ইশক – এর তিন রাস্তা

প্রথম রাস্তাঃ “শুধু তুমি, তুমি-ই সব”

ইশক এর যে রাস্তা তার ভেতর একটি হলো তুমি শুধু তুমি। এ অবস্থায় একজন খোঁজি মানুষ তুমির মাধ্যমে সেই পরমসত্তাকে অনুভব করে। আমার ‘আমি’ সে তার বৃহৎ ‘তুমি’ এর মাঝে হারিয়ে ফেলে। চারপাশে শুধু সে তাকেই দেখতে পায়। তুমির মাঝে সে তার আপনসত্তা কে ছুঁয়ে ফেলে। আর এ তুমিময়তা থেকে ভালোবাসার গান তৈরী হয়। এ পৃথিবীতে যত ভালোবাসার গান তৈরী হয়েছে তা এই তুমি কে কেন্দ্র করে। যার তুমি যত বৃহৎ সে ততই পরমসত্তার দিকে তলিয়ে যেতে থাকে।

তোমার মাঝে আমি আমাকে হারিয়ে ফেলেছি। তোমার সত্তাতে আমার সত্তা অর্পন করে দিয়েছি। তাই আমি আজ আর নেই চারদিকে তুমি শুধু তুমি। চারপাশে শুধু তোমার অস্তিত্ব। এই তুমিময়তা কোন সম্পর্কের বিচ্ছেদে নষ্ট হয় না। এ তুমি পুরো বিশ্বকে ঘিরে, আবার কোন কোন ক্ষেত্রে কোন ব্যক্তিকে ক্ষেত্র করেও ঘটতে পারে। এই ক্ষেত্রে কোন ব্যক্তি তার প্রিয় কে এতটাই ভালোবেসে ফেলে তার মাঝেই তার সমস্ত অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়।

এমনকী তার প্রিয় এর সাথে বিচ্ছেদ এ দুনিয়াতে ঘটলেও অন্তরে তার প্রিয় অর্থাৎ তার ‘তুমি’ নামক বিষয়ে সে যে তার জীবন অর্পন করেছে তা চির বিরাজমান থাকে আর যার ফলে তার অনুপস্থিতিতেও সে তার উপস্থিতি তার হৃদয়ে উপলব্ধি করে। এজন্যই মীরা কৃষ্ণের প্রেমে, মজনু লায়লীর প্রেমে নিজেকে দেয় বিসর্জন।

অথচ বাস্তবিকভাবে তারা দুজন দুজন থেকে যোজন দূরে, কিন্তু তারা সেই তুমিময়তা দিয়ে তাদেরকে সর্বসময় উপলব্ধি করেছে। আর এজন্যই হয়ত রামকৃষ্ণ পরমহংসের ইহধাম ত্যাগ করার পরও সারদা দেবী কাঁদেননি। তিনি বলতেন সে তো মরেননি, আমি কেন কাঁদবো।’ তুমি’ র ভালোবাসা এমনই তা অনন্ত। এই তুমি যে কোনকিছুকে ঘিরে হতে পারে। আর এই ‘তুমি’ প্রেমে মত্ত হয়ে জালালউদ্দীন রুমী লিখেছিলেন তাঁর “মসনবী শরীফ”।

আর এই তুমি প্রেমে নিজের সত্তা যখন বিলীন হয়ে প্রেমিক পরমসত্তাকে ছুঁয়ে ফেলে তখন সে ভগবত্ত প্রাপ্ত হয়। আর ঐ অবস্থা থেকেই হয়ত মনসুর আল হাল্লাজ বলেন, ” আনাল হক্ব”- ” আমিই সত্য”। এ ইশক্ এ ‘আমি’ হয়ে যায় “নাই”, আর ‘তুমি’ হয়ে যাও সব।

দ্বিতীয় রাস্তাঃ “আমি শুধুই আমি; আমিই সব”

আমি কে? দুই লাইনের প্রশ্ন কিন্তু জবাবের তল খুঁজে পাওয়া মুশকিল। রমণ মহর্ষি এ প্রশ্ন দিয়েই শুরু করেছিলেন তাঁর যাত্রা। আরো অনেকের যাত্রায় ছিলো এই প্রশ্ন। ব্যাপারটা কেমন অদ্ভুত? আমরা এত কিছু জানি, অথচ জানি না আমি কে? জানাটা এত সহজও নয়। কিন্তু খোঁজ তো করা যেতেই পারে, উত্তরের জন্য নয় কেবল খোঁজার জন্য খোঁজা। এই আমিই তো ভালোবাসা, এই আমিই তো সব। কিন্তু আমি তো আমাকে অনুভব করতে পারি না। আমাকে ভালোবাসতে পারি না। আমার ‘আমি’ টা বেশ ক্ষুদ্র। আমি বলি আমার বাড়ি, আমার গাড়ি, আমার সম্পদ, ইত্যাদি আরও কত কী। আমার ‘আমি’ এর গন্ডি অতি কৃপন। এই ‘আমি’ এর সীমা বাড়াতে হবে।

যে আমি শুধু একটি অংশ নিয়ে ব্যস্ত নয়। সে আমি সবজায়গায় ছড়িয়ে। প্রতিটি মানুষের মাঝে, প্রকৃতির মাঝে আমি আমাকে খুঁজে পাই। কেউ যখন কাঁদে তখন তার মাঝেও আমি আমাকেই দেখতে পাই৷ আমি অন্যের ভেতর দিয়ে সেই আমিকেই ভালোবাসি। এভাবে যখন সবকিছু ‘আমি’ এর মাঝে চলে আসতে থাকে, সীমা বাড়তে থাকে তখন ইশকের দুয়ার খুলতে আরম্ভ করে। ‘আমি’ যখন তাঁর ক্ষুদ্রতা থেকে বৃহৎ রূপ লাভ করতে থাকে, তখনই ভালোবাসার বাতাস বইতে আরম্ভ করে। এই ‘আমি’ একসময় বাড়তে বাড়তে এত বৃহৎ হয়ে যায় তা একসময় চূর্নবিচূর্ন হয়ে যায়।

আর এখানেই হয়তো আমি ‘আমি’ তে ডুবে যায়। এজন্য হয়ত মুনি ঋষিরা বলেছিলেন, ” অহম ব্রক্ষ্মাস্মি” – আমিই ব্রক্ষ্ম। আমাদের ‘আমি’ শুধু পরে থাকে একটি অংশ নিয়ে কেননা ঠিক তখনই নিজেকে কিছু বলে মনে হয়, তুলনার খেলা চালানো যায়, দ্বন্দ্বের খেলা চালানো যায়, প্রতিযোগিতা করা যায়। কিন্তু ‘আমি’-ই সব, আমি- ই সবকিছুর মাঝে, তা কী করে হয়!!! এখন আমি এখন কীভাবে তুলনা করি, কীভাবে দম্ভ করি,,,,, সবই যে আমি।

আর এখান থেকেই ইশক্ হয়। সবার মাঝে ‘আমি’ আমাকেই দেখি তখন যা হয় ইশক্ থেকে হয়। এই ইশক্ শুদ্ধ ‘আমি’ – এর ইশক। যেখানে পুরো বিশ্বই আমি; তখন কার সাথে আর যুদ্ধ করা যাবে কেবল ভালোবাসা ছাড়া।

তৃতীয় রাস্তাঃ “তুমিও নাই, আমিও নাই”

ইশক্-এর এ তিন নং রাস্তায় ‘তুমি’ ও ‘আমি’ এর ধারণা বিলীন হয়ে শূন্য হয়ে যায়। এ শূন্যতা বলতে একেবারে শূন্যতা নয়, বরং একে বলা যায় এক পরিপূর্ণ শূন্য। গৌতম বুদ্ধ যাকে বলেছিলেন নির্বাণ বা Nothingness। এ স্তরে এসে সবকিছু বিলীন। এ স্তরের ব্যাখ্যা আসলে ভাষা দিয়ে দেওয়া যায় না। এজন্যই রুমী বলেন, “Silence is the best language, other language are poor translation।” আগে বর্ণিত দুটি পথে আমি তুমিতে মিশে যায় ও তুমি আমিতে মিশে যায়। কিন্তু এই পথে সব বিলীন হয়ে গিয়ে সেখানে থাকে এক অখন্ড নীরবতা পরিপূর্ণ শূন্যতা। আর এখানেই পাওয়া যায় সবচেয়ে বিশুদ্ধ সে পরমসত্তাকে।

আমরা যদি সমুদ্রের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাব যে সেই সমুদ্রে অসংখ্য ঢেউয়ের খেলা চলছে। কোনটা ছোট কিংবা কোনটা বড়। এখন আমরা ধরে নিয়েছি আমরা সেই ছোট ও বড় ঢেউ। যে ঢেউ তার পাশের ঢেউয়ের থেকে বড় সে তার থেকে ছোট ঢেউকে বলে তুই ছোট, আমি তোর থেকে বড়। ঠিক এভাবে আরেকটা বড় ঢেউ আবার সেই ঢেউকে বলে তুই ছোট, আমি বড়। এভাবে খন্ড খন্ড ছোট বড় ঢেউয়ের মাঝে চলতে থাকে দ্বন্দ্ব।

একদিন সেই ঢেউগুলো তার মূল যে পানি তাতে সমূলে আছড়ে পড়ল তখন ঢেউগুলো বুঝতে পারলো কোথায় সেই আমি আর তুমি এতো অখন্ড সত্তা, পরিপূর্ণ সত্য যা থেকে আমি ও তুমি এর জন্ম; এ তো “পরম আমি”!!! এভাবেই সেই পরম আমি গহ্বরে কেউ যখন ঝাঁপ দিয়ে দেয় তখন সাধারণ ‘আমি’ ও ‘তুমি’ ঘুচে যায়। আর তারপর বলতে ইচ্ছে করে আমিও নাই, তুমিও নাই।

0Shares

নাজিউর রহমান নাঈম

আমিকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। কিন্তু সে যে কোথায় লুকাইলো ও এই লোকটি যে তা বড় আশ্চর্যের বিষয়! আমি হারিয়ে যা হল একে কীই-বা বলা যায় বলুন। এখন যাকে দেখছেন সে তো অন্য কাজ করে বেড়াচ্ছে, তার পরিচয়ও নিশ্চয়ই বদলে গেছে। তাহলে আপনি কাকে দেখছেন? দেখছেন আপনাকে আপনার চিন্তাকে যা আপনাকে আমাকে দেখাচ্ছে বা কল্পনা করাচ্ছে। তাহলে শুধু শুধু পরিচয় জেনে কী হবে বলুন। তার চেয়ে বরং কিছু সাইকোলাপ-ই পড়ুন ও নিজেকে হারিকেন নিয়ে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ুন। পথিমধ্যে হয়ত কোথাও দেখা হয়েও যেতে পারে!!! সে পর্যন্ত- কিছু কথা পড়ে থাকুক জলে ভেজা বিকালে খুঁজে চলুক এই আমি পিলপিল করে অনন্ত "আমি" র অদৃশ্য পর্দার আড়ালে

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *