আনাল হক্ক ও অহম ব্রক্ষ্মাস্মী – ওশো

গীতা দর্শন পর্যালোচনা – ওশো

গীতার বিভিন্ন অংশ নিয়ে ডিসকোর্স চলাকালে ওশো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে আলোকপাত করেন। বিষয়টি হলো এমন যে, কৃষ্ণ যখন “আমিই ব্রক্ষ্ম” এরকম বাক্য উচ্চারণ করে তখন যিশু কিংবা মনসুরের মত কৃষ্ণ শুলিতে চড়ে যাননা। বরং দেখা যায় তিনি পূজিত হন। অথচ মনসুর কিংবা যিশু তথা যারা একেশ্বরবাদী ধারাগুলোর অন্ঞ্চলে তাদের উপলব্ধিগুলো ব্যক্ত করেছেন তাদেরকেই হত্যা করা হয়েছে। তাদের মুখ দিয়ে উচ্চারিত এসব কথা তারা মেনে নিতে পারেনি।

বিষয়টা একটু আশ্চর্যের বটে!

একই ঘোষণা দুই অন্ঞ্চলে দুইভাবে গৃহীত হয়েছে এবং যারা এ উপলব্ধিগুলো ব্যক্ত করেছেন দুইভাবেই তাদের বলার মর্মার্থকে চাপা দিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে পূজো করাতে সমস্যা কোথায়? কৃষ্ণের কথা মেনে নিয়ে তো তাকে শ্রদ্ধাভক্তি জানানো হচ্ছেই, মনসুর কিংবা যিশুর মত তো আর তাকে এসব কথার জন্য তাকে হত্যা করা হচ্ছে না।

ওশো বলেন যে, কৃষ্ণকে ভারতবর্ষের মানুষেরা নিজেকে ব্রক্ষ্ম হিসেবে দাবী করবার জন্য এ কারণেই তাকে হত্যা করা হয়নি যে, এসব “অহম ব্রক্ষ্মাস্মী” বা “আমিই ব্রক্ষ্ম” এ ধরনের কথাগুলো কৃষ্ণের বহু আগে থেকেই ভারতবর্ষের মানুষেরা শুনে অভ্যস্ত ছিলো। এটা তাদের কাছে তেমন নতুন কিছু ছিলো না। তবে এটা তাদের কাছে বেশ প্রচলিত থাকলেও ও তারা এগুলো বারবার শুনে থাকলেও এর গূঢ়ার্থ অধিকাংশেরই বোধের মধ্যে ছিলো না। আর যা বোধে ধরা দেয়না তাকে পূজো করার মধ্যে দিয়ে ভগবান, অবতার, মহাপুরুষ বলে এতদূরে ঠেলে দেওয়া হয় যাতে নিজের ভেতরে থাকা সেই ভগবত্ব প্রাপ্তির বীজের বিকাশের জন্য যে সংগ্রাম করতে হবে তা যেন তাকে আর নিতে না হয়। এভাবেই কৃষ্ণ এ ঘোষণার মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছিলেন আমি যা হয়েছি তোমাদেরও সে সম্ভাবনা রয়েছে তোমরা তার দিকে ধাবিত হও।

কিন্তু বেচারা কৃষ্ণ, কে শোনে তার কথা। দেখালেন তিনি চাঁদ, লোকে দেখলো তার আঙ্গুল ও অন্ধ হয়ে তার আঙ্গুল ধরে পূজো দেওয়া শুরু করলো।

এখানে আরেকটি ব্যাপার উল্লেখযোগ্য যে, অমৃতের সন্তান, ব্রক্ষ্ম এসব বাক্যগুলো মানুষ শুনতে শুনতে তাদের ভেতরে মনের একটা স্বয়ংক্রিয় অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। আর যা অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায় তাতে জং ধরে যায়। এটা ইগোর একটা চমৎকার ফাংশন। যন্ত্রের মত কোনকিছুকে মেনে নিলে তার বেশ আরাম হয়। যার কারণে কৃষ্ণের ঘোষণা শুনে তাকে শূলে চড়ানোর কষ্ট করার থেকে বরং অবতার বানিয়ে অন্ধ হয়ে পূজো দিলে একটা তাকে কাছে রাখার ভান করে বহু দূরে সরিয়ে দিয়ে সংগ্রাম থেকে পার পাওয়া যায়। কেননা পলায়নবাদীতা ইগোর একটি চমৎকার ফাংশন।

অপরদিকে ওশো মনসুর হাল্লাজের আনাল হক্ক নিয়ে বলতে গিয়ে বলেন যে, মনসুরের এই যে, ঘোষণা এটা উক্ত অন্ঞ্চলের মানুষের কাছে ছিলো নতুন। তাই এহেন ঘোষণা তাদের কাছে দাম্ভিকপূর্ণ বলে প্রতীয়মান হয়। অথচ মনসুরের আনাল হক্ক হলো তারই প্রকাশ যাকে তারা খোদা বলে মানে। কিন্তু এখানেও রয়েছে ইগোর হাত। কেননা এ ঘোষণা মেনে নিলে যে তার গড়া সমস্ত মিথ্যার জাল ও অনুসন্ধানে ব্যাপৃত না হবার সমস্ত ভুল স্বীকার করে নিতে হয়।

কিন্তু কেন নিবে তারা এ ঝামেলা?

তাই এ অকস্মাৎ ঘোষণা তাদের গড়া বাস্তবতাকে নাড়িয়ে দিয়েছিলো ও তার ফলস্বরূপ মনসুরকে তারা হত্যা করে।

আর একথা স্মরণে রাখা জরুরী যে, যার মাঝে ইগো প্রবল সে অধিকাংশ সময় অন্যকেই প্রবল ইগোর অধিকারী বলে দাবী করে বসে।

যিশুর ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। সেখানকার সংস্কৃত যিশুর মুখ দিয়ে এরকম বাণী শুনতে প্রস্তুত ছিলো না। তারা এটাকে গ্রহণ করতে কেননা এসব কথা ভারতবর্ষের মত অতটা প্রচলিত ছিলো না। যার কারণে যিশুকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়। ইগো যখন প্রবল হয় তখন এটা অন্ধ হয়ে যায়। এজন্যই যিশু ক্রুশে বিদ্ধ থেকে বলেছিলো, “হে ঈশ্বর ওদেরকে ক্ষমা করে দাও, ওরা জানে না যে ওরা কী করছে।” এই হলো ইগোর অন্ধত্ব।

এজন্যই ওশো বলেন যে, ইহুদীরা ও মুসলিমরা যিশু এবং হাল্লাজকে তাদের ঘোষণার জন্য হত্যা করে তাদের অনুসন্ধান থেকে পলায়ন করেছিল। অপরদিকে ভারতবর্ষের লোকেরা কৃষ্ণকে অবতার বানিয়ে পূজো করে তাদের থেকে বহুদূরে ঠেলে দিয়ে তাদের অনুসন্ধান থেকে রেহাই পেতে চেয়েছিল। আর এ জায়গাতে এসেই কৃষ্ণ, মনসুর, যিশু অসহায় কেননা পরমের পানে ইঙ্গিতের জন্য তাদের মত মানুষদের পক্ষে ভাষা সর্বকালেই একটা দ্বন্দ্বের মাঝে নিয়ে তাদেরকে ফেলে দিয়েছে। কিন্তু কিছু করার নেই সত্য তো কোন না কোন মাধ্যমে প্রকাশিত হবেই এতে যদি মৃত্যুও হয় তবুও; আর এখানেই সত্যের সৌন্দর্য।

0Shares

নাজিউর রহমান নাঈম

আমিকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। কিন্তু সে যে কোথায় লুকাইলো ও এই লোকটি যে তা বড় আশ্চর্যের বিষয়! আমি হারিয়ে যা হল একে কীই-বা বলা যায় বলুন। এখন যাকে দেখছেন সে তো অন্য কাজ করে বেড়াচ্ছে, তার পরিচয়ও নিশ্চয়ই বদলে গেছে। তাহলে আপনি কাকে দেখছেন? দেখছেন আপনাকে আপনার চিন্তাকে যা আপনাকে আমাকে দেখাচ্ছে বা কল্পনা করাচ্ছে। তাহলে শুধু শুধু পরিচয় জেনে কী হবে বলুন। তার চেয়ে বরং কিছু সাইকোলাপ-ই পড়ুন ও নিজেকে হারিকেন নিয়ে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ুন। পথিমধ্যে হয়ত কোথাও দেখা হয়েও যেতে পারে!!! সে পর্যন্ত- কিছু কথা পড়ে থাকুক জলে ভেজা বিকালে খুঁজে চলুক এই আমি পিলপিল করে অনন্ত "আমি" র অদৃশ্য পর্দার আড়ালে

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *