ওশো – গীতা দর্শন পর্যালোচনা । ইন্ট্রোভার্সি ও এক্সট্রোভার্সি

ব্যক্তি ইন্ট্রোভার্ট না এক্সট্রোভার্ট তা বুঝবে কীভাবে এবং তার প্রকৃতিতে এ দুটির মধ্যে কোন মাত্রাটি বেশী তা কীভাবে নির্ণয় করবে এ নিয়ে ওশো তার গীতা দর্শনের ৫ নং ভলিউমে চমৎকার একটি আলাপ দেন। সেখান থেকে কিছু কথা নিজের মত করে বলার ও নিজের কিছু পর্যালোচনা দেবার চেষ্টা করব এই লেখাতে।

মানুষের সাইকোলজিক্যাল ন্যাচার অনুযায়ী মোটাদাগে তাকে ইনটোভার্ট ও এক্সট্রোভার্ট এই দুটি ক্যাটাগরীতে ফেলা যায়। কোন ব্যক্তি অন্তর্মুখী না বহির্মুখী তা নির্ণয় করা সম্ভব বলে ওশো মনে করেন। এবং বর্তমান সাইকোলজিক্যাল গবেষণাতেও কয়েকটি মেট্রিক অনুযায়ী তৈরী করা প্রশ্নের সত্য জবাব দেবার মাধ্যমে এটা সহজেই বোঝা যায় যে, আপনার স্বভাব বহির্মুখী না অন্তর্মুখী।

এখন কথা হল কোন ব্যক্তি যদি বহির্মুখী টাইপের হয় ও সে যদি অন্তর্মুখী তথা ইন্ট্রোভার্সির দিকে ঝোঁকে তাহলে তার অনেক ঝক্কি পোহাতে হয়। কেননা এটা তার ন্যাচারের বিপরীত। এই বিষয়টা ঘটেছিল মহাভারতের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে অর্জুন ছিল ক্ষত্রীয় অর্থাৎ, একশন ওরিয়েন্টেড তথা বহির্মুখী টাইপের।

কিন্তু হঠাৎ করে যখন কৃষ্ণকে বলে বসলো সে যুদ্ধ করবে না তার সন্ন্যাসে চলে যাওয়া উচিত তখনই কৃষ্ণ এখানে তার সূক্ষ্ম চালাকী ধরে অর্জুনকে উপদেশ দেয় যে, তোমার পালানো চলবে না তোমাকে যুদ্ধ করতে হবে। কারণ যুদ্ধের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জুনের ভেতরে যে দূর্বলতা ও মোহগুলো ছিল তা দূর হওয়া সম্ভব। যখন অর্জুন সন্ন্যাসী নিয়ে কর্মহীনতার কথা বলে যা কীনা ইন্ট্রোভার্সির সাথে সামন্ঞ্জস্যপূর্ণ তখন সে আসলে যুদ্ধ থেকে পালাতে চায় কিন্তু কেউ যাতে তাকে কাপুরুষ বলতে না পারে এজন্য সে কৃষ্ণের কাছে ভ্যালিডেশন চাচ্ছে।

এতে করে কেউ যাতে এটা বলতে না পারে যুদ্ধ করার ভয়ে সে পালিয়ে গিয়েছে। এ জায়গায় কৃষ্ণের অর্জুনের মতামতের একটি সমর্থন অর্জুনের স্বার্থপূর্তি করতে পারত। কিন্তু ওশো বলেন যে, কৃষ্ণের মত সারথি যখন কারও ভাগ্যে জোটে তখন তার ফাঁকি দিয়ে পালাবার কোন পথ থাকেনা।

এজন্যই দেখা যায় যে, কৃষ্ণ অর্জুনকে বলেন যে, নিজের ধর্ম অনুযায়ী চলার কথা। এর মানে আর কিছুই নয়, নিজের মনের অন্তর্নিহিত প্রকৃতি অনুসারে চলা। যখন কেউ তার প্রকৃতি অনুযায়ী চলতে ব্যর্থ হয় তখনই সমাজে বিশৃঙ্খলা ও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব এবং অসন্তোষের সৃষ্টি হয়।

যে ব্যক্তির ন্যাচার এক্সট্রোভার্ট টাইপের সে যদি মুক্তির খোঁজে হিমালয়েও চলে যায় সেখানে তার প্রকৃত ত্যাগ ঘটিত হবেনা। কেননা তার ন্যাচার কর্মমুখী সক্রিয়, তাই তাকে সক্রিয় কর্মের মাধ্যমে তার মুক্তির পথ বানিয়ে নিতে হবে। এসবক্ষেত্রে তার সেসকল পথগুলোরই সন্ধান কাজে দিতে পারে।

আবার যে ব্যক্তি অন্তর্মুখী টাইপের সে যেখানেই থাকুক না কেন তার মাঝে কর্মহীনতা পরিলক্ষিত হয়। এখানে কর্মহীনতা মানে আলস্য নয়। সে কেবলই নিষ্ক্রিয় অর্থাৎ, তার এপ্রোচ হল অন্তর্নিহিত বৈরাগ্যতা। যে এক্সট্রোভার্ট তার কাছে ইন্ট্রোভার্টদের নিষ্ক্রিয়তা আলস্য বলে মনে হতে পারে৷ কিন্তু আসলে তা নয়। ওশো বলেন যে, বিশ্রাম ও আলস্য এ দুইয়ের মাঝে বিশাল ফারাক রয়েছে।

একজন বিশ্রামকারী ব্যক্তি যদি নিষ্ক্রীয় হয়ে চুপচাপ বসে থাকে তাহলে তার মাঝে কোন ক্লান্তির ছাপ থাকেনা, বরং এক সজীবতা, সতেজতা দেখা যায় যা ভেতরে থাকা শক্তি থেকে আসে। এ ব্যাপারে ওশো উল্লেখ করেন যে, কোনকিছুকে ছেড়ে দেবার জন্য যথেষ্ট শক্তির প্রয়োজন হয়। উদাহারণস্বরূপ, এক্সট্রোভার্ট তার কর্মের দ্বারা, সক্রিয়তা দিয়ে লাখ টাকা কামালো, এখন এটাকে ত্যাগ করা বা ছেড়ে দেবার জন্য তার চেয়ে বড় শক্তি চাই; নাহলে এতগুলো টাকা ত্যাগ করা মোটেই সহজ কাজ নয়।

এতে আপনার ভেতরে থাকা ইমোশনের উথাল-পাথালের সাথে লড়ে আপনার আপন শক্তি দিয়ে এর মাঝে একপ্রকার উদাসীনতার ডাইমেনশনে আপনাকে আসতে হবে।

এভাবে যে ব্যক্তির মাঝে অন্তর্মুখীতা বেশী করে পরিলক্ষিত হয় সে ঐ পথে এগিয়ে গেলে একটা সময় পর তার মাঝে এক বৈরাগ্যতা আসে। তখন তার আর চেষ্টা করার মনোভাব থাকেনা, তার মাঝে এ জগতের সকলকিছুর প্রতি ঔদাসীন্য দেখাবার শক্তি এসে যায়। এরকম বৈশিষ্ট্য আপনারা দেখতে পাবেন প্রাচ্যদেশীয় আধ্যাত্মিক ধারাগুলোর মধ্যে যেসকল ব্যক্তিত্বরা ছিলেন বুদ্ধ, মহাবীর, নাগার্জুন এরা সবাই ইন্ট্রোভার্ট ক্যাটাগরীর। এছাড়া এর ধারাগুলোতেও জগতের প্রতি একপ্রকার ঔদাসীন্যতা ও বৈরাগ্যতা লক্ষ্য করা যায়।

এজন্য ভারতবর্ষে আপনারা দেখবেন যে, আধ্যাত্মিকতার পদ্ধতি হিসেবে ধ্যানের প্রচলন দেখা যায়। কেননা ধ্যানের ভেতর যে ঘোষণা ঋষিদের দিতে দেখা যায় – “অহম ব্রক্ষ্মাস্মি” তা মূলত নিজের আপন সত্তার ঘোষণা। যে ব্যক্তি তার অন্তর্মুখীতার সর্বোচ্চ সীমায় চলে গেছে সে নিজের ভেতরে গুটিয়ে যায়, সেখানে নিজের মাঝে সে লুপ্ত হয়ে যায়, একাকী, নীরালায় সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নির্জনতায় ডুবে যায়।

অন্যদিকে ভারতবর্ষের বাইরের অন্ঞ্চলগুলোতে আধ্যাত্মিকতার ধারা হিসেবে (যথাঃ ইসলামীয়, খ্রিস্টীয়) ইত্যাদিতে ধ্যানের পদ্ধতি দেখা যায়নি। তাদের পদ্ধতির মাঝে প্রার্থনার ব্যাপারটি গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। প্রার্থনার মধ্যে আপনার বাইরে কাউকে প্রয়োজন হয়, সক্রিয়তা লাগে, প্রেম লাগে। যা এক্সট্রোভার্সির লক্ষণ। এজন্য মীরা, নানক, মুহম্মদ, যিশু খ্রিস্ট ইত্যাদি যারা আছেন তাদের ধারায় সক্রিয়ভাবে প্রেমীর নাম জপতে হয়।

ওশো একটি দৃষ্টান্ত দিয়ে বলেন যে, মনসুর হাল্লাজ যখন বলে, “আনাল হক্ক” “আমিই সত্য” তখন তার সমকালের মুসলিমরা তাকে বুঝতে পারেনি। কেননা মনসুর এখানে ইন্ট্রোভার্ট ন্যাচারে বলেছে, নিজের একান্ত আপন সত্তার কথা বলেছে। কিন্তু মুসলিমদের কালেকটিভ সাইকোলজিক্যাল প্যাটার্ন ছিলো এক্সট্রোভার্ট টাইপের।

ভারতবর্ষের আধ্যাত্মিক ধারা ছিলো ইনট্রোভার্ট ন্যাচারের। কিন্তু বর্তমান বৃহৎ পরিসরের সমাজ হয়ে গিয়েছে এক্সট্রোভার্ট ন্যাচারের। হাতে গুণে কয়েকজন খুঁজে পাওয়া যাবে যারা কীনা আসলেই ইনট্রোভার্ট। তাই ওশো বলেন যে, ভবিষ্যতের আধ্যাত্মিক ধারাগুলোতে কর্ম মার্গের ব্যাপারগুলো বেশী উপযোগী হবে সামাজিকভাবে। প্রকৃতিতে কখনও ইন্টোভার্সি ডমিনেন্ট হিসেবে দেখা দেয়, আবার কখনও এক্সট্রোভার্সি ডমিনেন্ট করে। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে, উভয়ই সকল যুগেই থাকে, খালি একেক সময় একেকটা প্রাধান্য বিস্তার করে এই যা।

বর্তমানে এক্সট্রোভার্সির প্রকোপ বেশী তাই প্রাচীন আধ্যাত্মপন্থী চিন্তাধারা তেমন সুবিধা করতে পারবে না সামাজিকভাবে যতক্ষণ না পর্যন্ত এটাকে যুগ অনুযায়ী ঢেলে সাজানো যাবে। তবে ওশো এও বলেন যে, ইন্ট্রোভার্ট যদি কেউ হয়ও সে ব্যক্তিগতভাবে তার যে পথ আছে সে অনুযায়ী জীবন ধারণ করবে এতে কোন সমস্যা নেই। কিন্তু সামাজিকভাবে প্রাধান্যটা এক্সট্রোভার্সির দিকেই বেশী।

তবে এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ওয়েস্টার্ন কান্ট্রিগুলোতেও এখন ধ্যানের ব্যাপারে আগ্রহ জোরদার হচ্ছে, এক নতুন ধরনের ধারার উৎপত্তি হচ্ছে। এতে আশা করা যেতে পারে যে, অদূর ভবিষ্যতে আবার কালেকটিভভাবে বিশ্বের পেন্ডুলাম ইন্ট্রোভার্সির দিকে মোড় নিবে। তখন হয়ত নতুন এক আধ্যাত্মিক ধারা আমরা পাবো যা আগের থেকেও বেশ পরিণত হবে।

ইন্ট্রোভার্ট বলি আর এক্সট্রোভার্ট যাই বলি না কেন দুটোরই চূড়ান্ত পরিণতিতে নিষ্কাম কর্ম ঘটিত হয়। কেবল যে ব্যক্তির ন্যাচার বহির্মুখী সে সক্রিয়ভাবে কর্ম করলেও তার নিষ্কাম কর্ম ঘটিত হবে। কেননা ফলের আকাঙ্খারহিত কর্মই হল নিষ্কাম কর্ম। আর যে অন্তর্মুখী ন্যাচারের তার নিষ্ক্রীয়তার সাথে স্থির অবস্থার সাথে নিষ্কাম কর্ম ঘটিত হবে।

অলসতার কথা বলতে গিয়ে ওশো একটা চমৎকার কথা বলেন যে, তথাকথিত দেখায় অলসতা নয়, বরং আসল যে আলস্য সে মূলত হয় শক্তিহীন সে করতে পারার শক্তি ও ছাড়তে পারার শক্তির মাঝে পড়ে থাকে। তার মূলত কোন শক্তিই থাকেনা, যার কারণে না পারে এদিক যেতে, না পারে ওদিক যেতে। এরাই হয় আসলে নপুংসক।

অর্জুনকে তাই কৃষ্ণ বারবার তার স্বধর্মের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় যে, তুমি ক্ষত্রীয়, যুদ্ধ করাই তোমার ধর্ম, ওতেই তোমার ব্যক্তিত্ব বিকশিত হবে, তুমি তোমাকে খুঁজে পাবে। এ জায়গাতেও ওশো চমৎকার একটি ইনসাইট এ আলাপে প্রদান করেন।

তিনি বলেন যে, যুদ্ধ যদি অন্য দলের সাথে হত বা কোন শত্রু রাষ্ট্রের সাথে হত তখন অর্জুনের যুদ্ধ করতে কোন সমস্যা হত না। তীর দিয়ে শত্রুর বুকের ছাতি ভেদ করা অর্জুনের মত বীর যোদ্ধার ভালোই জানা আছে। কিন্তু এই যুদ্ধ শত্রুপক্ষ-মিত্রপক্ষে হচ্ছেনা। এ যুদ্ধ হচ্ছে নিজেরই পরিবারের সাথে।

কুরুক্ষেত্রের অপরপ্রান্তে অর্জুনের নিজের গুরু দ্রোণ, প্রাণপ্রিয় পিতামা ভীষ্মও রয়েছে। তাদের মত এত আপনজন যাকে সে নিজের করে দেখেছে তাদের সে কীভাবে হত্যা করবে। এই ঘোর দুঃসময়ে তার সে সাহস হচ্ছেনা, নিষ্কামভাবে আপন ধর্ম অনুযায়ী তার সংকল্প নিষ্কম্প সে রাখতে পারছে না। বিশ্বপ্রকৃতি সমতার হয়ে সে এ্যাক্ট করতে পারছে না, মাঝখানে বারবার তার “নিজের” আত্মীয়দের এটাচমেন্ট সামনে এসে পড়ছে।

আর এরকম চরম অবস্থায় এই এটাচমেন্ট ভেঙ্গে ননএটাচ হয়ে অর্জুন তীর চালাতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছে ও পলায়ন করতে চাইছে। অপরদিকে কৃষ্ণ তা বুঝে এই চরম অবস্থাকে অর্জুনের পরমসত্য পাবার উপলক্ষ্য হিসেবে কাজে লাগাতে চাইছে। এজন্যই কৃষ্ণের কাছে অর্জুনের এত প্রশ্নবাণ ও কৃষ্ণের জবাব।

এখানে চাইলে মানুষের সাইকোলজির নানা ধরনের সূক্ষ্মস্তর খুঁজে পাওয়া সম্ভব যার মূল্য অপরিসীম। এজন্য ওশো বারবার বলেন যে, গীতাকে কোন ধর্মগ্রন্থ হিসেবে নয় বরং সাইকোলজিক্যাল গ্রন্থ হিসেবে দেখতে পারলে ও এর সেভাবে বিশ্লেষণ হলে ভবিষ্যতে মানুষের জন্য এর ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।

আর মহাভারত সিরিয়াল পুরো দেখার পর আমার কাছে ওশোর এই কথাটা যথেষ্ট কনভিন্সিং বলেই মনে হয়।

আজ এ পর্যন্তই। অন্য কোনদিন গীতা দর্শনের সাইকোলজিক্যাল বিশ্লেষণ নিয়ে আবার আলোচনা করব। সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ পোস্টটি পড়ার জন্য।

0Shares

নাজিউর রহমান নাঈম

আমিকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। কিন্তু সে যে কোথায় লুকাইলো ও এই লোকটি যে তা বড় আশ্চর্যের বিষয়! আমি হারিয়ে যা হল একে কীই-বা বলা যায় বলুন। এখন যাকে দেখছেন সে তো অন্য কাজ করে বেড়াচ্ছে, তার পরিচয়ও নিশ্চয়ই বদলে গেছে। তাহলে আপনি কাকে দেখছেন? দেখছেন আপনাকে আপনার চিন্তাকে যা আপনাকে আমাকে দেখাচ্ছে বা কল্পনা করাচ্ছে। তাহলে শুধু শুধু পরিচয় জেনে কী হবে বলুন। তার চেয়ে বরং কিছু সাইকোলাপ-ই পড়ুন ও নিজেকে হারিকেন নিয়ে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ুন। পথিমধ্যে হয়ত কোথাও দেখা হয়েও যেতে পারে!!! সে পর্যন্ত- কিছু কথা পড়ে থাকুক জলে ভেজা বিকালে খুঁজে চলুক এই আমি পিলপিল করে অনন্ত "আমি" র অদৃশ্য পর্দার আড়ালে

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *