ওশোর ১ লক্ষ ৫০ হাজার বইপড়া – এ সম্পর্কিত সাক্ষাৎকারের কিছু অংশ

ওশোর ১ লক্ষ ৫০ হাজার বইপড়া – এ সম্পর্কিত সাক্ষাৎকারের কিছু অংশ
বইপোকা হিসেবে যদি কারও মাম করতেই হয় তাহলে তাদের মধ্যে অন্যতম একজন হিসেবে ওশোর নাম চলে আসবে। তিনি তার জীবদ্দশায় প্রাশ দেড় লক্ষের কাছাকাছি বই পড়েছেন। আজকের এই ভিডিওতে তার এই বইপ্রীতি নিয়ে তার নিজস্ব কিছু অনুভূতি ও পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে কেন তিনি তার বইপড়া থামিয়ে দিলেন সে ব্যাপারে তার ছোট একটি সাক্ষাৎকার বাংলা ভাবানুবাদে আপনাদের সামনে উপস্থাপন করার চেষ্টা করব। চলুন তাহলে দেরী না করে বই নিয়ে ওশোর কথামালা শুনে নেওয়া যাক।
 
আমি অনেক ছোটকাল থেকেই বই পড়তে খুব ভালোবাসতাম। আমার ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে প্রায় সকল ধর্ম, দর্শন, কবিতা, সাহিত্যের সাথে সম্পর্কিত দেড় লক্ষের মত দুষ্প্রাপ্য সব বই রয়েছে। আর এগুলোর সবই আমি পড়েছি। তবে এসব বই পড়ার পেছনে আমার কোন উদ্দেশ্য ছিল না; আমার বই পড়ে খুব আনন্দ হত এই যা। আমার বাবা কমপক্ষে তিন-চার দফা বোম্বেতে যেতেন ও যাওয়ার সময় তার সন্তানদেরকে জিজ্ঞেস করতেন, “তোমাদের কার কী আবদার আছে বলে ফেলো? কী নিয়ে আসলে তোমরা খুশী হবে?” তিনি আমাকেও জিজ্ঞেস করতেন, “যদি তোমার কোন আবদার থাকে, তাহলে বলে ফেলো আমাকে, আমি টুকে নেই সেটা ও তোমার জন্য বোম্বে থেকে সেগুলো নিয়ে আসবো।”
 
আমি তাকে কখনও কোন জিনিসপত্র আনার জন্য আবদার করিনি। একবার তাকে শুধু বলেছিলাম, “আমি চাই তুমি যেন বোম্বে থেকে আরেকটু মানবিক, একটু কম পিতৃসুলভ, অধিক বন্ধুবৎসল, কম স্বৈরতান্ত্রিক, অধিক গণতান্ত্রিকতা পূর্ণ হয়ে ফিরে আসো। যখন তুমি ফিরবে আমার জন্য আরেকটু স্বাধীনতা নিয়ে ফিরে এসো।” সে আশ্চর্য হয়ে তখন বলত, “কিন্তু এসব জিনিস তো আর বাজারে কিনতে পাওয়া যায়না।” আমি তখন বলি, “আমি জানি এগুলো বাজারে কিনতে পাওয়া যায়না, কিন্তু এগুলোই হল আমার পছন্দের তালিকাঃ একটু স্বাধীনতা, একটু বড় সীমানা, কম নিয়মকানুন, আদেশ-নির্দেশ এবং একটু সম্মান।”
 
কোন শিশুই তোমার কাছে সম্মান পাবার জন্য আবদার করেনা। তোমার কাছে তাদের আবদার থাকে খেলনা, মিষ্টি, কাপড়, সাইকেল এবং এরকম অনেক কিছুর ও তুমি তাদেরকে সেগুলো কিনে দিতেও পারো। কিন্তু এগুলো এমন কোন জিনিস নয় যা তোমার জীবনকে উল্লাসময় করে তুলতে পারে।
 
আমি তার কাছে শুধু তখনই টাকা চাইতাম যখন আমি অনেক বই কিনতে চাইতাম। আমি আর কোনকিছুর জন্য তার কাছে টাকার জন্য আবদার করিনি। আর তাকে আমি এও বলেছি,
 
“যখন আমি বইকেনার জন্য টাকা চাইব তখন তোমার উচিত হবে ভালোয় ভালোয় সেই টাকাটা আমাকে দিয়ে দেওয়া।”
 
পরক্ষণেই সে বলল, “এর মানে কী! তুমি কী বোঝাতে চাইছ?”
 
আমি তখন বললাম, “সোজাসুজিভাবে আমি বোঝাতে চেয়েছি যে, যদি তুমি আমাকে বই কেনার টাকা না দাও তাহলে আমাকে টাকা চুরি করতে হবে। আমি মোটেই একজন চোর হতে রাজি নই, কিন্তু তুমি যদি আমাকে বাধ্য করো তাহলে আমার কাছে চুরি করা ছাড়া আর কোন রাস্তা নেই। তুমি জানো যে, আমার কাছে কোন টাকা নেই, আর আমার এই বইগুলো খুব প্রয়োজন এবং যেকোন মূল্যেই হোক এগুলো আমি সংগ্রহ করবোই এটাও তুমি বেশ ভালো করেই জানো। সুতরাং, যদি আমাকে টাকা না দেওয়া হয় তাহলে আমাকে তা চুরি করেই নিতে হবে। সেইসাথে এও মনে রেখো যে, এটা থাকবে তুৃমি যে আমাকে চুরি করতে বাধ্য করেছে।”
 
সে তৎক্ষনাৎ বলল, “থাক, থাক বাবা, তোমার আর চুরি করে কোন কাজ নেই। যখন তোমার টাকা লাগবে তুমি আমার কাছে এসে নিয়ে যেও।”
 
তখন আমিও তাকে আশ্বস্ত করে বলি যে, “তুমি নিশ্চিন্ত থাকো এই ব্যাপারে যে, যখনই আমি টাকা চাইব তা কেবল বইয়ের জন্য অন্য কিছুর জন্য নয়।”
 
তাছাড়া তার নিশ্চয়তার কোন দরকার ছিলোনা কেননা সে তার চোখের সামনে বাড়িতে একটা লাইব্রেরি গড়ে ওঠা দেখতে লাগল। ধীরে ধীরে ঘরের ফাঁকা জায়গা ভরাট হয়ে যেতে লাগল ও সেখানে বইয়ের জায়গা ছাড়া আর কোন জায়গাই খুঁজে পাওয়া মুশকিল হয়ে পড়ল।
 
এই দেখে আমার বাবা বললেন, “হাহ্! প্রথমে আমাদের বাড়িতে একটা লাইব্রেরি ছিল, আর এখন আমাদের একটা লাইব্রেরি আছে যার ভেতরে একটা ঘর আছে! কেবল এগুলোই নয় তোমার এই সকল বইয়ের ভান্ডারকে আমাদের রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়। কারণ তোমার বইয়ের কিছু হলে তুমি যা কান্ডকারখানা আরম্ভ করে দাও কী বলব আর! তোমার বইয়ের সম্ভার দেখে লোকেরা রীতিমত আতঙ্কিত হয়ে যায় কেননা এগুলো দিয়ে সব জায়গা ভরে গেছে ও কেউ যখন ঘরে আসে তখন তার বইয়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়া ছাড়া তার কোন উপায় থাকেনা এবং তোমার জ্বালাযন্ত্রণাও শুরু হয়ে যায়। তাছাড়া ছোট ছোট বাচ্চারাও তো রয়েছে…!”
 
আমি বললাম, “ছোট ছোট বাচ্চারা আমার কাছে কোন সমস্যা নয়। সমস্যা হল গিয়ে বয়স্ক শিশুদের নিয়ে৷ কেননা ছোট শিশুদেরকে আমি এতটাই সম্মান করি যে, তারা আমার বইয়ের প্রতি খুবই যত্নশীল আচরণ প্রদর্শন করে। অবাক করার মত ব্যাপার এই যে, আমার সকল ছোট ভাই ও বোনেরা সবাই আমার বইয়ের ব্যাপারে খুব খেয়াল রাখত যখন আমি সেখানে থাকতাম না। কেউ আমার বই ছুঁতে পর্যন্ত পারত না। আর তারা বইগুলোকে পরিষ্কার করে সেগুলোকে সঠিক জায়গায় গুছিয়ে রাখত যেখান থেকে আমি ওগুলোকে বের করেছিলাম যাতে করে যখন আমার বইগুলোকে দরকার পড়বে তখন যেন আমি সেগুলোকে সঠিক জায়গায় খুঁজে পাই। এবং এটা খুব সোজা হিসাব যে, আমি তাদেরকে এতটাই সম্মান করতাম যে, তারা আমার বইগুলোর যত্ন করেই সে সম্মানের প্রতিদান আমাকে নিজ থেকে দিত।”
 
আমি এইমাত্র বলছিলাম যে, “আসল সমস্যা হল বয়স্ক শিশুরা – আমার কাকা, কাকী, ফুফু, আমার বাবার শ্যালক এরাই হল সেই লোকজন যাদের নিয়ে যত সমস্যা। কারণ কেউ আমার বইয়ে দাগ দিক বা আন্ডারলাইন করুক তা আমি মোটেই পছন্দ করতাম না। আমার বইয়ে অন্যকেউ আন্ডারলাইন করুক এটা আমি মোটেই গ্রাহ্য করতে পারতাম না।
 
আমার বাবার এক শ্যালক ছিলেন যিনি ছিলেন একজন অধ্যাপক। যেহেতু তিনি একজন অধ্যাপক ছিলেন তার একটা অভ্যাস ছিল আমার বইয়ের ওপর নিজের নোট লিখে রাখা। আমি তাকে শেষমেষ বলতে বাধ্য হয়েছিলাম যে, এটা কেবল অসদাচরণ, অসভ্যতামী নয়; এটা প্রমাণ করে যে আপনি কেমন মনের অধিকারী। আমার কাছে বই শুধু বই নয়, বরং আমার কাছে এটা একটা ভালোবাসার সম্পর্ক।
 
তাই যদি আপনি আমার কোন বইয়ে আন্ডারলাইন করে থাকেন তাহলে আপনাকে এরজন্য টাকা দিতে হবে ও আপনি সে বইকে আপনার সাথে করে নিয়ে যাবেন। কেননা এরপর আমি আর এটাকে আমার চোখের সামনে দেখতে চাইনা। কারণ একটা নোংরা মাছ সমস্ত পুকুরকে নোংরা করে ফেলতে পারে। আমি কোন বইকে ধর্ষিত হতে দিতে চাইনা – আপনি মানে মানে ঐ আন্ডারলাইন করা বই নিয়ে কেটে পড়ুন।
 
সে তার সাথে করা আমার এই আচরণে খুব রেগে যায়। কেননা সে তো এসবের কিছুই জানেনা।
 
আমি বললাম, “আপনি আমাকে বুঝবেন না যেহেতু আপনি আমার সাথে অতটাও পরিচিত নন। আপনি বরং আমার বাবার সাথে এ নিয়ে কথা বলুন।”
 
অতঃপর আমার বাবা তাকে বললেন, “আসলে ভুলটা আপনারই। কেন আপনি ওর বই আন্ডারলাইন করতে গেলেন? কেন আপনি তার বইয়ের ওপর নোট লিখতে গেলেন? এতে করে আপনার কী লাভ হয়েছে? বইগুলো তো ওর লাইব্রেরিতেই পড়ে থাকবে। তাছাড়া আপনি ওর কাছ থেকে অনুৃমতিও নেননি যে আপনি তার বই পড়তে চান।”
 
তুমি আশ্চর্য হয়ে যাবে যে, যখন আমি মেট্রিকুলেট পাশ করে বেরিয়েছি সেসময় আমার হাজারেরও ওপর বই পড়া হয়ে গিয়েছিল। কাহলিল জিবরান, দস্তয়েভস্কি, তলস্তয়, চেখভ, গোর্কি, তুর্জেনিভ এদের সবাইকে আমার ততদিনে পড়া হয়ে গেছে। যখন আমার ইন্টারমিডিয়েট শেষ হয় তখন আমার সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টটল, বারট্রান্ড রাসেল ইত্যাদি যতরকম দার্শনিকদের আমি যে যে লাইব্রেরিতে বইয়ের দোকানগুলোতে বা কারো কাছ থেকে ধার নিয়ে পেরেছি সংগ্রহ করে পড়ে শেষ করে ফেলেছিলাম।
 
ওশো বই পড়া কেন থামিয়ে দিলেনঃ
 
একজন ইন্টারভিউয়ার ওশোর বইপড়া থামিয়ে দেবার ব্যাপারে প্রশ্ন করছেন –
 
ইন্টারভিউয়ারঃ কেন আপনি ১৯৮০ সালের দিকে বইপড়া বাদ দিয়ে দিলেন? তাহলে কীভাবে আপনি এই দুনিয়ার ঘটনাবলির ব্যাপারে সবসময় আপডেটেড থাকেন? আমি শুনেছি যে, আপনি সিনেমা দেখতে পছন্দ করেন এবং মাঝে মাঝে তা সময় পেলে দেখেনও। এটা কী সত্যি?
 
ওশোঃ মাঝে মাঝে দেখি, কারণ আমি আর এখন তেমন বইটই পড়িনা। অন্যথায়, সম্ভবত আমি এই দুনিয়ার সবচেয়ে বেশি শিক্ষিত লোকের পর্যায়ে পড়তাম। আমার ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে প্রায় দেড়লক্ষের মত অতি মূল্যবান বই রয়েছে এবং আমি ক্রমাগত পড়ার মধ্যে ছিলাম…কিন্তু অবশেষে যখন আমি আমার সত্যকে খুঁজে পেলাম তখন সেই বইগুলোকে আমার কাছে আবর্জনা স্তুপের মত মনে হতে লাগল। ধীরে ধীরে সেগুলো অর্থহীন হয়ে উঠতে লাগল। মাঝে মাঝে দুই একটা বইয়ের পাতা একটু উল্টিয়ে পাল্টিয়ে দেখা হয় যার কিছু গুরুত্ব আছে। কিন্তু বইপড়া আমি পাঁচবছর আগেই থামিয়ে দিয়েছি। অনেক হয়েছে আর না। তুমি একশ বই পড়বে, তারপর দেখবে যে, সেগুলোর ভেতর থেকে একটি কী দুটি বই পাবে যা আসলেই অর্থপূর্ণ। আর সেগুলোও আমার জাগরুকতা, আমার সত্তাকে পরিপুষ্টি প্রদান করার জন্য যথেষ্ট নয়৷ তাই, পাঁচ বছর যাবৎ আমি কোনকিছুই পড়িনি; সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশন এগুলো থেকে প্রাপ্ত কোন খবরাখবরই আমি রাখিনি। কালেভদ্রে কোনদিন যদি আমার সন্যায়াসীনরা কোন ফিল্ম দেখে ও তা যদি তাদের কাছে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে হয় তখন আমি সেটা দেখি৷ কিন্তু সেই দেখাটা হল অমাবস্যা চাঁদের মত, প্রায় হয়না বললেই চলে। উদাহারণস্বরূপ, দস্তয়েভস্কি’র ব্রাদার্স কারামাজোভের কথা বলা যেতে পারে। যখন এটা নিয়ে সিনেমা হল তখন আমি এটা দেখেছিলাম। কারণ আমি এই বইকে পবিত্র বাইবেলের থেকেও অতি মূল্যবান বলে মনে করি। এটি এতটাই অন্তর্দৃষ্টিতে পরিপূর্ণ একটি বই। সুতরাং, মাঝে মাঝে এটা ঘটে যে তাদের কাছে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে ও হয়তো এটা আমার আগ্রহ জাগাবে এমনকিছু তারা আমার কাছে নিয়ে আসে তখন আমি তা দেখি। কিন্তু এটি খুব কমই ঘটে।
 
 
0Shares

নাজিউর রহমান নাঈম

আমিকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। কিন্তু সে যে কোথায় লুকাইলো ও এই লোকটি যে তা বড় আশ্চর্যের বিষয়! আমি হারিয়ে যা হল একে কীই-বা বলা যায় বলুন। এখন যাকে দেখছেন সে তো অন্য কাজ করে বেড়াচ্ছে, তার পরিচয়ও নিশ্চয়ই বদলে গেছে। তাহলে আপনি কাকে দেখছেন? দেখছেন আপনাকে আপনার চিন্তাকে যা আপনাকে আমাকে দেখাচ্ছে বা কল্পনা করাচ্ছে। তাহলে শুধু শুধু পরিচয় জেনে কী হবে বলুন। তার চেয়ে বরং কিছু সাইকোলাপ-ই পড়ুন ও নিজেকে হারিকেন নিয়ে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ুন। পথিমধ্যে হয়ত কোথাও দেখা হয়েও যেতে পারে!!! সে পর্যন্ত- কিছু কথা পড়ে থাকুক জলে ভেজা বিকালে খুঁজে চলুক এই আমি পিলপিল করে অনন্ত "আমি" র অদৃশ্য পর্দার আড়ালে

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *