অমৃত এবং হলাহল (বুক রিভিউ)

বইটিতে রয়েছে ১৫টি গল্প। একেকটি গল্প একেকরকম ও ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে গল্পগুলো উপস্থাপন করা হয়েছে। শুরুর গল্পটি হল অমৃত এবং হলাহল। এ গল্পের প্রধান চরিত্র হলেন জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় যে কীনা কিছুক্ষণ বাদেই তার হাতের কব্জি কেটে ফেলবেন। তার এই শূন্যতা ভরা জীবনে কী তিনি মাঝপথে ঝুলে আছেন। কী অসহ্যকর যন্ত্রণা! এ যন্ত্রণাকে বিলীন করে দেয় যখন সে শুনতে ওায় বিতস্তা নামক এক সুন্দরী রমণীর ডাক। তার খেয়াল, যত্ন তাকে অভিভূত করে রাখে, তাকে ঘিরে জয়ন্ত এক সুখের নগরী তৈরী করতে চায়। তার কাছে বিতস্তা যেন অমৃত কিন্তু শেষ পর্যন্ত অমৃত কী আছে তার ভাগ্যে নাকী হলাহল? কে জানে!
 
টিকটিক টিকটিক
 
প্রতিদিনকার শহুরে ব্যস্ততা, সময়ে বাঁধা জীবন এসব করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যাওয়া আবিদের বিরক্তি অবসান সেই রেললাইনের প্লাটফর্ম। অধীর আগ্রহে বসে থাকা, মূল্যহীনতা, একটু চাওয়া পাওয়ার গল্প পড়তে পড়তে টিকটিক করে সময় বয়ে যায় আমাদের। তবে প্রতীক্ষার অবসান হয় কী কোনদিন!
 
অস্ত্র
 
ভদ্র কারা যারা মুখ বুজে সব মেনে নেয়? যারা উচ্চবাচ্য করে না। সবকিছুর সাথে কমপ্রমাইজ করে যায়। কেউ আমাকে বললেও আমি কিছু বলি না। এটাই কী আমার ভদ্রতা? আসলে কাউকে কিছু আমি বলতে পারি না। মুখ ফুটে কাউকে প্রেম নিবেদন করতে পারি। হায়! আমি কাপুরুষ। এটাই আমার ভদ্রতা। তবে আজকে আমি একটা অস্ত্র পেয়েছি এবার সেই অস্ত্রই হোক আমার স্বাধীনতা।
 
ছাপ
 
কয়েকজন বন্ধু মিলে রাজবাড়িতে ঘুরতে যায়। তারা বিভিন্ন জিনিস ঘুরে ঘুরে দেখে, বিস্মিত হয় এর কারুকার্যে, এর সৌন্দর্যে। কিন্তু কে বোঝাবে এ সৌন্দর্য এলো কোথা থেকে রাজবাড়ির আশপাশ যে সব মলিন হয়ে পড়েছে।
 
পাখি
 
অর্পা কিছুতেই খাবার খেতে চাচ্ছে না। মা তাকে বারবার জোড় করেও খাওয়াতে চাচ্ছে না। তার ইচ্ছা হয়েছে সে মুরগীর মাংস খাবে৷ একটু পরই তার বাবা আসে ছোট্ট একটা পাখি নিয়ে৷ পাখিটির মরো মরো অবস্থা। পাখিটিকে ঘিরে সেই রাতে কত কথার ফুলঝুড়ি চলে মিলি, অর্পা ও আনিসের মাঝে সে নিয়েই এই গল্প।
 
মাৎস্যন্যায়
 
প্রেম করা মানে মাছ ধরা। যেখানে একজন মাছ ধরে, একজন টোপ গিলে। সম্পর্কের ব্যাপারে চমৎকার কিছু সম্পর্ক কথাবার্তা উঠে এসেছে এ গল্পটিতে।
 
আত্মজার জন্য বিলাপ
 
তমিজউদ্দিনের মেয়ে আত্মহত্যা করেছেে। এতে তমিজউদ্দিনের শোক নেই। বরং তার মনে ঘটে চলেছে নানান ধরনের চিন্তা। এটা যেন এমন যে মরেছে সে তো পার পেয়ে গেল কিন্তু তমিজ তার কী হবে। সে এ যন্ত্রণা থেকে কীভাবে রেহাই পাবে? একটা আত্মহত্যাকারী মেয়ের লাশ নিয়ে গ্রামটির মানুষের মস্তিষ্কে যে ভাবনার আলোড়ন হয় তা উঠে এসেছে এ গল্পটিতে। গল্পের শেষে তমিজউদ্দিনের আর্তনাদ গল্পটিতে নতুন একটা মাত্রা যোগ করেছে। কীভাবে তা পাঠক পড়লেই বুঝতে পারবেন।
 
দুই বোন ও শিঙাড়া
 
গ্রাম্য দুইটি বোন ও একটি শিঙাড়ার গল্প। গ্রামীণ জীবনের চালচিত্র উঠে এসেছে এখানে। একটুখানি শখও কত মূল্যবান হয়ে ওঠে যখন তা দুষ্প্রাপ্য হয় এটা যেন খুঁজে পাই এ গল্প থেকে।
 
নরক গুলজার
 
ঢাকা শহরের জ্যামে বসে থাকা আর নরকে বসে একই কথা। এ বাসের ভেতরেই ঘটে যায় কত নিত্যনতুন কাহিনী। রাজনীতি, হাতাহাতি, পকেটমারি এমনসব বিচিত্র অথচ চেনা কাহিনীগুলো ভিন্ন আকারে চিত্রায়িত করা হয়েছে গল্পটিতে।
 
যেভাবে আমি নিজেকে খুন করি
 
যেদিন আমি নিজেকে খুন করি সেদিন আমি গোসল করি না। একটি পাপ ও হত্যার চিন্তা আমাকে নানারকম দার্শনিক প্রশ্নের দিকে ছুঁড়ে দেয়। হত্যা কী বৈধ না অবৈধ? এসব নিয়ে গল্পের চরিত্রটির মাথা খারাপ হয়ে যায়। তাহলে সে কাকে খুন করবে? সক্রেটিস, মনসুর আল হাল্লাজকে কে মারা হয়েছিল? নাকী তারা নিজেরাই বেছে নিয়েছিলেন মৃত্যুর পথ। তবে কী তারা আত্মহত্যা করেছিলেন। এরকম কিছু ইন্টারেস্টিং চিন্তার চালাচালি এ গল্পটিতে পাওয়া যায়।
 
সুশীল নাপিতের জীবন বৃত্তান্ত
 
জীবনপ্রবাহের স্রোতে একজন সুশীল নাপিতের জীবন কীভাবে একটু একটু করে ক্ষয়ে যায়। সময়ের পরিবর্তনে জীবনের পরিবর্তন কীভাবে সুশীক নাপিতের জীবনকে একটা নির্বিকার পরিণতির দিকে ঠেলে দেয় তারই কাহিনী এটি।
 
মহাপ্রাণ
 
পৃথিবীতে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ লেগে গেছে। কেউ বেঁচে নেই। চারদিকে মরা মানুষের গলিত লাশ, মৃত জীবজন্তুরা মরে এদিক সেদিক পড়ে আছে কেবল বেঁচে রয়েছে লেখক নিজে। লেখক এক গুহার ভেতর আটকা পড়ে গেছেন। আদিবাসী পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা নিয়ে একটা উপন্যাস লেখার জন্য এখানে তিনি এসেছিল সপ্তাহখানেক আগে। ঘুরতে ঘুরতে অরণ্যে ঢুকে তার একটা গুহার ভেতর আটকা পড়ে যান। এরপর ধীরে ধীরে লেখক কীভাবে গুহা থেকে বের হয়ে এ নিঃস্ব পৃথিবীতে আবার মহাপ্রাণের আশার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হন সেটার বিভিন্ন চিন্তনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি পাওয়া যাবে এ গল্পটিতে।
বাকী তিনটি গল্প নিয়ে কিছু আর বললুম না। পাঠকরা কিনে তা পড়ে নিবেন।
 
এই ১৫টি গল্পের মধ্য থেকে আমার ভালো লাগা তিনটি গল্প হল –
১. অমৃত এবং হলাহল (এটার শেষটা দারণ ছিল)
২. আত্মজার জন্য বিলাপ (তমিজউদ্দিন শেষের দিকের হাহাকার টা!)
৩. মহাপ্রাণ (উজ্জ্বল আগামী ভবিষ্যতের জন্য)
সবশেষে এ বইটির ১৫টি গল্পের মূল থিম ছিল এ জীবন, পরিবেশ, সমাজ,রাষ্ট্র, শহুরে মানুষের জীবনযাপনের চালচিত্র, সেইসাথে গ্রামের চালচিত্রও কিছুটা উঠে এসেছে। হতাশা, অস্তিত্ব নিয়ে টানাটানি, নৈরাশ্য এবং আশা আলোর সবকিছুর মিশ্রণ আলাদা আলাদ করে পাঠক এ গল্পগুলো থেকে তার তার মত করে উদ্ধার করতে পারবেন।
0Shares

নাজিউর রহমান নাঈম

আমিকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। কিন্তু সে যে কোথায় লুকাইলো ও এই লোকটি যে তা বড় আশ্চর্যের বিষয়! আমি হারিয়ে যা হল একে কীই-বা বলা যায় বলুন। এখন যাকে দেখছেন সে তো অন্য কাজ করে বেড়াচ্ছে, তার পরিচয়ও নিশ্চয়ই বদলে গেছে। তাহলে আপনি কাকে দেখছেন? দেখছেন আপনাকে আপনার চিন্তাকে যা আপনাকে আমাকে দেখাচ্ছে বা কল্পনা করাচ্ছে। তাহলে শুধু শুধু পরিচয় জেনে কী হবে বলুন। তার চেয়ে বরং কিছু সাইকোলাপ-ই পড়ুন ও নিজেকে হারিকেন নিয়ে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ুন। পথিমধ্যে হয়ত কোথাও দেখা হয়েও যেতে পারে!!! সে পর্যন্ত- কিছু কথা পড়ে থাকুক জলে ভেজা বিকালে খুঁজে চলুক এই আমি পিলপিল করে অনন্ত "আমি" র অদৃশ্য পর্দার আড়ালে

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *