ওশো – গীতাদর্শন (পর্ব – ০২)

নিষ্কামকর্মকর্মচক্র

ওশো তার গীতাদর্শনের ডিসকোর্সে কর্মের ওপর আলোচনা করতে গিয়ে বলেন যে, তুমি যা কিছুই করো কিংবা না করো তুমি এই দুনিয়ায় কর্মকে এড়াতে পারবে না। তুমি যেহেতু এ দুনিয়ায় এসেছো তোমাকে কর্ম করতেই হবে, এমনকী তুমি যদি কিছুই না করে চুপচাপ বসে থাকো তবু ওটাও একটা কর্ম। এজন্য স্বয়ং ভগবান যদি অবতার হিসেবে এ ধরাতে আসেন, তাকেও কর্ম করতে হবে।

তাহলে কর্ম থেকে কী মুক্তি নেই?

মুক্তি আছে। এইজন্য কৃষ্ণ অর্জুনকে বলেন নিষ্কাম কর্মের কথা। কর্মের উদ্ভব মূলত হয় কামনা বা বাসনা দ্বারা। এজন্য দেখা যাবে আমরা যদি চুপচাপ বসেও থাকি, দৃশ্যত আমরা কোন কাজ না করলেও, আমাদের মনের ভেতরে অনবরত বাসনা ঢেউ, কামনার ঢেউ জাগ্রত হয়ে চলছে। আর এই ঢেউ অনবরত সূক্ষ্ম স্তরে কর্ম উৎপাদন করে চলছে। প্রকৃতপক্ষে আমরা যা কিছু বাহ্যিকরূপে করি তা আমাদের অন্তর্গত কোন না কোন ফললাভের বাসনা থেকে। এবং এ বাসনাটাই হলো কর্ম ও এভাবে কর্ম আমাদেরকে তার জালে আবদ্ধ করে ফেলে। এরপর জালে আবদ্ধ হবার পর এর সাথে জড়ানো বিভিন্ন ঘটনা ও এর ফলাফল অনুযায়ী হয় আমরা দুঃখ, সুখ, রাগ ইত্যাদি বিভিন্ন আবেগের ফলাফল লাভ করি।

এখন আমরা যদি নিষ্কাম হয়ে কর্ম করার ভাব তথা কাজ করার সময় সম্পূর্ণরূপে বর্তমানে ডুবে গিয়ে কাজ করতে পারি তাহলে এই কর্মজালের চক্র এর থেকে অনেকটা হালকা হয়ে এ জগতে বিচরণ করতে পারব যা কৃষ্ণ, অর্জুনকে বলেন। এবং এভাবে যখন আমার পুরো জীবনধারা বাহিত হতে থাকবে, জীবনের শেষে সমস্ত স্তরের কর্ম থেকে ব্যক্তি মুক্ত হয়ে মোক্ষলাভ করবে।

এই নিষ্কামকর্ম নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আরেকটি চমৎকার বিষয় মাথায় আসলো। বিষয়টা হলো আমাদের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ও ভাগ্য। একটি ব্যাপার খেয়াল করলে দেখা যায় যে, আমি যদি কর্মগত ফলাফলের বিষয়টা ধরে নিয়ে এ দুটিকে ব্যাখ্যা করি তাহলে এ দুটি ব্যাপারের সুন্দর একটা মীমাংসা হয়ে যায়। ব্যাপারটা এরকম –

আমি যদি বলি যে, পৃথিবীর সবকিছুই ভাগ্য দ্বারা নিয়ন্ত্রিত একে এড়ানোর উপায় নেই। তাহলে এই শুনে আমি আবার এও বলতে পারি যে, আচ্ছা ঠিক আছে, সবকিছু ভাগ্য দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হলে আমি আজ থেকে কিছুই করবো না, কেননা আমার যা হবার তা তো আগে থেকেই লেখা আছে তাহলে আর পরিশ্রমের দরকার কী। কোন কাজই করবো না। কিন্তু এটি হবে না। কেননা এই যে, আমি কোন কাজ করব না অর্থাৎ আমি কর্ম বাদ দিতে চাইছি ও ফলাফল সরাসরি আসার যে পরিকল্পনা করছি তা আমার সসীম ইচ্ছা দ্বারা ঘটবে না। কেননা আমি সেই একই কর্মের জালে আবদ্ধ; আমাকে কর্ম করতেই হবে। এমনকী আমি যদি কিছু নাও করি ওটাও একটা কর্ম যেহেতু আমার বাসনা রয়েছে যা ওপরে বলার চেষ্টা করা হয়েছে।

এখানেই আপনাকে কর্ম করতে হবে ও এরজন্য আমার দরকার হবে ইচ্ছা। তখন আমি আমার এই কর্মচক্রে আসা স্রোতগুলো থেকে নির্দিষ্ট কিছু কর্ম নির্বাচন করার সুযোগ পাবো যা দুনিয়ায় আমার সাপেক্ষ অনুযায়ী ইচ্ছা বলে আমার কাছে মনে হবে৷
এ অনুযায়ী ইচ্ছাটা আমার সসীম “আমি” র কাছে একটা উপায় মাত্র।

এখন আমি যদি খুব খুশী হয়ে বলি দেখেছো ভাগ্যই সব। তাহলে আমরা সচরাচর যে দৃষ্টিতে ভাগ্য বিবেচনা করি সে অনুযায়ী এটা হবেনা। কেননা এই ভাগ্যের ওপর অহংকার তার দোষ চাপিয়ে নিজে পালিয়ে যেতে পারে। এইজন্য কর্মচক্রের যে বৃহৎ জাল রয়েছে তা স্মরণে আনলে বোঝা যাবে যে, আমি ভাগ্য মেনে নেই কিংবা নিজের স্বাধীন ইচ্ছা মেনে নিয়ে কাজ করি আসলে মূলত যা করছি তা হলো কর্ম। আর যখন আমি এই বৃহৎ জালকে ধারণায় আনতে পারবো যে আমার কর্মের প্রভাব সমস্ত জগতে পড়ে। আর সমস্ত জগতের প্রভাব আমার ওপর পড়ে; তখন এই বৃহৎ শৃঙ্খলা দেখে আমার ভাগ্য আর স্বাধীন ইচ্ছা নিয়ে ভাবা ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক ক্ষণিকের জন্য স্তম্ভিত হয়ে যায়। আর এটা হলে তখন কেবল দুটি রাস্তা বাকী থাকে –

১. আমি যদি বলি যে, আচ্ছা ঠিক আছে ভাই, আমি আর টু শব্দটি করবো না যা হচ্ছে তা হবেই কিছুই করার নেই, আমি আত্মসমর্পণ করলাম এই নিয়তির কাছে, এই চক্রের কাছে, জীবন যা দেয় সেটাই ঠিক আছে, এরকম ভাব যদি আমার চলে আসে ও আমি সেভাবে জীবনযাপন করি ও এ জীবনযাপনের সমস্ত ফলাফল মোকাবিলা করার হিম্মত রাখি তাহলে এ রাস্তাতেই আমার নির্বাণ, মোক্ষসব। এজন্য ওশো তার একটা কথায় বলেছিলো প্রাচীন ঋষিরা এজন্যই কর্মচক্র দিয়ে জীবনকে ব্যাখ্যা করার প্রয়াস পেয়েছিলেন যাতে এত বৃহৎ কর্মচক্রের জাল অনুধাবন করে ভাগ্যের প্রতি সমর্পিত হয়ে অহংকারের বোঝা হালকা করা যায়। কিন্তু এ পদ্ধতিতেও সংগ্রাম ও কষ্ট রয়েছে। তবে এই ভাগ্যকে ব্যাবহার করে অহংকার যে পলায়ন করার রাস্তা তৈরী করে নেয় তা তাকে নিজেরই কর্মচক্রে করুণ ফলাফলে নিয়ে ফেলে যদিও চালাকি করার সময় তার এ বৃহৎ জাল সম্পর্কে ধারণা থাকেনা কেননা সে তার সসীম খোল দিয়েই চিন্তা করে সবসময়।

২. আমি তখন এ বৃহৎ জাল দেখে বলবো যেহেতু যা ঘটছে তা ঘটবেই তাহলে আমি এই সসীম জগতে সসীম শরীরের সাপেক্ষে এর সামনে যা আসবে তার দায়িত্ব নিয়ে এগোব। যেহেতু আমি কিছুই এড়াতে পারবো সুতরাং আমার সসীমতার ইচ্ছা দিয়েই আমি কাজ করে যাবো এবং আমার সাথে যা ঘটবে এর দায়ভার আমার। বুদ্ধ যেটা বলেছিলেন তোমার কর্মের ফল তুমিই ভোগ করবে আর কেউ না। এভাবে আমি দায়িত্ব গ্রহণ করবো। এটাও একটা রাস্তা। এ রাস্তাতেও সংগ্রাম রয়েছে। আর ধৈর্য ধরে এগোতে পারলে সেই নির্বাণপ্রাপ্তি। যেহেতু এ রাস্তায় নিজেকেই আমি সকল কর্মের দায়িত্বরূপে মানছি সুতরাং এখানে একটা স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি আমার কাজ করবে জাগতিক দৃষ্টিকোণ থেকে।

উল্লেখ্য যে, এ দুটি রাস্তাই হলো চরমবিন্দু ধরে চলা। ভাগ্য ধরে চললে আপনি এ জগতে কর্মচক্রে প্রবাহিত হয়ে আসা কিছুতে টুঁ শব্দটি করতে পারবেন না। এবং এই যন্ত্রণার চড়াই, উৎরাই পেরিয়ে আপনি মহাজাগতিক ভাগ্যে মিলিয়ে যাবেন। আর যদি স্বাধীন ইচ্ছা ধরে চলেন তাহলে আপনি যাই করেন কর্মচক্রের প্রবাহতে ভেসে আসা ঘটনার ওপর আপনার প্রতিক্রিয়ার সব ফলাফল আপনার। আর এর যন্ত্রণার চড়াই উৎরাই পেরিয়ে আপনি মহাজাগতিক স্বাধীনতায় মিলিয়ে যেতে পারবেন।

এখানে মূল বিষয়টা হলো মহাজাগতিক যে ব্যাপারটা বলা হলো ওখানে সবই আছে। ওই দৃষ্টিকোণ থেকে ভাগ্য, ইচ্ছা এসব বলা অর্থহীন। জগতে আমরা কেবল সেখান থেকে উৎসারিত কর্মপ্রবাহকে ব্যাখ্যার জন্য ভাগ্য, ইচ্ছাশক্তি নিজেদের সুবিধা অনু্যায়ী ব্যাখ্যা করে নিয়েছি।যখন এটাতে গন্ডগোল লেগে গেলো তখন কর্মচক্রের ব্যাখ্যা ধরে নিলে সেখান থেকে আমাদের যে অনুধাবন হবে তার ওপর ভিত্তি করে আমি আমার প্রকৃতি অনুযায়ী যেকোন একটা রাস্তা বেছে নিয়ে তীব্রতার সাথে জীবনকে যাপন করে যেতে পারি তবেই আমার জীবন সার্থক।

আর যদি এর মাঝখানে থাকি তাহলে দ্বিধাদ্বন্দে থাকবো, প্রকৃত সংগ্রাম ও যন্ত্রণায় ঢোকা যাবেনা। এবং তাতে না ঢুকতে পারলে বীজ থেকে গাছও হবেনা, তত্ত্ব নিয়ে যুগ পার হয়ে যাবে আমার নৌকা কখনও তরীতে ভিড়বে না।

0Shares

নাজিউর রহমান নাঈম

আমিকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। কিন্তু সে যে কোথায় লুকাইলো ও এই লোকটি যে তা বড় আশ্চর্যের বিষয়! আমি হারিয়ে যা হল একে কীই-বা বলা যায় বলুন। এখন যাকে দেখছেন সে তো অন্য কাজ করে বেড়াচ্ছে, তার পরিচয়ও নিশ্চয়ই বদলে গেছে। তাহলে আপনি কাকে দেখছেন? দেখছেন আপনাকে আপনার চিন্তাকে যা আপনাকে আমাকে দেখাচ্ছে বা কল্পনা করাচ্ছে। তাহলে শুধু শুধু পরিচয় জেনে কী হবে বলুন। তার চেয়ে বরং কিছু সাইকোলাপ-ই পড়ুন ও নিজেকে হারিকেন নিয়ে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ুন। পথিমধ্যে হয়ত কোথাও দেখা হয়েও যেতে পারে!!! সে পর্যন্ত- কিছু কথা পড়ে থাকুক জলে ভেজা বিকালে খুঁজে চলুক এই আমি পিলপিল করে অনন্ত "আমি" র অদৃশ্য পর্দার আড়ালে

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *