আত্মবিস্মৃতি – ওশো

ভারতে একটি প্রাচীন গল্প আছে। দশজন অন্ধ মানুষ একটি নদী পাড়ি দিবে৷ স্রোতের গতি ভীষণ তীব্র। তাই তারা একে অপরের হাত ধরল এবং অপরপ্রান্তে গিয়ে পৌঁছলো। অপরপ্রান্তে পৌঁছানোর পর তাদের মধ্যে থেকে থেকে একজন বললো যে, “আমাদের সবাইকে গণনা করা প্রয়োজন। স্রোত এত তীব্র ছিল এবং আমরা কেউই কাউকে দেখতে পাইনা, হয়তো কেউ নদীর সাথে ভেসে চলে গিয়ে থাকতে পারে।

অতঃপর তারা গণনা করল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, বারবার গণনা নয় সংখ্যায় এসে থেমে যাচ্ছে। প্রত্যেকেই গোণার চেষ্টা করলো কিন্তু প্রতিবারই তারা নয় সংখ্যাই পেল। নদীর পাড়ে বসে থাকা একজন মানুষ এই দেখে হাসতে আরম্ভ করে দিলো – কী মজার কান্ড। আর অন্যদিকে ওই অন্ধ দশজন সেখানে বসে থেকে চোখ দিয়ে কান্নার জল ফেলছে এই কারণে যে, তারা তাদের একজন সাথীকে হারিয়ে ফেলেছে। ঐই মানুষটি তাদের কাছে এগিয়ে এলো ও বললো, “কী হয়েছে এখানে?”

তারা তাদের অবস্থা সবিস্তারে ব্যাখ্যা করে লোকটিকে বললো। সে বললো, “তোমরা সবাই লাইন করে দাড়াও। এরপর আমি প্রথম ব্যক্তিকে আঘাত করলে তার বলতে হবে ‘এক’। তারপর আমি দ্বিতীয় ব্যক্তিকে আঘাত করলে তাকে বলতে হবে ‘দুই’ কেননা আমি তাকে দুইবার আঘাত করবো। আমি তৃতীয় ব্যক্তিকে তিনবার আঘাত করলে তাকে বলতে হবে ‘তিন’।”

অদ্ভুত ব্যাপার, সে দশম ব্যক্তিটিকে খুঁজে পেল যে হারিয়ে গিয়েছিল। তারা সবাই তাকে ধন্যবাদ দিল, তার পা জড়িয়ে প্রণাম করলো; তারা এও বললো যে, “আপনি আমাদের কাছে ভগবানের মত। আমরা ভেবেছিলাম যে, আমরা আমাদের একজনকে হারিয়ে ফেলেছি। কিন্তু দয়া করে আপনি আমাদেরকে একটু বলুন যে… আমরাও তো গণনা করেছিলাম; আমরা সবাই গোণার চেষ্টা করেছি কিন্তু দশম ব্যক্তিকে খুঁজে পাইনি৷ কীভাবে সে হঠাৎ করে হাজির হলো?”

লোকটি বললো, “এটা একটা অতিপ্রাচীন রহস্য, তোমরা ওসব বুঝবে না। তোমরা তোমাদের পথে রওনা করো।”

এরমাঝে কী এমন অতিপ্রাচীন রহস্য রয়েছে? একজন ব্যক্তি তার নিজের ব্যাপারে ভুলে যায়। প্রকৃতপক্ষে, একজন ব্যক্তি তার পুরো জীবন কাটিয়ে দেয় নিজেকে স্মরণ করা ছাড়াই। সে অন্য সবকিছুকেই দেখে, সে সবার সম্পর্কে জ্ঞান রাখে; কেবল সে নিজেকেই ভুলে যায়।

ধ্যান হলো একমাত্র পদ্ধতি যার মাধ্যমে তুমি নিজেকে ‘এক’ বলে গণনা শুরু করতে পারবে।

এর পাশাপাশি যেহেতু এটা ধর্মীয় কোন বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত নয় সেহেতু এতে কোন সমস্যা নেই। সমগ্র বিশ্বে, প্রতিটি স্কুলে, প্রতিটি কলেজে, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এটাকে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাড়ি ফিরে আসা যে কারোরই একটি গভীর, ধ্যানপূর্ণ সত্তা ও তার চারপাশে ধ্যানমগ্নতার বিভা নিয়ে ফিরে আসা উচিত। অন্যথায় সে যা নিয়ে ফিরে আসবে সেগুলো হলো নোংরা, আবর্জনা। ভূগোল সম্পর্কে সে জানে, সে জানে টিমবুকতু (Timbuktu) কোথায়, কনস্টান্টিনোপোল (Constantinople) কোথায় সে এটাও জানে – অথচ সে নিজে কোথায় সেটা জানে না!

0Shares

নাজিউর রহমান নাঈম

আমিকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। কিন্তু সে যে কোথায় লুকাইলো ও এই লোকটি যে তা বড় আশ্চর্যের বিষয়! আমি হারিয়ে যা হল একে কীই-বা বলা যায় বলুন। এখন যাকে দেখছেন সে তো অন্য কাজ করে বেড়াচ্ছে, তার পরিচয়ও নিশ্চয়ই বদলে গেছে। তাহলে আপনি কাকে দেখছেন? দেখছেন আপনাকে আপনার চিন্তাকে যা আপনাকে আমাকে দেখাচ্ছে বা কল্পনা করাচ্ছে। তাহলে শুধু শুধু পরিচয় জেনে কী হবে বলুন। তার চেয়ে বরং কিছু সাইকোলাপ-ই পড়ুন ও নিজেকে হারিকেন নিয়ে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ুন। পথিমধ্যে হয়ত কোথাও দেখা হয়েও যেতে পারে!!! সে পর্যন্ত- কিছু কথা পড়ে থাকুক জলে ভেজা বিকালে খুঁজে চলুক এই আমি পিলপিল করে অনন্ত "আমি" র অদৃশ্য পর্দার আড়ালে

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *