একটি দেশ যেভাবে দাঁড়ায়

বইয়ের নামঃ একটি দেশ যেভাবে দাঁড়ায়
লেখকের নামঃ রউফুল আলম
পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ১৯১

“শিক্ষা যদি একটি জাতির মেরুদন্ড হয়, তাহলে শিক্ষাঙ্গনগুলো সে মেরুদন্ডের কশেরুকা। কশেরুকা দুর্বল হয়ে গেলে যেমন মানুষের মেরুদন্ড দুর্বল হয়ে যায়, মানুষ সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না, তেমনি শিক্ষাঙ্গন দুর্বল হয়ে গেলে একটা জাতি শির উঁচু করে ঋজু হয়ে দাঁড়াতে পারে না।”

এই বইয়ের মূল বিষয়টি এতে লেখা এ কথাগুলোর উপর দাঁড়িয়ে আছে। আসলেই তো একটি জাতির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যত উন্নত হয় সেখানে তত শিক্ষিত মানুষ গড়ে ওঠে। কিন্তু আমাদের এই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যে শোচনীয় অবস্থা তা লেখকের বিদেশী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বর্ণনা শুনে হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যায়। একটি দেশ গড়ার জন্য সে দেশের মানুষকে শিক্ষিত করা ছাড়া উপায় নেই। অথচ যখন এসব ক্ষেত্রে দুর্নীতি তার শেকড় গেঁড়ে বসে তখন একটি দেশ দাঁড়ানো তো দূর সে আরও কুঁজো হয়ে যায়।

এখন এ কুঁজো হয়ে যাওয়া অবস্থা থেকে কীভাবে একটি দেশ আবার দাঁড়াতে শেখে ও তার উপায় কী হতে পারে সেসব ব্যাপার নিয়েই লেখকের এ বইটি।

একটি দেশ দাঁড়ায় তার শিক্ষার জোড়ে, জ্ঞানের আলোতে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যেসব দেশ আজ মাথা তুলে দাড়িয়েছে তারা মূলত এ শিক্ষা ও জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হয়েই দাড়িয়েছে।

ভাবতে গেলে অবাক হতে হয় লেখকের বইয়ে উল্লেখ করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবেশ আর আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবেশ ও শিক্ষকদের অবস্থা দেখে। অন্যসব ক্ষেত্রে দুর্নীতি হলেও হতে পারে কিন্তু শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতি কোনক্রমেই মেনে নেওয়া যায় না অথচ এটাই প্রতিনিয়ত হচ্ছে। এটা হবার যথেষ্ট কারণও রয়েছে যারা আসলেই শিক্ষিত তারা প্রশ্ন করে, চিন্তা করে ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান।

তাই শিক্ষার আলো জ্বালানোতে সমস্যা আছে কেননা এ আলোয় অন্ধকারের বসে থাকা কুচক্রীদের কালো হাত দিবালোকে বেরিয়ে আসবে এবং এটা তারা চান না। তাই শিক্ষার এই বেহাল দশা!! এ থেকে বোঝা যায় উপযুক্ত শিক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থা কতটা গুরুত্বপূর্ণ একটি জাতির জন্য। লেখক তার বইয়ে এ কথাটি বারবার বলে গেছেন। আর যে কথাটি বলেছেন তা হল গবেষণার কথা।

গবেষণার যে কী মূল্য ও তাৎপর্যপূর্ণতা তা লেখকের বইটি থেকে বোঝা যায় অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ নাকী গবেষণা না করে রাজনীতি করেন!!! এটা আসলেই দুঃখের। এসব সমস্যার কথাই লেখক শুধু বলে যাননি। তিনি এখান থেকে বেরিয়ে আসার উপায়ও বলেছেন; বলেছেন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠানে কী কী থাকলে তাকে আসলেই বিশ্ববিদ্যালয় বলা যেতে পারে।

আমাদের বিশ্বটা এখন আর আলাদা নেই, তথ্য-প্রযুক্তির ছোঁয়ায় তা হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক। তাই আমাদের শুধু নিজেরটা নিয়ে পরে থাকলে চলবে না, বিশ্ব নিয়েও ভাবতে হবে। অন্য সকল জায়গায় কী কী হচ্ছে তা ভেবে দেখার দরকার আছে। না হলে আমরা তাল মিলিয়ে চলতে পারব না।

অন্যান্য দেশগুলোতে দেখা যায় তাদের দেশের হাজার হাজার শিক্ষার্থীদের সরকারী খরচে বাইরের দেশে গবেষণার জন্য পাঠানো হয় এবং ঐখান পরবর্তীতে গবেষণা শেষে উপযুক্ত মর্যাদা দিয়ে তাদের দেশে তাদেরকে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে দেশের মেধা পরিচর্যার কাজে লাগানো হয়। এসব ক্ষেত্রে দেখা যায় চীন ও ভারতের বহু শিক্ষার্থী রয়েছে। তারা বাইরের দেশ থেকে গবেষণা করছেন ও উন্নত হয়ে দেশের জন্য কাজ করছেন।

আর আমাদের বিদেশে থাকা মেধাবী তরুণেরা দেশে এসে কিছু করতে চাইলে তাদের যথাযথ সম্মানটাই দেওয়া হয় না। তাদের ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হয় না। দেশের শিক্ষার মান উন্নত করতে হলে এসব মেধাবী তরুণ তরুণীদের দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। এর পাশাপাশি উপযুক্ত গবেষণা করার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। শিক্ষকদের রাজনীতি বাদ দিয়ে ক্লাসে ফিরে যেতে হবে।

শিক্ষার্থীদেরকে বাইরে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ করে দিতে হবে। শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক নেতানেত্রীদের ছবি ও পোস্টারের বদলে মহৎ কীর্তিমান মনীষিদের ছবি থাকতে হবে যাতে করে শিক্ষাঙ্গণে এসব কীর্তিমান মানুষের কীর্তি সর্বদা অনুপ্রেরণা সুবাস ছড়িয়ে বেড়ায়। কেননা লেখক তার বইয়ের এক জায়গায় বলেছেন যে বড় হতে গেলে বড় মানুষদের সাহচর্যে ও তাদের স্মরণে রাখা প্রয়োজন।

এ বইয়ের “সম্ভাবনার দুয়ারে আছ দাঁড়িয়ে”- এ অংশে লেখকের বলা বিষয়টি খুবই ভালো লেগেছে। তিনি এখানে ইন্টারনেটকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে জ্ঞান রপ্ত করার কথা বলেন।

আসলে আমরা যদি ৫ বছর আগের কথাও চিন্তা করি তখন ইন্টারনেট এত সহজলভ্য ছিল না, এখন যতটা না আছে। আমরা চাইলেই ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞানঅর্জন করতে পারি। বিভিন্ন দেশের ভাষাও চাইলে শিখতে পারি সহজেই। শুধু দরকার ইচ্ছাশক্তি। এই ইন্টারনেটে বিদেশে কী কী গবেষণা হয় তা বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশ হয় তা আমরা চাইলেই পড়তে পারি।

এটাই হল গ্লোবালাইজেশনের ক্ষমতা। এই সুযোগগুলোকে পায়ে ঠেলা ঠিক নয়। “Google Scholar” বলে একটা বিষয় আছে ওখানটায় বিভিন্ন বিষয়ের ওপর রিসার্চ পেপার পাওয়া যায়। চাইলে আমরা সেখান থেকেই পড়তে পারি। তাই হতাশ না হয়ে আমরা এ প্রযুক্তির আশীর্বাদকে কাজে লাগানোর মাধ্যমে নিজেদেরকে শক্তিশালী করতেই পারি। তাই আমার দ্বারা কীই- বা হবে এটা ভেবে বসে থাকার কারণ নেই। যা আছে তার ভেতর থেকেই শ্রেষ্ঠটা বের করে আনার চেষ্টা করতে হবে। এইক্ষেত্রে বইয়ের শুরুতে একটি আফ্রিকান প্রবাদ রয়েছে। প্রবাদটি এরকম-

“If you think you are too small to make a difference, you haven’t spent a night with a mosquito.”

অর্থাৎ, যদি তুমি মনে কর তোমার কাজে কিইবা আর আসবে যাবে, তাহলে তুমি একটি মশার সাথে রাতই কাটাওনি।

একটি ছোট্ট মশার কামড়ের জন্য মানুষের ঘুমের তেরটা বেজে যায়। তাহলে আমাদের ছোট ছোট কাজও একদিন বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

এছাড়াও আমাদের ছোট ছোট শিশুদের তাদের জীবনের শুরুতে শিক্ষার করুণ দশা ও জিপিএ ফাইভের জন্য যে কী অবর্ণনীয় কষ্ট স্বীকার করতে হয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। শিশুদের প্রশ্ন করতে শেখানো হয় না বরং উত্তর মুখস্থ করতে বলা হয়।

কিম্ত মাঝে মাঝে উত্তরের থেকেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াতে পারে একটি সুন্দর প্রশ্ন। কারণ প্রশ্ন কৌতূহল বজায় রাখে আবিষ্কারের প্রতি নেশাটা বাড়িয়ে দেয়। আর উত্তর বসে বসে বইয়ের প্রশ্নের উত্তর গেলা প্রশ্নকে রুদ্ধ করে দেয় ও কলুর বলদ বানিয়ে দেয়। এবং একটি শিশু যদি এরকম পরিবেশের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠে তাহলে তার অঙ্কুরেই বিনাশ ঘটে যায়। এসব সমস্যার কথা লেখক বেশ আফসোস ও কষ্টভরেই বলেন।

এ বইতে রয়েছে জাহিদ হাসান, সাইফ সালাউদ্দিন, সাইফ ইসলাম, ফজলুর রহমান খান, মনিরুল ইসলাম এসব বাংলাদেশী মেধাবী মানুষদের উজ্জ্বল সব দৃষ্টান্তের উদাহারন।

আরও রয়েছে জাপান, চীন, সিঙ্গাপুর, ভারত, আমেরিকা, দক্ষিণ কোরিয়া, ইউরোপ এসব দেশগুলোর শিক্ষাব্যাবস্থা ও এসব ব্যাপারে তাদের মনোভাব। এসব থেকে আসলেই অনেক কিছু শেখার আছে।

জাপানে পরপর দুটো পারমাণবিক বিস্ফোরণের পরও মাত্র ২০ বছরের মাথায় যেভাবে মাথা তুলে দাড়িয়েছিল তা হল তাদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও শিক্ষা অর্জনের অদম্য স্পৃহা এমনকী তা যদি তার শত্রু দেশের থেকেও হয় তবে তাই। এখান থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটা পাওয়া যায় যে, শিক্ষার ব্যাপারে নো কমপ্রমাইজ। শত্রু হলেও তার কাছে শেখার অনেক কিছুই থাকতে পারে।

এখানে অহং দেখিয়ে কোন লাভ নেই বরং ক্ষতি। অন্যান্য দেশ অন্য দেশ থেকে ভালো কিছু, উপকারী ও কাজের জিনিস আহরণ করে কাজে লাগায়। আমরা করি তার উল্টো আমরা তাদের অন্য সবকিছুই গ্রহণ করি যা কোন কাজের না আর যেটা কাজের যা কীনা শিক্ষা, উদ্ভাবনী পদ্ধতি, গবেষণা ইত্যাদি নিতে পারি না। আমরা যেদিন চাঁদে পৌঁছবো সেদিন অন্যান্য দেশ নেপচুন, প্লুটো থেকে আমাদেরকে টেলিস্কোপ দিয়ে খুঁজবে ও ভাববে এলিয়েনগুলো এত স্লো কেন!!!

আসলে আমরা মোটেই স্লো নই কিন্তু দুর্নীতি সকল উন্নতির পথে অন্তরায়। চাইলেই এ বইয়ে দেওয়া পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন পথে অগ্রসর হওয়া যায় এবং তা ব্যাপক অগ্রগতি সাধন করতে পারে। তাই এ ব্যাপারে আমাদের প্রত্যেকের সচেতন হওয়া উচিত।

আমাদের শিক্ষার নাজেহাল দশা হলেও আমরা শিক্ষার্থীরা যাতে আমাদের দিক থেকে যতটা পারা যায় ততটা যেন আমরা করি ও হতাশা আসবে কিন্তু তারপরও তাতে প্রভাবিত না হয়ে, আত্মহত্যার পথ বেছে না নিয়ে যেন আশার মশাল জ্বালিয়ে রাখতে পারি লেখক তারই প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। তাই ছোট পদক্ষেপ হলেও যেন আমরা নিতে শিখি। কেননা লাওৎসু বলেন,

“A journey of thousand miles begins with a single step.”

“সহস্র মাইলের যাত্রা একটি পদক্ষেপ ফেলার মধ্য দিয়েই শুরু হয়।”

0Shares

নাজিউর রহমান নাঈম

আমিকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। কিন্তু সে যে কোথায় লুকাইলো ও এই লোকটি যে তা বড় আশ্চর্যের বিষয়! আমি হারিয়ে যা হল একে কীই-বা বলা যায় বলুন। এখন যাকে দেখছেন সে তো অন্য কাজ করে বেড়াচ্ছে, তার পরিচয়ও নিশ্চয়ই বদলে গেছে। তাহলে আপনি কাকে দেখছেন? দেখছেন আপনাকে আপনার চিন্তাকে যা আপনাকে আমাকে দেখাচ্ছে বা কল্পনা করাচ্ছে। তাহলে শুধু শুধু পরিচয় জেনে কী হবে বলুন। তার চেয়ে বরং কিছু সাইকোলাপ-ই পড়ুন ও নিজেকে হারিকেন নিয়ে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ুন। পথিমধ্যে হয়ত কোথাও দেখা হয়েও যেতে পারে!!! সে পর্যন্ত- কিছু কথা পড়ে থাকুক জলে ভেজা বিকালে খুঁজে চলুক এই আমি পিলপিল করে অনন্ত "আমি" র অদৃশ্য পর্দার আড়ালে

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *