ওশো – গীতাদর্শন (পর্ব-০১)

ওশো – গীতাদর্শন (পর্ব-০১)

ইমিটেশন সাইকোলজি

ওশোর গীতাদর্শন ডিসকোর্সে তাকে একটি প্রশ্ন করা হয়। প্রশ্নটি হলো এমন যে, শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলে যে, হে অর্জুন তুমি যুদ্ধ থেকে পলায়ন করলে তোমার এই আচরণ অন্যদের ওপরও প্রভাব ফেলবে,

এমনটি কৃষ্ণ, অর্জুনকে কেন বলে?

এর উত্তর দিতে গিয়ে ওশো বলেন যে, দেখো প্রথমত অর্জুন যে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরে যাবার কথা বলছে এটা তার স্বজনদের প্রতি মায়া-মমতা থেকে নয়, বরং এ যুদ্ধে যে “অর্জুনের” তথা নিজের স্বজনেরা মারা যাবে তার মুখোমুখি হতেই অর্জুন ক্ষত্রীয় বর্গের হওয়া সত্ত্বেও হঠাৎ করে এমন পালিয়ে গিয়ে সন্ন্যাস নেবার কথা বলছে। অর্জুন মূলত এ যুদ্ধে তার স্বজনরা মারা যাবে এর থেকে বেশী চিন্তিত হওয়া অপেক্ষা তার নিজের স্বজনেরা মারা যাবে ও যদি তারা মারা যায় তাহলে সে তার কৃতিত্ব কাদেরই বা দেখাবে এইসব ভেবে ভেবে দ্বন্দ্বে পড়ে গিয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন করার মাধ্যমে যুদ্ধক্ষেত্র এড়াতে চাইছে।

আর কৃষ্ণ অর্জুনের এই ভীতি টের পেয়ে গিয়ে তাকে নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করতে গিয়ে তখন এইভাবে অর্জুনের সামনে কথাটা উপস্থাপন করে যে, তুমি যদি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করো তাহলে অন্যদের কী হবে। কারণ অর্জুন কোন সাধারণ যোদ্ধা নয়। তার ব্যক্তিত্ব ও শৌর্যবীর্য অতুলনীয়। এবং এমনটি হলে স্বাভাবিক যে হস্তিনাপুরের অন্যান্য যারা আছে তাদের মাঝে কিংবা আসন্ন ভবিষ্যতে যে প্রজন্ম আসবে তারা অর্জুনের কথা পড়বে ও তার দ্বারা প্রভাবিতও হবে।

এখন যদি অর্জুন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করে তাহলে অন্যান্যরা তার কাছ থেকে কী এই শিখবে যে, ক্ষত্রীয়দের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করা উচিত বা কাপুরষতা ঠিক আছে কেননা অর্জুন তো করেছে। এ ব্যাপারে কৃষ্ণ অর্জুনকে ইশারা করেন।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে অর্জুনের চরিত্র নিয়ে অন্যদের মাথাব্যাথা কেন? কেনইবা তার প্রভাব গিয়ে অন্যদের ওপর পড়বে? আর অর্জুনকে এ নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে?

এখানটায় এসে ওশো আমাদের বলছেন যে, মানুষ হলো ইমিটেটিভ তথা অনুকরণপ্রিয় প্রাণী। আমরা অনুকরণ করতে পছন্দ করি। মানুষ আসলে অন্যের ওপর তার প্রভাব সহসা এড়াতে পারেনা। এর ফলে তার আশেপাশের ব্যক্তিকেও সে অনুকরণ করে। যেমনটা আমরা ছোটবেলায় স্পাইডার, সুপারম্যান দেখে এগুলো হবার বাসনা এসব কাল্পনিক চরিত্রগুলোকে অনুসরণ করার চেষ্টা করতাম।

এর সূত্র ধরে অন্য একটি প্রসঙ্গে এসে ওশো বলেন যে, প্রাচ্যে পরিবারের মধ্যে সবসময় একধরনের অনুশাসন ছিলো। পরিবারের মধ্যে শিশুদের সে অনুশাসনগুলো মেনে চলতে হতো। আর এর নড়চড় হলে সন্তানদের পিতার মুগুড়ের মুখে পড়তে হতো। এসব কড়া অনুশাসন এমন যে শিশুর নিজে স্বতন্ত্র হয়ে যে, নিজের ইচ্ছেমতো চলাফেরা করবে তার তেমন সুযোগ ছিলো না। অর্থাৎ একটা ডিসিপ্লিনড ফ্যামিলি টাইপের একটা ব্যাবস্থা ছিলো।

অপরদিকে পাশ্চাত্যে শিশুদের লালন পালনের ব্যাবস্থা সেরকম নয়। বরং এটি প্রাচ্যের ঠিক উল্টো। সেখানে সন্তানের মুক্তভাবে চলাফেরার সুযোগ রয়েছে৷ নিজের মত সে যা চায় তাই করতে পারে। এর ফলস্বরূপ আমরা দেখতে পাবো যে, প্রাচ্যের পরিবারের সন্তানেরা বাবাকে দেখলেই একটু ভয়ে ভয়ে থাকে সেখানে পাশ্চাত্যে লালিত পালিত হওয়া সন্তানদের অবাধ বিচরণে পিতারা কোন ঝামেলা করছে কীনা তা নিয়ে পিতা বেচারা ভয়ে ভয়ে থাকে। না জানি কী বললে সন্তানের নিজের মত করে বেড়ে ওঠাটা নষ্ট হয়ে যায়।

কিন্তু মূল গন্ডগোল হয়ে গেছে অন্য জায়গায়। প্রাচ্যের পরিবারগুলির যে নিয়মশৃঙ্খলার ভার সন্তানের ওপর আরোপণ করা হতো অর্থাৎ এটা করতে হবে, ওটা করতে হবে… ইত্যাদি অনুসরণ মেনে চলতে এর বিপরীতে পাশ্চাত্যে যে সন্তানের নিজস্বভাবে বেড়ে ওঠার যে সুযোগ তৈরী করে দেয়া এতে কী সন্তানেরা আদৌ অনুশাসনের অনুকরণতা থেকে মুক্ত হতে পেরেছে?

ওশোর জবাব হলো তারা অনুকরণ, অনুশাসন থেকে মোটেই মুক্ত হতে পারেনি। কারণ এখন তারা তাদের পরিবারের রীতিরেওয়াজ তোয়াক্কা না করলেও স্বাধীনতা পেয়ে টিভি, ইন্টারনেট এসব মাধ্যমে যাদের দেখছে তাদেরই অনুসরণ করছে, অনুকরণ করছে। এবং এটা আমরা বর্তমানেই দেখতে পাবো যে, ছোট ছোট শিশুরা জন্মের কয়েক বছর পরেই তাদের এসব প্রযুক্তির সাথে পরিচয় হয়ে যায় ও স্বভাববশত তারা এইসবের মাঝে থাকা জিনিসগুলির অনুকরণ করছে।

তাহলে দেখা যায় যে, অনুকরণের কিছুই হয়নি, কেবল প্রক্রিয়াটা পাল্টেছে। এর অর্থ হলো এইযে, নিজের মত করে স্বকীয় একটা ব্যক্তিত্ব হুট করে যে গড়ে উঠবে এমনটি নয়। কেননা মানুষের জীবন পর্যায়ের একটি অঙ্গ হলো এ অনুকরণপ্রিয়তা।

এজন্য মানুষের অন্তর্নিহিত এ মানসিক প্রবণতার কথা ভেবে কৃষ্ণ অর্জুনকে যুদ্ধ থেকে পলায়ন করতে মানা করে। অর্জুনের যে ব্যক্তিত্ব তা তার অগোচরেই অনেকে এর দ্বারা প্রভাবিত হবে ও অনুকরণ করবে এ সম্ভাবনার কথা ভেবে কৃষ্ণ অর্জুনকে তার পূর্ণশক্তি দিয়ে যুদ্ধ করে নিজের ক্ষত্রীয় ধর্ম পালন করতে বলেন যাতে করে অন্যান্যরা অর্জুনের থেকে পলায়নবাদীতা না শিখে সাহসীকতা, স্বধর্মে অটল থাকা অনুকরণ করা শিখতে পারে।

অনুকরণের এই বিষয়টি আমরা এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ ব্যাপক আকারে দেখবো। একটি অল্পবয়সের শিশু যখন স্যোশাল মিডিয়ার সংস্পর্শে আসবে তখন সে স্বাভাবিকভাবেই এতে থাকা বিষয়ের অনুকরণই করবে। এখন এতে অনেক গার্বেজ কনটেন্টের প্রসারতা বেশী দেখা যায়। এতে যা হচ্ছে তা হলো এটা ঘুরেফিরে আপনার সন্তানের ওপরই প্রভাব ফেলবে। স্যোশাল মিডিয়ায় যে ভালো কনটেন্ট নেই এমনও নয়, রয়েছে কিন্তু এর প্রসারতা নেই। তাই মানুষ যত সচেতন হবে তত যারা ভালো ভালো বিষয় শেয়ার করছেন তাদের প্রসার হবে ও এটা হলে আপনার সন্তান স্যোশাল মিডিয়ায় ভালো কিছুরই অনুকরণ করতে পারবে ও এতে তার স্বইচ্ছাও বিদ্যামান থাকবে।

প্রাচ্যের যে গতানুগতিক অনুশাসন, রীতি রেওয়াজ ছিলো যখন তাতে প্রাণ ছিলো তখন তা সন্তানের জন্য মঙ্গলজনক ছিলো কিন্তু কালের পরিক্রমায় এটার প্রাণ নষ্ট হয়ে গিয়ে ক্রমে ক্রমে তা কেবল পরিবারের সদস্যদের মাঝে আদর্শরূপেই থেকে যায় কিন্তু তা বড় সদস্যদের মাঝে চর্চিত ও ধারণ না করার ফলে তা থেকে পরিবারের ছোট সদস্যরা এগুলো মেনে নেওয়ার কোন উৎসাহই খুঁজে পায় না। এর ফলে অনুকরণও নিজের ইচ্ছায় হয়না বরং আদেশে করতে হয় এমন একটা ভাব তৈরী হয়। যার জন্য সন্তানদের ভয় দেখিয়ে আদেশ মানাতে হয়। তবে ভয় দেখিয়ে মানতে হলেও এর যে কিছু কিছু কার্যকারিতা ছিলো তা পাওয়া যেত।

অপরদিকে পাশ্চাত্যের পারিবারিক ধারা সন্তাদেরকে মুক্ত করে দিয়ে যে সুযোগ করে দেয় তাতে তারা বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমের যেসব ব্যক্তি আছে, ধারণা আছে তাদেরই অনুকরণ করা শুরু করে। আর তারা যদি রেসপনসিবল না হয় তাহলে সন্তানও ঐরূপ চরিত্র নিয়ে বেড়ে ওঠে। এবং এ প্রবণতাটাই আমরা আজ বেশী দেখতে পাবো।

এজন্য এই দুটি ধারা দেখার পর মনে হয় স্যোশাল মিডিয়াকে আরও কনশাসভাবে ব্যাবহার করতে হবে কেননা এর ওপর আমাদের আসন্ন প্রজন্মের মানসিক অনুকরণপ্রিয়তার সুফল ও কুফলের বীজ নিহিত রয়েছে।

0Shares

নাজিউর রহমান নাঈম

আমিকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। কিন্তু সে যে কোথায় লুকাইলো ও এই লোকটি যে তা বড় আশ্চর্যের বিষয়! আমি হারিয়ে যা হল একে কীই-বা বলা যায় বলুন। এখন যাকে দেখছেন সে তো অন্য কাজ করে বেড়াচ্ছে, তার পরিচয়ও নিশ্চয়ই বদলে গেছে। তাহলে আপনি কাকে দেখছেন? দেখছেন আপনাকে আপনার চিন্তাকে যা আপনাকে আমাকে দেখাচ্ছে বা কল্পনা করাচ্ছে। তাহলে শুধু শুধু পরিচয় জেনে কী হবে বলুন। তার চেয়ে বরং কিছু সাইকোলাপ-ই পড়ুন ও নিজেকে হারিকেন নিয়ে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ুন। পথিমধ্যে হয়ত কোথাও দেখা হয়েও যেতে পারে!!! সে পর্যন্ত- কিছু কথা পড়ে থাকুক জলে ভেজা বিকালে খুঁজে চলুক এই আমি পিলপিল করে অনন্ত "আমি" র অদৃশ্য পর্দার আড়ালে

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *