস শব্দটি যেহেতু ইংরেজী শব্দ ও একে সেভাবে পাশ্চাত্যে তেমন করে একে কেন্দ্র করে এর অর্থগুলোকে আলাদা করা হয়নি। দার্শনিক দেকার্ত থেকে শুরু করে এর পরবর্তী আরও অনেক দার্শনিক এ নিয়ে কথা বলেছেন৷ তবে কনশাসনেস বলতে বেশীরভাগ পাশ্চাত্য দার্শনিকেরা নিজের চিন্তার ব্যাপারে সচেতনতাকে বুঝিয়েছেন। যেমনঃ দেকার্ত বলেন আমি আমার চিন্তার ব্যাপারে সচেতন অর্থাৎ ‘aware’, ‘conscious’। সার্ত্রেও এর আশেপাশে কিছু একটা মনে করতেন৷ কনশাসনেস শব্দটি বলতে একপ্রকার সাধারন সচেতনতাকেই তারা বুঝাতেন। কিন্তু বর্তমানে এসে দেখা যায় শব্দটি কোন একটা পরম কিছুর নির্দেশনা হিসেবে অনেকে ব্যাবহার করেন। আর এজন্যই অনেক প্যাঁচের তৈরী হয়েছে।

এজন্য অনেকের মনে প্রশ্ন জন্মেছে, ‘Is consciousness God?’ কেননা বিজ্ঞানের স্বর্ণযুগের আগে ধর্মের বেশ প্রভাব ছিলো। তাই বর্তমানে এসে পরম, চরম হিসেবে কনশাসনেসকে নির্দেশ করলে সবার দৃষ্টি সেই ধর্মের দিকে যায়। কিন্তু প্যাঁচটা হলো দর্শন কিংবা বিজ্ঞানে এমনকী মনোবিজ্ঞানে কনশাসনেস শব্দটা বলতে ‘sense’ ও ‘senseless’ এই অবস্থার দিকে নির্দেশ করে। মানে ঘুরেফিরে সাধারন সচেতনতা। এখন এই সচেতনতার আবার গভীরতা আছে৷ সে মাত্রা অনুযায়ী ফ্রয়েড সাব-কনশাস, আনকনশাস, কনশাস এই তিনভাগে এর স্তরকে ভাগ করেছেন৷ অপরদিকে ইয়ুং আরও একধাপ গভীরে প্রবেশ করে কালেকটিভ আনকনশাসের স্তরটি নির্ণয় করেছেন। এখান থেকে এসব স্তরের মেমোরী, ইনফরমেশন, বাসনা, প্রবৃত্তি এসবও উঠে এসেছে। সেইসাথে পারসোনালিটি, ইগো এসবের ব্যাপারও চলে এসেছে। এই ব্যাপারগুলোকে দেখলে মনে হবে মানুষের সাধারন কনশাসনেস অবস্থা একেক স্তরে গেলে একেক রকম পরিস্থিতি তৈরী করে।

এরপর বর্তমানে এসে আরও কয়েকটি স্তরের কথা শুনতে পাওয়া যায় সেগুলো হলো সুপার কনশাসনেস, কসমিক কনশাসনেস, হায়ার কনশাসনেস ইত্যাদি। এগুলো নিয়ে অনেক মডেলও রয়েছে।

যাইহোক, বর্তমানে কনশাসনেস বলতে অনেকে যে পরম, চরমকে বুঝিয়ে থাকেন সেটার ব্যাখ্যাবলি দার্শনিকেরা অন্যভাবে, অন্যশব্দের দ্বারা দিয়েছেন৷ দার্শনিক দেকার্ত বলেন, “I think therefore I am.” অর্থাৎ, “আমি চিন্তা করি, তাই আমি আছি।” এখন দেকার্ত ‘I’ কে কোন অর্থে বুঝিয়েছেন সেটা জানাটাও গুরুত্বপূর্ণ। কেননা ‘I’ এরও অনেক মিনিং হয়। তিনি কী তার ‘আমি’ দিয়ে সেই চরমকে নির্দেশ করেছেন যাকে বর্তমানের অনেক স্প্রিরিচুয়ালিস্টরা কনশাসনেস নামে আখ্যা দিয়ে থাকে। কিন্তু এখানে এসে একটু হতাশ হতে হয় কেননা দেকার্তকে সশরীরের পাওয়া সম্ভব নয়, তার কথাগুলোয় এখানে ভরসা। এ নিয়ে আমি একটা বড় আর্টিকেল লিখেছিলাম। চাইলে এই প্যারার নিচে দেওয়া লিঙ্কে ক্লিক করে ব্লগটি পড়ে দেখতে পারেন। আশা করি এখানে কনফিউশনের ওপর একটা আলো পড়লেও পড়তে পারে।  👇👇👇

 

দেকার্তের “আমি চিন্তা করি তাই আমি আছি” – এর ক্রিটিক ও অন্যান্য।

 

তো যা বলছিলাম, দেকার্ত যদি তার চিন্তাকেই সব মনে করে বসে থাকে বা এটা শুনে আপনার যদি এরকম মনে হয় তাহলে আপনার কাছে প্রশ্ন আপনি কী আপনার চিন্তা? কে আপনি? এ ধরনের প্রশ্ন করতে ওস্তাদ ছিলেন রমণ মহর্ষি। আপাতত ওখানে না যাই। দেকার্ত আরেকটা কাজও করেছিলেন দেহ ও মন দুটি স্বতন্ত্র বিষয় বলে তিনি এক ডুয়ালিজমের সৃষ্টি করেছিলেন৷ পাশ্চাত্যে এর বেশ প্রভাব পড়ে।
দেকার্ত ঈশ্বরের ব্যাপারেও আলাদা মত দেন। কেননা তখনও ঈশ্বর ধারণটা অতটা উবে যায়নি। আর কনশাসনেসের নয়া ইন্টারপ্রিটেশনও আমদানি হয়নি।

এবার আসি দার্শনিক স্পিনোজার ব্যাপারে। তিনি তার সর্বেশ্বরবাদী দর্শনে সবকিছুকেই ঈশ্বর বলে গণ্য করেন। তিনি এই প্রকৃতিতে যা কিছু আছে সবকিছুর মাঝেই ঈশ্বরের অস্তিত্ব খুঁজে পান। স্পিনোজার সর্বেশ্বরবাদী ধারণা ও তার দর্শনের বিভিন্ন বিষয়ে ব্যাখ্যা নিয়ে তিন পর্বের একটা আর্টিকেল লিখেছিলাম৷ লিঙ্কে ক্লিক করে পড়তে পারেন।

স্পিনোজার দর্শনে দ্রব্যের ধারনাটাও গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। এই দ্রব্যকেও তিনি চরমত্ব প্রদান করে সেটাকেই ঈশ্বর বলে গণ্য করেন। এখন যদি কেউ কনশাসনেসকে সেই চরম বলে মনে করে সে এই স্পিনোজার বক্তব্যের সাথে বোঝাপড়া করে নিতে পারে। কিন্তু তাদের ব্যাবহার করা কনশাসনেস শব্দটি যদি তারা ঈশ্বর, চরম বলে গণ্য করেন তাহলে এখানে প্যাঁচের সৃষ্টি হবে৷ কেননা এ শব্দটি বলতে তারা বুঝিয়েছেন নিছক সচেতনতা অর্থে। মানে নিজের যে সেলফ বা ব্যক্তিত্বগত আইডেনটিটি আছে তার ব্যাপারে সচেতনতাকে বুঝিয়েছেন।

স্পিনোজার দর্শন প্রসঙ্গ – ০১

স্পিনোজার দর্শন প্রসঙ্গ – ০২

স্পিনোজার দর্শন প্রসঙ্গ – ০৩

 

এখন আপনি যদি আনন্দের সাথে স্পিনোজার ঈশ্বর দিয়ে ধর্মীয় ঈশ্বর মিলাতে যান তাহলে আপনি ধরা খাবেন কেননা স্পিনোজার ঈশ্বর ও ধর্মীয় ঈশ্বর অনেকটাই আলাদা অর্থে রূপায়িত হয়ে গিয়েছিল সেই সময়টায়। এছাড়াও একেক দার্শনিকের ঈশ্বর নিয়ে একেক মত রয়েছে। তাই তাদের ঈশ্বরের কনসেপ্টকে তাদের মত করে না বুঝলে বা ভুলেও নিজের কনসেপ্ট দিয়ে ফেলতে গেলে প্যাঁচের সৃষ্টি হবে৷

দার্শনিক কান্টও কনশাসনেস নিয়ে সচেতনতাকে বুঝিয়েছেন। কিন্তু চরমের বেলায় তিনি বলেছেন তা জানা যায়না ও এটা ইন্দ্রিয়ের জগতে এর কোন ব্যাবহারিকতা নেই। তাই তার দর্শনে তিনটি স্তরের সৃষ্টি হয়েছে। প্রথম হলো সত্তার জগৎ, দ্বিতীয়টি হলো ইন্দ্রিয়ের জগৎ ও তৃতীয়তে মাঝখানে আছে যুক্তি, বুদ্ধি মানে ইন্দ্রিয় দিয়ে সব সংবেদন মনে প্রবেশ করে এরপর বুদ্ধি তার বিভিন্ন ক্যাটাগরি দিয়ে বোধে তথা ‘understanding’ এর পর্যায়ে নিয়ে যায় ও জ্ঞান হিসেবে জানতে পারা যায়। তবে তা সবসময়ই স্বরূপের অবভাস। মূল স্বরূপকে কখনও জানা যায়না। এখানে তার দর্শন অজ্ঞেয়বাদে পড়ে যায়। তার মানে চরমকেই, এখানে কান্ট স্বরূপত সত্তা তথা ‘Noumena’ বলেছেন। এখন এই অর্থে যদি আপনি কনশাসনেস বলতে চান তাহলে ঠিক আছে। কিন্তু কোন বৈজ্ঞানিক, নিউরোসায়েন্টিস্ট কনশাসনেস বলতে এমনটা বোঝেন না। এছাড়াও কান্ট আদৌ তার ‘Noumena’ বুঝেছিলেন কীনা বা এটা তার একটা দেওয়া নাম কীনা এ ব্যাপারেও সন্দেহের অবকাশ থেকে যায়। কেননা মেনে নিলেন তো ফেঁসে গেলেন। বিষয়টা খুবই ট্রিকি ও ইগোর কারসাজি রয়েছে।

এদিকে আবার হেগেল তার দ্বান্দ্বিক ভাববাদ দিয়ে ‘Absolute Idea’ তে গিয়ে ঠেকলেন। এখানেও একই কেস। মার্টিন হাইডেগার তার ‘Godot’ এ কী লিখলেন তা সেই-ই ভালো জানে। নিৎসে তার ‘Beyond Good & Evil’ দিয়ে ঐপারে কিছু একটা বোঝাতে চাইলেন। এভাবে গড়াতে গড়াতে ও পাশ্চাত্যের দর্শন প্রাচ্যের দ্বারা প্রভাবিত হতে হতে সেখানকার আধ্যাত্মতার সাথে মিশতে মিশতে ননডুয়াল কনসেপ্ট, অদ্বৈতবাদ কনসেপ্টের আমদানী করলো ও এখান থেকে ধীরে ধীরে কনশাসনেসটা পরম, চরমের স্থানে এসে পড়ল। অন্তত এভাবে ব্যাবহার করাটা কিছু কিছু সার্কেলে শুরু হয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞান, দর্শন মনোবিজ্ঞানের এসব শাখাগুলোতে তাদের ধারণাকৃত কনশাসনেসের মিনিং সম্পূর্ণ আলাদা।

এছাড়াও কনশাসনেস নিয়ে স্প্রিরিচুয়ালিস্ট ধারাতেও নানা মতভেদ রয়েছে। কেননা এখানেও নাম, শব্দ এসবের খেলা রয়েছে। যা আমি পর্যায়ক্রমে আলোচনা করব।

তবে একটা বিষয় এখানে মনে রাখা ভালো যে, কনশাসনেস শব্দটা এখন যে অর্থে ব্যাবহার অনেকেই অনেকভাবে ব্যাবহার করছে তার ভেতরের মিনিং যে ব্যক্তির মিনিং করা অর্থেই অপর ব্যক্তি বুঝছে বা বিপরীতভাবে বোঝাচ্ছে এমনটি নয়। যেমনঃ মিচিও কাকু ও রজার পেনরোজ যখন কনশাসনেস নিয়ে কথা বলেন তখন তারা ম্যাটেরিয়ালিস্ট প্যারাডাইমের ভেতর থেকেই কনশাসনেস ব্যাপারটাকে নির্দেশ প্রদান করেন। কনশাসনেস মানে তাদের কাছে মানুষের নিজ আইডেনটিটি সম্পর্কে সচেতনতা মাত্র। আর এটি কীভাবে আসে বা হয় এ ব্যাপারে তারা বিভিন্ন মডেল ও থিওরী প্রদান করেন বা আরও উন্নততর মডেলের খোঁজের আশাবাদ ব্যক্ত করেন। ব্যস এটুকুই।

এবং বর্তমানে যারা আধ্যাত্মিক গুরু টাইপের ব্যক্তি তারা কনশাসনেসকে তাদের পুরনো ঘরানার আধ্যাত্মতাকে নতুন মোড়কে, নতুন পরিস্থিতিতে প্রকাশ করার জন্য চরম, পরম এসবের সাথে যুক্ত করে দেন বা ব্যাখ্যা করে থাকেন। অপরদিকে তাদের এ ব্যাখ্যা শুনে নাস্তিক, ম্যাটেরিয়ালিস্ট, কিছু কিছু বিজ্ঞানীরা গোঁড়া ধর্মের ঈশ্বর মনে করে ক্ষেপে যায় বা ইগনোর করে দেয়।

দার্শনিক মার্ক্স এই সব প্যাঁচগোচ বিদায় করার জন্য হেগেলের ভাববাদকেই উড়িয়ে দিয়েছেন। কিন্তু উড়ালেই তো সমস্যা মিটে যায়না। অবশ্য তার পরিস্থিতি অনুযায়ী তার এরকমটা করাটাই হয়তো ঠিক ছিল। অবশ্য তার ক্ষেত্র আলাদা। তবে বর্তমান পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা।

এর মূলে রয়েছে এই কনশাসনেস ও এই কনশাসনেসের অনেক লেভেল রয়েছে। এর ওপর নির্ভর করে ইগোর ডেভেলপমেন্টের ব্যাপারও জড়িত হয়ে গিয়েছে যা নিয়ে আমি আর্টিকেল লেখা শুরু করেছি৷ তবে কনশাসনেসের কিছু ব্যাপার আগে একটু পরিষ্কার করা প্রয়োজন। তাই এই লেখা।

মনোবিজ্ঞানের পাড়ায় দেখা যায় যে, মানুষের পারসোনালিটি টাইপ, কনশাস বিহেভিয়ার, বিভিন্ন ধরনের পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার এসবসহ আরও নানাবিষয় দেখা যায়। আসলে এসবই বিশ্লেষণী ধারার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। আমরা যদি আমাদের মনকে নিয়ে এর নানাধরনের উপাঙ্গগুলো নিয়ে বিশ্লেষণ করতে বসি তাহলে নানা ধরনের অজানা তথ্যই বেরিয়ে আসবে৷ পাশ্চাত্য তার বস্তুগত ধারা অনুসারে বিশ্লেষণ করে এগিয়েছে বলে, আমরা মনের ক্ষেত্রে এসেও ফ্রয়েডের হাতে মনোবিশ্লেষণের দেখা পাই। অর্থাৎ, আমাদের সচেতনতারই বিভিন্ন মাত্রা ও স্তরের সন্ধান আমরা পাই। কিন্তু এসবই কী রিয়েল কনশাসনেস? এসব সন্ধান করতে করতে প্যারাসাইকোলজি নামক ব্যাপারটির কথা মনে পড়ে গেলো। আমরা মাঝে মাঝে মনের শক্তি দিয়ে অনেককে অনেক অদ্ভুত কিছু করতে দেখি বা তাদের কথা শুনে থাকি। অনেকের আবার সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম বিষয়ের ব্যাপারে সচেতনতা জন্মে। তাহলে এরকম উচ্চমাত্রার অদ্ভুত অভিজ্ঞতার সচেতনতা কী কনশাসনেস? এভাবে ধরে ধরে আগাতে আগাতে হয়ত আমাদের সামনে আরও অনেক কিছুই আসতে পারে।

যাইহোক, কনশাসনেসের ক্ষেত্রে রিয়েলিটির ব্যাপারও চলে আসে। এখন মানুষ যেখানে বাস করছে সেটা কী আদৌ রিয়েল, এখন অনেক প্যারালাল ইউনিভার্স, মাল্টিভার্সের কথা শোনা যায়। তাহলে কোন ভার্সের রিয়েলিটি একচুয়াল রিয়েলিটি। নাকী অজস্র রিয়েলিটি আছে যার মধ্য থেকে আমাদের পৃথিবী একটা রিয়েলিটি, এর মধ্য থাকা ছোটখাটো মানুষ এখন এই লেখাটা পড়ছি স্বচক্ষে এটা ছোটখাটো রিয়েলিটি?

রিয়েলিটির কথা বলতে গিয়ে এখন চলে আসে সিমুলেশন থিওরীর কথা। এই থিওরীর প্রথম সূত্রপাত ঘটে দেকার্তের হাত ধরে। পরে দার্শনিক হ্যানস মোরাভেকের দ্বারা এটি আলোচিত হয়। তারপর দার্শনিক নিক বসটর্ম এর বিস্তৃত একটি তত্ত্ব দাঁড় করান। এ তত্ত্ব অনুযায়ী আমরা যে রিয়ালিটিতে আছি এর বাইরেও উর্ধ্বে আরও অনেক রিয়ালিটি রয়েছে যা ইনফিনিট। যেমনঃ আপনি, আমি কম্পিউটারের স্ক্রিনে কোন গেম খেললে গেমের ভেতরে যে চরিত্রটি রয়েছে তার দৃষ্টিকোণ থেকে সে গেমের ভেতরেই ডুবে আছে, সে বুঝছে না যে, তার বাইরে কেউ তাকে পরিচালনা করছে, সে তার গেমের রিয়েলিটিকে বাস্তব বলে মনে করে বসে আছে।

এভাবে মানুষকেও হয়তো তার উর্ধ্বে কোন রিয়েলিটি তাকে পরিচালনা করছে, কিন্তু সে তার এই রিয়েলিটিকেই আসল বলে ধরে আসে আছে। এভাবে ঐ উর্ধ্বের রিয়েলিটিকে তার উর্ধ্বের রিয়েলিটি এভাবে ইনফিনিট পর্যন্ত রিয়েলিটির সিমুলেশন হয়ে চলছে। এছাড়াও অনেকে মনে করেন যে, এই রিয়েলিটি সিমুলেট করে এমন রিয়েলিটি তৈরী করাও সম্ভব যে, যা আমরা ভার্চুয়াল রিয়েলিটির মত করে আলাদা করে পার্থক্য করতে সমর্থ হবো না। ওই সিমুলেটেড রিয়েলিটি এতটাই বাস্তব হবে যে, যেমনটা আমরা আমরা আমাদের বসবাসকৃত জগতকে বাস্তব বলে মনে করে থাকি। এভাবে দেখা যায় যে, ‘Life is a dream’ এমন একটা ব্যাপার চলে আসে। আমরা যেন এক স্বপ্ন থেকে আরেক স্বপ্নে চলে বেড়াচ্ছি। কনশাসন মনের একেকটা তৈরীকৃত স্বপ্ন থেকে আরেকটা স্বপ্নে যেন আমাদের এই অগ্রযাত্রা।

এ জায়গায় এসে ভারতীয় দার্শনিক ও আধ্যাত্মবাদী শংকরের কথা মনে পড়ে যায়, ‘এ জীবন হলো মায়া’। অবশ্য তিনি এসব সিমুলেশন থিওরী টিওরী জানতেন না। অনেক ‘New age spiritualist’রা এরকম মায়া টাইপের ব্যাপারটা একটু আধুনিকভাবে সিমুলেশন দিয়ে ব্যাখ্যা করে। আমি অবশ্য দুটোকে এক বলছি না, কেননা এর প্রেক্ষাপট আলাদা। তবে এই মায়া ও ভ্রমের গভীরত্ব মনে হয় সিমুলেশন থেকে শংকরের তত্ত্বে আরও বেশ ভালো করে মালুম হয়। এটা নিতান্তই আমার ব্যক্তিগত মত।

একদম বাস্তব আরেকটি রিয়েলিটির অভিজ্ঞতা বেশকিছু সাইকেডেলিকের মাধ্যমেও হয় বলে অনেকে তাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। এরকম একটি সাইকেডেলিক রয়েছে যার নাম সিলভিয়া ডাইভানোরাম। এটা গ্রহণে নাকী তার সামনে অন্য আরেকটা কনক্রিট রিয়েলিটি তৈরী হয়ে যায়। তবে এ বিষয়টি বেশ সাবজেক্টিভ বিধায় সবার ক্ষেত্রে এমন নাও ঘটতে পারে।

কিন্তু এরকম অসংখ্য রিয়েলিটি তৈরী হলে, অসংখ্য প্রকার কনশাসনেস থাকলে কোনটিই বা একচুয়াল রিয়েলিটি এবং কোনটিই বা আমাদের সেই কাঙ্ক্ষিত কনশাসনেস? প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়।

অতঃপর তাহলে চলুন ধর্মতত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে কনশাসনেসের বিষয়টি নেড়েচেড়ে দেখা যাক।

 

ধর্মতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে কনশাসনেসঃ

 

ধর্মতত্ত্ব বা থিওসফি নিয়ে যারা আলোচনা করেন তারা কনশাসনেস বলতে মূলত সেই চূড়ান্ত গড বা ঈশ্বরেকেই নির্দেশ করে থাকেন। তবে এ জায়গায় গডের ধারণাটা একটু অন্যরকম। কোন বিজ্ঞানীরা যখন মহাবিশ্বের মডেল, ব্যাখ্যা এগুলো দিয়ে ধাপে ধাপে একটা অনুসন্ধান করে যান ও কনশাসনেসের ব্যাপারেও যখন অনুসন্ধান ও বিচার, বিশ্লেষণ করে আগাতে চান ও এসব ব্যাপারে বলেন তখন ধর্মতাত্ত্বিকরা তাদের এপ্রোচটা মূলত ধরতে পারেন না। এবং তা না করতে পেরে তারা কনশাসনেসকে তাদের কনসেপ্ট দিয়ে মাপে। কিন্তু আদতে একই বিষয়ে দুটি মতামত ভিন্নরকম।

এখন এখানে এসে একটা চমৎকার সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে৷ অনেক থিওসফিস্টরা কনশাসনেসকে গড বলে স্বীকার করে তাদের ব্যাপারগুলোকে বিজ্ঞানের সাথে মিলসম্পন্ন করার চেষ্টা করছেন। অপরদিকে এর প্রতিক্রিয়ায় বিজ্ঞানীরা একে ডিবাঙ্ক করে তাদের ব্যাখ্যা ও মডেল দিয়ে কনশাসনেস ও এটার একটা চূড়ান্ত সমাধানের দিকে অগ্রসর হবার চেষ্টা করছে। যদি কনশাসনেস বলতে থিওসফীয় গডমূলক এমনকিছু থেকে থাকে তাহলে তা অবশ্যই ধরে ফেলা সম্ভব। কিন্তু এ জায়গায় কারোরটা নিয়ে কারো জলঘোলা করার প্রয়োজন নেই। কেননা কনশাসনেসকে গড করে তোলা বা বিজ্ঞানের গড নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হবার কোন কারণ নেই।

তারপরও এরকম ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া চলছে। হার্ডকোর ম্যাটেরিয়ালিস্ট সায়েন্টিস্ট যারা তারা যেমন ম্যাটেরিয়াল ব্যাপার স্যাপারের মাঝেই নিজেকে আবদ্ধ রাখেন বা এর গন্ডির মাঝেই ব্যাপারগুলোকে ব্যাখ্যা করতে চান, ঠিক তেমনি থিওসফিস্ট চিন্তাভাবনার মাঝে তাদের গডও ম্যাটেরিয়ালিস্টিক! তারা গডকে একজন ব্যক্তিরূপে কল্পনা করে থাকেন কিংবা কোন প্রেরিত মহাপুরুষের আকৃতি বলে মনে করেন। এভাবে তাদের স্বর্গ, নরক এবস্ট্রাকট কোন বিষয় নয় বরং কনক্রিট, ম্যাটেরিয়াল! এমনটা আমাদের ছোটবেলায় অনেকের হতো গডের কথা আসলেই সাদা দাঁড়িওয়ালা বুড়ো লোকের একটা ছবি আমাদের মানসকোণে ভেসে উঠত। তো যারা হার্ডকোর ম্যাটেরিয়ালিস্ট তথা বস্তুবাদী তাদের বস্তুগুলো আপনি হাত দিয়ে ছুঁতে পারবেন বা একটা বাস্তব দৃশ্যমানতা পাবেন। কিন্তু থিওসফিক্যাল বা ধর্মতত্ত্বের গড ও এর আশেপাশের কনসেপ্ট হলো কাল্পনিক কিন্তু ম্যাটেরিয়ালিস্টিক কল্পনা। অর্থাৎ, এ পৃথিবীতে না পাওয়া গেলেও মৃত্যুর পরে ম্যাটেরিয়াল তথা বস্তু টাইপের কিছু একটা আমার হাতে লাগবে। এখন মাঝে এই বিজ্ঞানীদের কৌতূহলজনক কনশাসনেস নিয়ে এই স্থূল আর সূক্ষ্ম বস্তুবাদীদের মাঝে যুক্তিতর্ক চলছে।

কিন্তু পদার্থবিদদের মধ্যে এমন অনেকেই ছিলো যারা যেমন ম্যাটার নিয়ে তীব্রভাবে মাথা ঘামাতে পারতেন তেমনি মেটাফিজিক্যাল কিংবা মানবজীবনের গভীরতর প্রশ্নগুলো নিয়ে রহস্যের মাঝে ডুবে থাকতেও পারতেন। তারা কখনই এ দুটি ব্যাপারকে এক করে দেখেননি। তারা জানতেন বিজ্ঞানের সীমা কতটুকু বা একে নিয়ে কতটুকু এগোনো যাবে ও সেইসাথে গড, কনশাসনেস এসব ব্যাপারে তাদের ছিলো প্যাশনেট ও গভীর এপ্রোচ। এদের মধ্যে কয়েকজন হলেন, আলবার্ট আইন্সটাইন, পল ডি ব্রগলি, নীলস বোর, ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ, ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক, শ্রডিঙ্গার আরও অনেকে।

তবে তারা গড, কনশাসনেস নিয়ে মাথা ঘামালেও এদেরকে তথাকথিত ধার্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে ধরা যায়না। বরং তারা এটাকে একটা বোধসম্পন্ন প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতেন। মিস্টিক ধারায় এরকম অনেক ব্যক্তিত্ব রয়েছেন যারা একটা অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে তারা চরমকে জানার প্রয়াস চালিয়েছিলেন। এরকম ধরনের অনুসন্ধিৎসু পিপাসা যেসব বিজ্ঞানীদের নাম উল্লেখ করা হলো এদের মাঝেও ছিলো ও তাদের অনেক মিস্টিকাল ধাঁচের লেখাপত্র রয়েছে। সম্প্রতি আমেরিকান প্রখ্যাত দার্শনিক কেন উইলবারের “Quantum Question” নামক বইটি পড়ছি। এখানে অনেক চমৎকারভাবে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানীদের পথিকৃৎদের মিস্টিকাল কথা ও বিজ্ঞান এবং আধ্যাত্মিকতার এ দুটি শাখার মাঝে যে কনফিউশন রয়েছে তা বেশ সুন্দরভাবে স্পষ্ট করা হয়েছে। সম্পূর্ণ বইটি পড়া শেষ হলে এ ব্যাপারে লেখার ইচ্ছা রইল।

বিজ্ঞানকে যদি অবজেক্টিভ, ম্যাটেরিয়াল হিসেবে বিবেচনা করতে হয় তাহলে স্পিরিচুয়াল বিষয়গুলো হলো সাবজেক্টিভ বিষয়। এবং এ দুটির মাঝে পদ্ধতিগত পার্থক্য রয়েছে যা একটার সাথে আরেকটি গুলিয়ে না ফেলাই ভালো। তবে অনেক পপ কালচার সায়েন্টিস্ট ও এর সমর্থকেরা স্পিরিচুয়ালিস্টদের ধর্মের সাথে গুলিয়ে ফেলে ও এটাকে ইগনোর করে দেয়। অন্যদিকে ধর্মীয় সেক্টগুলোত আছেই বৈজ্ঞানিকভাবে তাদের ব্যাপারগুলো প্রমাণ করার জন্য যেটা আরও কনফিউশন সৃষ্টি করে। আমাদের অবজেকটিভ ওয়ার্ল্ড ও সাবজেক্টিভ ওয়ার্ল্ড এ দুটির সীমানা ও পদ্ধতিগুলো বুঝতে হবে। তারপর এ দুটিকে যথা জায়গায় প্রয়োগ করার মাধ্যমে একটা পূর্ণাঙ্গ ধারণা আমরা পেতে পারি। সমন্বয়ের মানে এই নয় যে, একটি ক্ষেত্রের সাথে আরেক ক্ষেত্র মিলিয়ে ফেলা বরং দুটোর সীমাবদ্ধতা, প্রয়োগ এগুলো বুঝে সহাবস্থান করা। তাহলে যে রিয়ালটি বা একচুয়াল কনশাসনেসের খোঁজে আমরা নেমেছি এর একটা হোলিস্টিক ভিউ পাওয়া যেতে পারে।

মিস্টিকদের কথা যখন চলেই আসল তাহলে চলুন মিস্টিসিজম পাড়ায় কনশাসনেসকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে তা জেনে আসা যাক।

 

মিস্টিকদের দৃষ্টিকোণ থেকে কনশাসনেসঃ

 

অনেক মিস্টিক অনেকভাবে কনশাসনেসকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। তবে আমরা যদি প্রাচীনকালের দিকে যাই তখন এই শব্দটি ঐভাবে তাদের ভাষাগত প্রকাশে প্রকাশিত হয়নি। প্রাচ্যধারায় কনশাসনেস যে অর্থের দিকে ইশারা করে তা পাশ্চাত্যধারা থেকে ভিন্ন অন্তত প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য মিস্টিসিজমের ধারাগুলো থেকে ভিন্ন। বর্তমানে কনশাসনেসকে অনেক কনটেম্পোরারি মাস্টাররা পরমসত্তার সাথে যুক্ত করে ব্যাখ্যা করেন।

এদের মধ্য সদগুরু কনশাসনেসকে আল্টিমেট ইন্টেলিজেন্স হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন যে, মেডিকেল টার্মিনোলজিতে কনশাসনেস বলতে প্রধানত যা বোঝায় তা আদৌ কনশাসনেস নয়। ইংরেজি কনশাসনেস শব্দটি ভিন্ন ভিন্ন ব্যাবহার অনুসারে সঠিকভাবে আলাদা করা হয়নি। যার কারণে একটা দ্বিধাদ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। তিনি ‘কনশাসনেস’ ও ‘ওয়েকফুলনেস’ এ দুটি টার্ম ব্যাবহার করেন। এখানে ওয়েকফুলনেস মানে হলো আমাদের জেগে থাকা অবস্থাকে বোঝায়। আবার আমরা যখন অচেতন হয়ে পড়ি তখন আমরা এ ওয়েকফুলনেস অবস্থাটা হারিয়ে ফেলি। এছাড়াও, তিনি ইন্টেলেক্ট ও ইন্টেলিজেন্স এ দুটির মাঝেও পার্থক্য করেছেন। ইন্টেলেক্ট বলতে তিনি মানুষের বুদ্ধিগত অংশের দিকটি বোঝান। আর এ অংশটিই আমাদের বর্তমান জীবনের সবচেয়ে ডোমিনেটিং ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে। কিন্তু এগুলোকে ছাপিয়ে একটি একটি ইন্টেলিজেন্স আছে যা আমাদের মানবীয় বুদ্ধি তথা ইন্টেলেক্টের বাইরের একটা অবস্থা যা একসেস করতে পারলে মনের একটা বাউন্ডারিলেস এক্সপেরিয়েন্স হয়। তো মনের এরকম আরও নানাধরনের ডাইমেনশন রয়েছে যা বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় সেসবের অভিজ্ঞতা অর্জিত হতে পারে।

সদগুরু বলেন যে, আমার শরীর ও তোমার শরীর ভিন্ন ভিন্ন এবং এবং এ থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতার মাঝে ভিন্নতা রয়েছে। কিন্তু তোমার কনশাসনেস আর আমার কনশাসনেস বলে কোন জিনিস। কনশাসনেস মানে হলো কনশাসনেস। এটি সবজায়গায় বিচরণশীল। এমনকী যেখানে কোন আকার নেই সেখানেও এটি রয়েছে। এটা হলো সমস্ত অস্তিত্বের ভিত্তিস্বরূপ। মানুষের হিসেবে আমাদের অতি জটিল ফাংশন রয়েছে তা যদি আমরা সঠিকভাবে ব্যাবহার করতে পারি তাহলে সেই কনশাসনেসকে এক্সপেরিয়েন্স করা সম্ভব। তিনি আরও বলেন যে, মহাবিশ্বে গ্যালাক্সি দেখার জন্য টেলিস্কোপের প্রয়োজন হয়। গ্যালাক্সি গ্যালাক্সির জায়গায় রয়েছে, টেলিস্কোপ এখানে কেবল একটি যন্ত্র যা দিয়ে আমরা গ্যালাক্সি দেখতে পারি। টেলিস্কোপ কখনও গ্যালাক্সি উৎপাদন করেনা। এটা কেবল একটা যন্ত্র যা দিয়ে গ্যালাক্সি দেখা সম্ভব হয়৷ তেমনিভাবে মানবদেহের বিভিন্ন অংশ মিলিয়ে এটিও একটি যন্ত্রের মত। এ যন্ত্রটি যদি আমরা একটা সঠিকভাবে একটা অবস্থানে কোনপ্রকার আইডেনটিটি, ফিলসফি এসব ঝেড়ে ফেলে ওপেন রাখতে পারি তাহলে আমাদের কনশাসনেসকে এক্সেস করতে পারা বা উপলব্ধি করতে পারার একটা সম্ভাবনা খুলে যায়৷ এখন এটাকে অনেকে অনেক মিনিং দিতে পারে কারও কাছে এটা কনশাসনেস হতে পারে, কারও কাছে বিয়িং হতে পারে, কারও কাছে গডও হতে পারে। তবে সদগুরু এটাকে মিনিং দেন লাইফ হিসেবে। সদগুরু এও বলেন যে, মিনিং দেওয়াটাও হলো একটা সাইকোলজিক্যাল প্রসেস।

আপনি কখনও এমনকিছুকে মিনিং দিতে পারবেন না, যার কোন মিনিং-ই নেই। কিন্তু একটা মিনিং আমরা সাইকোলজিক্যাল প্রসেস হিসেবে দিয়ে থাকি। কিন্তু একে কখনও বোঝা সম্ভব নয় তবে আমরা একে উপলব্ধি করতে পারি। এরজন্য ব্রেনের কিছু সাইকোলজিক্যাল প্রসেস বিশ্লেষণ করলেই একে বোঝা যাবেনা কেননা এটা বোঝার উর্ধ্বে। একে কোন ল্যাবে নিয়ে পরীক্ষা করে বা কোন বাহ্যিক যন্ত্রপাতি দিয়ে বোঝা যাবেনা। তবে আমরা মানুষ হিসেবে নিজেই যে একটি অতি জটিল যন্ত্র একে সঠিকভাবে ব্যাবহারের মাধ্যমে আমরা একে উপলব্ধি বা এক্সেস করতে পারি। কেননা আমরা বাইরে যে যন্ত্রপাতি দেখি যা দিয়ে আমরা পরীক্ষানিরীক্ষা করি তা তো আমরাই বানিয়েছি। তাহলে যে এত জটিল যন্ত্র বানিয়েছে সে তো আরও জটিল যন্ত্র। তাই আমরা মানুষ হিসেবে এই শরীরের সমস্ত অংশকে ভালোভাবে ব্যাবহারের দ্বারাই কনশাসনেসের এক্সেস আমরা করতে পারি।

এ থেকে একটা কথা মাথায় এলো যে, মানুষ যে যন্ত্র বানালো সেই যন্ত্র কী একটি মানুষকে বানাতে পারবে?

মিচিও কাকু আশঙ্কা করেন যে, অদূর ভবিষ্যতে মানুষ ও রোবট সমকক্ষ হয়ে দাড়াবে। আমার কথা হলো ব্রেনের দিক দিয়ে নাহয় রোবটরা মানুষের সমান সমানই হয়ে দাড়ালো। কিন্তু বাকী অংশ যেমন কিডনী, পাকস্থলী, লিঙ্গ এসব রোবটে কীভাবে ফাংশন করানো সম্ভব। ধরে নিলাম এটাও সম্ভব। তারপরও রোবট কী মানুষের মত টয়লেট করতে সক্ষম হবে? বা তাদের মলমূত্রই বা কেমন হবে? একটু বেশী বেশীই হয়ে গেলো বোধহয়! আসলে ব্যাপারটা হলো বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সমপর্যায়ে যাওয়া মানে এই নয় যে, মানুষের মতই হয়ে যাওয়া। মানুষের আবেগ ব্রেন দিয়ে ব্যাখ্যা করা গেলেও প্রাণের ব্যাপারটার দিক দিয়ে বিষয়টা ভাবতে হবে। আমরা মনে মনে যে আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী এআই রোবটের কল্পনা করছি তা আসলে একটু ধোঁয়াশা বলেই আমার কাছে মনে হয়। কেননা আমরা যে, সিলিকন কনশাস নিয়ে ভাবছি তা বুদ্ধিবৃত্তিক সচেতনতার একটা অংশ মাত্র। এই অংশের প্যাটার্ণ, মানুষের একটা প্যাটার্ণের মত গড়ে ফেলা গেলেও হুবুহু মানুষের মত করে ফেলা যাবে কীনা তা একটা প্রশ্ন বটে? কেননা মানুষের বুদ্ধির বাইরে আরও ডাইমেনশন থাকলেও তো থাকতে পারে! বুদ্ধিতে আইডেনটিফাইড হয়ে থাকলে আমরা তাহলে এআই তৈরী করে নিজেরাই খাল কেটে কুমির ডেকে আনছি।

তাই নয় কী?

এখানে এসে বিজ্ঞানের কনশাসনেস চিন্তায় একটা সীমানা চোখে পড়ে। আধুনিক বিজ্ঞানের থিওরী, মডেল ধীরে ধীরে জটিল থেকে জটিলের দিকে যাবে। হয়ত এমন একটা সময় আসতে পারে যে, বিজ্ঞানের মডেল বোঝার জন্য একটা এআই লাগবে! সবচেয়ে মজার কথা হলো বিজ্ঞানের আবিষ্কৃত এআই গ্র্যান্ডমাস্টারদের পর্যন্ত হারিয়ে দিচ্ছে কোন মায়াদয়া না করেই। কথা হলো মানুষরা অতি চালাক ও অলস হবার জন্য খালি সুযোগ খোঁজে। খেয়াল করে দেখুন, কেন শুধু শুধু আমাদের বুদ্ধি খরচ করে ব্রেনের তেল ফুরোতে হবে। তার থেকে ভালো না এআইকে কাজে বসিয়ে দিয়ে আমরা বাকী সময় অন্যকিছু করবো বা অনুসন্ধান করবো। এআই হলো মানবের বুদ্ধির এক্সটেনশন। একজন মানুষ যে কয়টা প্যাকেট বানাতে পারে, মেশিন তার থেকে বেশী পারে; এটা মানুষের হাতের এক্সটেনশন। তাই ক্যালকুলেটিভ বিষয়গুলো এআই এর হাতে ছেড়ে দিয়ে আমরা বাকী সময় হাওয়া তো খেতেই পারি ভবিষ্যতে৷ কিন্তু তখন আমরা করবোটা কী! এটাই হলো এক্সিস্টেনশিয়াল ক্রাইসিস। কেননা এখন তো আমরা বুদ্ধি তথা ইন্টেলেকচুয়াল প্রসেসকেই গড বানিয়ে ফেলেছি, রিজনই হলো আমাদের মা, বাবা সব। যার ফলে এআই সবকিছু করলে আমরা সামনে করার কিছুই দেখিনা। অথচ মানুষের একটা সুযোগ আছে তার এই কাঠামোবদ্ধ সীমা থেকে একটু বের হয়ে গভীর কিছু ছুঁতে পারার এটাই অনেক মিস্টিকরা ইশারা করেন। তবে এটা কোন যন্ত্র দিয়ে নয় বরং নিজের ভেতরে খুঁজতে হবে। বাইরে হাতড়ে নয় বরং অন্তর হাতড়ে খুঁজে বের করতে হবে।

এভাবে হাতড়াতে হাতড়াতে হয়ত একদিন দেখা যাবে, যা আমি হাতড়াচ্ছি তা আর কেউ নয় এই কনশাসনেস স্বয়ং আমি নিজেই!

এজন্যই আরেক রহস্যবাদী জিদ্দু কৃষ্ণমূর্তি বলেন যে,

 

“Observer is observed”

 

অর্থাৎ,

“পর্যবেক্ষক হলেন পর্যবেক্ষিত বস্তু।”

 

এ কথা শুনেই আমাদের মন একটা ধাক্কা খেয়ে বসে। আমাদের মন সহসা যেন শূন্য কূপে পড়ে যায়। প্রশ্ন কিছুক্ষণের জন্য যেন থেমে যায়। পর্যবেক্ষক, পর্যবেক্ষিত বস্তু হলে পর্যবেক্ষকই কী বা সে বস্তুটাই কী। সব দ্বৈততা যেন মিশে গিয়ে এক অদ্বৈততার জন্ম দেয়। একে কনশাসনেস বলা যায় যার ভেতর সমস্তকিছু ঘটে চলেছে। কৃষ্ণমূর্তি একে বলেন “Awareness”। আমরা যখন ধীরে ধীরে আন্ডারস্ট্যান্ডিং এর গভীর থেকে গভীরে প্রবেশ করতে থাকি তখন এটিতে গিয়ে ‘Awareness’ ছাড়া আর কিছুই থাকেনা। কৃষ্ণমূর্তির সাথে কয়েকজন নিউরোসায়েন্টিস্টদের একটা টকশোর মত একটা ভিডিও দেখেছিলাম আমি লেখার শেষে এ ভিডিওর লিংক দিয়ে দেবো৷ এই ভিডিওতে কথোপকথন আপনারা শুনে দেখতে পারেন। অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইনসাইট পাবেন।

এই অদ্বৈততা নিয়ে পাশ্চাত্যে প্রাচ্যেরই একটি ধারার নতুন নামে ব্যাপারটি বেশ পরিচিতি লাভ করেছে যা হলো ননডুয়ালিটি। এটি মূলত বেদান্ত দর্শনেরই ধারা যা পাশ্চাত্যে “Advaita Vedanta”, “Nonduality” নামে পরিচিতি লাভ করেছে। এরসাথে আবার কিছুটা জেনের টাচ্ রয়েছে। কেননা সেখানেও দ্বৈততার উর্ধ্বে শূন্যতার দিকে ইশারার একটা ব্যাপার স্যাপার রয়েছে। এখন আমরা একটু এ ব্যাপারে আলাপ করার চেষ্টা করবো।

ননডুয়ালিটির বিষয়টি এতটা বিস্তৃত যে, একে এই কনশাসনেসের আলোচনায় সেভাবে ব্যাখ্যা করতে গেলে আলাদা করেই লেখা উচিত। তারপরও কিছুটা আলোচনা তো করা যেতেই পারে। এ পৃথিবীতে আপনি যা দেখছেন বা যেভাবে আপনার মন বিষয়গুলোকে প্রত্যক্ষণ করছে, এরদিকে তাকালে আপনি অসংখ্য ডুয়ালিটি তথা দ্বৈততার উদাহারণ দেখতে পাবেন। এমনকী ভাষার ক্ষেত্রেও আপনি এ দ্বৈততা দেখতে পাবেন। ভালো-খারাপ, হ্যাঁ-না,সুখ-দুঃখ,আলো-অন্ধকার ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রকৃতপক্ষে আমাদের মনের প্রকৃতি এমন যে এটা সবকিছুকে ভাগ করে দেখতে পছন্দ করে। এটা এতটাই গভীর যে, আপনি যদি এটি নিয়ে অনুধ্যান করতে বসেন আপনি হতচকিত হয়ে যাবেন।

তাহলে ননডুয়ালিটি কী?

ননডুয়ালিটি হলো এসব ডুয়ালিটির উর্ধ্বে চলে যাওয়া। তবে আপনি কী লক্ষ্য করেছেন যে, ননডুয়ালিটির বিপরীত যে ডুয়ালিটি তা আপনার মন ইতোমধ্যেই সূক্ষ্মভাবে ভেবে নিয়েছে। তাহলে দেখেছেন প্যাঁচটা কোথায়। আপনার পুরো মনের ম্যাকানিজম ডুয়াল ন্যাচারে চলে সে আপনি যত সাধু, সন্ন্যাসীই হোন না কেন। তবে এটা আপনাকে গভীর থেকে গভীরে উপলব্ধি করতে হবে ও সজাগ হতে হবে৷

এখন বিজ্ঞানকে একটু টেনে আনি৷ বিজ্ঞানের কল্যাণে যে আমরা নাথিংনেস, শূন্যতা এসবের কতগুলো ধারণা পাই কিংবা স্বচক্ষে নমুনাও দেখতে পাই, তা দেখে শূন্যতা নিয়ে, বুদ্ধের নির্বান নিয়ে, এমনকী জেনপাড়ার নাথিংনেস নিয়েও অনেক কাসুন্দি ঘাটা হয়েছে৷ কিন্তু শূন্যতা বলতে বিজ্ঞান যা বুঝে থাকে বা আমরা আমজনতাদের মনে যে প্রতিচ্ছবি ভাসে তা আদৌ শূন্যতা নয়। একটু খেয়াল করলে দেখবেন যে, আমাদের মনে একচুয়াল শূন্যতার কোন বোধই নাই, যা আছে তা হলো মনের ধারণকৃত কনসেপ্ট ও বৈজ্ঞানিক চিত্রায়িত মহাকাশের স্পেসীয় শূন্যতা। ঐ কথাগুলোই সার! অথচ এ শূন্যতার বিপরীতে আমাদের মনে পূর্ণতার ধারণাও রয়েছে। যেমনঃ আমরা যখন কোন গ্লাসে পানি দেখি তখন বলি গ্লাসটি পূর্ণ। আবার গ্লাসে পানি না দেখলে বলি গ্লাসটি শূন্য! গড়পড়তায় সাধারণের কাছে শূন্যের এমন একটা চিত্রপট রয়েছে। কিন্তু আসলেই কী তা শূন্য? এখন এটাকে আরেকটু জটিলে গিয়ে পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞান আরেকটু উচ্চতর শূন্যতার ধারণা দেয়। কিন্তু সেই নাথিংনেস কী আসলেই নাথিংনেস? নাকী চোখ ও ধর্তব্যের মাঝে না আসতে পারা সীমাযুক্ত নাথিংনেস। আমরা বলি অসীমত্ব। কেন বলি? কেননা আমাদের মনের কনসেপ্ট ধারণের একটা সীমা রয়েছে। কিন্তু কিছু একটা তো আখ্যা দিতে হয়; তাই এই অসীমত্বের ধারণা। তবে অসীমত্বের সাথে সাথে সসীমত্বও এসে যায়।

আপনি কোথায় যাবেন তাহলে?

এখানেই আপনাকে নিজের সাবজেক্টিভ তথা ফার্স্ট হ্যান্ড এক্সপেরিয়েন্সের দিকে তাকাতে হবে। অর্থাৎ, বাইরে অব্জেক্টিভ ভিউকে সাবজেক্টিভে নিয়ে আসতে হবে ও এর ডায়নামিক্স বুঝতে হবে৷ প্রাণীকুলের বিবর্তন যত জটিল পর্যায়ে গিয়েছে ও এর ফলস্বরূপ মানুষে এসে এর দুটি আউটলুক তৈরী হয়েছে একটি হলো সাবজেক্টিভ ও অবজেক্টিভ ভিউ যা অন্যান্য ম্যাটেরিয়াল বস্তর মাঝে অর্থাৎ যার মাঝে প্রাণের বিকাশ হয়নি তার মাঝে নেই। তবে তার মানে এই নয় যে, এতে কনশাসনেস নেই এই জড়ের মাঝেও কনশাসনেস রয়েছে। বরং আমরা যদি একে আরও বৈচিত্র্য সহকারে বলি তাহলে বলা যেতে পারে যে, কনশাসনেস কোথায় কোথায় নেই। এটি দেহ কিংবা বিদেহী সর্ব জায়গায় ব্যাপৃত হলেও এর বিকাশে যে সৃষ্টি তার মাঝে বৈচিত্র্য আছে বৈকী। এর মাঝে যাদের আমরা জড় বলি তারা একটু ডাম্ব প্রকৃতির, বেশ কনক্রিট। অপরদিকে জীবের বেলায় দেখা যায় এটি ক্রমে ক্রমে সরল থেকে জটিল আকার ধারণ করে ও মনে হয় প্রত্যেকের বৈজ্ঞানিক টার্মে আপন আপন কনশাসনেস ওয়ার্ল্ড রয়েছে। তবে মানুষের কথা যদি বলতে হয় তাহলে তার যে আচরণ প্রক্রিয়া, স্বভাব সেখানে সাবজেক্টিভ ও অবজেক্টিভ দুটো বিষয় বেশ ভালোভাবে প্রত্যক্ষ করা যায়। এখানে এসে মানুষের পন্ঞ্চইন্দ্রিয় দিয়ে যে অভিজ্ঞতা হয় তা তার মনে গিয়ে যেভাবে একটা ভাব তৈরী করছে তাকে বলা যায় ফার্স্ট হ্যান্ড এক্সপেরিয়েন্স। কিন্তু এই এক্সপেরিয়েন্স যখন আপনি বিচার বিশ্লেষণ করতে যাবেন অবজেক্টিভলি তখন তা হয়ে যাবে সেকেন্ড হ্যান্ড এক্সপেরিয়েন্স। আর বৈজ্ঞানিক সমস্ত অবজেক্টিভ এনালিসিস হলো এই সেকেন্ড হ্যান্ড এক্সপেরিয়েন্স। যার ফলে এটি সাবজেক্টিভ বিষয়গুলোর ব্যাপারে এখনও একটু একগুয়েমি বয়ে বেড়াচ্ছে। কেননা ননডুয়ালিটির বিষয়টা শুরুই হয় সমস্ত বিচার বিশ্লেষণ ঝাড়াঝাড়ির পর আপনি যখন নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার প্যাঁচের মাঝে গিয়ে অনুধ্যান করতে আরম্ভ করেন।

ননডুয়ালিটি সম্ভবত সামনে বিজ্ঞানের জন্য একটি সম্ভাবনার নতুন দুয়ার উন্মোচন করে দিতে পারে।

যাইহোক, তারপরও একটা ভেজাল কিন্তু শেষ হয়নি। সাবজেক্ট, অবজেক্ট এ দুটোও তো ডুয়ালিটি!

তাহলে উপায় কী?

উপায় হলো, এসব ডুয়ালিটির উর্ধ্বে চলে যাওয়া। এখন উর্ধ্বে গিয়ে একে আপনি ননডুয়ালিটি বলেন, কনশাসনেস বলেন, জীবন বলেন বিষয়টা আবার চরমে গিয়েই খাবি খাচ্ছে। আসলে মাঝে মাঝে আমাদের সীমাকে স্বীকার করতে মনের বড় কষ্ট হয়। এটাও ইগোর একটা চালাকী। সে সবকিছুকে কনসেপ্টে এনে একটা বুঝ দিয়ে তা দখল করতে চায় ও স্মার্ট সাজতে চায়। অথচ, তার ওপরে চরম কিছু স্বীকৃতি সে উপলব্ধি করতে চায়। আবার অনেকে আছে অতিসহজে করেও ফেলে। দুজনেই ইগোকে সায় দিয়ে চলেন। যে স্বীকার করতে চায়না সে যুদ্ধ করে চরমের সাথে, যে অতিসহজে স্বীকার করে নেয় সে অনুসন্ধানের পথে পা মাড়ায় না, সে সুবিধা খোঁজে, সে মাথা খাঁটাতে প্রস্তুত নয়। এই দুপ্রকারে ইগো বলদামি করে থাকে।

বলতে বলতে ইগো টেনে আনতেই হলো। কী আর করবো, কনশাসনেস, ইগো ভাই ভাই। একজনকে রেখে আরেকজনের কথা বললে মাইন্ড করে বসে।

মূল আলোচনায় ফিরে আসা যাক।

কনশাসনেস নিয়ে ভারতীয় রহস্যবাদী গুরু ওশো অনেকগুলো ভাগের কথা বলেন। তিনি বলেন যে, ফ্রয়েড, ইয়ুং মানুষের চেতনার অতি গভীরে, নিচের দিকে গিয়ে সাধারণ জাগ্রত কনশাসনেসসহ subconscious, unconscious, collective unconsciousness এসব স্তর আবিষ্কার করেছেন। কিন্তু ওশো বলেন তারা নিচের দিকের স্তরগুলোতে যেতে পারলেও উর্ধ্বস্তরগুলো সম্পর্কে বুঝে উঠতে পারেননি। নিচে সাধারাণ লেভেলের কনশাসনেস যখন ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতে থাকে এটি তখন পর্যায়ক্রমে higher consciousness, super consciousness, cosmic consciousness – এ প্রবেশ করে। কসমিক কনশাসনেসরই আরেকটি সাদৃশ্যপূর্ণ শব্দ এখন শোনা যায় তা হলো Universal Conscioisness, মানে মহাবৈশ্বিক চেতনা। তবে এগুলো সবকিছুই স্তরীয় বিশ্লেষণ মাত্র। রহস্যবাদীদের মধ্যে যারাই এ ব্যাপারে কিছু প্রকাশ করেছেন তারা একে এক ধরণের অবর্ণনীয় অবস্থা বলে অভিমত দিয়েছেন। তারা একে কোন আলাদা বস্তুগত জিনিস বলে প্রকাশ করেননি বরং সমস্ত বস্তু-অবস্তু, দ্বৈততা সবকিছুর মূলআধার হল এই কনশাসনেস, বাংলায় যাকে বলে চৈতন্য।

রমণ মহর্ষি “Who am I” এই তিনটি শব্দ দিয়ে পশ্চিমে ব্যাপক সাড়া ফেলে দিয়েছেন। আমি যে কে এই প্রশ্ন যেন আজও রহস্যময়। আমি কী আমার দেহ, মন, চিন্তা নাকী অন্যকিছু? এরকম প্রশ্ন করতে করতে যখন অনুসন্ধানী গভীরে তলাতে থাকে তখন এক পর্যায়ে একটা কিছু হয়ত এরকম থাকে যেখানে কোন প্রশ্ন থাকেনা, সমস্ত প্রশ্ন ঝরে যায়। এই যে প্রশ্নহীন অবস্থা এটাকেও অনেকে একচুয়াল কনশাসনেস হিসেবে ইঙ্গিত দিতে চান। তবে এই অবস্থা যে কী তা সঠিকভাবে নির্ধারণও করা যায়না। কেমন যেন একটা ধোঁয়াশা ও রহস্য এর চারপাশে ঘিরে থাকে। তাই যন্ত্রপাতি দিয়ে ধরাও যায়না, বিজ্ঞানের মত করে প্রমাণও করা যায়না। তাই মাঝে মাঝে চিন্তা আসতে পারে যা বোঝা যায়না তাকে নিয়ে মাথা না ঘামালেই চলে! ঠিক তাই মাথা না ঘামানোই ভালো কিন্তু শেকড় কী গাছের চিন্তা না করা ছাড়া থাকতে পারে?

যাইহোক, আমরা মাঝে মাঝে রহস্যবাদী ও স্প্রিচুয়ালিস্টদের সাথে জড়িত অনেক অদ্ভুত অদ্ভুত ঘটনার কথা শুনে থাকি। এগুলোর মধ্যে কয়েকটি হলো টেলিপ্যাথি, সাইকোকাইনেসিস, অ্যাস্ট্রাল ট্রাভেল, ইএসপি ইত্যাদি। এগুলো নিয়ে অনেক বিজ্ঞানীরা অনুসন্ধানও করছেন, তবে বেশীরভাগই এসবকে অপবিজ্ঞান বলে নাকচ করে দিতে চান। যদি ইএসপি টাইপের এরকম বিষয়াদি থেকেও থাকে তার প্রকৃতির কারণে ও বিষয়টি সাবজেক্টিভ নির্ভর হওয়ায় বৈজ্ঞানিক অবজেক্টিভ পদ্ধতিতে ধরাটা একটু কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। এখন এ ব্যাপারগুলো আবার সরাসরি উড়িয়েও দেওয়া যায়না৷ এগুলোকে ননম্যাটেরিয়াল, ননফিজিক্যাল বলেও অনেকে বলতে চান। অবশ্য মিচিও কাকু টেলিপ্যাথি, টেলিপোর্টেশন, টেলিকাইনেসিস এসব ঘটনাগুলো অদূর ভবিষ্যতে বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি হিসেবে ব্যাবহার হবার আশা রাখেন।

এখন যেখানে ম্যাটার রয়েছে সেখানে যদি কিছু মিস্টিকাল অভিজ্ঞতা বা ঘটনাকে ননম্যাটেরিয়াল বলে বুঝতে চাওয়া হয় বা আখ্যা দেওয়া হয় তাহলে এটাও সেই একই ডুয়ালিটিতে পড়ে যায়। ম্যাটেরিয়াল হোক কিংবা ননম্যাটেরিয়াল হোক এসবকিছুই একই কনশাসনেসে অন্তর্গত। ম্যাটার ও ননম্যাটারকে বলা যায় এর দুটি অংশ।

সবকিছুই যদি কনশাসনেসের অংশ হয় তাহলে এসব মানুষের সাথে ঘটে যাওয়া কিছু কিছু ঘটনা আমাদের কাছে রহস্যময় লাগে কেন। লাগে এই কারণে যে, আমরা ব্যাপারটা জানিনা। জানিনা বলেই রহস্য আরোপ করি। এছাড়াও আমরা আমাদের সাবজেক্টটিভিটির ব্যাপারে খুব একটা সচেতন নই। যার কারণে এর সূক্ষ্ম ব্যাপারগুলো আমাদেরকে অবাক করে দেয়। আপনি দুইভাবে জীবনের দিকে আগাতে পারেন, হয় জীবনের সবকিছুই রহস্যময় নাহয় জীবনের কোনকিছুতেই রহস্য নেই, সবই সাধারণ। কিন্তু কিছু সাধারণ, কিছু রহস্যময় এখানেই মনের দ্বৈততা ঘটে ও কনশাসনেস দুইভাগে ভাগ হয়ে যায় যেমনভাবে সাবজেক্টিভ ও অবজেক্টিভ দুটি অভিজ্ঞতা আলাদা হয়ে যায়। এর একটা নিয়ে সত্য, ফ্যাক্ট প্রমাণের লড়াই করতে চাওয়ার অর্থই হলো সত্যের ব্যাপারে অনাগ্রহ প্রকাশ করা।

আর এভাবে কনশাসনেসের হাজারও ব্যাখ্যা দাড় করানো যায়। কিন্তু যতই দাড় করানো যাকনা কেন এটা বারবারই সাইকোলজিক্যাল ডিসঅর্ডারের মত একচুয়াল কনশাসনেসের স্প্লিট পারসোনালিটি তৈরী করে। যেমনভাবে মানুষ স্ক্রিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মাল্টিপল পারসোনালিটি তৈরী করে তেমনিভাবে একচুয়াল কনশাসনেসও অসীম সংখ্যক পারসোনালিটি তৈরী করতে পারে কিন্তু এটা ইলুশন ছাড়া কিছুই নয়। এজন্য শংকর এ জগতকে বলেছিলেন মায়া, ব্রক্ষ্ম বলেছিলেন একমাত্র সত্য। কিন্তু জগৎ মায়া হলেও এর ব্যাবহারিকতা শংকর মোটেই অস্বীকার করেননি। কিন্তু শংকরের কপাল খারাপ এই যে, তার কথার সরল বিশ্বাস সরল মনে মানুষ মেনে নিয়ে এটাকে ঘিরে নির্বুদ্ধিতা ও কুসংস্কার রচনা করে ফেললো। এ কারণে কোনকিছু ঠুস করে মেনে নেওয়া, গভীরতাকে নষ্ট করে; আর গভীরতা নষ্ট হলে প্রকৃত সত্য কাছে থেকেও বহুদূরে পড়ে থাকে।

মিস্টিসিজম টার্মিনোলজিতে বলতে গেলে কনশাসনেসের মাঝেই সবকিছু অন্তর্ভুক্ত। এ মহাজগতিক মনুষ্য চোখে দেখা, অদেখা সকলকিছুই এর মাঝে রয়েছে। এটি কারোর মাঝে নেই বরং সকল বস্তু, অবস্তু, ইত্যাকার সবকিছু এর মাঝে রয়েছে। পৃথিবী কিংবা অন্য গ্রহে যেসকল প্রাণী বা জড়বস্তু রয়েছে সবার মাঝে এটি রয়েছে এবং প্রত্যকেই প্রত্যকের অবস্থান থেকে তার মত করে সেই কনশাসনেসের সাথে সংযুক্ত রয়েছে। আমরা মানুষ হিসেবে আমাদের আইডেনটিটি বায়াসের কারণে আমরা আমাদের নরমাল কনশাসনেস যেটাকে বৈজ্ঞানিক টার্মিনোলজি অনুযায়ী সচেতনতা বলা যায় সেটাকে অধিকতর উন্নততর বলে মনে করি।

অনেক আধ্যাত্মিক ধারায় মানুষের এই সচেতনতার মাত্রাকে গ্লোরিফাই করে অন্যান্য প্রাণীদের বা বস্তুদের আনকনশাস বলে মানবজাতির সচেতন ক্ষমতাকে একটু শ্রেষ্ঠত্বের রঙে রাঙানো হয়েছে। কিন্তু এখানে একটা ব্যাপার বোঝা দরকার যে, আমরা যে বিড়াল, কুকুর, পিঁপড়া এদের যে আনকনশাস ভাবছি বা এও ভাবছি যে, আহা, বেচারারা এনলাইটেন্টড হতে পারেনা, কারণ তারা আনকনশাস বা তাদের কনশাসনেসের মাত্রা কম… এধরনের ভাবনাটা নিতান্তই সাবজেক্টিভ। বিড়াল, কুকুর আপনার মহাপুরুষীয় আলোকপ্রাপ্তিকে দুই পয়সা দিয়ে দাম দেওয়ার কোন প্রয়োজন নাই। বরং, মানুষের বুদ্ধি নামক একটা ইয়ে থাকার কারণে সে একচুয়াল কনশাসনেসের সাথে কানেক্টেড হতে পারেনা। অথচ বিড়াল, কুকুরকে দেখুন তারা নিশ্চিন্তে খেয়েদেয়ে একটা ঘুম দেয়, কে জানে হয়তো ঐ অবস্থাটাই তাদের জন্য এনলাইটেন্ড অবস্থা! ঐ মুহূর্তে হয়তো তারা আসল কনশাসনেসের সাথে কানেক্টেড হয়। কিন্তু যখন তাদের প্রবৃত্তি ডাক দিয়ে ওঠে তাদের আবার একটু বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে হয়।

একজন মানুষ হয়ে আপনি যতক্ষণ না পর্যন্ত আসলে কুকুর, বিড়াল, গরুর কনশাসনেসে ঢুকে তার ফার্স্ট হ্যান্ড অভিজ্ঞতা না নিতে পারছেন আপনি বুঝতে পারবেন না তাদের জগৎ কী, তাদের কাছে তাদের রিয়েলিটি কী। আপনি যতক্ষণ না পর্যন্ত একটি কাঠের চেয়ারে না পরিণত হচ্ছেন আপনি বুঝতে পারবেন না একটা কাঠের চেয়ারের অভিজ্ঞতা কী। এ মহাবিশ্বের সবকিছুই কনশাসনেসের মাঝে থাকলে বস্তু কিংবা অবস্তু সবাই তাদের মত করে তার সাথে যুক্ত। কিন্তু একেকজনের সাবজেক্টিভিটি অনুযায়ী একেকজন একেকভাবে কনশাসনেসকে বুঝে থাকে ও তার সাথে যুক্ত হয় বা বিচ্ছিন্ন হলে যুক্ত হবার আকাঙ্খা পোষণ করে।

মানুষ হিসেবে আমাদের অতি জটিল মস্তিষ্ক রয়েছে। এর কারণে আমরা বিভিন্ন ডাইমেনশনে নানাধরনের ব্যাপার উপলব্ধি করতে পারি। কিন্তু তাই বলে আমরা যে, প্রকৃতির অন্যান্য জীবদের দেখে একেকটা আনকনসাস, অনুন্নত ট্যাগ লাগিয়ে দেই এটা আমাদের জন্য ব্যাবহারিকতার বাইরে কিছুই নয়। কিন্তু আসলেই যদি গভীরে প্রবেশ করা যায় তাহলে অন্যান্য প্রাণীর ব্যাপারে আমাদের সেকেন্ড হ্যান্ড এক্সপেরিয়েন্স ছাড়া কোন জ্ঞানই নাই। এখানে ফার্স্ট হ্যান্ড এক্সপেরিয়েন্স মানে যার কেন্দ্র করে ঘটনাটা ঘটে তার নিজস্ব অভিজ্ঞতা, আর সেকেন্ড হ্যান্ড এক্সপেরিয়েন্স মানে হলো কেউ যখন কারও বা কোনকিছুর অভিজ্ঞতাকে কেটেছিড়ে বিশ্লেষণ করে বা পর্যবেক্ষণ করে।

যেমনঃ আমরা দেখি আকাশ থেকে বৃষ্টি পড়ে, কিন্তু বৃষ্টির যে অভিজ্ঞতা তা কী আমরা বুঝি? আমরা আমাদের ইন্দ্রিয় দ্বারা দেখা অভিজ্ঞতা অনুভব করি যেটা আবার আমাদের সাপেক্ষে ফার্স্ট হ্যান্ড এক্সপেরিয়েন্স। এখন কোন বৈজ্ঞানিক যদি যন্ত্রপাতি দিয়ে আমার ব্রেনে এই বৃষ্টি দেখার অনুভূতির ক্রিয়াকলাপ দেখতে চায় এটা হবে সেকেন্ড হ্যান্ড এক্সপেরিয়েন্স আমার ফার্স্ট এক্সপেরিয়েন্সের সাপেক্ষে। এভাবে চলতে চলতে আসল এক্সপেরিয়েন্স কতগুলো ব্যবহারিকতায় সমাবিষ্ট হয় ও এটা নিয়ে আমরা কিছু মানদন্ড গড়ে তুলি যা খুব উপকারী। কিন্তু উপকারী হলেই তা সত্য নয়, এজন্যই সত্যের পথ কঠিন হয় বরাবরই। বৃষ্টির তো মানুষের মত এনলাইটেন্ড হবার প্রয়োজন হয়না, হয়ত হয় তবে তাদের ফাংশন আলাদা। এভাবে মহাবিশ্বের সবকিছুরই ফাংশন আলাদ, আলাদা, ইউনিক, তারা ইউনিকভাবে তাদের এক্সপেরিয়েন্সগুলো নিয়ে থাকে তা আমাদের দৃষ্টিতে হোক উন্নত বা অনুন্নত।

এতো গেলো সাবজেক্টিভিটির কথা, কিন্তু এর উর্ধ্বে গিয়ে রয়েছে চূড়ান্ত কনশাসনেস যার মাঝে এই সাবজেক্টিভ, অবজেক্টিভ সমাবিষ্ট হয়ে আছে। প্রতিটি বস্তু, অবস্তুরই এই কনশাসনেসের কানেকশনের প্রয়োজন হয়। যেমনঃ আমরা যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হই তখন আমরা কোথায় থাকি। এই ব্যাপারটা আমাদের সাধারণ কনশাসনেস অজ্ঞ থাকে বলে এটাকে বাড়িয়ে ঐ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টার জন্য আধ্যাত্মিক ধারাগুলোতে কনশাসনেসের এরকম নানাস্তর করা হয়েছে। মানুষবাদে অন্যান্য প্রাণীদের নিয়ে যদি আমরা সম্পূর্ন কনসেপ্টের বাইরে চলে আসি তাহলে দেখা যায় যে, ওটা ওরা প্রকৃতির বেশ কাছাকাছি মানে কনশাসনেসের খুব কাছাকাছি। কিন্তু আমরা আমাদের ফাংশনের পূর্তির জন্য বা ওদের মত চলতে চাইনা বলে এবং আমাদের ন্যাচার ভিন্ন হওয়ার কারণে আমরা বুদ্ধির মাধ্যমে জটিল অগ্রযাত্রা করে সেই কনশাসনেসের দিকে ধাবিত হই। এভাবে আমরা প্রাণীদের বেলায় আনকনশাস ও আমাদের বেলায় হায়ার কনশাসনেসের ব্যাপারে সচেতনতন হবার সম্ভাবনা দাবি করি। অবশ্য এর প্রয়োজন রয়েছে নাহলে মানুষের নিজস্বতা বলে কিছু থাকবেনা। ফুলের যেমন আপন নিজস্বতা রয়েছে, তেমনি মানুষসহ প্রতিটি প্রাণী, বস্তুরই নিজস্বতা রয়েছে তবে কেউ কারও থেকে উন্নত বা অবনত হিসেবে নয়, বরং ইউনিক হিসেবে তারা একে অপরের সাথে সহাবস্থান করছে একই লক্ষ্যের উদ্দ্যেশে, একই সুতায় নিজেদেরকে গেঁথে রাখার কামনায় যা হলো পিওর কনশাসনেস।

 

কনশাসনেস নিয়ে আলোচনার মুড়িঘন্টঃ

 

এতক্ষণ কনশাসনেস নিয়ে যেসব আলোচনা করা হলো তা থেকে অনেক টার্ম, নতুন শব্দ আমরা জানতে পারলাম। কিন্তু এই কনশাসনেস বিষয়টা এতটাই ব্যাপক যে, এটিকে নিয়ে লিখলে লেখার শেষ হবেনা। কেননা যা লিখছি, যা লেখা হচ্ছে ও ভবিষ্যতে লেখা হবে তার সবই যে এর অন্তর্ভুক্ত! যতদূরে যাওয়া যায় পথ যেন আরও অসীম থেকে অসীমে ছড়াতেই থাকে ঠিক উত্তম কুমার আর সুচিত্রা সেন অভিনীত সিনেমার একটা গানের মত, “এই পথ যদি না শেষ হয় তবে কেমন হত তুমি বলো তো?” এটাই হলো মানুষের প্রশ্ন… কেমন হতো এই পথটা?

উত্তরে অস্তিত্ব মুচকী হেসে বলে, “তুমিই বলো।”

অথচ বলা যে থামতে চায়না, আবার একই পথে ফিরে আসে, “এই পথ যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হতো… তুমি বলতো?

” যদি পৃথিবীটা স্বপ্নের দেশ হয়, তবে কেমন হতো… তুমি বলো তো?”

– “তুমিই বলো…”

এখানেও সেই নিজের দিকে ইশারা ফিরে আসে। কনশাসনেস নিয়ে আমার সমস্ত প্রশ্ন প্রতিফলিত হয়ে আমার দিকেই ফিরে আসে। সে যেন চুপিচুপি জানাতে চায় মন নামক যন্ত্রে যেসবের অবিরত যাতায়াত তার অনুভব বোঝার জন্য তুমি কোন সহকারীকে ডেকোনা, কোন ভাষাকে ডেকোনা, কোন তত্ত্বকে ডেকোনা।

তাহলে ডাকব কাকে?

– “কাউকে ডেকোনা।”

শুধু দেখো, অনুভব করো, আপনিতেই সব ঘটবে।

কিন্তু কিছুই তো ঘটেনা, জবাবও মিলেনা।

এ যেন শিশুর মত অবস্থা। কিছুতেই কিছু হয়না। কেবলই ক্লান্তি।

যা বাইরে খোঁজা হয়, পর্যবেক্ষণ করা হয় ও একে সুনির্দিষ্ট একটি নাম দেওয়া হয়… সেই নামের উৎপত্তি হয় কোথা থেকে? জ্ঞানের উৎপত্তি হয় কোথা থেকে? এ নিয়ে দর্শনের তর্ক এখনও থামেনি। থামবে বলে মনেও হয়না। নতুন মানুষরা আসবে নতুন করে তারা এই উৎপত্তির ব্যাখ্যা করবে। এভাবে ব্যাখ্যা পাল্টে যায় কিন্তু কনশাসনেস যদি তাকে ফান্ডামেন্টাল হিসেবে ধরে নিই তা কী পাল্টায় নাকী পাল্টায় না?

অনেককাল থেকেই মনে হতো এই যে জীববিজ্ঞানে থাকা একেকটি প্রাণীর বৈজ্ঞানিক নামগুলো এগুলো তো কারও না কারও দেওয়া। আমরা যে, হোমো স্যাপিয়েন্স বা আমরা যে মানুষ এসব মনে করি… এসব তো আমরাই দিয়েছি… এগুলোর ব্যাবহারিক কার্যকারীতা ছাড়া এটা কী বিশুদ্ধ সত্য? মনে তো হয়না। কোন অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে ওটাকে আমরা পর্যবেক্ষণ করি এবং সেটাকে একটা ট্যাগ দিয়ে শ্রেণীবিন্যাস করি। এই শ্রেণীবিন্যাসগুলো কাজে লাগলেও এটাই যে সত্য তা তো নাও হতে পারে।

আমরা যুক্তির কথা বলি… কিন্তু যৌক্তিক অবরোহ প্রণালীতে আশ্রিত আশ্রয় বাক্যগুলোর ওপর ভিত্তি করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রমাণ নির্গত হয়। কিন্তু শর্ত হলো আশ্রয়বাক্যগুলো সত্য হতে হবে। তাহলে আশ্রয়বাক্যগুলো যে সত্য এটার গভীরে না তলিয়ে দেখলে সত্য খোঁজায়, কনশাসনেস বোঝায় যুক্তির কী মূল্য? আরোহ প্রণালীতেও সকল প্রামাণ্য ঘটনা দেখাও সম্ভব নয়, কয়েকটি ঘটনা দেখে সেটাকে সত্য বলে ধরে নেওয়া তাই বা কতটুকু সত্য?

রহিম মরণশীল
করিম মরনশীল
জলিল মরণশীল
রহিম, করিম, জলিল সকলেই মানুষ এবং মরণশীল
সুতরাং, সকল মানুষ মরণশীল।

ব্যাপারটা খুব পরিষ্কার। সবাই মরণশীল। কিন্তু এই মৃত্যুটা আমরা কতটুকু জানি? বিজ্ঞান বলে, চার্বাক দার্শনিকরা বলে, মৃত্যুর পর কনশাসনেসও শেষ হয়ে যায়। মানে আমার সচেতনতা লুপ্ত হয়ে যায়। আবার ধর্ম বলে মৃত্যুর পর দেহনাশ হয়, আত্মা ও আধুনিক ব্যাখ্যানে কনশাসনেস চৈতন্য থেকে যায়। অনেক তন্ত্রশাস্ত্র মতে সূক্ষ্মদেহ শরীর থেকে বের হয়ে যায়।

মৃত্যুর পর কী থাকে না থাকে সেটা পরের কথা। প্রশ্ন এসে যায় যে, মৃত্যু কী? মৃত্যু কী নিতান্তই একটা ধারণা, কনসেপ্ট নয়? নিজের মরার অভিজ্ঞতা নাহলে কীভাবে বলা যায় যে মানুষের মৃত্যু হয়? আমরা আমাদের মাঝ থেকে কাউকে গত হতে দেখি, এটাকে আমরা মৃত্যু নাম দিয়েছি। কিন্তু নিজে তো কখনও মরে দেখিনি তাহলে বুঝবো কীভাবে মৃত্যুর পর কনশাসনেস থাকে নাকী থাকেনা, আত্মা থাকে নাকী থাকেনা, সূক্ষ্মদেহ আদৌ থাকে নাকী থাকেনা, পরকাল বলে আদৌ কিছু আছে নাকী নেই।

বিজ্ঞান, ধর্ম, দর্শন, আধ্যাত্মের ধারণা যাই বলি না কেন আমরা সবকিছু জেনে বসে আছে। কোথাও পড়ে হয়তো, আগে থেকে প্রমাণিত সত্য ও অথোরিটি দ্বারা স্বীকৃত বলে কিন্তু নিজের কাছে এগুলোর মানে আমরা জানতে চাইনা। জানলেই যে, ইমারত ভেঙ্গে পড়বে।

এজন্য ধার্মিকরা তাদের পুঁথির উত্তর নিয়ে খুশী, বিজ্ঞানীরা তাদের সূত্র নিয়ে, দার্শনিকেরা তাদের প্রশ্ন নিয়ে, আধ্যাত্মবাদীরা তাদের জয়গুরু নিয়ে খুশী, কেবল নিজেকে নিয়েই কেউ খুশী নয়!

নিজের দিকে আঙ্গুল আসলে হয় আঙ্গুল কেটে ফেলো নাহয় মুখ ফিরিয়ে বলে দাও ওসব নিয়ে আমাদের শাস্ত্র, প্রশ্ন, সূত্র, গুরুরা মাথা ঘামায় না।

দার্শনিক ওকাম তাই এসব ভেজাল দেখে তার রেজারই নিয়ে ছাঁটাই করে দিতে চাইলেন এসবকিছু এবং বললেন বাহুল্যতা পরিহার করতে। তত্ত্ব, প্রমাণ যত বোধগম্য ও সার্বজনীন রাখা যায় ততটাই ভালো।

কিন্তু তা দিয়ে কী হলো?

প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঘটে গেলো, মানুষ মারা গেলো। ব্যাবহারযোগ্য সূত্র দিয়ে যন্ত্র আবিষ্কার হচ্ছে ও তা দিয়ে মারা যাচ্ছে আরও মানুষ। অবশ্য উপকারও হচ্ছে এ লেখাটা লিখতে পারছি। তাই বলে ঘটনা তো অস্বীকার করা যায়না।

এতক্ষণ বিজ্ঞান, ধর্ম, দর্শন, আধ্যাত্ম ইত্যাদি দিক দিয়ে কনশাসনেস নিয়ে যাই আলোচনা করা হলো,,,দেখা যায় যে, এসবের প্রতিটি ক্ষেত্রে এসেই কোন এক চূড়ান্ত কিছুর সমাধান বা জানার আকুতি প্রতিটি ক্ষেত্রের মাঝেই বিদ্যমান। যার কারণে কনশাসনেসের পিছনে সবাই পড়েছে। এই নিয়ে একেক গোষ্ঠীর একেক মতামত।

তবে কারটা সত্য? কার ব্যাখ্যাটা গ্রহণযোগ্য?

নাকী সবারটাই সত্য তাদের সসীম দৃষ্টিভঙ্গি থেকে?

কিন্তু সত্য কী খন্ড, খন্ডভাবে সত্য হয়, সত্য কী অনেকগুলো হয়? যদি তা নাহয়… অখন্ড সত্য কী রয়েছে? যদি থেকে থাকে… তাহলে তা কীভাবে রয়েছে – বস্তুগতভাবে আলাদা হয়ে যাকে নাকী বিষয়ীর সাথে এনটেঙ্গেল হয়ে?

এর সমাধান কীভাবে সম্ভব?

আমরা যদি প্রাচীন মিস্টিসিজমের ধারাগুলোর দিকে তাকাই, তারা বারবারই বলে এসেছে সত্য বা এক্ষেত্রে তাদের টার্মিনোলজি অনুযায়ী এখনকার ব্যাখ্যান অনুযায়ী কনশাসনেস তোমার বাইরে নয়, যাকে তুমি অন্যান্য বস্তুর মত আলাদা করে দেখতে পাবে। এটা তোমার ভেতরে রয়েছে। এই ভেতরের বিষয়েও আবার অনেক ধোঁয়াশা রয়েছে যা অনুপলব্ধ মন বুঝতে পারেনা। ভেতর বলতে কতটুকু ভেতরে? ভেতর বলতে এখানে এই বিষয়টার গভীরে তলিয়ে উপলব্ধি করার দিকে সম্ভবত ইঙ্গিত করা হয়েছে। কোন যন্ত্র দিয়ে শরীরের ভেতরটা কাটলে আমরা কনশাসনেস নামক কোন আলাদা জিনিস খুঁজে পাবোনা। বা মহাবিশ্ব চষে বেড়িয়েও আমরা এর সন্ধান পাবো না হয়তো। কেননা আমরা যাকে খুঁজছি, তার ভেতরেই আমরা।

একটি রূপক দিয়ে ব্যাপারটা বোঝানো যাক –

আপনি আপনার ডান হাতের কনিষ্ঠ আঙ্গুলের দিকে তাকান। এই কনিষ্ঠ আঙ্গুলটি চাইছে সে এমন একটা কিছুর সন্ধান করবে যা একেবারে সবকিছুর মূল বস্তু নিরপেক্ষ, ফান্ডামেন্টাল। তো সে সন্ধানে বেরোলো সে অনেক আঙ্গুলকেই ছুঁয়ে ছুঁয়ে, দেখে, ব্যবচ্ছেদ করে, বিশ্লেষণের সাহায্যে সবকিছু কীভাবে ঘটে তা ব্যাখ্যা করলো। এভাবে করতে করতে তার একদিন মনে হলো আচ্ছা এই যে, আমি এতকিছু করছি, এই “আমি” কে নিয়ে তাহলে একটু কাটাছেঁড়া করা যাক। কিন্তু এই আমি কে দেখতে গিয়ে দেখা গেলো যে, একে অন্যান্য বস্তুর মত করে দেখা যায়না, এটা যেন কেমন একটা আবছা অস্পষ্ট ছায়ার মত। তারপরও এসব দেখে বিভ্রান্তিতে যেন না পড়তে হয়, সে যুক্তি, বিশ্লেষণ করে করে ক্রমে ক্রমে জটিল জটিল ব্যাখ্যায় পৌঁছতে থাকলো। কিন্তু যতই এগোচ্ছে ব্যাপারগুলো স্থূল বস্তুসত্তার মত না থেকে থেকে সূক্ষ্ম হয়ে যাচ্ছে। যদিও এই সূক্ষ্মতাও একপ্রকার বস্তুর মতই, ধরার জন্য একটু বুদ্ধি লাগবে এইযা।

এরপর অবশেষে সে একদিন চিন্তা করলো সে নিজেকে দেখবে। এজন্য সে আয়না দিয়ে নিজের চেহারাকে দেখতে লাগল। কিন্তু হঠাৎ তার মনে হলো এটা তো তার চেহারার আয়নার প্রতিফলন মাত্র, তার আসল চেহারা কোনটা? তখন সে আরেকটু অগ্রসর হয়ে স্মার্টফোন হাতে নিলো ও এর মিরর ইফেক্ট ও মিরর ইফেক্ট ছাড়া একটি ছবি তুললো ও সন্তুষ্ট হলো যে, এইতো আমি নিজেকে দেখতে পারলাম। কিন্তু আরেকটা বিপত্তি ঘটে গেলো… ছবিতে তোলা তার ছবি তো সে নয়, হাজার হাজার পিক্সেলের সমষ্টি মাত্র যা একসাথে হয়ে তার চেহারার মত মনে হয় ও তার একটা অবয়ব তৈরী করে। তাহলে তো এবারেও তো আমি আমাকে দেখতে পেলাম না।

আচ্ছা, এই ব্রক্ষ্মান্ডের সবকিছু যদি আলাদা আলাদা হিসেবে একটি ক্ষুদ্র পিক্সেল হয় এবং এইসকল পিক্সেলগুলো গেঁথে গিয়ে যদি একটি ব্রক্ষান্ডের আকার ধারণ করে তাহলে এই পুরো ব্রক্ষান্ডকে মায়া বলা যায়না? কিন্তু কই আমি তো সবকিছুকে বাস্তব বলে ছুঁতে পারছি। মায়া বলে তো একেবারেই মনে হচ্ছেনা৷

তাহলে পিক্সেলের সমষ্টি যদি আমাকে আপাত বাস্তব আমার চেহারার অভিজ্ঞতা দিতে পারে, তবে এই পুরো ব্রক্ষ্মান্ডের মাঝে কী এমন কোন শক্তি নেই যে সে এই ব্রক্ষ্মন্ডকে মায়ারূপে প্রতিভাত করতে পারে এবং আমাদের সসীম জীবের কাছে মনে হতে পারে এটা একেবারে কনক্রিট। আর আমরা যদি এই এই ব্রক্ষান্ডের মায়ার মাঝে আটকে যাই তাহলে আমরা যে অবজেক্টিভ বাস্তবতা, ফান্ডামেন্টাল পদার্থ আবিষ্কার করতে চাচ্ছি তা কতটুকু বাস্তব বা তা অনুসন্ধানের পদ্ধতি কতটুকু খাঁটি সেই কাঙ্ক্ষিত কনশাসনেস, সত্যের তুলনায়?

কিন্তু… কিন্তু এভাবে তো জীবন চলেনা ও নীতিনৈতিকতাকেও অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করতে হয়। জীবনের কোন অর্থও থাকেনা। এভাবে ধরে নিতেই হবে কেন… যদি মায়াই হয়… তাহলে মিথ্যে অভিনয় তো করা যেতেই পারে। উইলিয়াম শেক্সপিয়ার তো এরকম করেই কিছু একটা বলেই গেছেন –

 

“The world is a drama stage & we are the actors.”

 

যাইহোক, এসব ভাবতে ভাবতে কনিষ্ঠ আঙ্গুলটি তার এ ধারণাটি ঝেড়ে ফেলে দিয়ে আবার ভাবনায় মন দিলো। এবার সে ভাবছে যে, আমি আমাকে কখনই আসলে দেখিনি। আমি অন্যের চেহারা দেখেছি কিন্তু তাও আধাআধা কেননা যেখানে আমার নিজের পর্যবেক্ষণই সীমাবদ্ধ সেখানে অন্যের চেহারার পর্যবেক্ষণ কতটুকু বস্তুনিষ্ঠ? তাহলে পর্যবেক্ষণের মূল্য নেই?

ধুর! তা হয় নাকী কোনদিন! অবশ্যই মূল্য আছে। যেহেতু আমরা আঙ্গুল পরিবার কেউ নিজেকে ঠিকভাবে চিনিনা, তাই একে অপরের সীমাবদ্ধ পর্যবেক্ষণ দিয়ে একটা উপযোগিতা সৃষ্টি করি। যার ফলস্বরূপ আমাদের নখগুলো যদি বড় হয়ে একে অপরকে ক্ষতবিক্ষত করতে উদ্যত হয় তখন আমার অন্য সহযোগী আঙ্গুল তা কেটে দিয়ে আমাকে সাহায্য করে। আবার আমিও তার নখ কেটে দেই। এভাবে কাটাকাটি চলে। কিন্তু দিনশেষে আমাদের সবারই একটাই প্রশ্ন কুঁড়ে কুঁড়ে খায়… আমি আসলে কে? সত্য কী, কনশাসনেস কী?

এভাবে কনিষ্ঠ আঙ্গুল ধীরে ধীরে এই “আমি” “আমি” বলা শব্দের দিকে তাকাতে থাকে। এরপর সে এটাতে তলাতেই থাকে, তলাতেই থাকে।

এরপর এতক্ষণ ধরে যে এই কনিষ্ঠ আঙ্গুল নিয়ে লিখছিলো ও ভাবছিলো তার মস্তিষ্ক ভাবতে থাকে আমার ডানহাতের কনিষ্ঠ আঙ্গুল কী ডানহাতেরই কনিষ্ঠ আঙ্গুল ছুঁতে পারে? যদি না পারে সে আসলেই কে কীভাবে বুঝবে? নাকী তার আসলে খোঁজার দরকার নেই, সে সদা বিদ্যমান, সবসময়ই ছিলো কিন্তু এতটা রহস্য হয়ে থাকে যাকে বুঝতে গেলেই সে আঙ্গুলের ফাঁক গলে বেরিয়ে যায়। হয়তো আঙ্গুলগুলোকে মুষ্টিবদ্ধ না করে, মুক্ত করে ছেড়ে দিলেই আপনাআপনি উপলব্ধি হয়। তবে কাউকে বোঝানো যায়না, কেননা অপূর্ণতা দিয়ে পূর্ণতার ব্যাখ্যা কীভাবে সম্ভব? আর যদি নিজে পূর্ণই হয়ে থাকি তাহলে ব্যাখ্যার কী প্রয়োজন! এটাই ব্যাখ্যার নিষ্প্রয়োজনীয়তাটাই তো হয়ে ওঠার পুরস্কার যার খেসারতে হয়তো লুপ্ত হয়ে যায় ব্যাখ্যা, প্রমাণ, নিজের সকলপ্রকার লালিত চিন্তা, বাসনা, সমস্তকিছু। অতঃপর পড়ে থাকে অকথ্য, নিশ্চুপ, গভীর, নির্মল শূন্যতা ও তাকে জড়িয়ে গান গেয়ে ওঠে পূর্ণতা। এটাই কী তবে কনশাসনেস নাকী এখনও আমার ঘোর কাটেনি!

 

সবশেষে এটি নিয়ে যারা আরও ঘাটাঘাটি করতে চান তাদের জন্য নিচের লিঙ্কটি শেয়ার করা হল। 😄😄😄

 

কনশাসনেসের ব্যাখ্যার ওপর গুরুত্বপূর্ণ ৩৫টি ভিডিওর প্লে-লিস্ট

0Shares

নাজিউর রহমান নাঈম

আমিকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। কিন্তু সে যে কোথায় লুকাইলো ও এই লোকটি যে তা বড় আশ্চর্যের বিষয়! আমি হারিয়ে যা হল একে কীই-বা বলা যায় বলুন। এখন যাকে দেখছেন সে তো অন্য কাজ করে বেড়াচ্ছে, তার পরিচয়ও নিশ্চয়ই বদলে গেছে। তাহলে আপনি কাকে দেখছেন? দেখছেন আপনাকে আপনার চিন্তাকে যা আপনাকে আমাকে দেখাচ্ছে বা কল্পনা করাচ্ছে। তাহলে শুধু শুধু পরিচয় জেনে কী হবে বলুন। তার চেয়ে বরং কিছু সাইকোলাপ-ই পড়ুন ও নিজেকে হারিকেন নিয়ে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ুন। পথিমধ্যে হয়ত কোথাও দেখা হয়েও যেতে পারে!!! সে পর্যন্ত- কিছু কথা পড়ে থাকুক জলে ভেজা বিকালে খুঁজে চলুক এই আমি পিলপিল করে অনন্ত "আমি" র অদৃশ্য পর্দার আড়ালে

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *